ভাল্লাগেনা জেনারেশন – কেন আমাদের কোন কিছুই ভালো লাগে না?

Share

খানিক পর পর ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করছে মাঈশা। ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর ব্রেকাপ পার্টিতে এসেছে সে। নিজের আইফোনে এই মাত্র একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করলো মাঈশা। এক মিনিট পেরিয়ে গেলেও কোনো লাইক আসে নি। দুই মিনিট পর সে আবার চেক করলো— মোটে পাঁচটা লাইক! বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে এলো তার। ধুর, কিচ্ছু ভাল্লাগে না!

মাঈশা বাংলাদেশের বিলাসপ্রিয় জেনারেশনের অংশ— তাদের জন্ম মূলত আশির দশকের শেষ থেকে নব্বইয়ের দশক জুড়ে। এই জেনারেশনের একটা বড়ো অংশ শহুরে সুবিধাভোগী উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিলাসপ্রিয় তরুণ সমাজ, যাদের ধারণা তারা একটা বিশেষ গল্পের প্রধান নায়ক বা নায়িকা। মাঈশা তাদেরই একজন। বোঝার সুবিধার্থে এই বিলাসপ্রিয় জেনারেশনের একটা নাম দেয়া যাক: ভাল্লাগেনা জেনারেশন।

মাঈশা নিজের ভাল্লাগেনা জীবন বেশ ভালোই উপভোগ করছে। সমস্যা শুধু একটাই: তার কিছুই ভালো লাগে না। সে রীতিমতো অসুখি। কারণ জানতে হলে আরও গভীরে যেতে হবে। বুঝতে হবে ঠিক কী কারণে একজন মানুষ সুখি কিংবা অসুখি হয়। ইকুয়েশনটা এরকম:

happiness equals to reality minus expectations

আর যখন একটা মানুষের রিয়েলিটি তার এক্সপেক্টেশনের সঙ্গে মিলে না, তখন সে অসুখি হয়। মাঈশার রিয়েলিটি তার এক্সপেক্টেশনের সঙ্গে মিলে নাই। কেনো মিলে নাই? সেটা বুঝার জন্যে মাঈশার বাবা-মায়ের অবস্থাটাও বুঝা জরুরী।

মাঈশার বাবা-মা!

মাঈশার বাবা-মা মাঈশার বাবা-মা জন্মেছেন পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। তাদের বড়ো করেছেন মাঈশার দাদা-দাদু, নানা-নানু— যারা গ্রেট ডিপ্রেশনের সময়টায় বড়ো হয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। অবশ্যই তারা ভাল্লাগেনা জেনারেশনের অংশ না।

মন্দা ও যুদ্ধের ভয়াবহতায় জর্জরিত মাঈশার দাদা-দাদুর মূল ভাবনা ছিলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কেন্দ্রিক। তারা মাঈশার বাবা-মাকে বেশ রিয়েলিস্টিক করে বড়ো করেছেন যেন তারা সবার আগে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে মনোযোগী হয়। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’— নিজের ছেলেমেয়েদের জন্যে এমনটাই চাইতো মাঈশার দাদা-দাদু। আরও চাইতো তাদের ছেলেমেয়েদের লাইফস্টাইল তাদের চেয়ে উন্নত হোক। তাদের বাগান জুড়ে থাকুক প্রাণবন্ত সবুজ ঘাস।

সমৃদ্ধ ও স্থায়ী ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখতে দেখতে মাঈশার বাবা-মা বড়ো হলো। তারা জানতো, তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন পূরণ অসম্ভব না। তবে, তার জন্যে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে গড়তে হবে সফল ক্যারিয়ার।

মাঈশার বাবা-মায়ের এক্সপেক্টেশন

প্রথাবিরোধী মনোভাব নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর মাঈশার বাবা-মা তাদের ক্যারিয়ারের দিকে মন দিলো। এদিকে সত্তর-আশি-নব্বই দশক পেরিয়ে যেতে থাকলে পৃথিবীর অর্থনীতি অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির মুখ দেখলো। মাঈশার বাবা-মা তাদের প্রত্যাশার চেয়ে উন্নত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ও আশাবাদী ছিলো।

মাঈশার বাবা-মায়ের রিয়েলিটি

নিজেদের বাবা-মায়ের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও নিশ্চিন্ত জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঈশার বাবা-মা মাঈশাকে বড়ো করলো ভীষণ আশাবাদ ও অমিত সম্ভাবনায়। শুধু তারা না, তাদের জেনারেশনের প্রায় সব বাবা-মা তাদের বাচ্চাদের এমন ভাবে বড়ো করেছে যেন তারা যা চাইবে তাই পাবে। এই শুনতে শুনতে ভাল্লাগেনা জেনারেশন নিজেদের বিশেষ কেউ ভাবতে শুরু করে, যেন পুরো পৃথিবী তাদের কেন্দ্র করে ঘুরছে। তাদের মনে গেঁথে গেছে তারা একটা বিশেষ গল্পের প্রধান চরিত্র। নিজেদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে তারা অস্বাভাবিক রকম বেশি আশাবাদী হয়ে ওঠে। এতোটাই বেশি যে তাদের বাবা-মায়ের সমৃদ্ধ ও স্থায়ী ক্যারিয়ারের স্বপ্ন তাদের কাছে পুরনো ধ্যান ধারণা ঠেকতে শুরু করে। তাদের নিজস্ব বাগানে শুধু সবুজ ঘাস থাকলেই হবে না, বাগান জুড়ে অসংখ্য রঙিন ফুল থাকা চাই!

তো ভাল্লাগেনা জেনারেশন সম্পর্কে আমরা যা ধারণা পেলাম, তা অনেকটা এরকম: ভাল্লাগেনা জেনারেশন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী।

ভাল্লাগেনা জেনারেশনের আকাশ কুসুম কল্পনা

তাদের বাবা-মায়ের নিরাপদ সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে তাদের আরও বেশি কিছু চাই। তাদের বাবা-মায়েরা যেমন একটা সিকিউর লাইফস্টাইল হলেই সন্তুষ্ট থাকতো, তাদের ক্ষেত্রে সেটা হলো না। তারা নিজেদের স্বপ্নের জগতে বসবাস করতে চায়— তাদের পার্সোনাল ড্রিম লাইফ! তাদের জীবনের মূলমন্ত্র একটাই, ‘Follow your passion’, গত বিশ বছর ধরে এটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জনপ্রিয় একটা লাইন। ‘Secure Career’ তাদের জন্যে যথেষ্ট নয়, তাদের দরকার ‘Fulfilling Career’.

বাবা-মায়ের মতো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তাদের চাই, কিন্তু সেই সাথে নিজেদের ক্যারিয়ার থেকে তাদের পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি চাই, যেটা নিয়ে তাদের বাবা-মায়ের কোনো মাথা ব্যথাই ছিলো না। গল্পটা এখানেই শেষ না, আরও অনেক কিছু বাকি। উচ্চাভিলাষী মাঈশাকে ছোটো বেলায় বিভ্রান্তিকর আরও অনেক কিছু বলা হয়েছে। জন্মের পর থেকে সবাই তাকে বলেছে, ‘তুমি স্পেশাল।’

ভাল্লাগেনা জেনারেশন বসবাস করে অদ্ভুত বিভ্রান্তির ভেতর। মাঈশা মনে করে, “সবাই নিজেদের জন্যে একটা ফুলফিলিং ক্যারিয়ার বেছে নিবে ঠিকই, কিন্তু আমি সবার চেয়ে আলাদা, অসাধারণ। তাই আমার ক্যারিয়ার ও লাইফস্টাইল হবে সবার চেয়ে অন্যরকম।” গোটা একটা জেনারেশন এরকম এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি নিয়ে মনে করতে থাকে তারা অন্যদের চেয়ে সৌভাগ্যবান, তাই তারা অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো কিছু ডিজার্ভ করে। তাদের ফুলেল বাগানে থাকবে রঙিন পঙ্খিরাজ ঘোড়া।

আপনি ভাবছেন, তো এতে বিভ্রান্তির কী আছে?

একটা জেনারেশনের সবাই নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা আর স্পেশাল ভাবতে থাকলে, সেটা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী! স্পেশাল, অনন্য, অতুলনীয়, অসাধারণ— কিন্তু সবাই যদি অসাধারণ হয়, তাহলে অসাধারণ কথাটার মানে কী থাকলো!

এই মুহূর্তে ভাল্লাগেনা জেনারেশন এই লেখাটা পড়তে পড়তে ভাবছে, “একদম ঠিক! কিন্তু আমি সত্যিই অসাধারণ!” সমস্যাটা এখানেই।

চাকরির বাজারে প্রবেশ করার পর, ভাল্লাগেনা জেনারেশনের বিভ্রান্তি আরও বাড়তে থাকে। মাঈশার বাবা-মা মনে করতো অনেক বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে সিকিউর ক্যারিয়ার গড়তে হবে। কিন্তু ‘অসাধারণ’ মাঈশা মনে করে আলাদিনের জাদুর চেরাগ ঘষে অসাধারণ ক্যারিয়ার চাইলেই, দৈত্য এসে তার ইচ্ছে পূরণ করে দেবে। যথাসময়ে একটা তুড়ি বাজালেই কাজ হয়ে যাবে!

মজার ব্যাপার হলো, দুনিয়াটা এতো সহজ জায়গা না। দারুণ একটা ক্যারিয়ার গড়তে রীতিমতো সাধনা করা লাগে। রক্ত পানি করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হয়, তারপরও সেখানে পঙ্খিরাজ দূরে থাক, ফুলের দেখা নাও মিলতে পারে। কোনো সফল মানুষের জীবনে সাফল্য এমনি এমনি আসে না।

কিন্তু ভাল্লাগেনা জেনারেশন এই সত্য মেনে নিতে প্রস্তুত না।

ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের একজন প্রফেসর এবং ‘ভাল্লাগেনা জেনারেশন’ এক্সপার্ট পল হার্ভি বলেন, “এই জেনারেশনের এক্সপেক্টেশন বিভ্রান্তিকর অবাস্তব, কোনো রকম নেগেটিভ ফিডব্যাক সহ্য করার ক্ষমতা তাদের নাই। নিজেদের নিয়ে আকাশ কুসুম কল্পনায় অভ্যস্ত তারা। যোগ্যতার বড়াই ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতা না মিললে তারা হতাশার অন্ধকারে ডুবে যায়। নিজেদের সামর্থ্য ও যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি সম্মান, পারিশ্রমিক ও মনোযোগ আশা করে তারা, বিনিময়ে কঠোর পরিশ্রম করার কোনো ইচ্ছে তাদের নেই। তাই এক্সপেক্টেশনের সঙ্গে তাদের রিয়েলিটি কখনোই মিলে না।”

হার্ভি মনে করেন, ভাল্লাগেনা জেনারেশনকে চাকরির ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা উচিত, “তুমি কি তোমার ক্লাসমেট ও কলিগদের চেয়ে নিজেকে সুপিরিয়র মনে করো? কেনো মনে করো?” তিনি বলেন, প্রথম প্রশ্নের উত্তরে ক্যান্ডিডেট যদি হ্যাঁবোধক উত্তর দেয়, কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলার মতো কিছু খুঁজে না পায়, তাহলে বুঝতে হবে সুপিরিয়োরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছে সে। ছোটো বেলা থেকে নিজেকে অসাধারণ বলে বিশ্বাস করে এসেছে বলে অতিরিক্ত আত্মসম্মান বোধে আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে। নিজেকে অসাধারণ মনে করার পেছনে কোনো কারণ না থাকলেও এই নিয়ে কেউ সন্দেহ পোষণ করলে আঁতে ঘা লাগে তার।

কিন্তু বাস্তব দুনিয়া অন্যরকম, যোগ্যতার মাপকাঠি এখানে মেধা। তাই গ্র্যাজুয়েশনের পর অতল গহ্বরে পড়ে মাঈশা। কারণ তার এক্সপেক্টেশনের সঙ্গে রিয়েলিটি একেবারেই মিলছে না।

উদ্ধত, উচ্চাভিলাষী, বিভ্রান্তিকর মাঈশা ইউনিভার্সিটি পাশ করে বাইরের দুনিয়ায় পা রাখতেই দেখতে পায় তার এক্সপেক্টেশন-রিয়েলিটি ইকুয়েশনের রেজাল্ট নেগেটিভ।

না, এখানেই শেষ নয়। অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে। ভাল্লাগেনা জেনারেশনের আরও গভীর একটা সমস্যা আছে।

ভাল্লাগেনা জেনারেশন নিজেদের সমালোচনা ও উপহাস শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছে।

মাঈশার বাবা-মা তাদের ক্লাসমেটদের সাফল্য কিছুটা শুনে টুনে থাকলেও, সেভাবে দেখে নাই। সেটা নিয়ে তারা অতো মাথাও ঘামায় নাই। কিন্তু মাঈশার ঘটনা আলাদা— কারণ সোশ্যাল মিডিয়া। প্রতি মুহূর্তে মাঈশার ইগো আহত করার জন্যে আছে ফেসবুকের রঙিনতম দুনিয়া।

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মাঈশা প্রতি মুহূর্তে জানতে পারছে, কে কী করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটা মানুষ তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করে। যারা স্ট্রাগল করছে তারা তাদের বাস্তবতা লুকিয়ে রাখে। অন্যদিকে যারা তাদের ক্যারিয়ারে কিছুটা হলেও সফল, তারা সেটা ঢাক ঢোল বাজিয়ে প্রচার করছে। শুধু ক্যারিয়ার না, রিলেশনশিপের ব্যাপারেও তা সত্যি। ফেসবুক জুড়ে সুখ-সুখ ভাব, সাফল্যের প্রচার, অনেক ভালো থাকার ভান দেখে মাঈশার দুর্দশা আরও বাড়ে।

আগে সে অসুখি ছিলো, এখন রীতিমতো ডিপ্রেসড, ফ্রাস্ট্রেটেড। নিজের সুপিরিয়োরিটি কমপ্লেক্সের সাথে রিয়েলিটি না মিললে মাঈশা ইনফেরিয়োরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে শুরু করে। এই অবস্থায় মোটামুটি ভালো একটা কিছু করতে গেলেও সেটা নিয়ে তার ভেতরে অসন্তোষ থেকেই যায়।

মাঈশার উদ্দেশ্যে বলতে চাই:

উচ্চাকাঙ্ক্ষী থাকো। বর্তমান পৃথিবীটা উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের জন্যে ভালো জায়গা। ফুলফিলিং ক্যারিয়ার গড়ার অনেক সুযোগ তুমি পাবে। কীভাবে? সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। পথটা তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে। তবে তার জন্যে তোমাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। হাল ছাড়লে চলবে না।

নিজেকে অসাধারণ বা স্পেশাল কেউ ভাবা বন্ধ করো। সত্যি বলতে, তুমি স্পেশাল কেউ না। তুমি একজন অনভিজ্ঞ তরুণ। পৃথিবীকে এখনো তেমন কিছু দিতে পারো নি তুমি। তবে, তোমার পক্ষে স্পেশাল হয়ে ওঠা সম্ভব। অনেক বছরের কঠোর পরিশ্রম তোমাকে সত্যি সত্যি অসাধারণ মানুষ করে তুলবে।

নিজেকে ছাড়া বাদবাকি সবাইকে অগ্রাহ্য করো। অন্যের বাগানের ঘাস বেশি সবুজ মনে হওয়াটা নতুন কিছু না, কিন্তু এই ফটোশপের দুনিয়ায় অন্যের বাগান আরও সমৃদ্ধ, আরও উজ্জ্বল, আরও রঙিন মনে হয়। সত্যি বলতে, সবাই তোমার মতোই নিজেকে নিয়ে দ্বিধান্বিত, সন্দেহগ্রস্থ, নিরাশ ও খামখেয়ালি। তুমি যদি তোমার কাজটা ঠিকঠাক ভাবে করো, তাহলে অন্যদের হিংসা করার কোনো কারণ নাই।

মূল: Why Generation Y Yuppies Are Unhappy by Tim Urban

রূপান্তর: ফারাহ্‌ মাহমুদ

All creative arts are created by Ahnaf Shahriar

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

Share