একাকীত্বের সাথে বসবাস

Share

ঐশী ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ক্লাসে তার অনেক বন্ধু। কিন্তু বাসায় আসলেই ঐশীর মনে হয় যে সে খুবই একা একজন মানুষ। ঐশীর বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। সে তখন প্রায়ই রুমের দরজা বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে। এই অবস্থায় সে পড়ায় মন দিতে পারেনা। তার রেজাল্ট আগের তুলনায় এখন বেশ খারাপ হচ্ছে। এজন্য তাকে তার বাবা মা অনেক কড়া কথা শুনিয়েছেন। ঐশী বুঝতে পারেনা তার অবস্থার জন্য আসলে দায়ী কে? তার মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা। কিন্তু তার মনে হয় তার কথা শোনার মত কেউ নেই। কলেজের সময়টুকু বন্ধুদের সাথে সে হাসি ঠাট্টা করলেও তার মনের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে বন্ধুদের সাথে অনেক কথা শেয়ার করতে চাইলেও কিছু শেয়ার করেনা এই ভেবে যে তারা ঐশীকে নিয়ে পরে কী ভাববে! এইভাবেই একাকী ঐশী নিজের মনের অবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে থাকে।

প্রতিযোগিতার যুগে আমরা অনেক সময়ই আমাদের সবচেয়ে আপনজনকে সময় দিতে পারিনা। যার ফলে তারা দিন দিন একা হয়ে পরে। আমরা সবাই সুখী জীবন যাপন করতে চাই।আর তার জন্য দরকার মানসিক প্রশান্তি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের সমাজে এখনও অনেক অবহেলিত। মানসিক সমস্যাগুলো ট্যাবুর মত। একাকীত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক প্রকার অন্তরায়ই বলা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রতিদিন কত মানুষের সাথে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। কিন্তু তবুও মাঝেমাঝে মনের কথাগুলো বলার জন্য কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। এই নিঃসঙ্গতা থেকে মন খারাপের সৃষ্টি হয়। বন্ধুমহলে ‘ভাল্লাগেনা রোগী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মানুষগুলোর কাছে তার বন্ধুরা কি কখনও জানতে চায় তার ভালো না লাগার কারণ কী? জিজ্ঞেস করলে হয়তোবা উঠে আসত কোনো ঘটনা যা তাকে এখনো পীড়া দিচ্ছে। বন্ধুদের এই ঠাট্টার কারণে হয়ত এখন সে নিজেকে আরও একা অনুভব করে ।

একাকীত্বের আরেকটি বড় কারণ হতে পারে আশেপাশের মানুষের ‘জাজমেন্টাল’ মনোভাব। পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর- কথাটি মেনে চলার মানসিকতা আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষের নেই। কেউ আমাদের কাছে তার অপরাধবোধজনিত কোন কষ্ট শেয়ার করতে আসলে আমরা অনেকেই বাঁকা কথার দ্বারা তার অপরাধবোধকে আরো তীব্র করে তুলি। ফলে অপরাধবোধের সাথে যুক্ত হয় সংকোচ এবং সেই মানুষেরা নিজেদেরকে খুবই একা অনুভব করে। এমনকি অতীতের কোন ট্রমার কথা বলতেও মানুষ সংকোচ বোধ করে আর নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সম্পর্কবিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, আপনজনের মৃত্যু, বিরূপ পারিবারিক পরিবেশ ইত্যাদি মানুষের একাকীত্বের কারণ হতে পারে।  এই একাকীত্বের কারণে পরবর্তীতে অনেকে মানসিক জটিলতায় ভোগে। যেসব শিশু সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ না পেয়ে একা বেড়ে উঠে পরবর্তীতে তারা সহজে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনা। একাকীত্ব শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ব্যাহত করে।

একাকীত্ব কোন রোগ নয় কিন্তু অনেক মানসিক রোগের লক্ষণ। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশিরভাগই নিজেকে খুব একা অনুভব করে। মানুষের আত্মহত্যা চিন্তার পেছনেও একাকীত্বের ভূমিকা রয়েছে। একাকীত্ব মানুষের শারীরিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নিজেকে বাইরের জগত থেকে গুটিয়ে নেয়া মানুষের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

একাকীত্ব দূর করার জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে নিজের সময় দেয়া উচিত। দিনের কিছুটা সময় নিজেকে নিয়ে ভাবলে নিজের পজিটিভ এবং নেগেটিভ সাইটগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এবং কোন কারণগুলো জন্য নিজেকে একা মনে হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। মাইন্ডফুলনেস চর্চা বা মেডিটেশন এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হতে হবে। আর এই ব্যাপারে কিছুটা সময় নিয়ে সঠিক বন্ধু বা সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। নিজের মনের কথাগুলো বিশ্বস্ত কাউকে বললে মানুষের একাকীত্ব অনেকাংশে কমে যায়। অন্যের ফ্যামিলি বা ফ্রেন্ড সার্কেল অথবা জীবনযাপনের সাথে নিজের তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মানসিক সমস্যাগুলো প্রয়োজনে কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। প্রতিদিন জীবনকে নতুন করে দেখার মানসিকতা আমাদের মানসিক উৎকর্ষের পক্ষে সহায়ক।

(সামিরা মাহজাবিন)

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share