মনের দানব

Share


মিলি তার বন্ধুদের সাথে পহেলা বৈশাখের দিন খুশি খুশি মনে ঘুরতে বের হয়েছে। রমনা বটমূলে বছরকে বরণ করে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে দিনটি  বন্ধুদের সাথে চমৎকার ভাবে কাটায় সে। কিন্তু বিকালের দিকে মিলি হঠাৎ করে তার বন্ধুদের হারিয়ে ফেলে এবং ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায়। মিলি ভীড়ের মধ্যে কিছু দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে যারা খুবই নোংরাভাবে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান স্পর্শ করে। মিলি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। মিলি ভিড়ের মধ্যে হাজার চিৎকার করলেও কারো সাহায্য পায়নি। এরপর পার হয়েছে বেশ কয়েক মাস। এখনো মিলির মনে সেই ঘটনাটি জীবন্ত। ঘোরের মধ্যে থাকে সে; বারবার এই ঘটনাটি মনে হতে থাকে তার এবং মনে হয় আবার বুঝি তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে এবং ভিড়ের অবস্থান জীবন্তভাবে তার কল্পনায় ভেসে উঠে। মিলি রাস্তায় বের হলে মনে হতে থাকে এই বুঝি কেউ তার গায়ে হাত দিলো। রাতে ঘুম হয় না, ঘুমালেও মাঝেমধ্যেই দুঃস্বপ্ন দেখে তাকে কেউ বাজে ভাবে স্পর্শ করছে এবং স্বপ্নগুলো সত্যি মনে হয়। এইভাবে রাতে প্রায়ই ঘুম ভাঙ্গে তার। তখন মিলির ঘাম হয় ও শরীর কাঁপতে থাকে।

রুবেল উপকূলীয় এলাকায় থাকে যেখানে কয়েক বছর পরপর ঘূর্ণীঝড়ের আগমন খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। একবার রুবেলের এলাকায় ঘূর্ণীঝড় সিডর আঘাত হানে যার ফলে রুবেল তার বাবা এবং তার সর্বস্ব হারায়। এর পর খোলা আকাশের নিচে ছাড়া থাকার আর কোন উপায় ছিল না তার। সিডরের পর রুবেলের ঘুমের সমস্যা প্রকট হয়ে যায়, স্মৃতিবিভ্রম হয়, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে এবং হালকা ঝড় হলেই ভয়ে অস্থির হয়ে যায় এই ভেবে আবার হয়তো তার বাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়ে যাবে এবং সে পথে বসে যাবে। সারাক্ষণ রুবেল তাই উদ্বিগ্ন থাকে। এতে তার দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাঘাত ঘটছে।

আমরা উপরে মিলি এবং রুবেলের যে অবস্থা দেখলাম, তাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি বলে। একটি দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে যখন কেউ সেই ঘটনা নিয়ে ভয় বা আশংকা অনুভব করে যেটার প্রভাব শারীরিক ও মানসিকভাবে তার ওপর পড়ে, তখন তাকে পিটিএসডি বলা হয়। সাধারণত একটি দুর্ঘটনার পর আমরা সেই ঘটনা নিয়ে কিছুদিন চিন্তা করতে থাকি। দুর্ঘটনাটি আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেললেই কি আমরা সেটিকে ডিসঅর্ডারের আওতায় আনবো?-না, দুর্ঘটনার রেশ থেকে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যপার হলেও সেটির প্রভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাঘাতগ্রস্থ হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। দুর্ঘটনার ১ মাস পরেও যদি কোনো ব্যক্তি মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে না পারে এবং এটি যদি পরবর্তী কমপক্ষে এক মাস ধরে তার প্রতিদিনের কাজে কর্মে প্রভাব ফেলতে থাকে এবং এর সাথে সাথে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ করতে থাকে তখনই সেটিকে আমরা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের কাতারে ফেলতে পারি।

আমরা মিলি ও রুবেলের মধ্যে যে লক্ষণগুলো দেখতে পাই যেমন ঘুমে ব্যাঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কল্পনায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, দৈনন্দিন জীবনের ব্যাঘাত ঘটা এবং শারীরিক প্রভাব পড়া। তাদের মধ্যে সেই দুর্ঘটনার প্রচুর ফ্ল্যাশব্যাক হয়, মনে হতে থাকে আবার হয়তো তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে। মিলির সাথে যৌন নিপীড়ন বা রুবেলের সর্বস্ব হারানোর ফলে তাদের মধ্যে ভয় ও আশংকা বিরাজ করে যার কারণে তাদের শরীরে বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়। ঘাম, দ্রুত নিঃশ্বাস, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, সাময়িক উচ্চ রক্তচাপ ইত্যদি উপায়ে শারীরিকভাবে প্রভাব ফেলে। তাই বলা হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তিরা ভুগে থাকে।  এমনকি তাদের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনা ঘটলে বা শুনলে তারা এড়িয়ে যায় বা রিএক্ট করে ফেলে কারণ ব্যাপারটা তারা সহজভাবে নিতে পারে না।

বিভিন্ন ভাবে পিটিএসডি থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন থেরাপি যেমন কগনিটিভ-বিহ্যাভিউরাল থেরাপি, এক্সপোজার থেরাপি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট থেরাপি, হিপনোথেরাপি, রিল্যাক্সেশন থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি বা গ্রুপ থেরাপি দিয়ে থাকে। থেরাপির সাথে সাথে কাউন্সেলিং ও করা হয় যাতে করে কথা বলার মাধ্যমে সেই ব্যাক্তি হালকা অনুভব করতে পারে। নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে পিটিএসডি ভালো হয়।

সবশেষে বলা যায়, পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তি যদি পারিবারিক সাপোর্ট পায় এবং কাছের মানুষ যদি তাদের স্ট্রেসের সময় পাশে থাকে, তাহলে তাদের দৈনন্দিন জীবন সহজ হয় এবং পিটিএসডি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সহজভাবে।

(নুজহাত জাহানারা)

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share