পারিবারিক বন্ধন

Share

(ঘটনা ১)

নাহিদা বেগম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। তার স্বামী শরীফ সাহেব একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত‌ আছেন। তাদের একমাত্র সন্তান সাকিব ঢাকার একটি স্বনামধন্য কলেজে পড়ছে। তিনজনের এই ছোট্ট পরিবারে সবার আগে দিন শুরু হয় নাহিদা বেগমের। প্রতিদিন সকালে উঠে স্বামী-সন্তানের জন্য নাস্তা তৈরি করে নিজের স্কুলে যাওয়ার জন্য তিনি রেডি হন। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেই বাসার অন্যান্য কাজে লেগে যান। সারাদিনে যেন মুহূর্তের বিশ্রাম নেই। শরীফ সাহেব আর সাকিবকে ঘিরেই তার জীবন। সাকিবের কলেজ ছুটির পর কোচিং শেষে বাসায় আসতে আসতে বিকাল হয়ে যায়। বিকালে সাকিবের প্রিয় কাজ কলোনির বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা। বাসায় থাকলেও সে প্রায় সময় নিজের রুমে গেমিংএ মশগুল থাকে। শরীফ সাহেব লক্ষ্য করলেন নাহিদা ইদানিং বেশ খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছেন। তিনি ভাবলেন ছেলে হয়তোবা কিছু করেছে, এইজন্য তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তিনিও নিজের মতই থাকেন। নাহিদার কাছে নিজেকে দিন দিন অনেক একা লাগে। ছোটখাটো ঘটনায় তিনি ইদানিং নিজের আবেগকে সামলে রাখতে পারেন না।

(ঘটনা ২)

প্রিয়াঙ্কা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তার বাবা মা দুজনেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং তাকে ঠিকমত সময় দিতে পারেন না। প্রিয়াঙ্কার টিচার ইদানিং লক্ষ্য করছেন সে ঠিকমতো পড়া শিখছেনা। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে বেশ কয়েকবার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, তার বাসায় কেউ না থাকলে তার ভীষণ ভয় করে এবং সে ভয় এড়ানোর জন্য পড়া শেষ না করেই ঘুমিয়ে যায়।

প্রিয় পাঠক, নাহিদা বেগম আর প্রিয়াঙ্কার ঘটনা দুটি আমাদের অতি ব্যস্ত শহুরে জীবনে অজানা কিছু নয়। আমরা সবাই নিজ নিজ জীবনে এত ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি যে আমাদের সবচেয়ে আপনজনের জন্যই আমাদের কাছে সময় নেই। শুধু নাহিদা বেগমই না আমাদের চারপাশে অনেক মা আছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে নিজের পরিবারের জন্য দিনরাত কাজ করে যান। অথচ পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছ থেকে তারা তাদের প্রাপ্য সময়টুকু‌ পান না। অথবা প্রিয়াঙ্কার মত অনেক শিশুরই ভয় আর একাকীত্বের মধ্যে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন পরিবারের সব সদস্য মিলে একসাথে টিভিতে কোন অনুষ্ঠান দেখতেন অথবা ছুটির দিনে একসাথে বেড়াতে যেতেন। সেই ‘পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম’ এখন ব্যস্ততা আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একপ্রকার হারিয়ে গিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী Zygmunt Bauman আধুনিক সমাজকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য ‘liquid modernity’ টার্মটি ব্যবহার করেছেন। ব’ম্যানের ভাষ্যমতে liquid modernity বলতে বুঝায়, আধুনিক সমাজের সম্পর্কগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সম্পর্কগুলোর গভীরতা কমে যাচ্ছে। তার বই ‘liquid love’ এর অন্যতম মূল বিষয়বস্তু হল ‘fraility of human bonds’ বা মানুষের জীবনে সম্পর্কের ভঙ্গুরতা। সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, traditional family values এখন অনেকটাই বিলীন। এর ফলেও সমাজে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

একজন মানুষের জীবনে একাকীত্ব, হতাশা, ডিপ্রেশন, মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব সুস্থ পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে। পরিবারের সদস্যদের একে অপরের সাথে সময় কাটানো সদস্যদের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করে আর সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন মানসিক সুস্বাস্থ্যের অন্যতম নিয়ামক। আপনার পরিবারকে সময় দিন এবং পরিবারের সদস্যদের বোঝার চেষ্টা করুন। পরিবারের কারও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে অবহেলা না করে তার সাথে কথা বলুন এবং সমস্যা জানার চেষ্টা করুন। হয়তোবা আপনার অনেক কাছের কেউ মানসিক ভুগছে। তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনবোধে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং সেবা নিন। পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।

মানুষের জীবনের সূচনা হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। তাই ভবিষ্যত জীবনে যত ব্যস্ততাই আসুক, আমাদের পারিবারিক বন্ধন যেন অটুট থাকে।

( সামিরা মাহজাবিন)

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share