ডিজলেক্সিয়া

Share

আমীর খান অভিনীত ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটার কথা মনে আছে? পড়তে সমস্যা হয়, লিখতে সমস্যা হয় এমন একটা বাচ্চা ছেলেকে ঘিরে এই সিনেমার কাহিনী আবর্তিত। সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, ৮বছর বয়সী ঈষান (দারশিল সাফারি) তার স্কুলে নিয়মিতভাবে ফল খারাপ করতেই থাকে, বাড়ির কাজ করে না, ক্লাসে বসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না এবং এই কারণে তার স্কুলের বন্ধুসহ শিক্ষকদের কাছেও অনেক অপমানিত হয়, টিটকারির শিকার হয়। এমনকি তার বাবা, যিনি কিনা অনেক ভালো চাকুরী করেন তিনিও তার ছেলের এই ধরণের কাজের জন্য তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করেন এবং এক সময় ঈষানকে বোর্ডিং(আবাসিক) স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অথচ ঈষানের ভেতরেও একটা রঙ্গীন জগত বাস করে। সে ভাবতে ভালোবাসে, নিজের মত তার একটা জগতের স্বপ্ন দেখে যায় সে নিয়মিত। তার পড়তে ভালো লাগে না, আঁকতে ভালো লাগে না, ভালো লাগে না ক্লাসে বসে থাকতেও। তার এই সমস্যা আর কেউই বুঝতে পারে না। নতুন করে আসা অংকন শিক্ষক আমীর খান তার এই সমস্যাটা বুঝতে পারে এবং ঈষানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ঈষান লিখতে গেলেই অক্ষরগুলো উল্টো হয়ে যেত, সে দেখতে পেত তার সামনে বইয়ে থাকা লেখাগুলো ছুটে পালাচ্ছে এবং তার মনে লালন করা কোন না কোন প্রাণী বা বস্তুর আকার ধারণ করতো। ঈষানের এই লিখতে না পারার, পড়তে না পারার, আঁকতে না পারার সমস্যাকে বলা হয়ে থাকে ডিজলেক্সিয়া।

ডিজলেক্সিয়া কি? ডিজলেক্সিয়া একটি শিখতে না পারাজনিত সমস্যা। ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিগণ সাধারণত ঠিকমত পড়তে পারেন না, উচ্চারণ করতে পারেন না, পারেন না ঠিকমত লিখতে। তবে, এটি বুদ্ধিমত্তায় কোন ধরণের প্রভাব ফেলে না। সময়ের সাথে নানা ধরণের সাহায্যের মাধ্যমে এই সমস্যা আস্তে আস্তে কমে আসে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের জন্য তৈরি বিশেষ ধরণের স্কুলে বা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ ধরণের বই পড়ে ও বিশেষ ধরণের সুবিধায় লিখে এই রোগ ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে যেতে পারে এবং এই ধরণের ব্যক্তিরাও জীবনে সফল হতে পারে। এরা যদিও আস্তে পড়ুয়া হয়, কিন্তু এদের চিন্তা করার ক্ষমতা অনেক সময় সাধারণ অনেক মানুষের থেকেও বেশী হয়ে থাকে। শতকরা ২০ জনের মধ্যেই এই ধরণের সমস্যা দেখা যায়। এবং সঠিকভাবে পরিচর্যিত ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত মানুষজন জীবনে সফলও হয়। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসো, আলবার্ট আইনস্টাইন, টমাস আলভা এডিসন, অভিষেক বচ্চনসহ আরও অনেকে বিখ্যাত ব্যক্তিই এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন, এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন।

ডিজলেক্সিয়ার কারণঃ ডিজলেক্সিয়ার জন্য জিন ও পরিবেশ উভয়ই দায়ী। পারিবারিক ইতিহাসে কেউ ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত আছে এমন কোন পূর্ব রেকর্ড থাকলে, ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত ব্রেণের বাঁ অংশ যা কিনা আমাদের কোন কিছু পড়ার কাজে সহায়তা করে থাকে, তাতে কম ইলেক্ট্রিকাল অ্যাক্টিভেশন দেখা যায়। ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত অনেকের গলার মাংশপেশীতেও সমস্যা দেখা যায় যার কারণে তারা ঠিকমত উচ্চারণও করতে পারে না।

ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণঃ যেহেতু ডিজলেক্সিয়া কোন নির্দিষ্ট বয়সের মানুষ নয়, যেকোন বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারে। বয়সভেদে ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণ বিভিন্নরকম হয়ে থাকে।
প্রি-স্কুল সময়েঃ

১। সহজ ছড়াগুলো বলতে না পারা(যেমনঃ টুংকেল টুইংকেল),

২। বর্ণমালা শিখতে, পড়তে ও মনে রাখতে সমস্যা হয়,

৩। নিজের নামের অক্ষরগুলো পড়তে না পারা,

৪। Cat, Rat, Bat – এর মত সহজ শব্দগুলোও উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।

১ম শ্রেণীতে পড়ার সময়েঃ

১। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসা শব্দ বুঝতে না পারা,

২। পড়ার সময়ে শব্দ হারিয়ে যায়,

৩। শব্দের সাথে বর্ণ মেলাতে পারে না।

মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময়েঃ

১। খুব ধীরে পড়া,

২। অপরিচিত শব্দ পড়তে সমস্যা হওয়া,

৩। জোরে না পড়া,

৪। পড়ার আগ্রহ কমে যাওয়া,

৫। কোন কিছুর নাম না বলে, “ঐ জিনিস”, “ঐ বস্তু” বলে চালিয়ে দেয়া,

৬। কথা বলতে গেলেই থেমে থেমে যাওয়া এবং “উমম”, “ইয়ে” উচ্চারণ করা,

৭। শব্দ গুলিয়ে ফেলা,

৮। বড়, অপরিচিত শব্দ ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

৯। কোন পড়া পড়তে, লিখতে বা প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশী সময় নেয়া,

১০। তারিখ বা অন্যান্য নাম্বার মনে রাখতে না পারা,

১১। বাজে হাতের লেখা,

১২। বিদেশী ভাষা শিখতে সমস্যা হয়।

 

পূর্ণবয়সেঃ

১। মানুষের নাম, জায়গার নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

২। পুনরাবৃত্তি করতে সমস্যা,

৩। আনন্দের জন্য পড়া এড়িয়ে চলা,

৪। জোরে না পড়া,

৫। সবাইকে এড়িয়ে চলা,

৬। ‘b’ এবং ‘d’ – এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলা,

৭। সবকিছুতে অগোছালো হয়ে পড়া।

 

লিখেছেন – চয়ন

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share