মরে গেলেই হয়ত বেঁচে যাবো!

Share

মনে পড়ে কনফিউজড শুভর কথা? তার এইচ.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে গতকাল। তার অনেক বন্ধুরা এ প্লাস পেলেও তার এ প্লাস আসেনি। এ নিয়ে বাবা মায়ের বকাঝকার শেষ নেই। সারাবছর খোঁজ না থাকলেও আজ অনেক আত্মীয় স্বজনই ফোন দিয়ে তার রেজাল্টের খবর নিচ্ছেন। এই এ-প্লাস না পাওয়ার ব্যর্থতাতেই অসহ্য মনে হচ্ছে জীবনটাকে।
দুই মাস পরের কথা, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির এ্যাডমিশন টেস্ট দেবার পরেও কোনোটাতেই চান্স হয়নি শুভর। এত ভালো পড়ালেখা করা সত্ত্বেও চান্স না পাওয়ায় সে অত্যন্ত হতাশ। এমনকি এ প্লাস না পাওয়ায় কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দেবারই সুযোগ পায়নি সে। এটি নিয়ে তার বাবা মা এখনো তার এইচএসসির রেজাল্ট নিয়ে তাকে কথা শোনায়। পরিবার থেকে অনেকটাই আইসোলেটেড হয়ে গেছে শুভ। ফ্রেন্ড সার্কেলে অনেকেই ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ায় ওদের সাথেও মেলামেশা কমে গেছে তার। বলা যায় সমাজ থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন সে। প্রায়ই তার মনে হয় এত গঞ্জনা সহ্য করার চাইতে এই ব্যর্থ জীবনকে শেষ করে দেয়াই শ্রেয়। বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভ। তার ভাবনা, এ জীবন রেখে আর কি হবে? মরে গেলেই হয়ত বেঁচে যাবে সে।

শুভর মধ্যে যে ভাবনাটি গড়ে উঠছে তাকে সুইসাইডাল থট কিংবা সুইসাইড আইডিয়েশন নামে অভিহিত করা হয়। আত্মহত্যার চিন্তা করা কিংবা প্ল্যান করাই হচ্ছে সুইসাইডাল আইডেয়শন। ব্যাক্তির মধ্যে এই চিন্তাটি অনেকদিনের গোছানো কিংবা হুট করে আসা দুই ভাবেই হতে পারে। সুইসাইডাল থট অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে সুইসাইডাল থট এর শিকার হন। কোনো বিষয় নিয়ে এ্যাংজাইটি কিংবা ডিপ্রেশন থেকে মানুষ সুইসাইড নিয়ে চিন্তা করে। সাধারণত সুইসাইডাল থট একটি অস্থায়ী বিষয় হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি বিপদজনক এবং ব্যক্তিকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। প্রথমত একজন ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থ, অকেজো ইত্যাদি ভাবা শুরু করে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া, বেকারত্ব ইত্যাদি পারিপার্শ্বিক চাপ এবং অবজ্ঞার মুখে এবং তার মনে হয় হয়ত জীবন শেষ করে দিলেই এইসব থেকে মুক্তি মিলবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় সে কাউকে অনুকরণ করতে চাইছে। সেটি হতে পারে তার পরিবারের কেউ যে কিনা আত্মহত্যা করেছে কিংবা কোনো সেলিব্রেটি। “মরে গিয়ে তো বেঁচে গেছে সে” এই ধরণের চিন্তা লালন করে সে। তার মধ্যে এই ধারণা  আসতে থাকে যে কেউ তাকে বুঝতে চাইছেনা কিংবা কেউ তাকে গ্রাহ্য করছেনা। এইজন্য অনেক ক্ষেত্রে “এ্যাটেনশন সীকিং”কেও ব্যক্তির সুইসাইডাল থট আসার কারণ হিসেবে ধরা যায়। অনেক সময় ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। সে মনে করে তার জন্যই সকল সমস্যার শুরু, অতএব মরে যাওয়াই শ্রেয়। আমরা আশেপাশে অনেকেই রয়েছে যে কিনা হয়ত প্রতিদিনই অল্প অল্প করে আত্মহননের উপায় নিয়ে চিন্তা করছে, উপকরণ নিয়ে ভাবছে। আমরা হয়ত গ্রাহ্য করছিনা কিংবা বুঝতে পারছিনা। একসময় হয়ত শুনতে পাবো সে সুইসাইড করতে সফল ও হয়েছে।
সুইসাইড নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বর্তমান বিশ্বের ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে সুইসাইড বা আত্মহত্যা একটি বড় সমস্যা। পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় দিনকে দিন আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে এই আত্মহত্যা। বর্তমানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ সুইসাইড করে। সমগ্র পৃথিবীতে যুবক যুবতীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এই সুইসাইড। যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই তবে গত ১ বছরে ১৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। এবং প্রতি বছর এই হার বেড়েই চলেছে। একটা মানুষ যখন তার নিজের জীবনের প্রতি সমস্ত আকর্ষণ কিংবা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে তখনই সে সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় তার সবথেকে বেশি প্রয়োজন কাছের মানুষদের সংস্পর্শে থাকা।  
প্রতিরোধঃ
এই সুইসাইডাল থট কিংবা সুইসাইড আইডিয়েশন একটি ক্ষণস্থায়ী বিষয় হলেও এটিকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। একজন মানুষ যখন সুইসাইড নিয়ে চিন্তা করে তখন তার কথাবার্তা আচার ব্যবহারে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন সে হয়ত তার প্রিয় কোনো বস্তু যা কিনা সবসময় নিজের কাছে আগলে রাখতো সেটিকে ফেলে দিচ্ছে কিংবা কাউকে দিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে অন্যদের বোঝা হিসেবে দেখছে। তার কথাবার্তার মধ্যেও নিরাশার ছাপ পাওয়া যায়। “বেঁচে থেকে কি হবে?” “আমি মরে গেলেই হয়ত সবার জন্য ভালো” ইত্যাদি কথাও বলতে শোনা যায়। ব্যক্তি মৃত্যুকে নিয়ে কথা বলে। পরিবার কিংবা বন্ধু বান্ধব থেকে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিচ্ছে। এইসমস্ত লক্ষণ দেখা দিলে আমরা ধরে নিতে পারি ব্যক্তির মধ্যে সুইসাইডাল থট বিরাজ করছে। এই সুইসাইডাল থট প্রতিরোধে পরিবার এবং বন্ধুরা বড় ধরণের সাহায্যে এসে থাকেন। কথা বলে, সময় দিয়ে সুইসাইডাল থট থেকে ব্যক্তিকে সরিয়ে আনতে পারেন তারা। ব্যক্তিকে নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে সাহায্য করা, তাকে সাহস দেয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। অনেক সময় প্রফেশনাল হেল্প ও প্রয়োজনীয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা কিনা সুইসাইডাল থট প্রতিরোধে কাজ করছে। এছাড়া সাইকোলজিস্ট এবং কাউন্সেলররাও প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মূলত কথা বলা এবং শেয়ারিং এর মাধ্যমেই ব্যক্তিকে সুইসাইডাল থট থেকে আস্তে আস্তে সরিয়ে আনা হয়। এছাড়া ব্যক্তি বিভিন্ন থেরাপির সাহায্য ও নিতে পারেন সুইসাইড কোনো সমাধান নয়। আপনার সুইসাইডাল থট আসছে এর মানে এই নয় যে আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ। আপনার আশে পাশের অনেক মানুষেরই সুইসাইডাল থট আসে এবং অনেকেই এটি থেকে মুক্তি পায়। এখানে সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে কথা বলা। নিজের ভাবনাকে নিজের মধ্যে পুষে না রেখে অন্যের সাথে শেয়ার করা, নিজের উপর বিশ্বাস রাখা। কথা বলুন, সুইসাইডাল থটকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আপনি ঠুনকো কিছু নন, একটি ব্যর্থতা আপনার গল্পকে শেষ করে দিচ্ছেনা। হয়ত সবেমাত্র তা শুরু। নিজেকে বলুন “My story will not end up in this way.”

আশিক মাহমুদ।

সিদ্ধান্তহীনতা

Share

শুভ এইবার এইচ.এস.সি পরিক্ষা দিয়েছে। সে এখন কোথায় এবং কী নিয়ে পড়বে তা নিয়ে খুব বেশী কনফিউজড। বাবা-মা বলছে মেডিকেলে পড়তে, নিজের ইচ্ছা রসায়ন কারণ তার রসায়ন পড়তে অসম্ভব ভাল লাগে, কিন্তু শুভর বন্ধুরা বলে সে যেহেতু সে ইংলিশে ভাল তাকে আইবিএ নিয়ে পড়তে। এখন শুভর মনে হয় মেডিকালে পড়লে তার বাবা-মা খুশি হবে, আবার নিজের ইচ্ছা কেমিস্ট হওয়ার, কিন্তু বন্ধুরা যা বলছে সেটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে শুভর। কারণ তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভর্তি পরিক্ষার প্রস্ততি নিতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই তার। যতদিন যায় ততই চাপে পড়ে শুভ। কোন দিকে যাবে সে? বাবা-মার মেডিকেলে যেতে বলার চাপ মেনে নিবে, নিজের ভাল লাগাকে গুরুত্ব দিবে নাকি বন্ধুদের কথা শুনবে? নিজের সিদ্ধান্তহীনতাবোধে চরম হতাশ শুভ। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে বাড়ছে দূরত্ব, ভাল লাগার কাজও এখন আর করতে পারে না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরতে থাকে ‘আমি এখন কি করব?’ চিন্তার চাপে সে এখন ছোটখাট সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বন্ধুরা তাকে ‘কনফিউজড শুভ’ নামে ডাকে আজকাল।

উপরে আমরা দেখলাম শুভ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। সময়ের প্রয়োজনে কি করতে হবে সেটা বুঝতে না পারাই সিদ্ধান্তহীনতা। জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং মাঝে মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। যেমন কোন জামাটা পড়ে বাইরে যাব, রেস্টুরেন্টের মেন্যু দেখে বুঝতে না পারা কোনটা রেখে কোনটা ওর্ডার করবে ইত্যাদি। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার কারণে যদি দৈনন্দিন জীবনের ব্যাঘাত ঘটে তাহলে এটা চিন্তার বিষয়।  

সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কিছু উপায় মেনে চলা যায়। যে বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ভুগছে সেটি একটি নোটবুকে লিখা এবং কোন সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে সেটি লিখে রাখা। সেই সময়ে ভেবে দেখা কোন সিদ্ধান্ত নিলে হলে কি আউটকাম আসবে। নিজেকে প্রশ্ন করা, ‘আমি কি এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেনে চলতে পারব?’ শুধু আউটকাম চিন্তা করলে হবে না, খুব সূক্ষ্ম ভাবে এর ফলাফলের দিকে তাকাতে হবে। যেমন, ডাক্তার হলে মাথায় রাখতে হবে দিন-রাত যেকোন সময়ে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে, পরিবার ও নিজের জন্য খুব একটা সময় ব্যয় করা যাবে না। তারপর ভেবে দেখা, নিজের আদর্শের সাথে সিদ্ধান্তটা যাচ্ছে নাকি। বা যে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটি আপনার জীবন ধরণের সাথে যায় কিনা। ধরুণ,আপনি যদি আরামপ্রিয় মানুষ হোন, সে ক্ষেত্রে কোন পরিশ্রমের পেশা বেছে নিলে সেটার সাথে খাপ খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হবে। আবার, যে কারোর সাথে সিদ্ধান্তটা নিয়ে কি ভাবছেন তা নিয়ে কথা বলা। খুব জানে এমন মানুষের সাথে কথা বলা লাগবে এমনটা নয়, কারণ দেখা গেছে চিন্তাগুলা কথার মাধ্যমে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু একজন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষেরে সাথে কথা বললে সঠিক দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। আপনি যে সিদ্ধান্তটা নিতে চাচ্ছেন সেটা যারা নিয়েছে, তাদের সাথে কথা বলেও সহজে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। তখন একজন বুঝতে পারবে, সে যে সিদ্ধান্তগুলো ভাবছে সেটি আসলেও প্রয়োগ করা যাবে কিনা এবং সিদ্ধান্তটা নিলে কী হবে। যেমন, একজন মেডিকেলের ছাত্রই আপনাকে বলতে পারবে মেডিকেলে পড়লে আপনার জীবনের পথ কেমন হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনি সেই পথে আগাতে চান কিনা। প্রয়োজনে, একজন কাউন্সিলরের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

আমরা প্রতিদিন অনেক ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি এবং মাঝে মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, সিদ্ধান্তহীনতার জন্য যাতে অন্যান্য কাজ বাধাপ্রাপ্ত না হয়।

(নুজহাত জাহানারা)

Emotional Literacy

Share

শুভ এইবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তার বাবা মার ইচ্ছা সে ডাক্তার হবে। কিন্তু শুভর চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় কেমিস্ট্রি। কেমিস্ট্রি সে অন্যান্য যেকোনো সাবজেক্টের চেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে পড়ে। শুভর ইচ্ছা সে ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়বে। কিন্তু শুভর এই সিদ্ধান্ত তার বাবা মা মানতে নারাজ। শুভর বাবার প্রথম প্রশ্নই ছিল ‘ কেমিস্ট্রি পড়ে তুমি কী করবে? আর মানুষ কী বলবে!’

শুভর এখন মনে হয় বাসার কেউ তার কথা বোঝার চেষ্টা করেনা। অনেকটা অভিমান করেই সে এখন কারও সাথে তেমন কথা বলেনা। সে এখন কী করবে নিজেও বুঝতে পারেনা।

শুভর মত ঘটনা হয়ত অনেকের সাথেই হয়। শুধুমাত্র ভর্তিযুদ্ধের সময়ই মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে পরে এমন নয়। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মনে হয় আমাদের কথা কেউ বুঝতে চায়না। এমনকি অনেক সময় আমরা নিজেরা কী চাই তাও বুঝতে পারিনা। শুধুমাত্র এই বোঝাপড়ার অভাবেই আমাদের আশেপাশের মানুষের সাথে এমন কিছু বিবাদের সৃষ্টি হয় যা কিনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এই সংক্রান্ত সাইকোলজির ভাষায় একটি টার্ম আছে- emotional literacy।

Emotional literacy কী

Emotional literacy বলতে বোঝায় নিজের চিন্তা ভাবনা, আবেগ সঠিকভাবে বোঝা এবং ইতিবাচকভাবে সেগুলো প্রকাশ করা। একইসাথে অন্যের কথা শোনা এবং তাদের চিন্তা ধারা বুঝতে চেষ্টা করা। সহজভাবে বললে, কোন মানুষের মানসিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতাকেই বলা হয় emotional literacy।

Emotional literacy কেন দরকার

সমাজে একসাথে চলতে গেলে অনেকের সাথেই আমাদের মনোমালিন্য হয়। এইসব কনফ্লিক্ট এর পিছনে একটি সাধারণ কারণ যা  মোটামুটি আমরা সবাই বলে থাকি তা হল- ‘সে আমার অবস্থা বুঝার চেষ্টা করেনা।‘ এই ‘বুঝতে না পারা’ মূলত emotional literacy এর অভাব।  মানুষকে বোঝার চেষ্টা করলে আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে সহমর্মিতা জন্মে। Emotional literacy মানুষকে productive way তে আবেগ প্রকাশ করতে শেখায়।  মানুষ নিজের আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে। সবার সব কাজ আপনার ভালো লাগবে না অথবা সবার চিন্তা ধারা আপনার সাথে মিলবে না এইটাই স্বাভাবিক। আপাতদৃষ্টিতে কারও কোন কাজ আপনার ভালো নাই লাগতে পারে। কিন্তু তাই বলে সবার সাথে কনফ্লিক্টে জড়ানো নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আরেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাপারটা দেখলে হয়তো অনেক কনফ্লিক্ট এর সমাধান হয়ে যায়। মানুষ নিজেকে যখন ভালভাবে বুঝতে শিখে, নিজের ব্যাপারে তার ধারণা যত স্পষ্ট হয়, নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়া তার পক্ষে তখন সহজ হয়। Positive living এর জন্য emotional literacy  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে আশেপাশের মানুষকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য জরুরি। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি না বুঝে সবসময় নিজের মতামত দেয়াটা সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

কিভাবে নিজের emotional literacy বাড়ানো যায়

ফ্রেঞ্চ সাইকোথেরাপিস্ট Claude Steiner তার ‘Emotional Literacy’ নামক বইতে emotional literacy কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন।

১. নিজের অনুভূতিগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা

২.সহমর্মিতা বা empathy চর্চা অর্থাৎ অন্যের জায়গায় নিজেকে রেখে চিন্তা করা।

৩.নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ

৪.Emotional problem (depression/anxiety ইত্যাদি) থাকলে তা চিহ্নিত করে দূর করা

৫. সার্বিকভাবে Emotional literacy এর প্রয়োগ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া।

Emotional literacy শব্দটা আমাদের অনেকের কাছেই নতুন। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অনেক বিবাদ কমে যাবে শুধুমাত্র এই মানুষকে বুঝতে চাওয়ার চর্চা করার মাধ্যমে।

(সামিরা মাহজাবিন)

পারিবারিক বন্ধন

Share

(ঘটনা ১)

নাহিদা বেগম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। তার স্বামী শরীফ সাহেব একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত‌ আছেন। তাদের একমাত্র সন্তান সাকিব ঢাকার একটি স্বনামধন্য কলেজে পড়ছে। তিনজনের এই ছোট্ট পরিবারে সবার আগে দিন শুরু হয় নাহিদা বেগমের। প্রতিদিন সকালে উঠে স্বামী-সন্তানের জন্য নাস্তা তৈরি করে নিজের স্কুলে যাওয়ার জন্য তিনি রেডি হন। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেই বাসার অন্যান্য কাজে লেগে যান। সারাদিনে যেন মুহূর্তের বিশ্রাম নেই। শরীফ সাহেব আর সাকিবকে ঘিরেই তার জীবন। সাকিবের কলেজ ছুটির পর কোচিং শেষে বাসায় আসতে আসতে বিকাল হয়ে যায়। বিকালে সাকিবের প্রিয় কাজ কলোনির বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা। বাসায় থাকলেও সে প্রায় সময় নিজের রুমে গেমিংএ মশগুল থাকে। শরীফ সাহেব লক্ষ্য করলেন নাহিদা ইদানিং বেশ খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছেন। তিনি ভাবলেন ছেলে হয়তোবা কিছু করেছে, এইজন্য তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তিনিও নিজের মতই থাকেন। নাহিদার কাছে নিজেকে দিন দিন অনেক একা লাগে। ছোটখাটো ঘটনায় তিনি ইদানিং নিজের আবেগকে সামলে রাখতে পারেন না।

(ঘটনা ২)

প্রিয়াঙ্কা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তার বাবা মা দুজনেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং তাকে ঠিকমত সময় দিতে পারেন না। প্রিয়াঙ্কার টিচার ইদানিং লক্ষ্য করছেন সে ঠিকমতো পড়া শিখছেনা। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে বেশ কয়েকবার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, তার বাসায় কেউ না থাকলে তার ভীষণ ভয় করে এবং সে ভয় এড়ানোর জন্য পড়া শেষ না করেই ঘুমিয়ে যায়।

প্রিয় পাঠক, নাহিদা বেগম আর প্রিয়াঙ্কার ঘটনা দুটি আমাদের অতি ব্যস্ত শহুরে জীবনে অজানা কিছু নয়। আমরা সবাই নিজ নিজ জীবনে এত ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি যে আমাদের সবচেয়ে আপনজনের জন্যই আমাদের কাছে সময় নেই। শুধু নাহিদা বেগমই না আমাদের চারপাশে অনেক মা আছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে নিজের পরিবারের জন্য দিনরাত কাজ করে যান। অথচ পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছ থেকে তারা তাদের প্রাপ্য সময়টুকু‌ পান না। অথবা প্রিয়াঙ্কার মত অনেক শিশুরই ভয় আর একাকীত্বের মধ্যে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন পরিবারের সব সদস্য মিলে একসাথে টিভিতে কোন অনুষ্ঠান দেখতেন অথবা ছুটির দিনে একসাথে বেড়াতে যেতেন। সেই ‘পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম’ এখন ব্যস্ততা আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একপ্রকার হারিয়ে গিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী Zygmunt Bauman আধুনিক সমাজকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য ‘liquid modernity’ টার্মটি ব্যবহার করেছেন। ব’ম্যানের ভাষ্যমতে liquid modernity বলতে বুঝায়, আধুনিক সমাজের সম্পর্কগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সম্পর্কগুলোর গভীরতা কমে যাচ্ছে। তার বই ‘liquid love’ এর অন্যতম মূল বিষয়বস্তু হল ‘fraility of human bonds’ বা মানুষের জীবনে সম্পর্কের ভঙ্গুরতা। সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, traditional family values এখন অনেকটাই বিলীন। এর ফলেও সমাজে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

একজন মানুষের জীবনে একাকীত্ব, হতাশা, ডিপ্রেশন, মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব সুস্থ পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে। পরিবারের সদস্যদের একে অপরের সাথে সময় কাটানো সদস্যদের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করে আর সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন মানসিক সুস্বাস্থ্যের অন্যতম নিয়ামক। আপনার পরিবারকে সময় দিন এবং পরিবারের সদস্যদের বোঝার চেষ্টা করুন। পরিবারের কারও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে অবহেলা না করে তার সাথে কথা বলুন এবং সমস্যা জানার চেষ্টা করুন। হয়তোবা আপনার অনেক কাছের কেউ মানসিক ভুগছে। তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনবোধে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং সেবা নিন। পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।

মানুষের জীবনের সূচনা হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। তাই ভবিষ্যত জীবনে যত ব্যস্ততাই আসুক, আমাদের পারিবারিক বন্ধন যেন অটুট থাকে।

( সামিরা মাহজাবিন)

মনের দানব

Share


মিলি তার বন্ধুদের সাথে পহেলা বৈশাখের দিন খুশি খুশি মনে ঘুরতে বের হয়েছে। রমনা বটমূলে বছরকে বরণ করে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে দিনটি  বন্ধুদের সাথে চমৎকার ভাবে কাটায় সে। কিন্তু বিকালের দিকে মিলি হঠাৎ করে তার বন্ধুদের হারিয়ে ফেলে এবং ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায়। মিলি ভীড়ের মধ্যে কিছু দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে যারা খুবই নোংরাভাবে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান স্পর্শ করে। মিলি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। মিলি ভিড়ের মধ্যে হাজার চিৎকার করলেও কারো সাহায্য পায়নি। এরপর পার হয়েছে বেশ কয়েক মাস। এখনো মিলির মনে সেই ঘটনাটি জীবন্ত। ঘোরের মধ্যে থাকে সে; বারবার এই ঘটনাটি মনে হতে থাকে তার এবং মনে হয় আবার বুঝি তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে এবং ভিড়ের অবস্থান জীবন্তভাবে তার কল্পনায় ভেসে উঠে। মিলি রাস্তায় বের হলে মনে হতে থাকে এই বুঝি কেউ তার গায়ে হাত দিলো। রাতে ঘুম হয় না, ঘুমালেও মাঝেমধ্যেই দুঃস্বপ্ন দেখে তাকে কেউ বাজে ভাবে স্পর্শ করছে এবং স্বপ্নগুলো সত্যি মনে হয়। এইভাবে রাতে প্রায়ই ঘুম ভাঙ্গে তার। তখন মিলির ঘাম হয় ও শরীর কাঁপতে থাকে।

রুবেল উপকূলীয় এলাকায় থাকে যেখানে কয়েক বছর পরপর ঘূর্ণীঝড়ের আগমন খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। একবার রুবেলের এলাকায় ঘূর্ণীঝড় সিডর আঘাত হানে যার ফলে রুবেল তার বাবা এবং তার সর্বস্ব হারায়। এর পর খোলা আকাশের নিচে ছাড়া থাকার আর কোন উপায় ছিল না তার। সিডরের পর রুবেলের ঘুমের সমস্যা প্রকট হয়ে যায়, স্মৃতিবিভ্রম হয়, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে এবং হালকা ঝড় হলেই ভয়ে অস্থির হয়ে যায় এই ভেবে আবার হয়তো তার বাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়ে যাবে এবং সে পথে বসে যাবে। সারাক্ষণ রুবেল তাই উদ্বিগ্ন থাকে। এতে তার দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাঘাত ঘটছে।

আমরা উপরে মিলি এবং রুবেলের যে অবস্থা দেখলাম, তাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি বলে। একটি দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে যখন কেউ সেই ঘটনা নিয়ে ভয় বা আশংকা অনুভব করে যেটার প্রভাব শারীরিক ও মানসিকভাবে তার ওপর পড়ে, তখন তাকে পিটিএসডি বলা হয়। সাধারণত একটি দুর্ঘটনার পর আমরা সেই ঘটনা নিয়ে কিছুদিন চিন্তা করতে থাকি। দুর্ঘটনাটি আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেললেই কি আমরা সেটিকে ডিসঅর্ডারের আওতায় আনবো?-না, দুর্ঘটনার রেশ থেকে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যপার হলেও সেটির প্রভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাঘাতগ্রস্থ হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। দুর্ঘটনার ১ মাস পরেও যদি কোনো ব্যক্তি মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে না পারে এবং এটি যদি পরবর্তী কমপক্ষে এক মাস ধরে তার প্রতিদিনের কাজে কর্মে প্রভাব ফেলতে থাকে এবং এর সাথে সাথে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ করতে থাকে তখনই সেটিকে আমরা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের কাতারে ফেলতে পারি।

আমরা মিলি ও রুবেলের মধ্যে যে লক্ষণগুলো দেখতে পাই যেমন ঘুমে ব্যাঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কল্পনায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, দৈনন্দিন জীবনের ব্যাঘাত ঘটা এবং শারীরিক প্রভাব পড়া। তাদের মধ্যে সেই দুর্ঘটনার প্রচুর ফ্ল্যাশব্যাক হয়, মনে হতে থাকে আবার হয়তো তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে। মিলির সাথে যৌন নিপীড়ন বা রুবেলের সর্বস্ব হারানোর ফলে তাদের মধ্যে ভয় ও আশংকা বিরাজ করে যার কারণে তাদের শরীরে বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়। ঘাম, দ্রুত নিঃশ্বাস, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, সাময়িক উচ্চ রক্তচাপ ইত্যদি উপায়ে শারীরিকভাবে প্রভাব ফেলে। তাই বলা হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তিরা ভুগে থাকে।  এমনকি তাদের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনা ঘটলে বা শুনলে তারা এড়িয়ে যায় বা রিএক্ট করে ফেলে কারণ ব্যাপারটা তারা সহজভাবে নিতে পারে না।

বিভিন্ন ভাবে পিটিএসডি থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন থেরাপি যেমন কগনিটিভ-বিহ্যাভিউরাল থেরাপি, এক্সপোজার থেরাপি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট থেরাপি, হিপনোথেরাপি, রিল্যাক্সেশন থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি বা গ্রুপ থেরাপি দিয়ে থাকে। থেরাপির সাথে সাথে কাউন্সেলিং ও করা হয় যাতে করে কথা বলার মাধ্যমে সেই ব্যাক্তি হালকা অনুভব করতে পারে। নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে পিটিএসডি ভালো হয়।

সবশেষে বলা যায়, পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তি যদি পারিবারিক সাপোর্ট পায় এবং কাছের মানুষ যদি তাদের স্ট্রেসের সময় পাশে থাকে, তাহলে তাদের দৈনন্দিন জীবন সহজ হয় এবং পিটিএসডি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সহজভাবে।

(নুজহাত জাহানারা)

লোকে কী বলবে!!!

Share


হাসান অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। ছোটবেলা থেকেই একটূ লাজুক প্রকৃতির ছেলে। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও তেমন অংশ গ্রহণ করেনা। বন্ধুদের আড্ডায়ও চুপচাপ। আসলে কথা বলতে ভয় পায়- যদি বন্ধুরা ঠাট্টা করে বসে! ক্লাসরুমে টিচার পড়ানোর সময় কোনোকিছু বুঝতে না পারলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে ভয় পায়। ভাবে, যদি তার ক্লাসমেটরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে! অথবা যদি নার্ভাস অবস্থায় প্রশ্ন করেও বসে তখন প্রশ্ন করতে যেয়ে কথা আটকে যাওয়া কিংবা তোতলানোর ফলে শিক্ষক যদি তাকে তাচ্ছিল্য করেন! ধুর! থাক না, কী দরকার! যার ফলে আর প্রশ্ন করা হয়না। ক্লাস শেষে অনেক বিষয় নিয়েই কনফিউশন থেকে যায় হাসানের।


মৌমিতা বেশ ভালো গান গায়। আজ প্রথমবারের মত সে কলেজ ফাংশনে গান গাইবে। একটু পরেই স্টেজে তার নাম ঘোষণা হবে। কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছে। যদি গানের লিরিকস বা টোন ভুল হয়ে যায়!! কী একটা লজ্জাজনক বিষয়! স্টেজে ওঠার পর হলভর্তি মানুষ দেখে ভয়টা যেন আরো জাঁকিয়ে বসলো মৌমিতার। স্টেজে উঠে ভুল গান গাওয়া! ছিঃ ছিঃ লোকে কি বলবে! হাত পা কাঁপছে মৌমিতার, গলা শুকিয়ে আসছে, হাত থেকে মাইকটা পড়েই গেলো।

এই মৌমিতা বা হাসানের মত অনেকেই আছে যারা কিনা এইরকম জনসম্মুখে কথা বলতে কিংবা যেকোনো কাজ করতে ভয় পান কিংবা অস্বস্তি অনুভব করেন। নিজেদের মতামত কিংবা পারফর্মেন্স সম্পর্কে অহেতুক দুশ্চিন্তা করেন। যদি ভুল হয় তো মানুষ কি বলবে!!! এই টেনশন কাজ করতে থাকে নিজের ভিতর। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে আগে “সোশ্যাল ফোবিয়া” বলে উল্লেখ করলেও এখন এটিকে “সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার” নামেই অভিহিত করে থাকেন। যাদের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার রয়েছে, তারা সামাজিক সিচুয়েশনগুলোতে নিজেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। তারা মানুষ কি ভাববে এই নিয়ে বিব্রত বোধ করেন। আমরা যদি সোশ্যাল এ্যাংজাইটির উদাহরণ নিয়ে কথা বলতে চাই তাহলে প্রধানত এই পাবলিক প্লেসে কথা বলা কিংবা খাওয়াদাওয়া করার কথা আসবে। স্টেজ পারফরমেন্স এর বেলায় ব্যক্তির মধ্যে এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কাজ করা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। ২০০৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া অস্ট্রিয়ান লেখিকা এলফ্রিদে ইয়েলিনেক স্টকহোমের আড়ম্বরপূর্ণ নোবেল প্রদান অনুষ্ঠানে আসেননি। তার সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ছিলো বিধায় তিনি তার নোবেল প্রাইজ গ্রহণ করেন একটি ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এতে আমরা হয়তো বুঝতে পারছি এই ডিসঅর্ডারটি যেকোনো মানুষের মধ্যেই থাকতে পারে। কিন্তু এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি আমাদের কেন হয়ে থাকে?


গবেষকরা বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির কারণ হিসেবে। তারা বলেন, এমন অনেকে আছেন যারা নিজেদের সম্পর্কে কিছু ধারণা নিজের মধ্যে লালন করেন, যেমন তারা হয়ত দেখতে আকর্ষণীয় নন কিংবা তারা যেকোনো কাজে দক্ষতার পরিচয় রাখতে পারবেন না অথবা দক্ষতার সাথে কোনো কাজ করতে গেলে তারা ব্যর্থ হবেন এবং মানুষ তাকে তার ব্যর্থতার জন্য ব্যঙ্গ করবে। তারা মনে করেন যে সামাজিক কোনো সিচুয়েশনে তার ব্যবহারের ফলে মানুষ তাকে তিরস্কার করবে। এই ধরণের নানারকম চিন্তা ভাবনা ব্যক্তির ভিতর গেঁথে যাওয়ার ফলেই মূলত এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির সূচনা হয়।


সোশ্যাল এ্যাংজাইটি আমাদের বিশ্বে বেশ সাধারণ একটি বিষয়। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় আমেরিকায় প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭ জনের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি রয়েছে। পুরুষদের চাইতে মহিলাদের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগার হার বেশি। প্রতি ২ জন পুরুষের অনুপাতে ৩ জন মহিলা এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির মধ্য দিয়ে যায় (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ, জানুয়ারী, ২০১৮) বাংলাদেশে এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষের হার শতকরা ৪ ভাগ। (ডেইলি স্টার, জুন, ২০১৮)


সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষজনের মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা যায় সেগুলোর ভেতর কথা বলায় জড়তা অনুভব করা, নার্ভাস ফীল করা, ঘাম হওয়া, কাঁপুনি অনুভব করা  কমন। অনেক সময় বেশি সংখ্যক মানুষের সামনে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা কিংবা নাচ-গান পারফর্মের সময় দুশ্চিন্তা অনুভব হওয়া কিংবা ভয় পাওয়া বিষয়টিকে “স্টেজ ফ্রাইট” (Stage Fright) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই স্টেজ ফ্রাইটের কারণ হচ্ছে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার। ব্যক্তি মনে করেন যে তিনি দক্ষতার সাথে পারফর্ম করতে পারবেন না এবং দর্শকরা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে; একজন স্টুডেন্ট মনে করে করে যে সে হয়তো ভালোভাবে তার এ্যাসাইনমেন্টটি রুমভর্তি অন্যান্য স্টুডেন্টদের সামনে প্রেজেন্ট করতে পারবে না। ফলে সে ভীত হয়ে পড়ে।


তবে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কোনো দুরারোগ্য বিষয় নয়। গবেষকরা এর প্রতিকার বের করেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা একে “এক্সপোজার থেরাপী” নামে উল্লেখ করে থাকেন যা কিনা বিভিন্ন ধরণের ফোবিয়া ট্রিটমেন্টের সময় ব্যবহার হয়ে থাকে। থেরাপিস্টরা বলেন সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা ব্যক্তিকে বেশি বেশি সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তার এই অহেতুক ভয়টি তিনি কাটিয়ে উঠছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া সাধারণ ভাবে হাসান কিংবা মৌমিতার মত সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষদের অন্যান্য পরামর্শ দেয়া হয়। যেমন ছোট গ্রুপে কথা বলা। যেহেতু তারা পরিচিত ও খুব কম মানুষের সামনে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেহেতু প্রথমে তাদেরকে তাদের বন্ধুদের সামনেই কথা বলতে বলা হয়। এরপর হয়তো তাদের সেই গ্রুপে এক দুইজন অপরিচিত ব্যক্তিকে আনা হয়। এরপর আস্তে আস্তে সেই সংখ্যাটি বাড়ানো হয়। একে বলে গ্রুপ থেরাপি। এভাবে আস্তে আস্তে মানুষের সামনে কথা বলতে পারা ব্যাপারটা তাকে যেকোনো সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। গ্রুপ থেরাপিতে গ্রুপ মেম্বাররা ব্যক্তিকে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেন। তার প্রশংসা করেন যাতে ব্যক্তি কথা বলতে কিংবা গান গাইতে সাহস পান। মৌমিতার মত স্টেজ ফিয়ারযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য অনেক সময় থেরাপিস্টরা আয়নার মত খুব সাধারণ একটি বিষয় ব্যবহার করেন। ব্যক্তিকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে নিজেকে দেখে পারফরম করতে বা কথা বলতে বলা হয়। এরপর হয়তো দুই একজন মানুষের সামনে তাকে উপস্থাপন করা হয় কথা বলার জন্য। এভাবে আস্তে আস্তে সে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে ওঠা এবং কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই কথা বলা কিংবা যেকোনো কাজ করতে পারার কৌশল রপ্ত করে। আমরা বলছি না আপনি দুই-একবারের চেষ্টাতেই মোটিভেশনাল স্পীকারদের মত স্টেজ কাঁপিয়ে দিতে পারবেন। তবে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে নিজেকে ভালোভাবে প্রেজেন্ট করতে পারাটাই এখানে বড় সাফল্য। এক্ষেত্রে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কাটাতে ব্যক্তির চেষ্টা এবং ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড় উপায়। মূলত বারবার প্র্যাকটিসের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কেটে উঠতে পারে বলে মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা।

(আশিক মাহমুদ)

Narcissistic Personality Disorder (NPD)

Share


সূচনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। সে নিজেকে সবসময় সবচেয়ে মেধাবী, সুন্দরী, অভিজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন  মনে করে এবং মনে করে সবাই তার গুণের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। নিজের সমালোচনা সে কখনোই শুনতে চায়না। অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখায় না। সূচনা কারো সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে ও তা রক্ষা করতে পারেনা। তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে সূচনার মধ্যে বিষয়গুলো দেখেছে এবং তাকে একজন সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেখান বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তারা জানতে পারে যে সূচনা নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।

আজকালকার দিনে মানুষের মধ্যে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD) বা আত্মমুগ্ধতাসূচক ব্যক্তিত্ব ব্যাধি প্রবলভাবে বেড়ে চলছে। নার্সিসিস্ট ট্রেইটগুলো যখন ব্যাক্তির মধ্যে স্থায়ী ও একরোখা থাকে, মনস্তাত্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ করে এবং ব্যাক্তির কাজে ক্ষতি করে তখন তাকে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅরডার(NPD) বলা হয়। NPD নির্ণয় করা হবে তখন যখন ব্যাক্তির মধ্যে নিম্নোক্ত পাঁচ বা তার অধিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পাবে। এগুলো হলো-

০১। নিজেকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

০২। ক্ষমতা, সাফল্য, সৌন্দর্য, শক্তি ইত্যাদি পাওয়ার মোহে আচ্ছন্ন থাকা।

০৩। অন্যের আবেগ-অনুভূতি, প্রয়োজনকে স্বীকার করতে না চাওয়া।

০৪। নিজেকে খুবই স্পেশাল মনে করা এবং শুধু উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মানুষ/প্রতিষ্ঠান তাকে বুঝতে পারে এরকম ধারনা পোষণ করা।

০৫। অহংকারী, উদ্ধত আচরণ প্রকাশ করা।

০৬। নিজেকে ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে মনে করা এবং নিজের ভুলটাকেও সঠিক বলে চালিয়ে দিতে চাওয়া।

০৭। আত্ম-সমালোচনা সহ্য করতে না পারা।

০৮। অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে না পারা।

০৯। যেকোনো আড্ডা বা সমাবেশে নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাওয়া।

১০। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না চাওয়া।

১১। প্রতিহিংসাপরায়ণ ও অনুভূতিহীন হওয়া।

১২। অত্যধিক প্রশংসা পাওয়ার উচ্চ বাসনা।

১৩। অন্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চাওয়া ও ক্ষমতা দেখাতে চাওয়া।

১৪। বাস্তবতা সম্পর্কে কম ধারণা রাখা।



নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD) পরিবেশ, সমাজ ও জিনগত কারণে হতে পারে। ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের তুলনায় এটি বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে ছোটবেলায় যেসব বাচ্চা বাবা-মায়ের কাছে অবহেলিত হয় এবং অনেক শাসনে থাকে, বড় হয়ে তাদের মধ্যে NPD দেখা দিতে পারে। এছাড়া ছোটবেলা থেকে যেসব বাচ্চা খুব বেশি পজেটিভ ব্যবহার (আশকারা) পেয়ে থাকে বিভিন্ন ভুল-ভ্রান্তি করা সত্ত্বেও; তাদের মধ্যে এই ডিসঅর্ডারটি দেখা দিতে পারে।



ট্রিটমেন্ট-

সাইকোথেরাপি, ট্রান্সফারেন্স-ফোকাসড, মেটাকগনেটিভ থেরাপির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে তার প্রকৃত ব্যক্তিত্ব, গুণাবলি, ক্ষমতা বুঝতে সাহায্য করা হয়। NPD তে আক্রান্ত বেশিরভাগ ব্যাক্তি তাদের রোগ স্বীকার করতে চায়না। সাইকোডায়নামিক থেরাপিস্টরা এরকম মানুষকে তার সমস্যাগুলো বুঝাতে সাহায্য করে এবং তার দুর্বলতা ও প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে।


আমাদের পরিবার বা বন্ধুমহলে এমন মানুষ হয়তো আছে যারা এই নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে। সবার সাহায্য ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবাই পারে তাদেরকে এই ডিসঅর্ডার থেকে বের হয়ে আসতে এবং সহানুভূতিশীল ও সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করতে।

অন্তরা অন্তু

চিন্তার কাছে দাসত্ব

Share

১)ফাইজা ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। তার বন্ধু সংখ্যা খুব কম। আরাফ সবসময় ওর সাথেই থাকে। ফাইজা মেয়েটা সবসময় সবকিছু নিয়ে Over confused  থাকে। রুটিন  থাকা স্বত্বেও আরাফকে ফোন দিয়ে কখন, কোন ক্লাস  সিওর হওয়া চাইই । প্রায়ই এমন হয় আরাফকে একটানা ২৫-৩০  বার কল দেয় ক্লাস  টাইম জানার জন্য । শুরুতে আরাফের ধারণা ছিল ওকেই শুধু এতবার কল দেয়,  বিরক্ত করে। কিন্তু ও সবাইকে  এতবার কল দেয়। ফাইজার আরেকটা সমস্যা হলো দরজার লক বার বার চেক করা। গত সপ্তাহে  Statistics ক্লাস মিস করেছে, বাসার গেইট বন্ধ করেছে কিনা তা সিওর হবার জন্য বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসায় ফিরে গিয়ে দেখে এসেছে গেইট  ঠিক মতো  বন্ধ করেছে কিনা। ফাইজা নিজের আচরণে প্রায়ই কষ্ট পায়।বাসার লোকজনও চায় ফাইজা আগের মতো হয়ে যাক।

২)আরাফের প্রতিবেশি মতিন আংকেল, কলেজের শিক্ষক। উনার একটি সমস্যা হলো বার বার হাত ধোয়া। ভদ্রলোক ৩ ঘন্টার মতো সময় নিয়ে গোছল করেন।উনার কাছে সবকিছু  অপরিষ্কার লাগে।  মোবাইল, টাকা, রিমোট ধরার পর বার বার হাত ধোয়া লাগে উনার । সহকর্মী বা বাসার সবাই উনার উপর খুব  বিরক্ত।

##ফাইজা বা মতিন আংকেল এক ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। যার নাম অবসেসিভ -কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার। যা সংক্ষেপে ওসিডি(OCD) নামে পরিচিত। যা চিন্তার কাছে দাসত্ব নামেও অবিহিত। এ রোগের লক্ষ্মণ গুলো হলোঃ

-বার বার একই কাজ বা একই চিন্তা করা,

-কোনো কাজ খুব বেশি নিখুঁত ভাবে করার চেষ্টা করা, বেশি দুশ্চিন্তা করা,

-হাত ধোয়া বার বার, ঘনঘন ঘর পরিষ্কার করা,

– পুরনো ও অদরকারি জিনিস জমিয়ে রাখা

-দরজার লক বার বার চেক করা ইত্যাদি।

কারণঃ

অনেক কারণে একজন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কারণ গুলো হলো –

১.হতাশা, মানসিক চাপ

২.বংশগত কারণেও অনেকে এ রোগে  আক্রান্ত হতে পারে

৩.মস্তিষ্কে বেশি পরিমাণে সেরোটোনিন থাকলে

৪.নিউরোট্রান্সমিটার এ ডিসফাংশন দেখা দিলে (ব্রেইন তখন বার বার একই কাজ করতে  সিগন্যাল দেয় )

চিকিৎসা:

১)মেডিটেশন, যোগ ব্যায়াম খুব উপকারী রোগ নিরাময়ে কারণ এর মাধ্যমে রোগী তার অবসেসিভ ব্যবহার উপলব্ধি করে।

২)ব্যক্তিগত সমালোচনা পরিহার করতে হবে,রোগীকে বুঝাতে হবে একই কাজ বার বার করার কোনো দরকার নেই।

৩)ব্রেইনের ফাংশন স্বাভাবিক করতে ঔষধ নিতে হবে

৪) কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি :রোগীর আচরণে পরিবর্তন ঘটিয়ে রোগ মুক্তি। এ থেরাপি দুভাবে কাজ করে,

এক্সপোজার – যে বিষয়ে রোগীর মনে  খুঁতখুঁতে চিন্তা আসে তার মুখোমুখি করা রোগীকে।

রোগীকে বুঝানো অযথা চিন্তা করছে তুচ্ছ বিষয় বা কাজ নিয়ে।

রেসপন্স প্রিভেনশন – রোগী যে কাজটি বার বার  করতে চায় তা করতে না দেয়া।এবং বুঝানো কাজটি বার বার করার কোনো মানে নেই ।

অনেক সময়  রোগীকে ভালো করতে আর অবসেসিভ চিন্তা দূর   ডায়েরি লিখতে বলা হয়। পছন্দের কাজ বা বন্ধুদের বেশি সময় দিতে উৎসাহ দেয়া হয় ।

লিখেছেন – তাহমিনা সুলতানা ইভা

মাইন্ডফুলনেস – বর্তমানে থাকুন

Share

সাহানা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।প্রতিদিনের হাজারো কাজের চাপে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন।এই দিশেহারা অবস্থা থেকে বের হতে তিনি নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়েছেন।
কক্সবাজারের সুবিশাল জলরাশী ও অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে থেকেও সাহানা অস্থির হয়ে আছেন বিভিন্ন চিন্তা নিয়ে।তিনি ভাবছেন তার এই মুহুর্তে কক্সবাজার না এসে অফিসের কাজ করা উচিত ছিল,ছুটিশেষে সে কিভাবে এতকাজ একসাথে সামলে নিবে,এছাড়া আরো কত কাজ তার পরে আছে,আগেও সে কাজে ফাঁকি দিয়েছিল যার জন্য তাকে খেসারত দিতে হয়েছিল ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে তার নিজস্ব চিন্তার জগতে হারিয়ে গেলো এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য তার আর উপভোগ করা হয়ে উঠলনা।

একটু ভেবে দেখুন তো আপনার সাথেও কি এরকমটা হয়?

এমন অনেক সময় হয় যে আমরা কারো সাথে কথা বলছি,বা বই পড়ছি কিন্তু আমাদের মন পড়ে আছে নিজেদের চিন্তা,আশংকা,ব্যাকুলতা,আশা-হতাশা,উদ্বিগ্নতা ভবিষ্যত নিয়ে অথবা অতীতের স্মৃতিরোমন্থন নিয়ে।আর বর্তমান সময়ে আমাদের মোবাইল ফোন,সোস্যাল মিডিয়া,মেইল,টেক্সট ইত্যাদি অতি সহজেই আমাদেরকে অন্যমনস্ক করে তোলে।প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়গুলোতে অতীত আর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমরা আমাদের বর্তমান মুহুর্তটিতে আর মনোযোগ দিতে পারিনা।

কিভাবে অতীত ও বর্তমানের হাজারো চিন্তা থেকে মনকে সড়িয়ে বর্তমানে ধরে রাখা যায়?

“মাইন্ডফুলনেস”যা আপনাকে আত্ম-পরিবর্তন ও আত্ম-সমৃদ্ধিতে সহায্য করবে।
কোন রকম বিচার বিবেচনা না করে বর্তমান মুহুর্তটিতে সজাগ থাকাই হলো মাইন্ডফুলনেস।
বর্তমান সময়টিই আসল।কিন্তু অতীত আর ভবিষ্যতের নানাবিধ চিন্তার কারনে বর্তমান সময়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়না।মাইন্ডফুলনেস আপনাকে বর্তমান সময়ে মনোযোগী ও দক্ষতাসম্পন্ন হতে সাহায্য করবে।

মাইন্ডফুলনেস একধরনের মেডিটেশন।বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরনের মাধ্যমে মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন করানো হয়ে থাকে।প্রতিনিয়ত প্র্যাকটিস করলে মনোযোগ বর্তমান মুহূর্তে ধরে রাখা সম্ভব।মাইন্ডফুল থাকা অবস্থায় আপনি দেখতে ও বুঝতে পারবেন বিভিন্ন চিন্তার জগৎ কিভাবে আপনাকে গ্রাস করে ফেলছে।যেহেতু মাইন্ডফুল অবস্থায় ক্লিয়ার মাইন্ডে থাকা হয় সেহেতু জীবনের বিভিন্ন প্রবলেমগুলোকে সহজভাবে দেখা যায়।

কেন আপনি মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস করবেন?

-মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস স্ট্রেস,এ্যাংজাইটি ও ডিপ্রেসন থেকে বের হয়ে আসতে অসাধারন ভূমিকা পালন করে।
-পর্যবেক্ষণ ও মনোসংযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
-আত্মনিয়ন্ত্রন ক্ষমতা বাড়ায়।
-মাইন্ডফুলনেস এক ধরনের মেডিটেশন যা প্রতিনিয়ত চর্চা করার ফলে আমার মতিষ্কের গঠনে পরিবর্তন আসে এবং শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
-শান্তিপূর্ণ ঘুমে এর ভুমিকা অনস্বীকার্য।
-বয়স্ক মানুষদের মধ্যে একাকীত্বতার হার কমায়।

আজকালকার দিনে যখন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারনে আমাদের মনোযোগ ও দক্ষতা সঠিকভাবে ব্যাবহার করা কঠিন হয়ে উঠছে তখন এই মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস আমাদের জন্য হতে পারে আশীর্বাদ।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন,মানসিক স্বাস্থ্য,মানসিক প্রশান্তি ইত্যাদির উপর হাতকলমে শিক্ষা দিয়ে থাকে।আর আপনার হাতে যদি সময় কম থাকে তবে ইউটিউবে মাইন্ডফুলনেস রিলেটেড ভিডিওগুলো দেখে নিতে পারেন।
মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস একবার শুরু করেই দেখুন না জীবন কতটা সুন্দর হয়ে উঠে;জীবনের স্বাদ,গন্ধ,প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করা আসলেই কতটা আনন্দদায়ক।


অন্তরা অন্তু

মন খারাপই বিষন্নতা নয়

Share

‘দোস্ত, কিছুই ভাল্লাগেনা, আমি অনেক ডিপ্রেসড!’ বর্তমান সময়ে প্রায় মানুষের মুখেই এই কথাটা শোনা যায়। কিন্তু আসলেই কি সবাই ডিপ্রেশনের শিকার?

প্রায় সময়ই আমরা মন খারাপ থাকা (sadness) এবং বিষন্নতাকে (depression) এক করে ফেলি। কিন্তু বিষয় দুটি এক নয়। মানুষের মধ্যে basic কিছু আবেগ বা emotion থাকে, sadness তার মধ্যে একটি।  আমাদের মন ভালো থাকাটা যেমন খুব স্বাভাবিক, তেমনি মন খারাপ থাকাটা‌ও খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন, আপনার কোন একটা পরীক্ষায় আপনার ফলাফল খুবই খারাপ হল। সেদিন আপনার মন খারাপ থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? অথবা প্রতিদিনের প্রচুর ক্লাস, পড়া, টিউশন আর কাজের চাপের কারণে বা কর্মক্ষেত্রে বিরূপ পরিবেশের কারণে দিন শেষে কিছুই ভালো না লাগা। এখানে আপনার ভালো না‌ লাগার কারণ ডিপ্রেশন না, কাজের চাপ বা stress। পরবর্তীতে কাজের চাপ সামলানো শিখে গেলে আমরা অনেকটা স্বস্তি বা‌ আনন্দ বোধ করি। এখানেই মূলত মন‌ খারাপ আর ডিপ্রেশনের মধ্যে পার্থক্যটা। 

ডিপ্রেশন একটি ক্লিনিকাল ডিজঅর্ডার।  আমাদের শরীরে কোন অসুখ আছে কি না তার জন্য যেমন diagnosis দরকার, তেমনিভাবে ডিপ্রেশন নির্ণয়ের জন্যও কিন্তু diagnosis দরকার। ডিপ্রেশনের অনেকগুলো লক্ষনের মধ্যে একটি হচ্ছে sadness।  প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ডিপ্রেশনের শিকার মানুষ কোন কাজেই আনন্দ খুঁজে পায়না। প্রতিদিন আড্ডা দেয়া মানুষটা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া শুরু করে। প্রিয় সিরিজের নতুন এপিসোড রিলিজ হলে সবার মাঝে যে excitement কাজ করে, ডিপ্রেশনে থাকলে সেই excitement এর ছিটেফোঁটাও হয়ত কারও মাঝে দেখা যায়না। পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ পায়। নিজের প্রতি, নিজের জীবনের প্রতি মানুষ খুবই নেতিবাচক ও হতাশ হয়ে পড়ে এবং কাজ করার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।  খাওয়া, ঘুম, প্রতিদিনের ছোট বড় কাজে মানুষ অনিয়মিত হয়ে পড়ে । মানুষ নিজের উপর যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই লক্ষণগুলো টানা দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে থাকলে ব্যক্তি ডিপ্রেশনে ভুগছে বলে ধরা হয়। চারপাশে ঘটে যাওয়া কিছু আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি তারা প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনের শিকার ছিল।

মন খারাপ ডিপ্রেশন কেন হয়?

মন‌ খারাপের কারণ আমাদের সবারই জানা। কারও সাথে মনোমালিন্য হলে, প্রিয় কোন জিনিস হারিয়ে গেলে, প্রিয় দল খেলায় হারলে ইত্যাদি কারণে আমাদের মধ্যে যে আবেগ বা ইমোশনের উদ্রেক হয়  সেটা sadness। অপরদিকে ডিপ্রেশনের কারণগুলো বেশ‌ সূক্ষ্ণ ও জটিল। বিভিন্ন মানুষের ডিপ্রেশনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন এবং তাদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে কারণগুলোর বিস্তৃত ও সঠিক বর্ণনা প্রয়োজন।

মন খারাপ থাকা আমাদের প্রতিদিনের রুটিনকে বাধাগ্রস্ত করেনা, অপরদিকে ডিপ্রেশনে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম কাজ করার জন্যও যেন নিজের সাথে যুদ্ধ করা লাগে। আমাদের মন খারাপ থাকাটা সাময়িক। পছন্দের কোন কাজ করলে বা প্রিয়জনের সাথে সময় কাটালে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু ডিপ্রেশন দূর করার জন্য প্রফেশনাল হেল্প বা কাউন্সেলিং দরকার।

জীবনে ভালো থাকার তাগিদ অনুভব করতে একটু আধটু মন খারাপের দরকার আছে। একটা দিন খারাপ যেতেই পারে। তাকে বিষন্নতা না ভেবে ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে দেখাটা জরুরি।

লিখেছেন – সামিরা