শিশুর বিকাশের ধারাবাহিকতা

Share

শিশুর বিকাশ (জন্ম থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত)

শিশুর বৃদ্ধি একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এক একটা বয়সে শিশুর এক একটা কাজ করা উচিত, একে বলে বিকাশের স্তর। তবে বয়স অনুযায়ী শিশু কাজকর্ম করছে কিনা সেদিকে নিয়মিত নজর রাখা উচিত প্রত্যেক মা বাবার। কেননা দুটি বাচ্চার বিকাশ সমগতিতে হয় না। শিশু অন্য রকম ব্যবহার করছে, তার কারন হয়তো সে অসুস্থ বা কোন কারনে বিপর্যস্ত। কখনো কখনো তার বিকাশ কোনো কোনো বিষয়ে সম বয়সের অন্য বাচ্চাদের তুলনায় ধীরে হতে পারে। কিন্তু অন্য বিষয়ে হয়তো অন্যদের থেকে অনেক আগে হতে পারে।শিশু নিজে প্রস্তুত না হলে তাকে হাঁটতে শেখার জন্য জোর করলে কোনো উপকার হয় না। তাই প্রত্যেক অভিভাবককে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ স্তরঃ

শিশুর বিকাশের স্তর হল একটি ক্ষমতা যা নির্দিষ্ট বয়সের অধিকাংশ শিশুদের দ্বারা অর্জিত হয়। বিকাশের স্তরগুলি শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়/জ্ঞানীয় এবং যোগাযোগ দক্ষতা যেমন হাটা, দৌড়ানো কথা বলা ইত্যাদি।শিশুর জন্মের পর শিশুর বেড়ে ওঠার ধারা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে পরিনতি লাভ করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

শিশুর মানসিক বিকাশের ধাপগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।সে যদি তা যথাসময়ে অর্জন করে, তবে তার বিকাশ স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায়। শিশু অন্য রকম ব্যবহার করছে, তার কারন হয়তো সে অসুস্থ বা কোন কারনে বিপর্যস্ত। এগুলো অবশ্য শিশুভেদে কখনো একটু এদিক – ওদিক হতেই পারে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও শিশুটি যদি বিকাশের ধাপ অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তার বিকাশের বিলম্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আলোচিত বিকাশের স্তরগুলোর মধ্যে কয়েকটি যদি শিশুর মধ্যে প্রকাশ না পায়, তবে শিশুর বিকাশ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা যেতে পারে। সাধারনভাবে এই দক্ষতাগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশ না দেখা গেলে বলা যেতে পারে শিশুর বিকাশে বিলম্ব হচ্ছে। তা ছাড়া কয়েক মাস পরও যদি শিশু বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক কাজ করতে না পারে, তবে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো দরকার।

জন্ম থেকে ২ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ

২ মাস বয়সে অধিকাংশ শিশু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকাশ হয়ে থাকে, কথা বললে হাসি দেয়,শিশু নিজে নিজে কান্না থামায় ও মুখে হাত নিয়ে চুষতে পারে। শিশু বাবা মাকে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পারে। স্থির দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকাতে পারে, কোলে নিয়ে দোলালে শান্ত হয়।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ

শিশুরা এইসময়ে কান্না ছাড়া গলা দিয়ে শব্দ করতে শুরু করে। শব্দ শুনে মাথা সেদিকে ঘুরিয়ে দেখতে চায়।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন, চিন্তন, সমস্যা সমাধান)
মুখ দেখে শিশুরা হাসে, হঠাৎ আওয়াজে চমকে যায়। শিশুরা খুশি প্রকাশ করতে শেখে, কষ্ট পেলে মুখে তার অভিব্যাক্তি দেখা যায়।

শারীরিক বিকাশঃ

শিশুর মাথা একদিকে ফিরিয়ে চিত হয়ে শুতে পারে, হাত পা অনবরত নড়াচড়া করতে পছন্দ করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

২ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ

জোরে শব্দ হলে প্রতিক্রিয়া না করা
মুখ দেখে না হাসা
নড়াচড়া করে এমন জিনিসের দিকে না তাকান।
উল্টো অবস্থায় শোয়ানো থাকলে মাথাটা তুলতে না পারা বা চেষ্টা না করা।

৪ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
৪ মাস বয়সে শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসতে পছন্দ করে,শিশুটি মাকে চিনতে পারে,মানুষের সাথে খেলতে পছন্দ করে, খেলা বন্ধ করলে কান্না করে।কিছু অভিব্যাক্তি অনুকরন করে যেমন হাসি দিলে হাসে, কথা বললে মুখ দিয়ে শব্দ করে।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
৪ মাস বয়স থেকে শিশু অর্থহীন শব্দ বলা শুরু করে, অভিব্যাক্তির সাথে সাথে শব্দ করে এবং যে শব্দ শোনে অনুরূপ শব্দ করার চেষ্টা করে।ক্ষুধা ক্লান্তি ও ভয় অনুভূতির সাথে সাথে শিশুর কান্নার ধরন ও পরিবর্তন হয়।

জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু গলা জরিয়ে ধরে, ঘুরিয়ে তাকায় এবং আদর করলে প্রতিক্রিয়া করে। খেলনা এক হাত থেকে অন্য হাতে নিতে পারে। চোখের দৃষ্টি কোন জিনিসের প্রতি স্থির করতে পারে। চলন্ত জিনিসের সাথে সাথে শিশু ও ঘুরে এদিক অদিক তাকায়।পরিচিত মানুষ চিনতে পারে ও দূরত্ব বুঝতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
হাতের মুঠো বন্ধ করতে পারে। বাচ্চার হাতের তালুতে কিছু ছোঁয়ালে সেটা ধরার চেষ্টা করে, ঘাড় শক্ত হয়, সোজা করে শোয়ালে উল্টো হয়, শিশু পা দিয়ে জিনিস ধাক্কা দেয়, এবং হাত পা মুখে দিতে চায়।যখন সোজা করে তোলা হয় সে বেশ কিছুক্ষন মাথা সোজা রাখতে পারে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

৪ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
নড়াচড়া করে এমন জিনিসের দিকে ঘুরে না তাকানো
পরিচিত মুখ দেখে না হাসা
ঘাড় শক্ত না হওয়া
মুখ দিয়ে কোন শব্দ না করা
মুখে কোন কিছু না দেওয়া
পা দিয়ে ধাক্কা না দেওয়া
চোখ ঘুরিয়ে দেখতে সমস্যা হলে
৬ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু পরিচিত মানুষ দেখে হাসে, অনেক শিশু অপরিচিত ব্যাক্তিদের কোলে যেতে চায় না ,অন্যদের সাথে খেলতে পছন্দ করে বিশেষ করে বাবা মার সাথে খেলতে পছন্দ করে, অন্যদের আবেগ বুঝে ও বেশিরবভাগ সময় হাসিখুশি থাকে।আয়নায় নিজেকে দেখে খুশি হয় বা আশ্চর্য হয়।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশু যে শব্দ শোনে অনুরূপ শব্দ করার চেষ্টা করে, অস্ফুট শব্দগুলো দুই শব্দের হয়।নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়, আনন্দ ও কষ্ট পেলে ভিন্ন শব্দ করে, এক শব্দ অনেকক্ষন করতে থাকে ।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু আশেপাশের জিনিস তাকিয়ে দেখে, জিনিস মুখে দেয়, দূরের কোন জিনিস ধরার জন্য কৌতূহল কাজ করে, এক হাত থেকে জিনিস অন্য হাতে নিতে পারে। আশেপাশের শব্দ শুনলে মাথা ঘোরায়।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু ৬মাস বয়সে চিত থেকে উপুড় বা উপুড় থেকে চিত হতে পারে, ঠেকা দিয়ে অল্প সময়ের জন্য বসতে পারে, শিশুকে উচু করে ধরলে পায়ে কিছু ভার নিতে পারে।উপুর হয়ে শুয়ে হাত –পা ছড়িয়ে নিজের শরীরের ভার নিতে পারে। শিশু দুই হাত জড়ো করে খেলে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৬ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
নাগালের মধ্যে কোন জিনিস না ধরতে চাওয়া।
বাবা মা বা তাকে যে দেখাশুনা করে তার প্রতি প্রতিক্রিয়া না দেখা।
আশেপাশের শব্দ শুনলে মাথা না ঘোরানো ।
মুখের কাছে কোন জিনিস নিতে কষ্ট হওয়া।
মুখে অস্ফুট শব্দ না করা।
নিজে নিজে চিত কাত না হওয়া।
না হাসা বা চিৎকার না করা।
খুব শক্ত হয়ে থাকা বা পেশী শক্ত থাকা।
খুব নিস্ক্রিয় থাকা।

৯ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু নতুন কোন ব্যক্তি দেখে ভীত হতে পারে,অনেক শিশু অপরিচিত ব্যাক্তি ছাড়া অন্য কার ও কাছে যেতে চায় না। মায়ের সঙ্গে বা যে তাকে দেখা শুনা করে তার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মায়ের কাছে সরিয়ে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে আপত্তি প্রকাশ করে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশু হ্যাঁ /না বুঝতে পারে, বড় শব্দ বলতে পারে,ভিন্ন ভিন্ন শব্দ বলতে পারে,যেমন মা বাবা ।অন্যের মুখে কথা শুনে একইরকম শব্দ করার চেষ্টা করে।আঙ্গুল দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু দেখাতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশুরা এইসময়ে টুকি (মুখ লুকিয়ে মুখ দেখানোর খেলা) পছন্দ করে, অনেক শব্দ বলতে শেখে।কোন জিনিস চাইলে দিতে পারে,এক হাত থেকে অন্য হাতে জিনিস সহজেই নিতে পারে।
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু দাঁড়াতে পারে কোন কিছু ধরে এগোনোর চেষ্টা করে, আসন করে বসতে পারে, সমর্থন ছাড়াই বসতে পারে। হাত মুঠো করে কোন জিনিস ধরে টান দিতে পারে।নিজের বাহু নিয়ন্ত্রন করতে শেখে।হামাগুড়ি দেয়া শুরু করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৯ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
সমর্থন ছাড়াই বসতে না পারা বা সমর্থন দিয়ে বসতে না পারা।
মা বাবা দাদা ইত্যাদি শব্দ না বলা।
মুখে অস্ফুট/অর্থহীন শব্দ না করা।
কোন খেলনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব না করা।
এক হাত থেকে জিনিস অন্য হাতে না নেওয়া।

১বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অপরিচিত লোক দেখে লজ্জা ও জড়তা কাজ করে, বাবা মা বাইরে গেলে কান্না করে। পছন্দের ব্যাক্তি বা মানুষ বুঝতে পারে।কিছু পরিস্থিতিতে ভয় পায়।গল্প বললে বা শব্দ শোনে মনোযোগী হয়। রাগ ও ভালবাসার প্রকাশ শেখে। প্রবল উৎসুক নিয়ে নানান জিনিসে হাত দিতে দেয় ,মুখে দেয়। কোন জিনিস দিতে বা নিতে শিখে.
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশুকে কোন বিষয়ে অনুরোধ করলে সাড়া দেয়, হাত নেড়ে টা টা করতে শেখে।না বললে বুঝতে পারে । কথা বললে সাড়া দিয়ে সেও কিছু বলার চেষ্টা করে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু ভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করতে পারে নিজেকে যেমন কোন জিনিস হাত ছুঁড়ে মারা। লুকানো জিনিস খুঁজে বের করতে পারে,।নির্দিষ্ট জিনিস নাম ধরে সনাক্ত করতে পারে। অন্যর অভিব্যাক্তি অনুকরন করতে পারে। কাপ দিয়ে পানি খাওয়া চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানো ইত্যাদি আচরন রপ্ত করে, শিশু দুটো জিনিস একত্রে জোড়া লাগাতে পারে, বোতলে/পাত্রে কোন জিনিস ভরতে পারে বের করতে পারে। আঙ্গুল দিয়ে জিনিস দেখাতে পারে। সাধারন নির্দেশনা বুঝে কাজ করতে পারে যেমন খেলনা যথাস্থানে রাখা।
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। শিশুরা এই বয়সে দাঁড়াতে শেখে । হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটু এগোতে পারে। বুড়ো আঙ্গুল ও তর্জনী একত্র করতে পারে। শিশু ফার্নিচার ধরে হাঁটতে পারে। অনেক শিশু একা একা হাঁটতে পারে। পায়ের উপর নিয়ন্ত্রন আসে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
১ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
হামাগুড়ি না দেওয়া।
সমর্থন দিয়েও দাঁড়াতে না পারা।
লোকানো জিনিসের প্রতি আগ্রহ না দেখানো।
এক শব্দ না বলা।
হ্যাঁ/না মাথা না ঝাকানো।
নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তু বুঝতে না পারা।
অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব।

১৮ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু ছোটখাটো নির্দেশ মানতে শেখে, অন্যের হাত থেকে কিছু নিয়ে খেলতে পছন্দ করে, মা বা যে দেখাশুনা করে তার কাছ থেকে সরিয়ে নিলে অত্যন্ত দুঃখ পায়।অনেক কথা শুনে সেগুলি উচ্চারন করে। আগ্রহ নিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। খাবার নিজে নিজে মুখে দিতে পারে,পুতুল কে দুধ খাওয়ানো ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি অনুকরন করে।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
অনেক একক শব্দ বলতে পারে,হ্যাঁ/না বলা বুঝতে পারে, এবং মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়।শিশুর চাহিদা সে দেখাতে পারে,এবংশিশু হাত দিয়ে দেখায় সে কি নিতে চায়।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু নিত্য ব্যবহার্য জিনিস বুঝতে পারে,যেমন টেলিফোন, ব্রাশ, চামচ। অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে, পুতুল বা প্রানীর প্রতি আগ্রহ দেখায় ও খাওয়াতে চায় তাকে সেভাবে খাওয়ায়।শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম বলতে পারে।নিজের জিনিস গুলো বুঝতে পারে, অভিব্যাক্তি ছাড়াই শব্দ বলতে পারে। দেখিয়ে দিলে কাগজে পেন্সিল ক্রেয়ন দিয়ে আঁকিবুকি করতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু একা একা হাঁটতে পারে, দৌড়াতে পারে বেশ কিছুক্ষন হাঁটতে পারে ১০ মিনিটের মত। কাপড় খুলতে পারে,একা পানি কাপ দিয়ে খেতে পারে,বাটিতে কিছু দিলে চামচ দিয়ে খেতে পারে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
১৮ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ

নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তু হাত দিয়ে না দেখানো।
হাঁটতে না পারা।
পরিচিত জিনিস চিনতে না পারা।
অন্যকে অনুকরন না করা।
নতুন শব্দ বলতে না পারা।
কমপক্ষে ৬টি শব্দ না বলা।
বাবা মার প্রস্থানে কান্না করা বা ভাবান্তর না হওয়া।
২ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অন্যকে অনুকরন করে বিশেষ করে বড়দের বা অন্য শিশুকে। অন্য শিশুদের সাথে থাকার সময় উচ্চসিত থাকে। মাঝে মাঝে অবুঝ হয়ে চেঁচামেচি করে, যা বলা যায় তার উল্টো করতে পছন্দ করে নিজে নিজে সব কিছু করে স্বাধীনতা প্রকাশ করতে চায়। অন্য শিশুকে বাবা মা আদর করলে অখুশি হয়।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
ছবি দেখে নাম বলতে পারে, পরিচিত ব্যাক্তিদের নাম বলতে পারে ও শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম ভালভাবে বলতে পারে .২ থেকে ৪ শব্দের বাক্য বলতে পারে।সাধারন নির্দেশনা বুঝে কাজ করতে পারে যেমন- (ঘুমুতে যাও,এটা খাও ,এখানে বস)কথা বললে কঠিন শব্দ পুনারাবৃওি করতে পারে।বইয়ের জিনিস দেখে বস্তুর নাম বলতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু দুই তিন পরতে ঢাকা জিনিস খোঁজে বের করতে পারে, আকার এবং রঙ এর ধারনা তৈরি হয়। পরিপূর্ণ বাক্য ও ছড়া বলতে পারে. ৪ বা বেশি ব্লক সাজিয়ে চূড়া বানাতে পারে। পায়খানা ও প্রস্রাব নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা আসে, দুটি ধাপে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ কতে পারে যেমন, (জুতা খোলে তাকে রেখে আস)। ছবি দেখে বইয়ের প্রানির নাম বলতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু সুন্দরভাবে দাঁড়াতে পারে,বলে লাথি দিতে পারে, শিশু জোড়ে দৌড়াতে পারে।উপরে চেয়ার ও টেবিলে আরোহন করতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে ধাপে ধাপে পা ফেলতে পারে। বল শূন্যে ছুঁড়তে পারে,লম্বা রেখা বা বৃত্ত অনুকরন করে চলা বা লিখতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
২ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
দুটি শব্দের সংযোগ না করতে পারা যেমন (দুধ পান করা,)
শিশু নিত্য ব্যবহার্য জিনিস না বুঝতে পারা ,যেমন টেলিফোন, ব্রাশ,চামচ,জামা ইত্যাদি।
শব্দ ও কাজ অনুকরন না করা
সাধারন নির্দেশনা অনুসরন না করা
হাঁটতে না পারা
৩ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অন্য শিশুদের সাথে বন্ধু তৈরি করতে পারে,হারিয়ে যাবার ভয় দেখা দিতে পারে। চেঁচামেচি করে শিশু রাগ প্রকাশ করে। কারোর খুশি,দুঃখ বা রাগ হয়েছে কিনা-সেটা মুখ দেখে বোঝার ক্ষমতা জন্মায়,বোকা বানিয়ে মজা পেতে শেখে।নিজের ও অন্যের জিনিস ধারনা হয়, অনেক শিশু নিজের খেলনা অন্যকে দিতে চায় না,তবে অন্য বাচ্চার পাশে বসে খেলতে ভালবাসে। ।বাবা –মাকে নকল করতে চায়,অনেক সময় নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায়। কিছু করতে বললে আপত্তি জানায়,হুকুম দিতে ভালবাসে। একই রুটিনে চলতে পছন্দ করে।কি চায় –অনেক সময় ঠিক বুঝে উঠতে পারে না । না বুঝিয়ে বলতে পারে না। একা একা জামা কাপড় পড়তে পারে। বাব মা ছাড়া সহজেই একা থাকতে পারে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
ছোট ছোট বাক্য বলতে শেখে- সেগুলি ব্যবহার করে জগতকে জানার চেষ্টা করে, এই বয়সে অনেক সময় তোতলামি দেখা দিতে পারে,কিন্ত সেটা স্থায়ী হয় না।পরিচিত জিনিসের নাম বলতে পারে,উপর, নিচ,পাশে বুঝতে পারে।নিজের ছোট নাম, বয়স,সে ছেলে না মেয়ে বলতে পারে।বন্ধুর নাম মনে রাখতে পারে।আমি তুমি সে ইত্যাদি সম্বোধন বুঝে ডাকতে পারে।বহুবচন শব্দ বুঝে বলতে পারে,যেমন গাড়িগুলো, পাখিরা।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান).
৩ বছরে শিশু বোতাম লাগাতে পারে,কোন কিছু ঘুরিয়ে খোলতে পারে।পুতুল,প্রানী, মানুষকে নিয়ে গঠনমূলক খেলা খেলতে পারে.৩-৪ টুকরা পাজল মিলাতে পারে,দুটি জিনিস সংযুক্ত করতে পারে।পেন্সিল দিয়ে বৃত্ত আঁকতে ও ভরাট করতে পারে।বইয়ের পাতা উল্টাতে পারে.৬বা বেশি ব্লক সাজিয়ে চূড়া বানাতে পারে।দরজা খোলা,ঢাকনা তোলা বা লাগাতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে উঠতে পারে, ট্রাই সাইকেল চালাতে পারে,সাহায্য ছাড়াই অল্প উপরে আরোহন করতে পারে
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৩ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে না পারা বা কষ্ট হোয়া।
কথা স্পষ্ট না হওয়া।
সাধারন খেলনা দিয়ে না খেলতে পারা।
বাক্য বলতে না পারা।
সাধারন নির্দেশনা অনুসরন না করা।
অন্য শিশুদের সাথে মিশতে না পারা বা খেলতে পছন্দ না করা
চোখে চোখে না তাকানো।
৪ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
বাবা মায়ের প্রতি ভালবাসা দেখায়,অন্ধকারে ভয় পায়, আঘাত পাবার ভয় ও দেখা দেয়।দলে বা অংশগ্রহনমূলক খেলা খেলতে পছন্দ করে। দেয়া নেয়া করতে শেখে। আমার কথাটা ব্যবহার করে এবং একসঙ্গে সবার সঙ্গে খেলতে শেখে। ছেলেদের বাবার সঙ্গে এবং মেয়েদের মায়ের সঙ্গে একাত্মতা বোধ শুরু হয়।অন্য ছেলেমেয়েদের শরীর সম্পর্কে কৌতূহল জন্মায়।কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করে খেলা করে । তার আগ্রহ ও পছন্দের বিষয় বলতে পারে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
৪ বছর বয়সে শিশুরা সে, তিনি,তার ইত্যাদি সম্বোধন করে কথা বলতে পারে।কবিতা ও গান বলতে পারে। এই বয়সে শিশু গুছিয়ে গল্প বলতে পারে,পুরো নাম বলতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)

সংখ্যা ও রঙের নাম বলতে পারে,গননা করতে ও সময় বুঝতে পারে।গল্পের আগের ও পরের অংশ মনে করতে পারে।একইরকম ও ভিন্ন জিনিসের ধারনা হয়।গঠন মূলক কিছু আঁকতে পারে।কাচি ব্যবহার করতে পারে, বোর্ড ও কার্ড গেইম খেলতে পারে,বইয়ের চিত্রে কি আছে বলতে পারে। গোল আঁকতে পারে,ক্রস আঁকতে পারে
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু এক পায়ে দাঁড়াতে শেখে,লাফিয়ে সামনে ও পেছনে যেতে পারে। বল হাত দিয়ে উপর থেকে ধরতে পারে খাবার মাখাতে পারে ও মাছের কাটা আলাদা করতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৪ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
লাফ দিতে না পারা।
অংশগ্রহন মূলক খেলায় আগ্রহ না থাকা।
অন্য শিশুদের এড়িয়ে চলা ।
বাবা মা বা পরিবারের লোকজন বাইরে গেলে প্রতিক্রিয়া না কর।।
কাপড় পরা ,টয়লেট ব্যবহার না করতে শেখা।
গল্প বলতে না পারা।
৩ অংশের নির্দেশনা বুঝতে না পারা।
একরকম ও ভিন্ন রকম জিনিসের পার্থক্য না বুঝা।
সঠিকভাবে আমি তুমি ও সে ব্যবহার না করে কথা বলা।

৫ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
অন্যদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করে, প্রতিযোগিতা মুলক খেলার ব্যাপারে উৎসাহী হয়।শিশুর কর্তব্যবোধ জন্মে, নিজের কার্যক্ষমতায় আত্মসন্তুষ্টি লাভ করে। নিয়মের সাথে অভ্যস্থ হয়।অভিনয়, গান,নাচ পছন্দ করে।সত্য মিথ্যা গল্প বুঝতে পারে। একা একা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।মাঝে মাঝে চাহিদা করে পূরণ না হলে জেদ করে।মাকে কাজে সহযোগিতা করে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
খুব স্পষ্টভাবে কথা গুছিয়ে বলে,ভবিষ্যত কালে কথা বলতে পারে যেমন ( বাবা আসবে,মা দিবে)।নাম ঠিকানা বলতে পারে।

জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
এই বয়সে শিশু ১০এর বেশি গুনতে পারে।আকার,আকৃতি,মানুষ হাত পা আঁকতে পারে।অক্ষর ও সংখ্যা লিখতে পারে। ত্রিকোণ ও চারকোণা আঁকতে পারে। খাবার টাকা এগুলোর সঠিক প্রয়োগ বোঝে।কথা বলার ধরন বড়দের মত করার চেষ্টা করে, কথাগুলো মোটামুটি শুদ্ধ হয়। গল্প বুঝতে পারে।
শারীরিক বিকাশঃ
লং জাম্প, হপ, স্কিপ ইতায়াদি করতে পারে। নিজের জামা নিজে পড়ে।চামচ, ছুরি ব্যবহার করতে পারে।টয়লেট ব্যবহার করতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৫ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
অতিরিক্ত ভয়,লজ্জা,ও রাগ প্রকাশ করা।
নিত্য ব্যবহার্য কাজ না করতে পারে।
৫ মিনিটের বেশি কোন কাজে মনোযোগ না থাকা।
মানুষের ডাকে সাড়া না দেওয়া ।
অন্যকে বা নিজেকে আঘাত করা বা জিনিস ভাংচুর করা।
ভিন্ন ভিন্ন কাজ না করা,(এক ধরনের কাজে বা খেলনা দিয়ে খেলা)।
নাম বলতে না পারা।
অতীত কালে বা ভবিষ্যতে কথা বলতে না পারা ।
ছবি না আঁকতে না পারা।
ব্রাশ করা, হাত ধোয়া,মোছা ও কাপড় খোলা, ইত্যাদি নিজে নিজে না করতে না পারা।

 

লিখেছেন – জাকিয়া সুলতানা

বয়ঃসন্ধির গল্প

Share

একটা জীবনের শুরু হয় কতগুলো অসাধারন ঘটনার মাধ্যমে। মায়ের পেটে ছোট্ট ভ্রুণ অবস্থা থেকে আমাদের জন্ম। একটি শুক্রাণুর সাথে একটি ডিম্বানুর একত্রিত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় একটি নতুন প্রাণ, একটি নতুন শিশু। এই শিশু অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং একদম শেষে মৃত্যু। কিন্তু শিশুটির এই অবস্থায় আসার পূর্বে পেরোতে হয় কিছু ধাপ। আর এই ধাপগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর। মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন বয়ঃসন্ধিকে একটা আলাদা ধাপ হিসেবে দেখা হলেও, পূর্বে কিন্তু তা ভাবা হত না।

১৮০০ শতকের শুরুর দিকে ভাবা হত শিশুরা হুট করেই “বড় মানুষে” পরিণত হয়। তাদের তখন বড় মানুষদের মত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই চিন্তা ধারার পরিবর্তন আসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে। সেসময় বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হওয়ার কারণে কাজ গুলো ক্রমশ জটিল হওয়া শুরু করে। তাই এই হুট করে বড় মানুষদের দায়িত্ব নেয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সময় দরকার হয় কৈশোর বয়সের ছেলে বা মেয়েটির। তখনই উদ্ভাবিত হয় বয়ঃসন্ধির ধারণাটি।

 

কিভাবে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরকাল চেনা যায়?

কিশোর বয়স মানুষের জীবনের এমন একটি সময় যখন একজন শিশুর প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য এবং বিকাশগত উন্নয়ন। এ সময়ে একজন ব্যাক্তি নতুন নতুন জ্ঞান এবং দক্ষতা অর্জন করে, কিভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রনে রেখে অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা যায়, এবং সেইসকল গুণ এবং দক্ষতা অর্জন করে যা তাকে তার কিশোর বয়সকে উপোভোগ করতে সাহায্য করে এবং একইসাথে তাকে প্রাপ্তঃবয়স্ক হওয়ার পথের যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে। সব সমাজে বা দেশেই একজন শিশু আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে যে পার্থক্য আছে তা চিহ্নিত করতে পারে। এখন শিশু থেকে বড় হওয়ার যে রূপান্তর তা কিভাবে হয়, কখন হয়, কিভাবে তা বোঝা যায়- সবকিছু নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সমাজ তা কিভাবে দেখে তার উপর। অতীতে দেখা যেত বয়ঃসন্ধির ধারণাটা তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সাথে দেখা দেখ, এখন আবার দেখা যাচ্ছে বয়ঃসন্ধি কালীন সময়টার ব্যপ্তি বেড়েছে।

বয়স বয়ঃসন্ধির সম্পূর্ণ গল্প নয়।

যদিও বা বয়স দ্বারা বয়ঃসন্ধিকে খুব সহজেই সংজ্ঞায়িত করা যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কিশোর বয়সের পুরো চিত্রটা ফুটে উঠে না। বরং আমরা বয়সকে এই সময়ের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলতে পারি। আরো ভালভাবে বলা যায়, বয়স দ্বারা শারীরিক এবং জৈবিক বিভিন্ন পরিবর্তনকে মূল্যায়িত এবং তুলনা করা যায়। এই ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুলো সকল সমাজের ক্ষেত্রে একইরকম প্রায়। কিন্তু সামাজিন যে রূপান্তর গুলো এই বয়সে এসে দেখা যায়, তার পার্থক্য দেখা যায় সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে।

বয়ঃসন্ধি শারীরিক পরিবর্তন।

বয়ঃসন্ধি মানব জীবনের অত্যন্ত ক্ষিপ্র একটা ধাপ। যদিওবা অধিকাংশ শারীরিক পরিবর্তন একটা নির্দিষ্ট ধাপ মেনে চলে, কিন্তু এই ধাপ শুরু হওয়া বা শেষ হওয়াটা কিছু ক্ষেত্রে সমাজ ভেদে ভিন্ন হয়। কোনো সমাজে দেখা যায়, শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়ে যায় ১১/১২ বছরে, আবার কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় তা শুরু হতেই সময় নেয় ১৩/১৪ বছর। আবার মেয়েদের এবং ছেলেদের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যেও পার্থক্য দেখা দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন ছেলেদের পূর্বে শুরু হয়। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের উচ্চতা এবং ওজন হুট করে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। যেই ছেলেটা বা মেয়েটা শিশুকালে সবার খাটো ছিল, দেখা যায় এ বয়সে এসে হঠাৎ করে তার উচ্চতাই সবার চেয়ে বেশি! গলার স্বরের পরিবর্তন, লোম বৃদ্ধি এসবও এই বয়সে এসে শুরু হয়।

বয়ঃসন্ধিঃ নিউরোডেভেলপমেন্টাল (neurodevelopmental) পরিবর্তন।

গুরুত্বপূর্ণ নিউরোডেভেলপমেন্টাল পরিবর্তনগুলো এই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে এসে দেখা দেয়। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে অনেক ক্ষেত্রেই হরমোনের পরিবর্তনের সংযোগ থাকলেও, তা পুরোপুরি হরমোনাল পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে এই বিকাশ সংঘটিত হয়। যেমন লিম্বিক সিস্টেম, যা কিনা আনন্দ লাভ এবং পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া, আবেগীয় নিয়ন্ত্রন, ঘুম নিয়ন্ত্রন ইত্যাদির সাথে যুক্ত। একই সময়ে প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সেও পরিবর্তন দেখা দেয়। যা কিনা বিভিন্ন কার্যনির্বাহী ক্রিয়া যেমন, ডিসিশন নেয়া, সংগঠিত করা, রাগ নিয়ন্ত্রন এবং ভবিষৎ পরিকল্পনার জন্য দায়ী। প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন গুলো লিম্বিক সিস্টেমে পরিবর্তনের পরে হয়।

বয়ঃসন্ধিঃমানসিক এবং সামাজিক পরিবর্তন।

হরমোনাল এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল যে সকল পরিবর্তন গুলো ঘটে থাকে তার সাথে সাইকোসোশাল এবং ইমোশনাল পরিবর্তন গুলো সংযুক্ত। জীবনের দ্বিতীয় দশক থেকে কিশোর এবং কিশোরিদের যুক্তিগত এবং নৈতিক দক্ষতার শক্তিশালী বিকাশ ঘটে। একই সাথে তারা ভাবগত চিন্তন এবং যুক্তিযুক্ত রায় করতে আরো সমর্থ হয়। কিশোরদের আশে পাশের পরিবেশ তাদের অভ্যন্তরীন এবং মানসিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। আবার একই সাথে কিশোরদের অভ্যন্তরীন পরিবর্তন গুলো প্রভাব ফেলে তাদের আশেপাশের পরিবেশের ওপর। বহিরাগত প্রভাব গুলো সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হয়। সামাজিক মূল্যবোধ এবং আদর্শ, পরিবর্তিত ভূমিকা, দায়িত্ব, সম্পর্ক, প্রত্যাশা ইত্যাদি সবকিছু ভূমিকা রাখের কিশোরটির মানসিক পরিবর্তনের উপর। এই সময়কালকে অনেকেই “ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ” সময় বলে দাবী করেন। কারণ এ সময় একজন কিশোরের মনের মধ্যে চলে অনেক প্রশ্নের ঝড়। নানারকম শারীরিক মানসিক পরিবর্তন তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিদ্ধ করে তুলে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মত মানুষ তারা পায় না। অনেক সময় এই পরিবর্তন বুঝে উঠতে উঠতে মেনে নিতেও তার সময় লাগে। না পারে বড়দের সাথে মিশতে, না পারে একদম ছোটদের মত করে থাকতে। হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় অন্যের প্রতি ভাললাগা। এ সময়টায় কিশোররা একটা “বিপ্লবী ধাপ (Rebel phase)” পার করে। নিজের এবং আশে পাশের মানুষজনের সাথে মনোমালিন্য আর বোঝা পরার অভাব দেখা দেয়। যা এই বয়ঃসন্ধি পার হতে হতে স্থিতীশীল পর্যায়ে চলে আসে।

স্বাস্থ্য এবং আচরণের ওপর বয়ঃসন্ধির প্রভাব।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বয়ঃসন্ধি কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অব্দী বিভিন্ন রোগের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। যেমন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক অসুস্থতা এবং আঘাত ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে সকল স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়, যার মধ্যে বিভিন্ন পদার্থ ব্যবহার ঘটিত ব্যাধি, মানসিক ব্যাধি এবং আঘাত ইত্যাদি কৈশোরের জৈবিক পরিবর্তন এবং পরিবেশের প্রভাবকেই প্রতিফলিত করে। অধিকাংশ স্বাস্থ্য ঘটিত সমস্যা যা বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে দেখা দেয়, তা বর্তমান এবং ভবিষতের স্বাস্থ্যগত সমস্যাকেই নির্দেশ করে। যেমন মদ্যপান জনিত সমস্যা কিংবা স্থুলতা, বরতমানেও যেমন শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে, একই সাথে তা ভবিষত্যেও স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতি নির্দেশ করে।

বয়ঃসন্ধিকালীন বৈশিষ্ট্য।

বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যেই পরিবর্তন গুলি দেখা যায় তা এই সময়ের নয়টি বৈশিষ্ট্যের প্রতি নির্দেশ করে যা স্বাস্থ্য গত নীতি এবং এই বিষয়ক কর্মসূচির উপর প্রভাব ফেলে।

১। বয়ঃসন্ধির ছেলে মেয়ে গুলো বিশেষ একটা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকে সবসময়।

২। সকল বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েরা এক নয়। তাদেরকে সবসময় এক কাতারে ফেলা যাবে না।

৩। কিছু কিছু কিশোর/ কিশোরী একটু বেশিই আবেগী।

৪। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলে মেয়েদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৫। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকা সারাজীবনের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৬। এ বয়সের ছেলে মেয়েরা কিভাবে চিন্তা করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে তা নির্ভর করে বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন গুলোর উপর।

৭। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে পরিবর্তন গুলো হয় তা বুঝতে হবে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েদের।

৮। পজিটিভ প্রভাব ফেলার লক্ষ্যে প্রাপ্ত বয়স্কদেরও এ সময়ের পরিবর্তন গুলো সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

৯। জনস্বাস্থ্য এবং গণ অধিকার বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশের সাথে একই বিন্দুতে মিলিত হয়।

 

বয়ঃসন্ধি একটি সংকটময় সময় সবার জীবনে। এই সময়ের সঠিক বিকাশই পরবর্তী জীবনের জন্য একজন ব্যাক্তিকে তৈরি করে দেয়। এই বয়সটা অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। শারীরিক, জৈবিক, মানসিক সকল পরিবর্তনকে সামলাতে সামলাতেই দিন চলে যায়। এই সময় তারা চায় একটু ভালবাসা, একটু অধিক মনোযোগ, একটু যত্ন, মন দিয়ে তাদের কথা শোনার মত একজন মানুষ। এ টুকু যদি আমরা তাদের দিতে পারি তাহলেই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়টা এতটাও সংকটময় হয়ে উঠে না।

 

লিখেছেন – অর্থি

নারী নির্যাতন ও মানসিক স্বাস্থ্য

Share

ঘটনা ১ –
জরিনা, বয়স ত্রিশ। বাসায় বাসায় কাজ করে সে পরিবারে অন্ন সংস্থান করে। দিনে অন্তত ৪-৫টি বাসায় কাজ করার পর দিনশেষে তাকে আবার পরিচর্যা করতে হয় নিজের পরিবারের, তিন সন্তান আর স্বামীর। তার স্বামী দিনের পর দিন আলসেমীতে দিন কাটিয়েও দিনশেষে রাতে এসে তার পৌরষত্বের প্রমাণ রাখতে যেয়ে অত্যাচার করে জরিনার উপর। মুখে গালাগালি আর পিঠের উপর কিল ঘুষি, জরিনার নিত্যদিনের জীবন। যার প্রভাব পরছে তার মানসিক অবস্থাতেও। ক্রমাগত তার মধ্যে এই নিয়ে একধরনের এঞ্জাইটি কাজ করে।

ঘটনা ২ –

ফারিয়ার বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো। প্রেম করে বিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ছয় বছরের প্রেমের পরিণতি। বিয়ের আগে একটা আইটি ফার্ম এ চাকরি করলেও বিয়ের পর স্বামীর ইচ্ছার প্রতিদান দিতে তাকে ছাড়তে হয় সেই চাকরি। আর এদিকে তার স্বামী নীরব একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির বেশ ভাল পদের কর্মকর্তা। বিয়ের প্রথম ক’বছর দু’জনের বেশ সুখের সংসার চললেও, কিছুদিনের মধ্যে দেখা দেয় নীরবের আসল রূপ। আগে যখন মুখে ফুটতো প্রেমের বুলি এখন সেই মুখ দিয়ে বের হয় ফারিয়ার প্রতি বিরক্তির সুর। ফারিয়ার প্রতিবাদের উত্তর হিসেবে সে এখন তার গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হয় না।

ফারিয়া, যে কিনা হাসি খুশি প্রানোচ্ছল মেয়ে ছিল, সে এখন জীবন নিয়ে হতাশ, কোনোকিছুতেই আর আগ্রহ পায় না। উপরে উল্লিখিত দু’টি ঘটনাই দুইজন নারীর জীবনের।

 

এখানে সমাজের ভিন্ন দুই স্তরের দুই নারীর কথা বললেও একটি জায়গায় এসে তাদের দুইজনের জীবন মিলে গেছে একই বিন্দুতে। দুইজনই শিকার পারিবারিক নির্যাতনের। যার প্রভাব পরছে তাদের মানসিক অবস্থায়।

নারী নির্যাতন বলতে আমরা বুঝি –

ব্যক্তিগত এবং পাব্লিক দুই ক্ষেত্রেই যে কোনো ধরনের লিঙ্গ নির্ভর নির্যাতন যা কিনা নারীদের শারীরিক, যৌনভিত্তিক এবং মানসিক ক্ষতি করে, একই সাথে এ ধরণের কাজ করার হুমকি এবং নারীদেরকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমান সমাজের একটি বেশ সাধারণ চিত্র হয়ে গেছে নারী নির্যাতন। রাস্তাঘাটে, বাসায়, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে সবখানে নারীরা মৌখিক বা শারীরিক কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আগে যেটা মনে করা হতো সমাজের নিম্ন শ্রেনীর, কম শিক্ষিত মানুষের মধ্যকার বর্বরতার চিত্র, এখন আর তা না। নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, স্বাধীন, শিক্ষিত সমাজের নারীরাও এই পাশবিক অত্যাচারের শিকার। আবার পুরুষ দ্বারা চালিত এই সমাজে নারীরা যতই নির্যাতনের শিকার হোক না কেন শেষ মেশ তাদের উপর সকল দোষ চাপিয়ে দেয়া হয়। এক ধরের সামাজিক চাপ দ্বারা তারা চালিত হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে পুরো বিশ্বে প্রায় ১৫-১৭% নারীরা এ ধরণের নির্যাতনের শিকার। বাংলাদেশে এর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাড়িয়েছে ৫০-৭০%। নারী নির্যাতন শুধুমাত্র শারীরিক না মানসিক দিক থেকেও নারীদের উপর হানিকর প্রভাব ফেলে। “বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা” তাদের একটি গবেষণায় নারীদের দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তাদের উপর নির্যাতনকে দায়ী করেছে। নয়টি নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশের উপর করা একটি কোয়ান্টিটিভ গবেষণার ফলাফল হিসেবে নারী নির্যাতনের সাথে তাদের আত্মহত্যার আন্তঃসম্পর্ক পাওয়া গেছে। মানসিক অসুস্থতা বহুগুণিতক অবস্থা। অনেকগুলো ফ্যাক্টর জটিল্ভাবে একত্রিত হয়ে মানসিক রোগের সৃষ্টি অথবা তা বজায় রাখে। কিছু জিনের সাথে সম্পর্কিত, আবার কিছু পারিপ্বারশিক পরিবেশ দ্বারা ত্বরান্বিত হয়। বেশ কিছু গবেষক নারী নির্যাতনের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কের গবেষনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিনহিত করেছেন। এটি গ্রুত্বপূর্ণ কারণ নির্যাতনের ধরন এবং এর প্রভাব সমাজভেদে ভিন্ন হয়। যেমন বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও তা কারো কাছে প্রকাশ করে নি, অপরদিকে ব্রাজিল এবং নামিবিয়ার ৮০% নারী তা প্রকাশ করেছে। নির্যাতনের ধরনের মধ্যে বিভিন্ন রকমভেদ পাওয়া গেছে গবেষণা করে। এগুলো কিছু ক্ষেত্রে মানসিক রোগের কারণ এবং প্রায় ক্ষেত্রে অসুস্থতা বহাল রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। নির্যাতনের রকমভেদে এর প্রভাবের পার্থক্য দেখা যায়। শারীরিক অত্যাচার, সামাজিক অপমান, মৌখিক নির্যাতন ইত্যাদি ভিক্টিমের মধ্যে ইমোশনাল এবং মানসিক ট্রমার সৃষ্টি করে। “তুমি কালো, তোমাকে আমার ভাল লাগে না, অন্যমেয়েরা তোমার চেয়ে বেশি সুন্দর” বরের কাছ থেকে এ ধরণের উক্তি কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা অন্য নারীর সাথে যৌন মিলন, দ্বিতীয় বিবাহ ইত্যাদি মানসিক অসুস্থতার দিকে নারীদের ঠেলে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক, মৌখিক, সামাজিক নির্যাতন কনভার্সন ডিজঅর্ডার, মুড ডিজঅর্ডার, বায়োপোলার ডিজরডার, অবসেশন, ডিপ্রেশন ইত্যাদির সৃষ্টি করে। এড়িয়ে চলা, অবজ্ঞা করা, কটু কথা শোনানো ইত্যাদিও ভিক্টিমের মানসিক অবস্থার উপর বাজে প্রভাব ফেলে। যার কারণে ক্রমাগত তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। বাংলাদেশে এবং একই সাথে পুরো বিশ্বে অনেক নারী প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে নির্যাতনের। সেটা ঘরে হোক কিংবা বাহিরেই হোক, শারীরিক হোক কিংবা মানসিক। এই নির্যাতন একটা নারীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি প্রভাব রাখে মানসিক অবস্থাতেও। বেশ কিছু ক্ষেত্রেই তার পরিণতি হয় মানসিক রোগে। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসড ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে ডিপ্রেশন। নির্যাতন প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এই মানসিক রোগগুলোর পিছনের। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগ থাকার কারণে তারা শিকার হয় নির্যাতনের। এমন একটি সমাজ ব্যাবস্থা, যেখানে মানসিক সমস্যাকে সাধারণভাবেই কটু দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেখানে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথাই থাকে না। অথচ এর কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত তাদের জীবন পার করছে এক কঠোর, বিষন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে। এই বিষয়ে সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীদের প্রতি সম্মান তৈরি করার মাধ্যমেই হয়তো এই সমস্যা কাটিয়ে উঠা যাবে।

 

লিখেছেন – অর্থি

 

আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য

Share

আত্মহত্যা বা, সুইসাইড কি তা হয়তো সহজ বাংলায় প্রায় সবাই বলতে পারবো।আত্মহত্যা হল স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশ করা।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে অনেক আগে থেকেই আত্মহত্যা কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সবাই। কিন্তু নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরও আত্মহত্যা এখনো মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এমন কি আমাদের দেশেও আশংকাজনক হারে আত্মহত্যার হার বাড়ছে।

World health organization এর প্রতিবেদন মতে, আমাদের বাংলাদেশে শুধু ২০১১ সালে ১৯,৬৯৭ জন আত্মহত্যা করেছে। আর বর্তমানে আত্মহত্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭ তম।

আজ কেন আবার আত্মহত্যা নিয়ে এতো বলার চেষ্টা করছি? কারণ আছে অবশ্যই। এক গবেষণার রিপোর্ট অনুসারে, আত্মহত্যা করা মানুষের মাঝে ৯০% মানুষ মানুষিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকে। এদিক থেকে বলতে গেলে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসাবে এটাকে দেখা যায়। আর এ ব্যপারে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বলতে গেলেই চলে।

 

মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের রুগীদের মাঝে সুইসাইডের প্রবণতা অনেকটা বেশী। এমন কি বাইপোলার ডিসঅর্ডার থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সুইসাইডের প্রবণতা বাড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া স্ক্রিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার(ও.সি.ডি), পোষ্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সহ বেশ কিছু মানুষিক রোগে আত্মহত্যার প্রবনতা বাড়ে।

এছাড়া যাদের পারিবারে আগে কেও আত্মহত্যা করেছে, ড্রাগ সহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত, যদি কেও কোন ধরনের abuse এর শিকার হয়ে থাকে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশী থাকে।
আত্মহত্যা প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা জরুরী। এজন্য প্রয়োজনে মানুষিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া জরুরী।
আমাদের সবারই চোখ-কান খোলা রাখা জরুরী। হয়তো, খুব নিকট জনের মনের ভেতর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, একটুখানি সচেতনতা অভাবে তা আমলে আসছে না।

 

লিখেছেন – আরিফ

তথ্যসুত্রঃ
Suicide – Wikipedia

Suicide in Bangladesh – Wikipedia

Suicide data

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার

Share

গত আগস্টে মায়ানমার থেকে অত্যাচারিত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলো মামুন। চোখের সামনে তার বাবাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, তার মাকে ধর্ষণ করেছে ঐদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সে বহু কষ্টে তার ছোট ভাইকে নিয়ে জীবন বাঁচাতে পেরেছে। এখনো সে রাতে ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়, সবসময় অস্থিরতায় ভোগে, সে এখনো ভয়ে থাকে এই বুঝি মায়ানমারের সেনাবাহিনী এসে আবার একইরকম অত্যাচার চালাবে।

মামুনের এই ভয় লাগা, আশঙ্কায় থাকাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়ে থাকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার। সাধারণত কোন আকস্মিক দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মানবিক বিপর্যয়ের ফলে মানসিকভাবে অস্থিরতা ভোগা মানুষজন এই মানসিক রোগের শিকার হয়ে থাকে। অনেক সময় এই রোগটির লক্ষণ দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই দেখা যায়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে অনেক পরেও আসে।

যেকোন বয়সের মানুষজনই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে, শিশুদের উপরে এর প্রভাব বেশী দেখা যায়। শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষেরা এটার শিকার হয়। চুরি বা ডাকাতির শিকার হওয়া, জটিল কোন রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষজনও এই জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

 

লক্ষণঃ সাধারণত তিন ধরণের লক্ষণ দেখা যায়। প্রথমত, কোন একটা কাজে যুক্ত থাকার মধ্যেও ঐ ট্রমার কথা মনে পড়ে যাওয়া এবং বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে একদম চুপ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, কোন জায়গা বা মানুষ দেখে ঐ কষ্টের ঘটনার কথা মনে পড়ে যাওয়া এবং মানুষদের এড়িয়ে চলা। তৃতীয়ত, হঠাৎ করে চমকে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে থাকা।

এছাড়াও আরও যেসব লক্ষণ দেখা যায়-

১। ঐ ঘটনাকে বারংবার মনে করা,

২। চুপচাপ হয়ে যাওয়া,

৩। ঐ ধরণের ঘটনা বা অবস্থা এড়িয়ে চলা,

৪। মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা,

৫। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া,

৬। ঘুমাতে না পারা,

৭। অল্পতেই রেগে যাওয়া,

৮। মানুষজন এড়িয়ে চলা,

৯। সম্পর্ক রক্ষা করতে হিমশিম খাওয়া,

১০। দুঃস্বপ্ন দেখা,

১১। নেতিবাচক চিন্তা বেড়ে যাওয়া,

১২। হ্যালুসিনেশনের শিকার হওয়া,

১৩। কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া,

১৪। মনে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া,

১৫। রক্তচাপ বেড়ে যায় ও শরীরে কাঁপুনি আসে।

প্রতি ১০০ জনে ৭-৮ জন এই ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে, নারীদের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা প্রায় ১১জন, যা পুরুষের ক্ষেত্রে ৫-৬। সাধারণত যুদ্ধের মধ্যে থাকা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এই হার বেড়ে যায় ২০-৩০%। আবার জীবনে সবাইই কোন না কোন সময়ে এই রোগের শিকার হয়ে থাকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, শৈশবে অবহেলার শিকার হওয়া পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হবার মূল কারণ। পুরুষের ক্ষেত্রেও ছোটবেলায় অবহেলা কিংবা শারীরিক নির্যাতন, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা এই রোগের কারণ।

প্রতিকারঃ
এই রোগের প্রতিকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই। এরপরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনেরা। নিজে সহজ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা, নিজের ইস্যুগুলো নিয়ে বিশ্বস্ত কারও সাথে কথা বলা, নিয়মিত খাওয়া ও ব্যায়াম করা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মাধ্যে দ্রুত এই মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এছাড়াও সাইকোথেরাপী, কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপী (সিবিটি), EMDR (Eye Movement Desensitisation & Reprocessing) থেরাপী, গ্রুপ থেরাপী ও মেডিকেশন খুবই কার্যকরী।

(Cognitive Behavior Therapy)
(Eye Movement Desensitization & Reprocessing)

 

লিখেছেন – চয়ন

মাইন্ডফুলনেস

Share

mindfulness-itsokaybd-orthi

মাইন্ডফুলনেস হচ্ছে এমন একটি মানসিক অবস্থা যা কিনা  ইঙ্গিত করে বর্তমান সম্পর্কে এক ধরণের সক্রিয় মনোযোগ ধরে রাখার প্রক্রিয়াকে।

অর্থাৎ যা আমরা করছি , যা আমরা ভাবছি তার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল বা মগ্ন না থাকা। অতীতে কি হয়েছে বা ভবিষত্যে কি হবে তা নিয়ে পরে না থেকে বর্তমানকে নিয়া চিন্তা করাই মাইন্ডফুলনেস।

যদিও মাইন্ডফুলনেস সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি অবগত আছি, তবুও ইহা আমাদের কাছে আরো সহজলোভ্য হয়ে ধরা দিবে যদি প্রতিদিন নিয়মমাফিক আমরা এর চর্চা করি। অর্থাৎ যদি আমরা মাইন্ডফুলনেসটাকে আমাদের অভ্যাসের সাথে জড়িয়ে ফেলতে পারি তবেই কিনা এর সর্বচ্চো সুবিধাটা উপভোগ করতে পারবো।

মাইন্ডফুলনেস আমাদেরকাছে সর্বদা প্রাপ্তিযোগ্য। সাধারণ মেডিটেশন প্রোগ্রাম দ্বারাই হোক কিংবা বডি স্ক্যান এর মাধ্যমেই হোক, মাইন্ডফুলনেস আমাদের সব কাজ থেকে একটা বিরতি নিয়ে কিছুক্ষন নিঃশ্বাস ফেলে আশে পাশের পরিবেশ, বিষয়গুলোকে অনুভব করতে শেখায়।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, এই যে আমরা এত মাইন্ডফুলনেসের কথা বলছি, বর্তমানকে অনুভব করার কথা বলছি, এর সুবিধাটা কোথায়? বৈজ্ঞানিকভাবে ৫টী উপকারিতা আছে এই মানিডফুলনেস চর্চার –

  1.      নিজের ব্যাথা, কষ্টটাকে বুঝতে পারা
  2.      আশে পাশের মানুষজন, পরিবেশের সাথে  নিজেকে কানেক্ট করতে পারা
  3.      ইহা আপনার স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে
  4.      মনকে কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে ফোকাস করতে পারা
  5.      ব্রেইনের মধ্যকার অনর্থক বক বক কমানো।

 

মাইন্ডফুলনেস কোনো অস্পষ্ট বা অদ্ভুত ধারণা না। এটা আমাদের মধ্যে বর্তমানে বিদ্যমান এবং আমরা এর উপস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত। আমাদের সকলের মধ্যেই বর্তমানে থাকার সামরথ্য আছে এবং তার জন্য আমাদের নিজেদেরকে পরিবর্তন করা কোনো প্রয়োজন পরেনা শুধু দরকার একটু চর্চার।যে কেউ যেকোনো অবস্থানে মাইন্ডফুলনেস চর্চা করতে পারে।এর জন্য না আছে কোনো বয়স, শ্রেণী , কাজের বাধা।তাই আসুন আমরা মাইন্ডফুলনেসের মাধ্যমে আশে পাশের সকল বিক্ষেপ থেকে নিজেদের একটু সরিয়ে বর্তমানকে নিয়ে থাকার চেষ্টা করি।

 

লিখেছেন – অর্থি

ডিজলেক্সিয়া

Share

আমীর খান অভিনীত ‘তারে জামিন পার’ সিনেমাটার কথা মনে আছে? পড়তে সমস্যা হয়, লিখতে সমস্যা হয় এমন একটা বাচ্চা ছেলেকে ঘিরে এই সিনেমার কাহিনী আবর্তিত। সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, ৮বছর বয়সী ঈষান (দারশিল সাফারি) তার স্কুলে নিয়মিতভাবে ফল খারাপ করতেই থাকে, বাড়ির কাজ করে না, ক্লাসে বসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না এবং এই কারণে তার স্কুলের বন্ধুসহ শিক্ষকদের কাছেও অনেক অপমানিত হয়, টিটকারির শিকার হয়। এমনকি তার বাবা, যিনি কিনা অনেক ভালো চাকুরী করেন তিনিও তার ছেলের এই ধরণের কাজের জন্য তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করেন এবং এক সময় ঈষানকে বোর্ডিং(আবাসিক) স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অথচ ঈষানের ভেতরেও একটা রঙ্গীন জগত বাস করে। সে ভাবতে ভালোবাসে, নিজের মত তার একটা জগতের স্বপ্ন দেখে যায় সে নিয়মিত। তার পড়তে ভালো লাগে না, আঁকতে ভালো লাগে না, ভালো লাগে না ক্লাসে বসে থাকতেও। তার এই সমস্যা আর কেউই বুঝতে পারে না। নতুন করে আসা অংকন শিক্ষক আমীর খান তার এই সমস্যাটা বুঝতে পারে এবং ঈষানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। ঈষান লিখতে গেলেই অক্ষরগুলো উল্টো হয়ে যেত, সে দেখতে পেত তার সামনে বইয়ে থাকা লেখাগুলো ছুটে পালাচ্ছে এবং তার মনে লালন করা কোন না কোন প্রাণী বা বস্তুর আকার ধারণ করতো। ঈষানের এই লিখতে না পারার, পড়তে না পারার, আঁকতে না পারার সমস্যাকে বলা হয়ে থাকে ডিজলেক্সিয়া।

ডিজলেক্সিয়া কি? ডিজলেক্সিয়া একটি শিখতে না পারাজনিত সমস্যা। ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিগণ সাধারণত ঠিকমত পড়তে পারেন না, উচ্চারণ করতে পারেন না, পারেন না ঠিকমত লিখতে। তবে, এটি বুদ্ধিমত্তায় কোন ধরণের প্রভাব ফেলে না। সময়ের সাথে নানা ধরণের সাহায্যের মাধ্যমে এই সমস্যা আস্তে আস্তে কমে আসে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের জন্য তৈরি বিশেষ ধরণের স্কুলে বা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ ধরণের বই পড়ে ও বিশেষ ধরণের সুবিধায় লিখে এই রোগ ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে যেতে পারে এবং এই ধরণের ব্যক্তিরাও জীবনে সফল হতে পারে। এরা যদিও আস্তে পড়ুয়া হয়, কিন্তু এদের চিন্তা করার ক্ষমতা অনেক সময় সাধারণ অনেক মানুষের থেকেও বেশী হয়ে থাকে। শতকরা ২০ জনের মধ্যেই এই ধরণের সমস্যা দেখা যায়। এবং সঠিকভাবে পরিচর্যিত ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত মানুষজন জীবনে সফলও হয়। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসো, আলবার্ট আইনস্টাইন, টমাস আলভা এডিসন, অভিষেক বচ্চনসহ আরও অনেকে বিখ্যাত ব্যক্তিই এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন, এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন।

ডিজলেক্সিয়ার কারণঃ ডিজলেক্সিয়ার জন্য জিন ও পরিবেশ উভয়ই দায়ী। পারিবারিক ইতিহাসে কেউ ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত আছে এমন কোন পূর্ব রেকর্ড থাকলে, ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত ব্রেণের বাঁ অংশ যা কিনা আমাদের কোন কিছু পড়ার কাজে সহায়তা করে থাকে, তাতে কম ইলেক্ট্রিকাল অ্যাক্টিভেশন দেখা যায়। ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত অনেকের গলার মাংশপেশীতেও সমস্যা দেখা যায় যার কারণে তারা ঠিকমত উচ্চারণও করতে পারে না।

ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণঃ যেহেতু ডিজলেক্সিয়া কোন নির্দিষ্ট বয়সের মানুষ নয়, যেকোন বয়সের মানুষই আক্রান্ত হতে পারে। বয়সভেদে ডিজলেক্সিয়ার লক্ষণ বিভিন্নরকম হয়ে থাকে।
প্রি-স্কুল সময়েঃ

১। সহজ ছড়াগুলো বলতে না পারা(যেমনঃ টুংকেল টুইংকেল),

২। বর্ণমালা শিখতে, পড়তে ও মনে রাখতে সমস্যা হয়,

৩। নিজের নামের অক্ষরগুলো পড়তে না পারা,

৪। Cat, Rat, Bat – এর মত সহজ শব্দগুলোও উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।

১ম শ্রেণীতে পড়ার সময়েঃ

১। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসা শব্দ বুঝতে না পারা,

২। পড়ার সময়ে শব্দ হারিয়ে যায়,

৩। শব্দের সাথে বর্ণ মেলাতে পারে না।

মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময়েঃ

১। খুব ধীরে পড়া,

২। অপরিচিত শব্দ পড়তে সমস্যা হওয়া,

৩। জোরে না পড়া,

৪। পড়ার আগ্রহ কমে যাওয়া,

৫। কোন কিছুর নাম না বলে, “ঐ জিনিস”, “ঐ বস্তু” বলে চালিয়ে দেয়া,

৬। কথা বলতে গেলেই থেমে থেমে যাওয়া এবং “উমম”, “ইয়ে” উচ্চারণ করা,

৭। শব্দ গুলিয়ে ফেলা,

৮। বড়, অপরিচিত শব্দ ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

৯। কোন পড়া পড়তে, লিখতে বা প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশী সময় নেয়া,

১০। তারিখ বা অন্যান্য নাম্বার মনে রাখতে না পারা,

১১। বাজে হাতের লেখা,

১২। বিদেশী ভাষা শিখতে সমস্যা হয়।

 

পূর্ণবয়সেঃ

১। মানুষের নাম, জায়গার নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করা,

২। পুনরাবৃত্তি করতে সমস্যা,

৩। আনন্দের জন্য পড়া এড়িয়ে চলা,

৪। জোরে না পড়া,

৫। সবাইকে এড়িয়ে চলা,

৬। ‘b’ এবং ‘d’ – এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলা,

৭। সবকিছুতে অগোছালো হয়ে পড়া।

 

লিখেছেন – চয়ন

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার

Share

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (Autism Spectrum Disorder-ASD) হলো একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার যা পরিপূর্ণ বিকাশের পথে বিভিন্ন ধরনের প্রকট ও পরিব্যাপক বাঁধার সৃষ্টি করে। ‘অটিজম’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘autós’ যার অর্থ হলো ‘নিজ’ বা self থেকে। অটিজম হচ্ছে অাচরণ সম্পর্কিত অবস্থা, যা জ্ঞাত এবং অজ্ঞাত শারিরীক,মস্তিষ্কের ত্রুটিপূর্ণ ফাংশানের কারণে হয়ে থাকে। সাধারণত শিশুর ৩ বছর বয়সের মধ্যেই এই আচরণগত সমস্যাগুলো দেখা যায়। অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার কোন একটি ডিজঅর্ডার নয়, বরং ‘স্পেকট্রাম’ শব্দটি থেকে আমরা ধারণা পেতে পারি যে এটি কতগুলো ডিজঅর্ডারের সমন্বয়ে সংজ্ঞায়িত হয়েছে।

Diagnostic Statistical Manual for Mental Disorders (DSM-5) এর মতে, অটিজম স্পেকট্রামের অন্তর্ভূক্ত ডিসঅর্ডারগুলো হলো:

অটিস্টিক ডিসঅর্ডার (Autistic Disorder)

অটিস্টিক ডিসঅর্ডার হল অটিস্টিক স্পেকট্রামের অন্তর্ভূক্ত সকল লক্ষণসমূহের সমন্বিত একটি ডিসঅর্ডার।এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির শিক্ষণজনিত সমস্যা থাকে। গড় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একজন মানুষও অটিজমের শিকার হতে পারে। এটাকে “হাই ফাংশনিং অটিজম” বলা হয়ে থাকে।

অ্যাসপারগার ডিসঅর্ডার (Asperger Disorder)

এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝারি কিংবা উচ্চ পর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা থাকতে পারে।এছাড়াও এদের ভাষাসংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে।

পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার-নট আদারওয়াইজ স্পেসিফাইড ( Pervasive Developmental Disorder-not otherwise specified)

একে ‘Atypical Autism’ ও বলা হয়ে থাকে। এই ডিসঅর্ডারের ডায়াগনসিস সম্পূর্ণভাবে অটিজম ডিসঅর্ডার বা অ্যাসারগার ডিসঅর্ডারের সাথে না মিললেও কাছাকাছি ধরনের সমস্যাগুলো প্রত্যক্ষ হয়।

 

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের ইতিহাস:

‘অটিজম’ টার্মটি সর্বপ্রথম ১৯০৮ সালে করেন একজন সাইকিয়াট্রিস্ট, ইউজেন ব্লিউলার উল্লেখ করেন। তিনি একজন সিজোফ্রেনিয়ার পেসেন্টকে ব্যাখা রার জন্য সর্বপ্রথম এই টার্মটির ব্যবহার করেন। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের সর্বপ্রথম অগ্রদূত হলেন হ্যানস অ্যাসপারগার এবং লিও ক্যানার। তারা ১৯৪০ সালে তাদের পৃথক কাজের মাধ্যমে এটি নিয়ে গরষণা করেছেন।

১৯৪৩ সালে আমেরিকান শিশুমনোবিজ্ঞানী লিও ক্যানার ১১ জন শিশুকে নিয়ে গবেষণা করে। তার গবেষনায় দেখা যায়, ওই সকল শিশুদের স্মৃতি, সামাজিক যোগাযোগ, শিশুদের দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তন, উদ্দীপকের প্রতি সংবেদনশীলতা, সহনশীলতা, খাবারে এলার্জি, বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত দক্ষতা, বক্তার একই কথার পুনরাবৃত্তি সংক্রান্ত সমস্যা দেখা যায়।

১৯৪৪ সালে হ্যানস অ্যাসপারগার আরো একদল শিশুক সেরটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটর’ ব্যবহার করা হয়। কারো মাঝে ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে তাদের ‘মেলোটনিন’ ব্যবহার হয়। এপিলেপসির সমস্যা দেখা দিলে ‘অ্যান্টিকনভালসেন্ট’ মেডিসিন ব্যবহার করা হয়। যদি ব্যক্তির মাঝে Attention Deficit Hyperactivity Disorder দেখা যায়, তবে তাকে ” মেলানফেনিডেট” প্রেস্ক্রাইব করা হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সোশাল লার্নিং প্রোগ্রাম, লেসার অ্যাক্টিভিটি প্রোগ্রাম ব্যক্তির দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।

 

ASD আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাদের পিতামাতার ভূমিকা অপরিহার্য।থেরাপি এবং মেডিকেশনের পাশাপাশি পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা ও সহায়তা অনেক বেশি জরুরি যা মাধ্যমে শিশুর অ্যাংকজাংটি অনেকাংশে কমানো সম্ভব ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।এক্ষেত্রে পিতামাতার করণীয় হতে পারে-

শিশুকে তার নাম ধরে ডাকা যাতে করে সে বুঝতে পারে যে তাকে সম্বোধন করা হচ্ছে। যতটা সম্ভব কম শব্দের মধ্যে শিশুকে রাখা।

সহজ ভাষায়, ধীরে ও স্পষ্টভাবে তার সাথে কথা বলা

কথা বলার সময় সহজ অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার করা শিশুকে কথা বুঝতে দেবার জন্য অতিরিক্ত সময় দেয়া

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের আক্রান্ত ব্যক্তি তুলনামূলক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

 

পরিশেষে বলা যায় যে, উপযুক্ত পারিপার্শ্বিক অবস্থা,থেরাপি,মেডিকেশন এবং সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের আক্রান্ত ব্যক্তি তুলনামূলক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা

সামাজিক ভীতি

Share

সামাজিক ভীতি (Social Phobia) এর মানে হল সামাজিক পরিস্থিতিতে ভয় লাগা বা অস্বস্তিবোধ করা । এটি কম বেশী সব মানুষেরই লাগতে পারে। তবে কেউ কেউ এতই অস্বস্তিবোধ করেন সামাজিক পরিবেশে, বিশেষ করে নতুন পরিবেশে বা অপরিচিত পরিবেশে যে তারা স্বাভাবিক আচরন করতে পারে না। তাঁরা ঘামতে থাকেন, অহেতুক ভ্য় কাজ করে। ব্যাক্তি সামাজিক পরিবেশে যেতে চায় না।

যা বাক্তির ব্যাক্তিগত , সামাজিক, ও পেশাগত জীবন ব্যাহত হয় , তার কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তখন একে বলে সামাজিক ভীতি বা সামাজিক উদ্ধেগজনিত বিকৃতি (Social Anxiety Disorder)।

এটা এক ধরনের মানসিক রোগ । এই ভীতিতে আক্রান্ত ব্যাক্তি তাকে মুল্যায়ন করা হবে, তাকে যাচাই করা হবে, অন্য কারও কাছে তার কাজ উপস্থাপন করতে হবে, এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ভয়, লজ্জা , উদ্ধেগ কাজ করে। নতুন লোকের সাথে কথা বলা, জনসমুক্ষে কিছু করতে , নাচ, গান, বক্তৃতা দিতে ভয়, লজ্জা কাজ করে।

সামাজিক ভীতি দুই ধরনের হয়।

যখন ব্যাক্তি একটি পরিস্থিতিতে ভয় পায়, এবং এড়িয়ে চলে, তখন তাকে বিশেষ সামাজিক ভীতি বলে। আর যখন ব্যাক্তি অনেকগুলো সামাজিক পরিস্থিতিতে উদ্ধিগ্ন ও ভীত হয়, তখন তাকে সাধারন সামাজিক ভীতি বলে। যাদের এই ভীতি থাকে , তারা একলা একলা থাকে, সামাজিক পরিবেশে কিছু করতে বা তার যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু যেতে পারে না। মনের ভেতর একটি খুঁতখুঁত ভাব থাকে।আমি হয়তো পারব না বা আমি যদি যাই কি হবে? মানুষ আমাকে দেখে হাসাহাসি করবে। বাকিরা কী ভাবছে? সারাক্ষন তাঁর মনের বেতর এসব চিন্তা হতে থাকে।

এই ভীতির কারন হিসেবে মনোবিজ্ঞনীদের বিভিন্ন গবেষণা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, ব্যাক্তির নেতিবাচক কোন অভিজ্ঞতা, পরিবারের অন্য সদস্য যেমন মা, বাবা, কার ও ভীতি থাকলে ছেলে মেয়েদের মধ্যে আচরনগত শিক্ষা থেকে হতে পারে। এছাড়া যেসব শিশুরা ছোট বেলায় পারিবারিক সংগাত ও টিজিং এর শিকার হয়, অপমান, উপহাস বা কঠিন সমালোচনার সম্মুখীন হয়। এছাড়া যেসব বাবা মায়েরা সন্তানদের প্রতি অতি রক্ষনশীল হয়, বা নিয়ন্ত্রন করে ,পরবর্তীতে তারা সামাজিক ভীতিতে আক্রান্ত হয়। জৈবিক কারন হিসেবে বলা হয় , আমাদের মস্তিষ্কে এমিগঢালা (amygdala) নামক একটি অংশ যা ভয় প্রতিক্রিয়া , নিয়ন্থ্রনে ভুমিকা পালন করে। যার একটি অতিরিক্ত এমিগঢালা আছে, তাদের একটি অতিরিক্ত ভয় , উদ্ধেগ কাজ করে, সামাজিক পরিস্তিতিতে তা বৃদ্ধি পায়। এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশী শুরু হয় বয়সন্ধিতে, যখন ব্যাক্তির জীবনে সামাজিক সচেতনতা এবং অন্যের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব বেড়ে যায়। শিশুদের মধ্যে ও এই রোগ দেখা যায়।
সামাজিক ভীতিতে আক্রান্ত ব্যাক্তি যেসব শারীরিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষন দেখা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে বা সামাজিক পরিবেশে কিছু করতে ঘাম হওয়া, বমি ভাব হওয়া, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, মাথা ঘোরা, পেশীতে টান টান অনুভব করা। অনেক সময় জ্বর হয়। পরবর্তীতে বাক্তি যেসব আচরণগত যেসব সমস্যা দেখা যায় , আত্ববিশ্বাসের ওভাব, একাকীত্ব অনুভব করা, সমালোচনা নিতে না পারা, সামাজিক দক্ষতার অভাব , নিজেকে দোষারোপ করা,মাদকাসক্ত হওয়া , আত্মহত্যার প্রচেষ্ঠা ইত্যিদি।

 

সামাজিক ভীতিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সাধারণত মনোবিজ্ঞানিরা কাউন্সেলিং, ও সাইকথেরাপী, আচরণগত থেরাপী ব্যবহার করে থাকেন ।এছড়াও মানসিক ডাক্তাররাও চিকিৎসা করে থাকেন । সময়্মত সঠিক মানসিক পরিচর্যা পেলে রোগীর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠা সম্ভব ।

লিখেছেন – জাকিয়া সুলতানা

 

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট

Share

স্ট্রেস এক ধরনের শারিরীক, মানসিক ও অাবেগ সংক্রান্ত ফ্যাক্টর যা শারিরীক কিংবা মানসিক টেনশনের সৃষ্টি করে। স্ট্রেস সাধারণত ‘flight or fight‘ রেসপন্সের সৃষ্টি করে থাকে। ফ্লাইট সিচুয়েশনে ব্যক্তি স্ট্রেসযুক্ত অবস্থানকে এড়াতে চেষ্টা করে থাকে এবং ফাইট অবস্থানে সাধারণত ব্যক্তি স্ট্রেসযুক্ত অবস্থা সামলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে চেষ্টা করে। স্ট্রেসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞাটি দিয়েছেন রিচার্ড এস. লাজারাস, সেটি হলো – “স্ট্রেস নামক অনুভুতি তখন অনুভূত হয় যখন কেউ অনুধাবন করে যে চাহিদাগুলো তার কার্যকরী ব্যক্তিগত ও সামাজিক সক্ষমতাকে অতিক্রম করেছে।”

স্ট্রেসের সংজ্ঞায় দুইটি মৌলিক উপাদান আছে, প্রথমত, একটি ব্যক্তি এবং পরিবেশের মধ্যে একটি গতিশীল সম্পর্ক। ব্যক্তি স্ট্রেসে কতটুকু প্রতিক্রিয়া করবে তা এই সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, স্ট্রেস জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, বেঁচে থাকলে স্ট্রেস অনুভব করতে হয়।

একজন ব্যক্তির জন্য স্ট্রেস খুব ভালোও নয় আবার খারাপও নয়। স্ট্রেস দুই ধরনের হতে পারে, যেমন: ইউস্ট্রেস বা পজিটিভ স্ট্রেস এবং নেগেটিভ স্ট্রেস বা ডিসস্ট্রেস। পজিটিভ স্ট্রেস জীবনে চ্যালেন্জ এবং উত্তেজনা থাকে। তাই মাঝারি পর্যায়ের অ্যাংকজাইটি, উত্তেজনা এবং একই ধরনের মানসিক কার্যক্রম ব্যক্তির জীবনে বিদ্যমান থাকলে তা স্বাস্থ্যকর। তবে এই স্ট্রেস যখন ব্যক্তিকে কোন স্ট্রেস সম্পন্ন অবস্থানে অনেক বেশি উত্তেজিত করে ফেলে তখন তাকে নেগেটিভ স্ট্রেস বা ডিসস্ট্রেস বলে। এই নেগেটিভ স্ট্রেস জীবনে এক ধরনের অস্বস্তি এবং শারিরীক ব্যাথার উদ্রেক করতে পারে।

স্ট্রেসের শারীরিক লক্ষণসমূহ:
– মাথা ব্যাথা
– বারবার ইনফেকশন হওয়া
– পেশী টানটান অনুভূত হওয়া
– পেশীতে খিঁচুনি
– অবসাদ
– নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া
– স্ট্রেসের আচরণগত লক্ষণসমূহ:
– খুব বেশি দূর্ঘটনা ঘটানো
– খাবারে অরুচি
– ইনসমোনিয়া
– অস্থিরতা
– অতিরিক্ত ধূমপান করা
– অতিরিক্ত মদ্যপান করা
– যৌনতাড়না হ্রাস পাওয়া
– স্ট্রেসের আবেগ সংক্রান্ত লক্ষণসমূহ:
– আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
– অতিব্যস্ত হওয়া
– বিরক্ত অনুভব করা
– ডিপ্রেশন
– ঔদাসিন্য
– নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন অনুভব করা
– কোন কিছু নিয়ে অনেক বেশি সংশয়ে থাকা
– এছাড়া স্ট্রেসে থাকলে ব্যক্তি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকে,খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা পরিবর্তন করে, দুঃস্বপ্ন দেখে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে থাকে।

 

স্ট্রেসের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে দুটি বড় যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে যা স্ট্রেসের সময় সমস্ত শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তার একটি হলো অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম (Autonomic Nervous System) এবং অপরটি হলো এন্ডোক্রাইন সিস্টেম (Endocrine System)।

অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের কাজ
স্ট্রেসের সময় অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম তার দুটি সাকার মাধ্যমে তার কাজ সম্পন্ন করে থাকে। প্রথমটি হচ্ছে ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ যা মূলত জরুরি ফ্লাইট অথবা ফাইট সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং অপরটি হলো ‘প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ যা ব্যক্তিকে স্ট্রেস সম্পন্ন অবস্থান থেকে বের হয়ে শান্ত হতে সাহায্য করে।

আমাদের মস্তিষ্কে একটি নার্ভ সেলের সমন্বয়ে গঠিত অংশ আছে, যার নাম হাইপোথ্যালামাস যা অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। স্ট্রেসের সময়ে এই হাইপোথ্যালামাস অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে যা শরীরের যে অংশগুলো জরুরি বা স্ট্রেস সম্পন্ন সময়ে কাজ করে তাদের উদ্দীপিত করে থাকে। শরীরের সে অংশগুলো তখন স্বাভাবিকের চাইতে বেশি কাজ করে থাকে। এটি স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়ায় শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষামূলক ধাপ। এমতাবস্থায় সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম শরীরে অ্যাডরেনাল গ্ল্যান্ডকে উদ্দীপিত করে যা অ্যাডেরেনালিন হরমোন নিঃসরণ করে। এর ফলে হৃদপিন্ড দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করতে থাকে,জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে যাতে করে আরো বেশি অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করতে পারে, পেশী শক্ত হয়ে ওঠে যাতে করে “ফ্লাইট কিংবা ফাইট” প্রতিক্রিয়া ঘটানো সম্ভব হয়ে থাকে। আবার অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের অন্য একটি শাখা, “প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম” কিছু সংখ্যক অঙ্গের কার্যক্রমের হ্রাস ঘটায় এবং কিছু অঙ্গের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে যাতে করে শারীরিকভাবে নিরাময় সম্ভব হয়। নার্ভাস সিস্টেমের এ অংশটি হৃদপিন্ডের কাজের গতি কিছুটা হ্রাস করে, রক্তনালীগুলো প্রসারিত করে এবং মুখের লালা নিঃস্বরণ ত্বরান্বিত করে।

এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের কাজ
স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপটি হলো এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের কাজ। এ সিস্টেমটি অসংখ্য গ্ল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত যা বিভিন্ন ধরনের হরমোন রক্তনালীতে নিঃসরণ করে থাকে। পিটুইটারী এবং অ্যাডরেনাল-দুটি গ্ল্যান্ড যা স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। যখন হাইপোথ্যালামাস পিটুইটারি গ্ল্যান্ডকে সক্রিয় করে তখন এটি এ.সি.টি.এইচ নামক হরমোন নিঃসরণ করে থাকে। এই হরমোনটি অ্যাডরেনাল গ্ল্যান্ডকে সক্রিয় করে যা স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসোল’ উৎপাদন করে। কর্টিসোল নার্ভাস সিস্টেমের ইমারজেন্সি ব্রাঞ্চকে সচল রাখে এবং স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

স্ট্রেস আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে থাকে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের অবস্থা ব্যক্তির সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থার ব্যাঘাত ঘটায়। স্ট্রেস একই সাথে শারিরীক ও মানসিক স্বস্থ্যের অবনতি ঘটায়। এটি সঠিক চান্তন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়,স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে এবং জীবনকে উপভোগ করতে বাঁধা দেয়। এসকল সমস্যা থেকে রেহাই পেতে সঠিক স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট অনেক বেশি জরুরি। এটি স্বাস্থ্যকর,সুখী জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয়।
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের জন্য কতগুলো সংগঠিত পদক্ষেপ নেয়া যায়:

১. স্ট্রেসের কারণগুলো চিহ্নিত করা:
স্ট্রেস সৃষ্টিকারী কারণগুলো চিন্হিত করার মাধ্যমে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। কিন্তু এই কারণসমূহ চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যক্তিকে কতগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হয়, যেমন: কোন কারণসমূহ স্ট্রেস সৃষ্টি করছে, এর ফলে শারিরীক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া কি হচ্ছে,স্ট্রেসের কারণে ব্যক্তির সার্বিক প্রতিক্রিয়া কি হচ্ছে এবং ব্যক্তি ভালো থাকার জন্য কি পদক্ষেপ নিচ্ছে ইত্যাদি। এসকল প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিকে স্ট্রেসের কারণসমূহ এবং তার সাথে মোকাবেলা করার জন্য গৃহীত পথগুলো সম্পর্কে জানা যায়।

২. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের ৪টি ‘A’ অনুশীলন করা:
যেহেতু স্ট্রেস নার্ভাস সিস্টেমের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, সুতরাং যে কোন সময়, যে কোন ঘটনায় স্ট্রেসের উদ্রেক হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্ট্রেসের কারণগুলোর প্রতি ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য চারটি ‘A’ অনুশীলন করা জরুরি। এই চারটি ‘A’ হলো:

Avoid (এড়িয়ে চলা) Alter (পরিবর্তন করা) Adapt (খাপ খাওয়ানো) Accept (স্বীকার করে নেয়া)

Avoid (এড়িয়ে চলা) :
স্ট্রেস তৈরি করে এমন ঘটনা গুলো এড়িয়ে চললে স্ট্রেস কমানো সম্ভব। এছাড়া কোন ব্যক্তি, পরিবেশ যদি টেনশন বা স্ট্রেসের উদ্রেক করে থাকে তবে তাদের এড়িয়ে চললেও স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিজের প্র্যাতাহিক কাজগুলোর একটি রুটিন তৈরি করে নিলে তা সুবিধাজনক হয়। প্রয়োজনে কাজের চাপ কমাতে কিছু কাজ কমিয়ে নেয়া যেতে পারে।

Alter (পরিবর্তন করা):
যদি কোন ঘটনা, পরিস্থিতি বা ব্যক্তি আপনার বিরক্তি কারণ হয় তবে সে বিষয়ে সম্পাদনের সাথে দৃঢ়ভাবে তা প্রকাশ করা জরুরি। সকল কাজের একট ব্যালেন্সড শিডিউল তৈরি করা জরুরি।

Adapt (খাপ খাওয়ানো) :
যদি স্ট্রেস সম্পন্ন পরিস্থিতির বদলানো সম্ভব না হয়, তবে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার মাধ্যমে আশেপাশের পরিস্থিতিকে আরো স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায়। এছাড়াও কোন কাজ পারফেক্টভাবে করার তীব্র ইচ্ছা ত্যাগ করার মাধ্যমে এবং নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমেও এ আচরণটি অনুশীল করা যায়।

Accept (স্বীকার করে নেয়া)
কিছু সংখ্যক স্ট্রেস সহজে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্র কোন ব্যক্তি, পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মাধ্যমেই স্ট্রেসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যে কোন বিষয় যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করাটাই ভালো। জীবনে কঠিন চ্যালেন্জসমূহ মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পজিটিভ থাকাটা জরুরি। অন্যকে ক্ষমা করতে শেখা এবং বিশ্বস্ত কারো সাথে নিজের অনুভূতি শেয়ার করার মাধ্যমেও স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

৩. ব্যায়াম করা, গান শোনা, বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, বিভিন্ন ধরনের গেমস খেলা ইত্যাদি।
৪. অন্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা।  সরাসরি কারো সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে স্ট্রেস অনেকটা উপশমিত হয় যা ফ্লাইট অথবা ফাইট প্রতিক্রিয়াকে তরান্বিত করে।
৫. নিজের রিল্যাক্সেশনের জন্য, বিনোদনের জন্য সময় খুঁজে বের করা এবং জীবনকে উপভোগ করা।
৬. নিজের কাজের সময়কে সঠিকভাবে রুটিনমাফিক ব্যালেন্স করা।
৭. নিজের খাদ্যাভাসে পুষ্টিসম্মত খাবার রাখা, চা-কফি কম পান করা, নেশাজাতীয় দ্রব্যাদি, ধূমপান না করা। সেই সাথে পরিমিত পরিমাণ ঘুম অনেক বেশি জরুরি।

অামাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা স্ট্রেসের সম্মুখীন হয়ে থাকি। অথচ তা যদি আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত কে তবে তা সুস্থ সুন্দর জীবনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে একজন অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্টের মাধ্যমে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে সুস্থ, সুন্দর জীবনযাপন করা যায়।

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা