শিশুর বিকাশ এবং ভাইগটস্কির তত্ত্ব কথা

Share

একজন শিশুর বিকাশ কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে? কেবলমাত্র তার শারিরিক বিকাশের উপর, পরিবারের সদস্যদের উপর নাকি শিশুর বিকাশে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকাও রয়েছে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাবার জন্য এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আলোকপাত করেন একজন রাশিয়ান মনোবিজ্ঞানী, লেভ ভাইগটস্কি। শিশুর বিকাশে তার দেয়া তত্ত্ব সম্পর্কে জানার আগে তার সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নেয়া যাক।

পরিচিতি

Image Source 

লেভ ভাইগটস্কি ১৮৯৬ সালে রাশিয়ার অরশা শহরে এক মধ্যবিত্ত ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৭ সালে তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক পাশ করেন। তিনি তার জীবদ্দশায় ২৭০টি বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল, অসংখ্য  লেকচার এবং অনেকগুলো মার্ক্স ভিত্তিক মনোবৈজ্ঞানিক,শিক্ষণ তত্ত্ব প্রদান করেন। তিনি ১৯৫৭ সালের জুন মাসে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৫৮ সালের আগে তার দেয়া তত্ত্বগুলো পশ্চিমা বিশ্বে সেভাবে প্রসার লাভ করতে পারে নি এবং ১৯৬০ সালের আগে তা প্রকাশিতও হয় নি।  ১৯৬২ সালের দিকে তার তত্ত্বসমূহ আমেরিকান মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে আগ্রহের জন্ম দেয়। তাকে “মোজার্ট অফ সাইকোলজি” বলা হয়।

ভাইগটস্কির তত্ত্ব

জ্ঞানগত বিকাশ বলতে সাধারণত একজন মানুষের শিশুকাল থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত যতগুলো চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরি হয়,সেই সবকটি প্রক্রিয়াকে একসাথে বোঝানো হয়ে থাকে, যেমন- কোন কিছু মনে করা, সমস্যা সমাধান করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ইত্যাদি। এছাড়া জ্ঞানীয় দক্ষতা বলতে এমন কিছু দক্ষতাকে বুঝায় যা সহজ থেকে জটিল- যে কোন ধরনের কাজ করতে সাহায্য করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আপনার মোবাইল ফোনটি  হঠাৎ বেজে উঠলো। মোবাইলের রিং টোন শুনে উত্তর দেওয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, ফোনের উত্তর দেওয়া, মোটর দক্ষতা (ফোনটির রিসিভ অপশনটি সিলেক্ট করা), ফোনে কথা বলা এবং বোঝার জন্যে ভাষার দক্ষতা, ভয়েসের স্বর ব্যাখ্যা এবং সঠিকভাবে অন্য মানুষের সাথে আলাপচারিতার জন্যে প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা- এ সকল কিছুই জ্ঞানীয় দক্ষতার অন্তর্ভুক্ত।

শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে ভাইগটস্কির দেয়া তত্ত্বটিকে “সোশ্যাল লারনিং থিওরি” বলা হয়ে থাকে। এ তত্ত্বটির মূল প্রতিপাদ্য হলো,একজন শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তার পরিবার, চারপাশের পরিবেশ, তাকে প্রদানকৃত শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  শিশু সমাজ থেকে পাওয়া তার এ জ্ঞানকে একসাথে করে তার কাজ সম্পাদন করে। যদিও একটি শিশুর জ্ঞানগত বিকাশের সাথে সঠিক শারীরিক বিকাশ জড়িত তবে সামাজিক বিষয়ের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। ভাইগটস্কি যুক্তি দেন যে,মনোযোগ, স্মৃতি, যৌক্তিক চিন্তা, পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের মতো মানসিক কাজগুলোর উন্নয়নে সামাজিক পরিবেশকে একটি প্রাথমিক ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচনা করা যায় ।  

তার ভাষ্যে, তিনটি ধারণা শিশুর বিকাশের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে তিনি দাবী করেন, সেগুলো হলো-    

ক) শিশুর জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোকে যদি বিকাশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে তাতে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা সহজেই বুঝা যায়।

খ) শব্দ, ভাষা ও বিভিন্ন ধরণের অভিব্যক্তি শিশুর মানসিক কাজকে সহজ এবং পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে।

গ) জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোর মূল উৎস হলো সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক- সাংস্কৃতিক পটভূমি। অর্থাৎ, শিশুর বিকাশকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজগুলো থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ শিশুর বিকাশের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও তিনি দাবী করেন যে, ভাষা শিশুকে তার জ্ঞানীয় কাজগুলোকে বুঝতে, আকৃতি প্রদানে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এটি শিশুকে কোন কাজের পরিকল্পনা করতে ও সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করতে পারে।

শিশুর বিকাশ সংক্রান্ত ধারণা

এ তত্ত্বটিতে ভাইগটস্কি প্রদত্ত দাবীগুলোর সাথে কতগুলো অভিনব এবং প্রভাব বিস্তারকারী ধারণার কথা বর্ণনা করেছেন; যেগুলো হলো-

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট ( Zone of Proximal Development-ZPD)

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding)

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought)

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (Zone of Proximal Development- ZPD):

জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (জে.পি.ডি.) দ্বারা কতগুলো কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে যার মাঝে কিছু কাজ  শিশু একা একাই করতে পারে আবার কিছু কাজ আছে যা তার একার পক্ষে সম্পাদন করা কঠিন। দ্বিতীয় কথাটির ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, যে কাজগুলো বা সমস্যাগুলো শিশু নিজে নিজে সমাধান করতে পারে না, সে কাজগুলো করার জন্যে সে  যদি একজন দক্ষতাসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বা সমবয়সী শিশুর (যে ঐ কাজটিতে দক্ষ) কাছে থেকে কাজটি করার বা সমস্যাটি সমাধান করার ঠিক নির্দেশনা পায়, তবে শিশু আগে যে কাজটি নিজে করতে পারতো না, এখন তা সহজেই নিজে নিজে করতে শিখে যায়।

জে.পি.ডি. সম্পর্কে ভাইগটস্কি বলেছেন,

The distance between the actual developmental level as determined by independent problem solving and the level of potential development as determined through problem solving under adult guidance or in collaboration with more capable peers.” – (Vygotsky, 1935)

জে.পি.ডি.-এর দুটি লেভেল আছে – একটি হলো ‘Upper Limit’ এবং অপরটি হলো ‘Lower Limit’.

 

Upper Limit

একজন দক্ষ ব্যক্তির আওতাধীন থেকে শিশুর অতিরিক্ত দায়িত্ব নেবার লেভেলকে বোঝায়

শিশুর স্বাধীনভাবে এবং নিজে নিজে কোন সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর লেভেলকে বোঝায়

Lower Limit

 

একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। যেমন ধরুন, বুদ্ধিমত্তা পরিমাপক টেস্টের মাধ্যমে ২টি শিশুর মানসিক বয়স পরিমাপ করা হল এবং তাদের মানসিক বয়স ৮ বছর পাওয়া গেলো। ভাইগটস্কির মতে, এখানেই থেমে না থেকে কিভাবে শিশুটি তার চাইতে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করতে পারে সেই চেষ্টা করা উচিত। শিশুটিকে যদি আরো দক্ষ কারো মাধ্যমে শিশুটির চেয়ে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তবে শিশুটির মানসিক বয়স ১২ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding): 

শিশুর নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে কাজটি করার জন্য বা কোন সমস্যা সমাধানের জন্য অধিক দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে যে সহযোগিতা দেয়া হয়, তাকে স্ক্যাফোল্ডিং বলে। এ ক্ষেত্রে শিশুটির বাবা, মা, শিক্ষক কিংবা ঐ সমস্যাটি সমাধানে তার চাইতে বেশি দক্ষ সহপাঠী প্রথমে তাকে সমস্যাটি সমাধান করার উপায় দেখিয়ে দেন, কিছু ক্লু বলে দেন এবং সমাধান করার সময় মুখে মুখে সমাধানটি বলতে থাকেন। এ প্রক্রিয়াটি দুই বা তার চাইতে বেশিবার শিশুকে দেখানো যেতে পারে। প্রয়োজনে শিশুকে প্রশ্নও করা যেতে পারে। অবশেষে, শিশুটিকে যখন কোন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে,তখন ভুল বা ঠিক নির্বিশেষে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে যাতে করে শিশু সমস্যা সমাধান করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সাথে শিশুর ভুলটি যেন তাকে ইতিবাচকভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখাটাও জরুরি। ধীরে ধীরে শিশুটি যখন নিজে নিজে সমস্যাটি সমাধান করার যোগ্য হয়ে পড়বে, তখন সহযোগিতার মাত্রা কমিয়ে দিতে হয়। অবশেষে কাজটি যখন শিশু সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে, তখন সহযোগিতা বা ক্লুগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে হবে। এ প্রসেসটিকে ‘ফেইডিং’ বলে।

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought):

ভাইগটস্কি বিশ্বাস করতেন যে, শিশুরা ভাষা কেবলমাত্র সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে ব্যবহার করে না, বরং ভাষাকে তারা পরিকল্পনা, নির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকে। এ সকল কাজের জন্যে ভাষার এ  ধরনের ব্যবহারকে অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ বলা হয়ে থাকে।

 

ভাইগটস্কির মতে, ভাষা এবং চিন্তন আলাদাভাবে বিকাশ লাভ করলেও পরে তা একত্রিত হয়ে যায়। শিশুরা সামাজিক যোগাযোগের জন্যে ভাষা ব্যবহারের আরো আগে থেকে সে তার নিজের চিন্তার উপর বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে।  প্রথমে শিশু তার চিন্তাকে মুখে উচ্চারণ করে প্রকাশ করে ফেলে,সাধারণভাবে বলতে গেলে, নিজের সাথে কথা বলে। ধীরে ধীরে সে তার চিন্তাকে সবসময় প্রকাশ না করে নিজের মাঝে রাখতে শিখে যায়। সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের মধ্যকার সময়ে শিশু এ বিষয়টি শিখে ফেলতে পারে। ভাইগটস্কির মতে, যে শিশু  তার ভাষাকে যত বেশি তার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করে, সে শিশু সামাজিকভাবে ততো বেশি উপযুক্ত হয়,সামাজিক যোগাযোগে ততো বেশি দক্ষ হয়।

তবে শিশুকে নির্দেশনা দেয়া এবং সহযোগিতা করা সব সময় কোন কাজ শিখতে বা সমস্যা সমাধান করতে একই রকম সাফল্য আনবে- এমন কোন কথা নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। যদিও ভাইগটস্কির তত্ত্বটি শিশুর বয়সের সাথে আসা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে তেমনভাবে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি, তা সত্ত্বেও এটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুর জ্ঞানের নির্মাণে সমর্থন দেয়। অর্থাৎ, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের ক্ষেত্রে শারীরিক বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশ, সহযোগিতা এবং নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।     

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা