প্যারেন্টিং স্টাইল ও সন্তানের ভবিষ্যৎ

Share

‘অমুকের ছেলে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে পারলে তুমি কেন পারবে না?’- আমাদের দেশে এইরকম কথা শুনেনি এইরকম ছেলেমেয়ে পাওয়া ভার। অনেক ছেলেমেয়ে ছোটবেলা থেকেই এই কারণে হীনমন্যতায় ভোগে। বাবা মা আমাদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী- এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্তানের ভালো হবে চিন্তা করে বাবা মায়েরা যা কিছু করেন তার সবই কি ঠিক?

শুধু খাদ্য, পোশাক, ভালো স্কুলে ভর্তি করানো ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণ করা পর্যন্তই অভিভাবকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না।সন্তানের মনস্তত্ব সঠিকভাবে বুঝা ও তার মানসিক বিকাশের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাও অভিভাবকের গুরুদায়িত্ব। এই প্যারেন্টিং স্টাইলের উপর সন্তানের ভবিষ্যৎ আচরণ অনেকখানি নির্ভর করে।

যেসব পিতামাতা তাদের সন্তানদের যথেষ্ঠ সময় দেন না তাদের সন্তানদের আচরণে পরবর্তীতে aggressiveness আর insecurity লক্ষণীয়। আবার সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল (over protective) বাবা মায়েদের কারণে সন্তানরা অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক পিতামাতাই সন্তানের ন্যায় অন্যায় সকল আবদার পূরণ করে থাকেন। সন্তানের আবদার পূরণ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় সন্তান আরেকজনের খেলনা তার অনুমতি ছাড়াই ব্যবহারের অন্যায় জেদ করে থাকে। আর পিতামাতা তাদের এই আবদার রক্ষাও করে থাকেন। এতে করে শিশুরা অন্যের খেলনা কেড়ে নিতে শিখে। পরবর্তীতে তারা আক্রমণাত্নক, অন্যের ইচ্ছা বা আবেগের প্রতি অসহিষ্ঞু এবং অবাধ্য হয়ে উঠে।

সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা শিশুর সামাজিকীকরণে প্যারেন্টিং স্টাইলের প্রভাব নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা মূলত তিন ধরণের প্যারেন্টিং স্টাইল চিহ্নিত করেছেন।

১. Authoritarian

২. Permissive

৩. Authoritative

Authoritarian প্যারেন্টিং এ পিতামাতার প্রতি চরম আনুগত্য প্রদর্শন করা হয়। শিশুদের মতামত বা ইচ্ছাকে কম মূল্যায়ন করা হয়। শিশুর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শাস্তির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে করে পিতামাতা ও শিশুদের সম্পর্ক আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার বদলে শিশুর মধ্যে ভীতি ও আনুগত্যের সৃষ্টি করে। Authoritarian প্যারেন্টিং শিশুর আত্নবিশ্বাস গঠনে বিরূপ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী জীবনে ব্যক্তির আচরণে রাগ, বিতৃষ্ঞা, ক্ষোভ, ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে।

Permissive পিতামাতা শিশুর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন না বরং শিশুদের নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেন। শিশুদের শাস্তির ভয় দেখিয়ে নিয়ম শৃঙ্খলা বা আদব কায়দা শেখানোর পরিবর্তে এর পেছনের যৌক্তিক কারণগুলো বুঝিয়ে নিয়ম কানুন মেনে চলতে উৎসাহিত করেন। যেমন, কোন শিশু জোর করে অন্যের খেলনা নেওয়ার আবদার করলে পিতামাতা যদি ছোট বয়সেই তাদের বুঝিয়ে বলেন যে অন্যের জিনিস তার অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার করা উচিত না- তাহলে তারা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। পরবর্তীতে তারা অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হবে।

মনোবিজ্ঞানীরা authoritative প্যারেন্টিং স্টাইলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। Authoritative পিতামাতা যেমন শিশুর নিজস্ব ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দেন তেমনিভাবে তারা সামাজিক মূল্যবোধ শিখানোর প্রতিও যত্নশীল। Authoritative প্যারেন্টিং এ ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, মতামত, ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করা হয়। শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, সামাজিকীকরণ, সফল ব্যক্তিত্ব গঠনে authoritative প্যারেন্টিং সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।গবেষণায় দেখা গেছে, authoritative প্যারেন্টিং এ বেড়ে উঠা শিশুর পরবর্তী জীবনে ডিপ্রেশন বা অপরাধ প্রবণতার হার অনেক কম।

প্রতিটি শিশু প্রাথমিক গুরুত্বপূ্র্ণ আচরণ পরিবার তথা পিতামাতা থেকেই  শিখে। তাই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য সঠিক প্যারেন্টিং এর প্রতি পিতামাতার যত্নবান হওয়া উচিত।  -সামিরা মাহজাবিন

ফ্রাস্ট্রেশনের এপিঠ ওপিঠ

Share

“খুব ফ্রাস্ট্রেশনে আছি” আমাদের প্রতিদিনের জীবনে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে এই কথাটি। সাধারণত আমরা কখন ফ্রাস্ট্রেশনে থাকি? কেনোই বা ফ্রাস্ট্রেশন ঘিরে ধরে আমাদের? এই নিয়েই আজকের লেখা।

ফ্রাস্ট্রেশন কখন হয়?

সাধারণত আমরা যখন আমাদের কোনো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হই কিংবা কোনো একটি কাজ করার সময় বাধার মুখে পড়ি তখন আমরা ফ্রাস্টেশনের সম্মুখীন হই। প্রতিদিনের ঘটনাবহুল জীবনে বিভিন্ন বিষয়ের কারণেই আমরা ফ্রাস্টেশন অনুভব করতে পারি। দীর্ঘ জ্যাম, টিকেট কাউন্টারের লম্বা লাইন, বিকট শব্দে বাজতে থাকা লাউডস্পীকারের ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতে না পারা ইত্যাদি ঘটনার কারণে আমরা প্রায় সময়ই ফ্রাস্ট্রেশন অনুভব করছি। ফ্রাস্ট্রেশনের সাথে প্রাথমিক ভাবে আমরা বিরক্তি এবং রাগ অনুভব করে থাকি। তবে সব ধরণের ফ্রাস্ট্রেশনই যে রাগের সৃষ্টি করবে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ফ্রাস্ট্রেশনকে একধরণের সিগন্যাল হিসেবে নিতে পারি যা কিনা আমাদের লক্ষ্যের দিকে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পন্থাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ কোনো এক উপায়ে কাজ সম্পন্ন না হলে অন্য কোনো উপায়ের আশ্রয় নেয়া। এতে ব্যক্তি তার সৃজনশীলতার চর্চা করতে পারে। ফ্রাস্ট্রেশন স্বয়ংক্রিয় ভাবেই আমাদের জীবনে আসবে এবং প্রভাব বিস্তার করবে। যেহেতু আমরা অর্জন এবং সাফল্যের দিকে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করছি সেহেতু প্রতিটি পদক্ষেপে বাধার সম্মুখীন হওয়া এবং তা থেকে ফ্রাস্ট্রেশনের সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক।

ফ্রাস্ট্রশন কেনো হয়?

আমরা আগেই জেনেছি যে, সাধারণত মানুষ যখন কাজেকর্মে বাধা পায় কিংবা কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনে বাধার সম্মুখীণ হয় তখন সে ফ্রাস্ট্রেশন অনুভব করে থাকে। সাইকোলজিস্টরা ফ্রাস্ট্রেশন কেনো হয় এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে অভ্যন্তরীন এবং বহিরাগত দুই ধরণের কারণ চিহ্নিত করেছেন। ফ্রাস্ট্রেশনের কারণ হিসেবে কোনো একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসের অভাব কে অভ্যন্তরীন কারণ এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের সামাজিক অবস্থা কিংবা উক্ত লক্ষ্যের প্রতি সমাজের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য বাধা বিপত্তিকে বহিরাগত কারণ হিসেবে দায়ী করে থাকেন। এছাড়া অধিক চিন্তা, ভয়, উদ্বেগ থেকেও ফ্রাস্ট্রেশনের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

ফ্রাস্ট্রেশনের রকমফের

ফ্রাস্ট্রেশন মূলত দুই প্রকার। প্রাইমারী ফ্রাস্ট্রেশন এবং সেকেন্ডারি ফ্রাস্ট্রেশন। প্রাইমারী ফ্রাস্ট্রেশন বলতে মূলত বোঝায় যখন কেউ একজন তার কোনো একটি প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনটির প্রাধান্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে ব্যর্থতাকেই ব্যক্তি বড় করে দেখেন। যেমন কেউ হয়ত পরের দিন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যক্তির কাছে এই ব্যর্থতাই তখন ফ্রাস্ট্রেশনের কারণ। সেকেন্ডারি ফ্রাস্টেশনে একটি দৃশ্যমান বাহ্যিক কারণের উপর জোর দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় উক্ত ব্যক্তি যদি লাউডস্পীকারে উচ্চস্বরে গান বাজানোর কারণে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হন তখন তিনি লাউডস্পীকারের উপস্থিতির কারণে ফ্রাস্ট্রেশন বোধ করেন।

ফ্রাস্ট্রেশনের ফলে সাধারণত মানুষ বিরক্ত বোধ করে থাকে এবং সেটিকে কাটিয়ে উঠতে সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় তাদের এই আক্রমণাত্মক ব্যবহারের ফলে তারা তাদের ফ্রাস্ট্রেশনের মূল কারণ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয় এবং সেটির সমাধান তখন অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফ্রাস্ট্রেশন থেকে মুক্তি

ফ্রাস্ট্রেশনের সমাধান হিসেবে সাইকোলজিস্টরা সাধারণত ফ্রাস্ট্রেশনের মূল কারণ কিংবা এর উৎপত্তি কে চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করতে বলে থাকেন। ফ্রাস্টেশনের সময় রাগান্বিত না হয়ে ফ্রাস্ট্রেশনকে একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মেনে নিয়ে শান্ত থাকলে এবং মেডিটেশন বা অন্যান্য উপায়ে নিজেকে “শীঘ্রই ফ্রাস্ট্রেশন কেটে যাবে” এই বিশ্বাস নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করলে ব্যক্তি আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেন। ফ্রাস্ট্রেশন মানেই থেমে যাওয়া নয়। বরং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ফ্রাস্ট্রেশন আমাদের জন্য শাপেবর হয়ে আসতে পারে। ফ্রাস্ট্রেশনের সময় নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস রেখে কাজ করলে এবং কাজের প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে থাকলে কাজ সম্পন্ন করার বিভিন্ন উপায় সামনে আসতে পারে যা ব্যক্তির ব্যবস্থাপনামূলক দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে।

আশিক মাহমুদ

মনঋতুর আদ্যোপান্ত

Share

গত লেখায় আমরা জেনেছিলাম ইউনিপোলার ডিপ্রেশন সম্পর্কে। এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় সময়ই শুধুমাত্র ডিপ্রেসনে ভুগে থাকেন। কিন্তু যদি আক্রান্ত ব্যক্তিটি কখনো অত্যন্ত ডিপ্রেশন আবার কখনো অত্যন্ত আনন্দিত অবস্থায় থাকে তখন আমরা সেটাকে কি বলতে পারি? মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তির এই মানসিক অবস্থার নাম দিয়েছিলেন “ম্যানিয়াক ডিপ্রেশন”; পরে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “বাইপোলার ডিসঅর্ডার”।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত কারা?

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যাক্তি উপর্যুপরি প্রচন্ড রকমের মুড সুইং এর শিকার হন। কখনো অত্যন্ত ডিপ্রেসড থাকেন; এতটাই ডিপ্রেসড থাকেন যে ব্যক্তি আত্মহননের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে পারেন আবার কখনো একজন ম্যানিয়াকের মত আচরণ করেন (ম্যানিয়া হচ্ছে ডিপ্রেশনের ঠিক উল্টো একটি অবস্থার নাম। এই পর্যায়ে ব্যক্তি অত্যন্ত উৎফুল্ল বোধ করেন)। ব্যক্তি তার এই ডিপ্রেশন কিংবা ম্যানিয়া ফেজটিতে সপ্তাহ কিংবা কখনো মাসব্যাপী অবস্থান করেন। মূলত ব্যক্তি এই দুই ধরণের অবস্থার মধ্যে প্রতিনিয়ত বসবাস করতে শুরু করেন বলেই একে বাইপোলার নামে অভিহিত করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী ওয়াইনরেবের ভাষায় বাইপোলার ডিসঅর্ডার মূলত আমাদের মস্তিষ্কের একটি সমস্যা যা কিনা আমাদের মানসিক অবস্থার ওঠানামা করার জন্য দায়ী। এই ওঠানামা এতটাই প্রকট হয় যে, এটি আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে যথেষ্ঠ ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম। মানসিক সমস্যার তীব্রতার উপর ভিত্তি করে বাইপোলার ডিসঅর্ডারকে দুইটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। ১) বাইপোলার ১ ডিসঅর্ডারঃ এখানে ব্যক্তি কমপক্ষে একবার ম্যানিয়া এবং তার আগে ডিপ্রেশন ফেজের মুখোমুখি হন। ২) বাইপোলার ২ ডিসঅর্ডারঃ এখানে ব্যক্তি একাধিকবার ডিপ্রেশনের শিকার হন এবং কমপক্ষে একবার হাইপো ম্যানিয়া ফেজে অবস্থান করেন। হাইপো ম্যানিয়াক ব্যক্তির ঘুম কম হয় এবং অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির হয়ে থাকেন। এছাড়া উৎফুল্লতা এবং প্রতিযোগী মনোভাব পোষণ করেন। তিনি প্রায়ই মিশ্র রকমের অনুভূতি অনুভব করেন। দুই ধরণের ক্যাটাগরিতেই ব্যক্তি প্রচন্ড রকমের মুড সুইং এর মধ্য দিয়ে যান।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
১) ম্যানিয়াক সিম্পটম-

  • অদ্ভুত বোধ করা।
  • উদাস কিংবা একঘেয়েমিতা।
  • বিভ্রান্ত বোধ করা।
  • উৎফুল্ল ব্যক্তির মনে হয় যে তারা যে কোনো কিছুই করতে পারেন এবং এই চিন্তা থেকে তারা বিপদজনক কাজ করে বসতে পারেন।
  • ব্যক্তির আচরণে হঠাৎ করে চিন্তার উদয় হওয়া আবার হঠাৎ ই সেটি মিলিয়ে যেয়ে নতুন কোনো চিন্তার উদয় হওয়া।
  • চঞ্চলতা কিংবা কখনো আক্রমনাত্মক ব্যবহার দেখা দেয়।

২) ডিপ্রেশন সিম্পটম

  • হতাশা
  • নিজেকে দোষী এবং ব্যর্থ মনে করা
  • উদ্বিগ্নতা
  • ঘুমের ব্যাঘাত
  • দুঃখী মনোভাব
  • বিরক্তিবোধ, ইত্যাদি।

ম্যানিয়াক ব্যাক্তি কখনো নিজেকে অত্যন্ত সফল এবং সুখী ভাবেন আবার হঠাৎই ডিপ্রেশন ফেজে হতাশায় নিমজ্জিত হন। কমপক্ষে সাত দিন থেকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে দুইধরণের লক্ষণই বারবার দেখা গেলে ব্যাক্তি বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বলে ধরে নেয়া যায়।

কি কারণে বাইপোলার ডিসঅর্ডার হতে পারে?

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের কারণ হিসেবে মূলত বিজ্ঞানীরা আমাদের মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক কার্যক্রমকে চিহ্নিত করেছেন। নোরেনেফ্রিন হরমোনের অধিক ক্ষরণের ফলে ম্যানিয়া এবং স্বল্প সেরোটোনিন ক্ষরণের ফলে ডিপ্রেশন ফেজের উৎপত্তি হয়। কিছু গবেষক নিউরন মেমব্রেনের ভেতরে এবং বাইরে আয়নের অস্বাভাবিক চলাচল এবং জেনেটিক এ্যাবনর্মালিটিকে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের জন্য দায়ী করছেন।

তবে সুখের বিষয় হচ্ছে বাইপোলার ডিসঅর্ডার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলেও এটি সমাধানযোগ্য। বাইপোলার ডিসঅর্ডার ট্রিটমেন্টের প্রধান লক্ষ্য থাকে ম্যানিয়াক এবং ডিপ্রেশন ফেজের পুনরাবৃত্তির হার কমানো। সাইকিয়াট্রিস্ট রোগীর অবস্থা অনুযায়ী তাকে এ্যান্টিসাইকোটিস মেডিসিন কিংবা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপী কিংবা ইলেক্ট্রো কনভালসিভ থেরাপীর আওতায় আনেন। সঠিক সেবার মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে রোগীর অবস্থার উন্নতি দেখা যায়।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার সহ অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত তাদের অসুস্থতা প্রকাশের আশঙ্কায় থাকেন কারণ তারা মনে করেন যে তারা সমাজের দ্বারা প্রত্যাখাত হতে পারেন কিংবা পাগল বলে অভিহিত হতে পারেন। এই ভয়টি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিত্সা গ্রহণ থেকে বিরত করতে পারে যা তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ করে দেয়। লিন্ডন (২০১১) এর মতে, দুই ধরণের ভয় কাজ করে; সাধারণ মানুষের বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীর প্রতি ভয় এবং রোগীর নিজের ভয়। রোগীর নিজের ভয় থাকে মূলত নিজেকে নিয়ে উৎপন্ন হতাশা এবং স্বল্প আত্মমর্যাদা।  যে ব্যক্তি উভয় ধরণের ভয়ে  ভুগছেন তিনি নিঃসন্দেহে মানসিক সাহায্য এবং প্রিয়জনের সমর্থন না পেলে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবেন না। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি আমাদের আরো বেশি সহানুভূতিশীল হতে হবে।

-আশিক মাহমুদ

বিষন্নতা বৃত্তান্ত

Share

খুব হাসিখুশি প্রাণবন্ত রাজীবের জীবন যেন হঠাৎ করেই থমকে গেছে। এক অদ্ভুত শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। সকালে ঘুম থেকে উঠলেও  রাজীব ঘন্টার পর ঘন্টা বিছানায় পড়ে থাকে। নানা অজুহাত‌ দেখিয়ে সে কয়েকদিন অফিসে যায়নি। তার খুব জরুরি প্রেজেন্টেশন ছিল আজকে অথচ তার মনেই নেই। অফিসের ম্যানেজারের ফোন পেয়ে রাজীবের মধ্যে খুবই হীনমন্যতাবোধ কাজ করছে। ফোনটা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজীব ভাবতে থাকে সে‌ হয়ত কোন কিছুরই যোগ্য না। রাজীবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু অভি গত কয়েকদিন তাকে ফোন করছে কিন্তু রাজীব বারবার কেটে দিয়েছে। তার মনে অনেক কিছু বলার আছে অথচ কারও সাথে কথা বলতেও প্রচন্ড দ্বিধা হচ্ছে।  প্রতিদিন এভাবেই তার দিন চলে যাচ্ছে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায়। অথচ কয়েক মাস আগেও রাজীবের অবস্থা এমন ছিল না‌।  একরকম জোর করেই অভি রাজীবকে সাইকোলজিস্ট এর কাছে নিয়ে যায়। রাজীবের গত কয়েক মাসের ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গেল সে বিষন্নতায় ভুগছে।

বিষন্নতা কী?

বিষন্নতা বা ডিপ্রেশন ব্যাপারটি বেশ জটিল এবং এর প্রেক্ষাপট বিশাল। এটি একটি সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। ডিপ্রেশনকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়- unipolar depression এবং bipolar disorder। সাধারণত ডিপ্রেশন বলতে আমরা Unipolar Depression কেই বুঝি। DSM-5 অনুযায়ী,‌ দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে ব্যক্তির মধ্যে ক্রমাগত ডিপ্রশনের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিলে ব্যক্তি ডিপ্রেশনে ভুগছে ধরা হয়। সময় ব্যবধান(duration) এবং লক্ষনের উপর ভিত্তি করে এর মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহ

ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলোকে পাঁচটি ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেরই আলাদা আলাদা সাইকোলজিক্যাল টার্ম রয়েছে। বোঝার সুবিধার্থে এখানে প্রত্যেক ক্ষেত্রের কিছু উদাহরণ দেয়া হল।

১| ব্যক্তির মধ্যে নেতিবাচক আবেগ যেমন: কষ্ট, রাগ, উদ্বেগ

বেড়ে যায়। কোন কোন সময় ব্যক্তি হয়ত কোন কাজেই আর আনন্দ বা আগ্রহ খুঁজে পায়না।

২| ব্যক্তির মধ্যে কাজ করার অনুপ্রেরণা বা উদ্যোগ, স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব থাকেনা। এমনকি বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলা বা ঘুরাফিরা করাও নানা অজুহাতে এড়িয়ে যায়।

৩| ব্যক্তির আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন আসে। তারা আগের মত কাজে মনোযোগ দিতে পারেনা। হঠাৎ করেই হয়ত আড্ডায় প্রাণবন্ত মানুষটি একা থাকা শুরু করে।

৪| ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষ প্রায়ই হীনমন্যতায় ভোগে। অপরের তুলনায় নিজেকে ছোট মনে করে‌ আর নিজেকে নিয়ে হতাশায় ভোগে।

৫| ডিপ্রশনের কারণে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, খাওয়ায় অরুচি ইত্যাদি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ডিপ্রেশন কেন হয়?

ডিপ্রেশন বিভিন্ন কারণে হতে পারে। ডিপ্রেশন হতে পারে সরাসরি জীবনের কোন ঘটনার কারণে এমনকি মানবদেহের হরমোনের কারণেও হতে পারে। সেরেটোনিন এবং নরএপিনেফ্রিন হরমোন নিঃসরণ কমে গেলে ব্যক্তির মধ্যে ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। ছোটবেলার কোন দুঃসহ স্মৃতি মানুষের মনে জায়গা করে ফেললেও মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে। তাছাড়া আরও অনেক কারণে ব্যক্তি বিষন্ন হয়ে পড়ে যেমন: নেতিবাচক চিন্তা ধারনা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, সামাজিক চাপে  ইত্যাদি।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়

ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে ডিপ্রেশনের কারণ যেমন ভিন্ন হয় তেমনি ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়ও ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। দক্ষ কাউন্সিলর এর সাথে নিজের সমস্যা আলোচনা করে এর সমাধান পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া নিজের নেতিবাচক চিন্তাগুলো ভালভাবে চিহ্নিত করে চিন্তায় ইতিবাচকতা আনতে হবে। ধীরে ধীরে বাইরের মানুষ আর পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলেই সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে আবার অনেক ‌সময় বন্ধুরাই বাঁকা কথার দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে হীনমন্যতাবোধ সৃষ্টি করে। নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।

(সামিরা মাহজাবিন)

HSC Exam :The বেসামাল চাপ!

Share

(১)

‘উফ্!!এবার আর এ+ পাব না। ‘

রাব্বির তাই মনে হচ্ছে। এপ্রিল থেকে তার পরীক্ষা শুরু হবে। ভালো কলেজের মেধাবী ছাত্র সে, প্রস্তুতিও খুব ভালো। সারাবছর রাতদিন এক করে পড়ালেখা করেছে। মা-বাবার প্রত্যাশা অনেক বেশি, একমাত্র ছেলে রাব্বি। সবার কথা মাথায় রেখে সে পরিশ্রম করেছে। অথচ পরীক্ষার সাত দিন আগে থেকে কিছুই পড়তে পারছে না। ভয় আর টেনশনের ফলে রাব্বি খুব হতাশ হয়ে পড়েছে। বই নিয়ে বসলেই মনে হয়,

– যদি Golden A + না আসে তবে কি হবে?

-যদি  MCQ কঠিন হয়?

 -ICT সহজ হবে তো? আর কত কী!

রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। ঘুমাতে গেলে দুঃস্বপ্ন দেখে। তাই সারারাত জেগে কাটাচ্ছে। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করতে পারছে না। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। মা-বাবা তাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। বন্ধুরা বিরক্ত। সবারই তো পরীক্ষা। ‘রাব্বি কেন বেশি ভাব ধরছে?’-বন্ধুরা মিলে তাই ভাবছে। পরীক্ষা আসলে প্রতি বার এমন হয় তার।কিন্তু এবার বেশি টেনশনে আছে রাব্বি। সামনে যে ভর্তি পরীক্ষা!

খুব ভালো  করতে হবে। সবাই রাব্বিকে মানসিক ভাবে চাপ মুক্ত থাকার সুফল বোঝাচ্ছে। তবুও বেচারার টেনশন কমছে না।

(২)

ইমা পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত। টিউশনি করানো, বাসার কাজ সবই আগের মতোই করছে। পরীক্ষা আসলে প্রতি বার সে সব কাজ সময় মতো করার চেষ্টা করে। ইমা মনোযোগী ছাত্রী,  পড়ালেখা করে নিয়মিত। ফলে সবসময় খুবconfident থাকে। সব পরীক্ষা ভালো করবে, সে বিশ্বাস করে। সান্ধ্য আড্ডায় কম যাবে। আর টিভি দেখবে খুব কম পরীক্ষার সময়টায়। ফেসবুক চালানো বাদ দিবে। পড়ালেখা আর কাজে  ভারসাম্য আনবে। ইমা আরও বেশি নিয়মিত হবে পড়াশোনায়। পরীক্ষার চাপ তাকে  মনোযোগী করে তুলেছে।

আমরা প্রতিনিয়ত স্ট্রেস জিনিসটিকে নেগেটিভ ভাবেই দেখে থাকি। তবে আমাদের মধ্যে এই স্ট্রেস থাকাটাই স্বাভাবিক; কিন্ত খেয়াল রাখতে হবে সেই স্ট্রেসটা যেন পরিমিত পর্যায়ে থাকে। বেশি স্ট্রেসড হলে আমাদের নিত্যদিনের কাজ কর্মে ব্যাঘাত ঘটে। আবার অনেক সময় একদমই স্ট্রেস না থাকাটা আমাদের যেকোনো কাজে ডিমোটিভেট করতে যথেষ্ট। আমরা বলছি না প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে জোর করে স্ট্রেস আনতে হবে। অনেকেই আছেন যারা স্ট্রেসে থাকলে কাজ ভালো করেন। আবার অনেকে স্ট্রেসড না থাকলেই কাজে ভালো বোধ করেন। বিজ্ঞানীরা এই অপটিমাম স্ট্রেস লেভেল কে একটি গ্রাফের সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এখানে দেখানো হয় স্ট্রেস কিভাবে প্রোডাক্টিভিটি অর্থাৎ উৎপাদনের সাথে জড়িত। স্ট্রেস যত কম থাকে, “আরে ধুর, সমস্যা নাই, হয়ে যাবে, এত টেনশনের কিছু নাই” ইত্যাদি মনোভাব তৈরী হয়, অর্থাৎ মোটিভেশন কম থাকে, ফলে কাজ অথবা উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। আবার স্ট্রেস বেশি হলে “হায় হায় কী হবে” মনোভাব তৈরী হয়ে সমস্ত কাজটিকেই বিগড়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা গ্রাফটির মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই পরিমিত স্ট্রেস অনেক সময় একধরণের ভালো মোটিভেটর হিসেবে কাজ করে এবং ব্যক্তিকে প্রোডাক্টিভিটির দিকে ধাবিত করায়। পরিমিত স্ট্রেস আমাদের মধ্যে ঠিক যতটুকু টেনশন সৃষ্টি করে ঠিক ততটুকুই কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য মোটিভেট করতে থাকে। তখন আমরা কাজটি শুরু করি। সুতরাং বলা যায়, আমাদের জীবনে স্ট্রেস সম্পূর্ণ নেগেটিভ কোনো ফ্যাক্টরও নয়।

(৩)

পরীক্ষা তো কি? প্যারা নাই মামা!!

তুহিন পরীক্ষা নিয়ে মোটেও চিন্তিত  নয়। পরীক্ষা যতই কাছে আসছে সে ততই অনলাইনে থাকে। তুহিনের চিন্তায় বাসার সবাই অস্থির। মা বলেন – পড়াশোনা না করলে ছেলেটা ফেল করবে,আমি মানুষকে মুখ দেখাব কি করে!?  তাতে কি! সবার টেনশন তুহিন কে পড়ায় বসাতে পারে না। সে নিয়মিত ছবি আপলোডে ব্যস্ত। কতটা like আর react  হলো ছবিতে সে তা নিয়ে ব্যস্ত।পড়তে বসলে মনে হয় দুবছর তো আর কম পড়িনি। ভালো রেজাল্ট করতে একদিন পড়লেই হবে। So no tension, do furti।

ICT, Finance এ টেনেটুনে পাশ করেও ফাইনালে ভালো করার স্বপ্ন দেখে তুহিন। মা বাবা, বন্ধুরা যতই মোটিভেট করুক না, তাতে কোনো লাভ হয়নি।

পরীক্ষার আগে পড়লেই ভালো করা যাবে, তাই তুহিন মানসিক ভাবে কোনো চাপ অনুভব করছে না।

###উপরের গল্প গুলো থেকে বলা যায়, রাব্বি পরীক্ষা নিয়ে অনেক বেশি  চিন্তিত। সে High Stress level এ আছে। এ অবস্থায় সে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারছে না। বেশি ভালো করার চিন্তায়, স্বাভাবিক পড়ালেখাই চালিয়ে যেতে পারছে না।পরীক্ষার সময় অনেকের  এমন হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরীক্ষায়। যারা সব কিছুতে Stress নেয় বেশি, তাদের পক্ষে ভালো করে পড়ালেখা বা কাজ করা সম্ভব হয় না।

অপরদিকে, ইমা optimum stress level  এ আছে। এজন্য ইমার পক্ষে পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজ চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হয় না। মানসিক চাপ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।  পরিমিত মানসিক চাপ  মনোযোগ বাড়ায়। ফলে মানসিক চাপ যে কাজ করার ইচ্ছে আর ক্ষমতা বাড়ায় তা প্রমাণিত হয়ে যায়।

যদি কোনো চাপ না থাকে কাজ করার সময় তবে কোনো কাজই  ভালো করে করা সম্ভব হয় না। তুহিনের বর্তমান চাপ মুক্ত চিন্তা তাকে পড়ায় মনোযোগী করতে পারছে না। মোট কথা তুহিন যদি মানসিক ভাবে পরীক্ষার জন্য চাপ অনুভব করে, তাতে পড়াশোনায় মন বসবে। তুহিন Low Stress level এ আছে, তার পক্ষে ভালো করা সম্ভব হবে না

তাই সবশেষে বলা যায়, রাব্বি কে মানসিক চাপ কমাতে হবে ভালো করার জন্য।

ইমা যেটুকু চাপ বা টেনশনে আছে তা থাকাটাই ভালো।

আর তুহিনের জন্য চাপ নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

চাপ কমাতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমে যেসব বিষয়ে আমরা স্ট্রেস অনুভব করি দেখতে হবে সেগুলি কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় কিনা। এর মধ্যে না বলতে শেখা অন্যতম। যেগুলি আমাদের চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে সেগুলিকে না করার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই চাপমুক্ত থাকতে পারি। এমনকি যেই মানুষ আমাদের স্ট্রেসে ফেলে দেয় তাদেরও আমরা এড়িয়ে চলতে পারি যেমন পাশের বাসার আন্টি। চাইলেই আমরা আমাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করে স্ট্রেস কমাতে পারি। আমাদের স্ট্রেসের কারণ আমরা কারো সাথে শেয়ার করার মাধ্যমে বা যারা আমাদের স্ট্রেসের পরিমান বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের জানানোর মাধ্যমে চাপমুক্ত থাকতে পারি। টাইম ম্যানেজমেন্ট করেও চাপমুক্ত থাকা যায় কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সময়মত কাজ না শুরু করার ফলে আমরা চাপে পড়ে যাই। যদি কোনভাবেই স্ট্রেস এড়ানো না যায় তাহলে স্ট্রেসের সাথে মানিয়ে নিতে পারি। স্ট্রেসের কারণ বা স্ট্রেসর কে নিজের সাথে ইতিবাচকভাবে মানিয়ে নিতে হবে। যেমন পরীক্ষার টেনসনে পড়া হচ্ছে না কিন্তু এটাও চিন্তা করা যায় যে এখন পড়তে না বসলে পরীক্ষা এমনিও খারাপ হবে তাই সময়মত পড়তে বসা যাতে পরীক্ষার ফল ভাল হয়। স্ট্রেস থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে গান শোনা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুর সাথে সময় কাটানো , আপনার যে কাজ করে আনন্দ পান সেগুলো করতে পারেন। অবশেষে যদি স্ট্রেস থেকে মুক্ত হবার কোন উপায় না পাওয়া যায় তাহলে কোন থেরাপিস্টের শরাপন্ন হতে পারেন।

সাধ্যের মধ্যে মন ভালো করার  পথ আছে। নিজেকে ভালোবাসুন, জীবন সুন্দর হয়ে যাবে রাতারাতি!!

লিখেছেন: তাহমিনা সুলতানা ইভা

কনভার্সন ডিসঅর্ডার

Share

ঘটনাঃ জনাব শহিদুল আলম একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার পদমর্যাদার কারণেই তার উপর অনেক কাজের চাপ থাকে। গত কয়েক মাস যাবত প্রতিদিন তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে প্রচণ্ড ব্যাথা হত। দিনে দিনে ব্যাথার পরিমাণ এতোই বেড়ে গেলো যে তার জন্যে অফিসে বসে কাজ করাটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছিলো। এ সমস্যা নিয়ে তিনি একজন অর্থোপেডিকের শরনাপন্ন হলেন,অথচ ডাক্তারের পরীক্ষায় এবং মেডিকেল টেস্টে কোন সমস্যাই ধরা পড়লো না। আবার এদিকে তার পায়ের ব্যাথার অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিলো।একদিন সকালে ঘুম ভেঙে প্রতিদিনের মত বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে শহিদুল সাহেব টের পেলেন তিনি হাঁটুর নিচ থেকে তার বাম পা নাড়াতে পারছেন না। তৎক্ষণাৎ তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন এবারও ডাক্তারের পরীক্ষায় কিংবা টেস্টে সবকিছু স্বাভাবিক আসলো। অথচ শত টেস্ট,ঔষধ দিয়েও শহিদুল সাহেব তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের অংশে কোন অনুভূতিই ফিরে পাননি।

উপরের বর্ণনা করা করা ঘটনাটির পেছনে মুখ্য কারণ হতে পারে কনভার্সন ডিসঅর্ডার। কনভার্সন ডিসঅর্ডার হলো ব্যক্তির এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে তার ঐচ্ছিক পেশী এবং শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গসমূহতে এমন কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা যায় যা প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার কোন রোগের উপসর্গের সাথে মিলে না। অর্থাৎ,ব্যক্তি শারীরিক বিভিন্ন অসুবিধায় ভুগে থাকে অথচ শারীরিক উপসর্গগুলো প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার কোন রোগের সাথে মিলে না । এটিকে ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডারও বলা হয়ে থাকে। এ ডিসঅর্ডারটিকে ‘কনভার্সন’ ডিসঅর্ডার বলা হয় কারণ অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার মানসিক চাহিদা বা দ্বন্দ্বকে স্নায়বিক লক্ষণসমূহতে রূপান্তর করে থাকে। কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত আংশিক পক্ষাঘাত, অন্ধত্ব, বধিরতা- এ সকল সমস্যার বিষয়ে উল্লেখ করে থাকে। প্রকৃত শারীরিক সমস্যা থেকে এ ডিসঅর্ডারটিকে আলাদাভাবে নির্ণয় করা পারা চিকিৎসকদের জন্যেও অত্যন্ত কঠিন বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই আসল শারীরিক ব্যাধিই এবং কনভার্সন ডিসঅর্ডার আলাদাভাবে নির্ণয় করার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু আসল শারীরিক ব্যাধি এবং কনভার্সন ডিসঅর্ডারের উপসর্গের মাঝে অনেক মিল পাওয়া যায়, তাই চিকিৎসকেরা সাধারণ আসল ব্যাধির উপসর্গ এবং রোগীর বর্ণনা করা উপসর্গের মাঝে পার্থক্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন । এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা তার শারীরিক উপসর্গগুলোর কারণে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সাধারণত শৈশবের শেষের দিক থেকে তারুন্যের শুরুর দিকে এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়।এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্তের মাঝে পুরুষদের চেয়ে মহিলারা ২ থেকে ৩ গুণ বেশি ভুক্তভোগী হয়ে থাকে।

 

 

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার কারণসমূহ

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার মূল কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। সাধারণত মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস, দুঃশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, মানসিক দ্বন্দ্ব, ইমোশনাল ট্রমা কিংবা বিষণ্ণতা- এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ ডিসঅর্ডারের কারণে ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে দু;শ্চিন্তাজনক বা স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে পরিত্রাণ পায়।

দ্বিতীয়ত, এই উপসর্গগুলো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকলে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সে স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মস্তিষ্কের স্ট্রাকচারাল, সেলুলার কিংবা মেটাবলিক কার্যক্রমের পরিবর্তন বা বাধাপ্রাপ্ত হবার কারণেও শারীরিক উপসর্গগুলো দেখা যেতে পারে। এ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে যে শারীরিক উপসর্গগুলো দেখা যায় তা মুলত আসন্ন কোন আশংকাজনক পরিস্থিতি বা স্ট্রেস থেকে সাময়িক পরিত্রাণ পাবার জন্যে শরীরের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া । উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, একজন পুলিশ অফিসার যে প্রতিনিয়ত দাগী এবং ফেরারী আসামীদের নিয়ে কাজ করে, যাকে তার কাজের প্রয়োজনে আসামীর উপর গুলি চালাতে হয়। অথচ দেখা গেলো যে গুলি চালানো কিংবা কাউকে হত্যা করার কাজটি তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে তাকে হয়তো প্রায়ই এ কাজটি করতে হয়ে থাকে। দেখা যেতে পারে যে, যে পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যে তার শরীরের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া হিসেবে তার হাত অবশ কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। তখন এটি কনভার্সন ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচিত হবে।
অনেকে অনেক ক্ষেত্রে মনে করেন যে, আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো তার শারীরিক সমস্যার ব্যাপারে মিথ্যা বলছেন বা বানিয়ে বলছেন। তখন তাদেরকে জোরপূর্বক এ সকল প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বাধা দেয়া হয় অথবা তাদের কথায় গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে এটি কার্যকরী উপায় তো নয়ই বরং তা দূর্দশার সৃষ্টি করে থাকে। এর উপসর্গগুলো শারীরিক মুভমেন্ট এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিসমূহ

  • যে সকল ব্যক্তি এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে, তারা হলেন-
    ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি (এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত থাকে না)
  • পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি ( যে ব্যক্তি কিছু সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত আচরণ এবং অনুভূতি প্রকাশে অক্ষম)
  • আগে থেকে মৃগীরোগ, কিংবা মুভমেন্ট জনিত সমস্যা থাকা
  • সাম্প্রতিক সময়ে কোন গুরুতর শারীরিক আঘাত বা মানসিক আঘাত পাওয়া
  • সম্ভবত, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের ইতিহাস বা শৈশবে অবহেলার শিকার হওয়া
  • পরিবারে অন্য কেউ কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত থাকলে

কনভার্সন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হবার লক্ষণসমূহ
কনভার্সন ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো ঠিক কোন ধরণের পরিস্থিতিতে কার্যকর হয়ে উঠবে তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। এটি জীবনের যে কোন সময় কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। এ উপসর্গগুলো নিজে থেকে চালু বা বন্ধও করা যায় না। এ ডিসঅর্ডারের বিভিন্ন রকম লক্ষণ থাকে বা তা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে উপস্থাপিত হতে পারে যা অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গের প্রকটতার উপরও নির্ভর করে থাকে। এর উপসর্গগুলো শারীরিক মুভমেন্ট এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। উপসর্গগুলো একবার কিংবা স্ট্রেস তৈরিকারী পরিস্থিতি বারবার উপস্থাপিত হলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে ।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারের উপসর্গগুলোকে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে, যথা-
• ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণ
• মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণ
• খিঁচুনি

ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণ :
ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অন্ধত্ব বা টানেল ভিশন, সাময়িক বা সম্পূর্ণ বধিরতা, ত্বকে অনুভূতি লোপ পাওয়া বা হ্রাস পাওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা কথা বলতে না পারা।

মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণ:
মোটর কার্যক্রম জনিত লক্ষণের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো- শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে দূর্বলতা অনুভব করা, পক্ষাঘাত বা শরীরের কোন অংশে অনুভূতি না পাওয়া, শরীরের ভারসাম্যহীনতা, কোন কিছু গিলতে অসুবিধা হওয়া বা গলায় কিছু আটকে আছে তা মনে হওয়া ইত্যাদি।

খিঁচুনি:
ব্যক্তির খিঁচুনির সাথে উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ শারীরিক প্রক্রিয়া দেখা যায় না। এক্ষেত্রে ব্যক্তির খিঁচুনির পাশাপাশি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে পড়ে।

উপরোক্ত তিনটি শ্রেণির সংমিশ্রণে কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে যা ব্যক্তির জন্যে কষ্টদায়কও হতে পারে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডার নির্ণয়ের উপায়সমূহ

কনভার্সন ডিসঅর্ডার মূলত Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders এর মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ণয় করা যায়। এ সকল উপায়সমূহ হলো-

  • শারীরিক মুভমেন্ট এবং ইন্দ্রিয়জনিত লক্ষণগুলো নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারা
  • নির্দিষ্ট স্ট্রেসজনিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই শারীরিক প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা দেয়া
  • শারীরিক লক্ষণগুলো চিকিৎসাগতভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা
  • শারীরিক লক্ষণসমূহ দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত করা
  • এছাড়াও ব্যক্তির কনভার্সন ডিসঅর্ডারের লক্ষণসমূহ নিশ্চিত করার জন্যে প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান,এক্স রে, ইলেক্ট্রোয়েনসেফালোগ্রাম, রক্তচাপ পরীক্ষা করা যেতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?

উপরে বর্ণিত লক্ষণগুলো যদি ব্যক্তির বর্ণনা করা লক্ষণের সাথে মিলে যায়, তবে সে ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এছাড়াও উক্ত লক্ষণগুলো আসলেই কোন শারীরিক বা স্নায়বিক গুরুতর সমস্যার কারণেও দেখা যেতে পারে বিধায় দেরি না করে তা নির্ণয় করে নেয়া উচিত। যদি নির্ণয় করার পর দেখা যায় যে, এটি একটি কার্যকরী নিউরোলজিক ব্যাধি, তবে তাৎক্ষণিক গৃহীত ব্যবস্থা ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলির অবস্থা উন্নত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে সমস্যাগুলি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারের কারণে সৃষ্ট জটিলতা

যদি উপযুক্ত সময়ে সঠিকভাবে কনভার্সন ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা না করা হয়, তবে সে সকল লক্ষণগুলো স্থায়ী হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা

সাধারণত বিভিন্ন ক্লিনিকগুলোতে এ ডিসঅর্ডারের চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রধানত রোগের পেছনে দায়ী থাকা স্ট্রেসজনিত পরিস্থিতিটিকে খুঁজে বের করা হয়। এছাড়াও থেরাপিস্ট এ ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলোর প্রকটতা কমিয়ে আনার জন্যে রোগীকে উপযুক্ত ইতিবাচক প্রণোদনা দিয়ে থাকেন যার ফলে রোগী স্ট্রেসজনিত পরিস্থিতিতে এ ধরনের উপসর্গের দ্বারা আক্রান্ত না হয়। এছাড়াও ব্যক্তিতে যে সকল থেরাপি দেয়া যেতে পারে, তা হলো-
• সাইকোথেরাপি
• ফিজিক্যাল থেরাপি (এটি স্ট্রেসজনিত পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট পেশীজনিত দৃঢ়তা বা খিঁচুনিকে শিথিলায়নে সহায়তা করে)
• গ্রুপ থেরাপি
• বায়োফিডব্যাক
• হিপোনসিস বা সম্মোহন থেরাপি
• রিল্যাক্সেশন থেরাপি এবং
• সাইকোট্রপিক মেডিকেশন বা ঔষধ সেবন (ডিসঅর্ডারের কারণে সৃষ্ট বিষণ্ণতা এবং উদ্বিগ্নতা দূর করতে সাহায্য করে)
উপরে উল্লেখিত উপায়গুলোর মাধ্যমে সহজেই কনভার্সন ডিসঅর্ডারকে নিরাময় বা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়ে থাকে।

কনভার্সন ডিসঅর্ডারের প্রতিরোধ

এটি সবসময় সব রোগের ক্ষেত্রেই সত্য যে, রোগ নিরাময় অপেক্ষা তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সর্বাধিক কাম্য। কনভার্সন ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়। কনভার্সন ডিসঅর্ডার প্রতিরোধের প্রাথমিক উপায় হলো স্ট্রেসজনিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবার উপায় খুঁজে বের করা এবং যথাসম্ভব উপায়ে মানসিক আঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা। এছাড়াও আর যে উপায়ে এ ডিসঅর্ডারটি প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা হলো-
• যে কোন মানসিক ব্যধিতে আক্রান্ত হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা
• ভালো কাজ করা এবং জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা
• সকলের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা এবং তা বজায় রাখার চেষ্টা করা
• একটি নিরাপদ ও শান্ত পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করা

উপরে উল্লেখ করা অনেক পরিস্থিতিই হয়তো আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব এসকল বিষয়গুলোকে কার্যকরীভাবে মোকাবেলা করা উচিত কারণ যারা এসকল ব বিষয়গুলোকে কার্যকরীভাবে মোকাবেলা করতে পারে তারা অনেকাংশেই তাদের চাইতে ভালো থাকে যারা বিরূপ পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে অক্ষম। সর্বোপরি, চাপ এবং মানসিক আঘাত হ্রাস করা কনভার্সন ডিসঅর্ডার প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।

অতএব, আমাদের জীবনে নানা ধরনের স্ট্রেস বা উদ্বেগজনিত পরিস্থিতি আসতেই পারে। এসকল পরিস্থিতি উপযুক্ত উপায়ে মোকাবেলা করা অথবা সময় থাকতেই কনভার্সন ডিসর্ডারের কোন লক্ষণ দেখা দিলে উপযুক্ত থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচত। আপনার সঠিক সময়ের একটি সঠিক পদক্ষেপ এ ডিসঅর্ডারে ফলে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তি দিতে পারে এবং আপনার আগামীকে করে তুলতে পারে আরো সুন্দর, স্বাভাবিক ও আনন্দময়।

লিখেছে – অধরা।

কাউন্সিলিং সাইকোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট: কখন কাকে প্রয়োজন?

Share

প্রফেশনাল সাইকোলজিস্টরা কেউ নিজেদের পরিচয় দেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হিসেবে, আবার কেউ পরিচয় দেন কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট হিসেবে। এদের মধ্যে পার্থক্য কী? মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য কার কাছেই বা যাবেন?
প্রথমে বলে নেয়া উচিত দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হতে যেমন এম. ফিল ডিগ্রি নেয়া আবশ্যক, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট হতে গেলেও তা আবশ্যক।

পার্থক্য বোঝার সুবিধার্থে শব্দদুটির মূলের দিকে তাকানো যাক। ক্লিনিক্যাল শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক ক্লাইন শব্দ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে বিছানা। অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের কাজ হচ্ছে শয্যাশায়ী, আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে গুরুতর অসুস্থদের চিকিৎসা করা।

স্কিৎজোফ্রেনিয়া, ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন জাতীয় রোগ যেগুলো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে একেবারে থামিয়ে দেয়, এগুলোই হচ্ছে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের ক্ষেত্র। বিভিন্ন মানসিক রোগের চিহ্নিতকরণ, চিকিৎসা, গবেষণা সংক্রান্ত কাজ করেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা। এজন্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাওয়া যায় বিভিন্ন মেন্টাল ইনস্টিটিউটে।

অন্যদিকে কাউন্সেলিং শব্দটি এসেছে ল্যাটিন কনসুলেয়ার হতে, যার অর্থ পরামর্শ দেয়া (উল্লেখ্য, কনসাল্ট শব্দটির উৎপত্তিও এখান থেকে)। ঐতিহাসিকভাবে, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টদের কাজ ছিল মানুষকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া। স্ট্রেস, সামাজিক সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত নিতে জটিলতা এসব ক্ষেত্রে সাহায্য দিয়ে থাকেন কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টরা। অর্থাৎ এই সেবা গ্রহণকারীরা নেসেসারিলি অসুস্থ নন। কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টরা কাজ করেন মানসিক রোগ প্রতিরোধে। মোটা দাগে তাঁদের কাজ হচ্ছে একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করা। এ কারণে উন্নত বিশ্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস প্রভৃতি জায়গায় কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এর প্র্যাকটিস শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টদের সাধারণ কাউন্সেলরদের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। একজন কাউন্সেলর শুধুই কাউন্সেল দেন। কাউন্সেলর হতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। মানুষের কথা শোনার ক্ষমতা থাকতে হয় এবং সেই সাথে সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে নিলেই যথেষ্ট। আর কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টরা হচ্ছেন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কাজের পরিধি ব্যাপক।
বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টদের কাজে ওভারল্যাপিং হয় প্রচুর। কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টরাও রোগ শনাক্ত করেন, সাইকোথেরাপি দিয়ে থাকেন। মানসিক রোগ সংক্রান্ত গবেষণায় ভূমিকা রাখেন। আবার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাও রোগীদের কাউন্সেল দেন। এ কারণে আজকাল অনেকে প্রস্তাব করছেন এ দুটি বিষয়ের পার্থক্য তুলে দিতে।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ, উভয়েই এম. ফিল ধারী। কখন কার কাছে যেতে হবে সেটি নির্ভর করে মানসিক সমস্যার প্রকটতার ওপর। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঠিক রাখতে অথবা শুধু পরামর্শ নিতে হলেও সাইকোলজিস্টদের কাছে যাওয়ার প্রচলন বাড়ানো উচিত।

লেখা: যারিন আনজুম কথা।

ব্যক্তিত্বের ধরণ

Share

personality-itsok-nujhat

কোন মানুষের কথার ধরণ, চালচলন বা আচার ব্যবহার দেখে আমরা বলে উঠি ‘বাহ! উনি তো বেশ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ!’ আসলে এই ব্যক্তিত্ব টা কি?

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যক্তিত্ব হলো প্রত্যকটি মানুষের আলাদা রকমের চিন্তার ধরণ,আচরণ এবং অনূভুতি৷ তা হলে আমরা বলতে পারি প্রত্যেকটি মানুষ একেক রকমের ব্যক্তিত্বের অধিকারী৷ তো এই ব্যক্তিত্বের ধরণ কার্ল ইয়াং ৩টি ডাইমেন্সনে ভাগ করেন৷ প্রত্যকটি ডাইমেন্সন আবার ২ ভাগে বিভক্ত:

১/ প্রকাশের ধরণ :

ক) এক্সরোভার্টেড(E)

খ) ইন্ট্রোভার্টেড(I)

এক্সরোভার্টেড মানুষ মিশুক হয়, তারা খুব সহজেই মানুষের সাথে ভাব জমাতে পারে৷ অন্যদিকে, ইন্ট্রোভার্টেডরা নিজেদের মত থাকতে পছন্দ করে , কোলাহল তাদের অপছন্দ৷

২/ উপলব্ধির ধরণ:

ক) সেন্সিং(S)

খ) ইন্টিউশন(N)

যাদের তথ্য উপলব্ধি তাদের ৫টি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে করে , ফ্যাক্ট আর ডিটেল অনুযায়ী পারসিভ বা উপলব্ধি করে তারা সেন্সিং এর মাধ্যমে পারসিভ করে৷ অপরদিকে, যারা তথের প্যাটার্ন ,প্রভাব বা অর্থের প্রাধান্য দেয় তারা ইন্টিউশনে অন্তর্ভুক্ত৷

৩/ বিচারের ধরণ:

ক) চিন্তা (T)

খ) অনূভুতি(F)

যারা যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় তাদের চিন্তা বা থিংকিং ধরণে ফেলা যায়৷ ইমশন বা আবেগ দিয়ে যারা সিদ্ধান্ত নেয় কোন যুক্তি ছাড়াই তাদের ফিলিং বা অনূভুতি ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়৷

ইসাবেল ব্রিগস ম্যায়ার ইয়াং এর ৩টি ডাইমেন্সানের সাথে আরেকটি যোগ করেন৷ মানুষের জীবন চলনের উপর ২ ভাগে ম্যায়ার ভাগ করেন৷

জাজিং(J)  ভারসেস পারসিভিং(P)৷

যারা তাদের জীবনের লক্ষ অনুযায়ী কাজ করতে থাকে এবং কোন ধরণের পরিবর্তন আনতে নারাজ তারা জাজিং এ অন্তর্ভুক্ত৷ এবং যারা ফ্লেক্সিবাল ভাবে তাদের জীবন লক্ষের দিকে এগিয়ে যায় তারা পারসিভিং ধরণের৷ পারসিভিং ধরণের মানুষ একটি বিকল্প প্ল্যান তৈরী রাখে৷

এই ৪ ডাইমেন্সনের ব্যাক্তিত্বের ধরণ বিন্যাস করলে ১৬ ধরণের ব্যাক্তিত্ব পাওয়া যায়৷ তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেয়া হল:

১/ ISTJ(The Duty Fulfiller):  এই ধরণের মানুষগুলো গোছানো, পরিশ্রমী এবং তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে নিরবে কাজ করে যায়৷ তারা খুবই দায়িত্ববান , অন্যের উপর নির্ভরশীল,খুবই মনোযোগী এবং নাছড়বান্দা হয়৷ শান্তশিষ্ট পরিবেশে থাকতে তারা পছন্দ করে৷

২/ ISTP(The Mechanic): এইসব মানুষ ‘কি’ এবং ‘কেন’ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ব্যস্ত থাকে৷ তারা সাধারণত চুপচাপ,নিজেকে গুটিয়ে রাখে, রিস্ক নিতে পছন্দ করে এবং বর্তমান নিয়ে বাঁচে৷ বন্ধুদের সাথে বিশ্বস্ত হলেও তারা নিজের লক্ষে পৌছানোর জন্য নিয়ম ভাঙ্গে৷ তারা মেকানিকাল কাজে প্রচুর দক্ষ৷

৩/ ISFJ(The Nurturer): তারা চুপচাপ,সদয়,ন্যয়বান,বাস্তববাদী এবং সংস্কৃতিমনা৷ অন্যের কষ্ট তারা তীব্রভাবে অনুভব করে এবং পরোপকারী৷

৪/ ISFP(The Artist): এইধরণের মানুষ সংবেদনশীল, গম্ভীর, শান্ত, বিশ্বস্ত হয়৷ তারা খুবই শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং ঝামেলামুক্ত থাকার চেষ্টা করে৷ নান্দনিক সৌন্দর্যের কদর খুব ভাল ভাবে করে , তারা মুক্তমনা ,বর্তমানে বাঁচে এবং স্বাধীনচেতা৷

৫/ INFJ(The Protector): তারা প্রভাবশালী, সংবেদনশালী এবং অন্যের প্রতি অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন থাকে৷ নিজের আদর্শে সবসময় লেগে থাকে৷একটা কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা হাল ছাড়ে না৷

৬/ INFP(The Idealist): তারা শান্ত, আদর্শিক, চিন্তাশীল, খুবই বিশ্বস্ত৷ সাধারণত তারা ভাল লেখক৷ নিজের আদর্শে চলে, তারা মানুষের পরিস্থিতি খুব ভাল বুঝে এবং পরোপকারী৷ তারা সম্ভাবনা হিসেবে পটু৷

৭/ INTJ(The Scientist): তারা স্বাধীনচেতা, বিশ্লেষণাত্মক, সংকল্পিত, কর্মদক্ষ এবং জ্ঞানের মূল্যায়ন করে৷ দীর্ঘ পরিসরে চিন্তা করে৷তাদের কর্মক্ষমতা খুবই ভাল এবং তারা ন্যাচারাল লিডার৷

৮/ INTP(The Thinker): যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, চুপচাপ ,নিজেকে গুটিয়ে রাখে ৷ নতুন আইডিয়ায় তারা খুবই উদ্দীপ্ত হয়৷ তারা জ্ঞান, কর্মদক্ষ এবং যুক্তির কদর করে৷ কোন কিছুর ব্যাখা তারা খুব ভাল বুঝে৷

৯/ ESTP(The Doer): তারা ফ্রেন্ডলি, কাজ ওরিয়েন্টেড এবং অনুকূল পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে৷ তারা অধৈর্যশীল, তাই তাদের কোন কাজের রেজালটের জন্য অপেক্ষা করা কষ্টকর৷ বন্ধুদের প্রতি খুব বিশ্বস্ত কিন্তু কোন কাজ হাসিলের জন্য তারা বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে৷

১০/ESTJ(The Guardian): তারা প্র্যাক্টিকাল, গোছানো, এ্যাথলেটিক৷ তাদের থিউরি তে আগ্রহ কম যদি না প্র্যাক্টিকালী প্রয়োগ করা যায়৷ তারা বিশ্বস্ত, পরিশ্রমী, এবং নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করে৷ একজন ভাল নাগরিক হিসেবে তাদের সুনাম আছে৷

১১/ ESFP(The Performer): মানুষের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে৷ অন্যের জন্য তারা পার্ফম করে আনন্দ পায়৷ তারা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পছন্দ করে ,পরোপকারী এবং নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায়৷

১২/ ESFJ(The Caregiver): তারা পরের স্বার্থে ঝাপিয়ে পরে নিজেরদের চিন্তা না করে৷ তারা নিজেরদেরকে অন্যের প্রতি দায়িত্ববান মনে করে৷ নিজেরদের ভালো লাগার জন্য তাদের পজিটিভ রেইনফোর্সমেন্ট দরকার হয়৷

১৩/ ENFP(The Inspirer): তারা উদ্যমী ,আদর্শবাদী ,সৃজনশীল, মুক্তমনা৷ নতুন আইডিয়ায় তারা উদ্দীপ্ত হয় কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ কাজে বিরক্ত হয়৷

১৪/ ENFJ(The Giver): খুব ভাল মিশুক, সংবেদনশীল, একা থাকতে অপছন্দ করে৷ অন্যরা তাকে নিয়ে কি ভাবলো তা নিয়ে চিন্তিত থাকে৷ সবকিছু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে৷ তাদের সোশ্যাল ম্যানেজিং স্কিল চমৎকার৷ তারা পরোপকারী৷

১৫/ ENTP(The Visionary): তারা সৃজনশীল, বুদ্ধিদীপ্ত৷ ডিবেট করে তারা আনন্দ পায় ,নতুন আইডিয়ায় উদ্দীপ্ত হয় কিন্তু রুটিন ওয়ার্ক তাদের পছন্দ নয়৷ তারা স্পষ্টভাষী, মানুষের সঙ্গে থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে৷ কোন কিছুর যুক্তিসঙ্গত সমাধানে তারা পারদর্শী৷

১৬/ ENTJ(The Executive): তারা স্পষ্টভাষী, জিদপূর্ণ, বুদ্ধিমান, পাবলিক স্পিকিং এ ভাল৷ তারা নেতৃত্বের অধীনে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে এবং অনিয়ম সহ্য করে না৷ এই ধরণের মানুষ জ্ঞান ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করে৷

পৃথিবীর সব মানুষ উপরের ১৬টির কোন না কোন ব্যাক্তিত্বের অন্তর্ভুক্ত৷ এই ব্যাক্তিত্বের ধরণেই একটি মানুষকে ডিফাইন করে৷

লিখেছেন – নুজহাত জাহানারা

পাগলামির ইতিহাস

Share

আদিম যুগ

 আদিম যুগে মানুষ শারীরিক ব্যাধি আর মানসিক ব্যাধির মধ্যে কোন পার্থক্য জানত না।তখন মনে করা হতো এক অশরীরী শক্তি মানুষ, প্রানী, এবং বস্তুগুলোর মধ্যে থেকে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রন করে।তখন শারীরিক ও মানসিক রোগগুলোকেও ঐসব অতিপ্রাকৃতিক শক্তির কাজ বলে মনে করা হত।

অতিপ্রাকৃতিক শক্তি দু রকম ছিলঃ ভাল এবং মন্দ (অনেকটা ফেরেশতা ও শয়তানের মত)।ভাল শক্তি কে বলা হত ঈশ্বরের দান হিসেবে আর মন্দ শক্তিকে বলা হত  ‘দানব’ ( প্রেত/ভূত)।মানুষ যখন খারাপ কাজ করত তখন ঈশ্বর তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ভূতকে পাঠাতেন অভিশাপ হিসেবে।এসব বিশ্বাস কে বলা হত প্রেততত্ত্ব।প্রস্তর যুগে মানুষের রোগ ব্যাধি সম্পর্কে এ ধরনের বিশ্বাস প্রচলিত ছিল বিভিন্ন দেশে যেমন-হিব্রুদের মধ্যে, মিশরীয়দের মধ্যে, প্রাচীন গ্রীসে এবং চীন দেশে।

ক্রমশঃ প্রেততত্ত্ব শারীরিক ব্যাধির চেয়ে মানসিক ব্যাধির সঙ্গে বেশি অনুষঙ্গবদ্ধ হয়ে পড়ে ।অর্থাৎ লোকেরা ভূত- প্রেতকে মানসিক ব্যাধির জন্য বেশি দায়ী করে।কিন্ত শারীরিক ব্যাধির জন্য ভূত- প্রেতকে এতটা দায়ী করতো না।যে শারীরিক ব্যাধিতে ভুগছে সে কষ্ট পাচ্ছে,কিন্ত তার চেতনা বা মস্তিষ্ক ঠিক আছে বলে সে চিকিৎসকের কাছে সাহায্য চাইতে পারে।যদিও অনেক আদিম সমাজে শারীরিকভাবে ব্যাধিগ্রস্তদের ও ভয়ের চোখ দেখা হত।কারন শারীরিক ব্যাধি অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং সমস্ত গোষ্টীকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।অবশ্য শারীরিক ব্যাধিগ্রস্তের প্রতি দয়া বা অনুকম্পা হত এবং গাছ –গাছড়া থেকে প্রস্তুত ঔষধের মাধ্যমে তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা হত।কিন্তু যেহেতু মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যাক্তি নিজের অসুখ বুঝতে পারে না, সেজন্য সে সাহায্য চায় না অথচ অদ্ভুত আচরন করে।সেজন্য আদিম সমাজের মানুষ মানসিক রোগীদের ভয় পেত এবং ভয়ের ফলে মানসিক রোগ সম্পর্কে তাদের মনে নানা রকম অলীক বা আজগুবি ধারনা সৃষ্টি হয়েছিল।সে মনে করত কেবল মাত্র একটি অসাধারন সত্তা-যেমন ভূত-প্রেতই একটি অদ্ভুত আচরন সৃষ্টি করতে পারে। প্রেত তত্ত্বে দুটি উপাদানের সংমিশ্রনে ঘটেছে – একটি হল অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ্বাস এবং অন্যটি হল ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যার ধারনাটি ছিল এই যে, যারা প্রেত দ্বারা অধিকৃত বা আশ্রিত সত্তা ( যেমন ভূত- প্রেত এর সাহায্য কাজ করে এবং এগুলো প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে নিয়মমত ঘটতে বাধা দেয়)আর ডাকিনীবিদ্যার  (যাদুবিদ্যার) ধারনাটি ছিল এই যে, যারা প্রেত দ্বারা অধিকৃত বা আশ্রিত হয় তারা প্রেতের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের অনিষ্ট করতে পারে।এদের বলা হত যাদুকর বা ডাইনি।অনেকেই মনে করতো যে, প্রেতাত্মারা অসুস্থ ব্যাক্তির সঙ্গে যোগসাজস করে ডাইনিকে যাদু শক্তিকে দিতে পারে।

প্রস্তর যুগের প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন, বাইবেল ও অন্যান্য পুস্তকাদি থেকে প্রামান পাওয়া যায় যে, সেই যুগে মানসিক ব্যাধির জন্য প্রেতের আশ্রয় করাকে দায়ী করা হতো।প্রস্তর যুগের মানুষের মাথার খুলি থেকে এ ধরনের প্রমান পাওয়া গেছে।কিছু কিছু মাথার খুলিতে একটি গোলাকৃতি ছিদ্র পাওয়া গেছে।এতে মনে হয় যে, মানুষের  মাথার খুলিতে ছিদ্র করা হতো।তখনকার বিশ্বাস ছিল যে, প্রেতগ্রস্ত মানুষের মাথায় যে প্রেতাত্মা প্রবেশ করেছে সেটি ঐ ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে যাবে।এ ধরনের অপারেশনের পর কিছু রোগী বেঁচে যেত-যার প্রমান পাওয়া যায় ছিদ্রের ধারের হাড়গুলো মোটা হয়ে যাওয়ার ফলে।অনেক রোগী হয়ত ভাল হয়ে যেত।বিশেষ করে যাদের মাথার খুলিতে বেশি চাপ থাকতকিন্তু এটা হয়ে থাকলে বুঝতে হবে যে এক উদ্দেশ্যের জন্য কাজ করে অন্যধরনের ফল পাওয়া।এধরনের ঘটনা চিকিৎসা শাস্ত্রে আরো অনেকবার ঘটতে দেখা গেছে।

যেমন, বিংশ শতাব্দীতে বৈদ্যুতিক আঘাতের দ্বারা অনেক মানসিক রোগীর চিকিৎসা করে ভাল ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু  যারা এটির আবিষ্কার করেছিলেন তারা এর কার্যকারিতা সম্বন্ধে যে ব্যাখ্যা দিতেন তা গ্রহনযোগ্য নয়।ঠিক তেমনিভাবে –মনোচিকিৎসা বা সাইকোথেরাপির কার্যকারিতা চিকিৎসা পদ্ধতির চেয়ে বরং মনোবিজ্ঞানীর ব্যক্তিত্বের উপরে বেশি নির্ভর করে।

বাইবেলের অনেক উক্তি অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানের ইতিহাস রচয়িতাদের আগ্রহ সৃষ্টি করে । বাইবেলে মানসিক রোগের জন্য অতিপ্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করা হয়েছে। যেমন “ ঈশ্বর তোমাকে উন্মাদ করে, অন্ধ করে এবং হ্রদস্পন্দন বন্ধ করে তোমাকে  সজোরে হঠাৎ আঘাত করবেন”

খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীর সাহিত্যে দেখা যায় ঈশ্বর এক প্রেতাত্মাকে পাঠীয়ে আত্মা কে তার অবাধ্যতার জন্য শাস্তি দিয়েছিলেন। আত্মা উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, বস্ত্র পরিত্যাগ করেছিলেন এবং তার ছেলেকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।‘ পাগলামির ভান করে ডেভিড তার শত্রুদের থেকে বাঁচতে পেরেছিলেন কারন তারা মনে করেছিল যে তার লক্ষণগুলো ঈশ্বরের কৃপায় হয়েছে এবং সেজন্য তাকে সম্মান করা উচিত।এমন কি গ্রীক সভ্যতার যুগেও মৃগী রোগকে পবিত্র রোগ বলে মনে করা হত। এ রোগের লক্ষনকে মনে করা হতো দেবতা কর্তৃক সম্মানের চিহ্ন হিসেবে। ব্যবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার এর ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল যে তিনি একটি বন্যগরু এবং তিনি ঘাস খেতেন। কথিত আছে যে যীশু খ্রিস্ট যাদু মন্ত্রের সাহায্যে একজন ব্যক্তির শরীর থেকে শয়তানদের তাড়িয়ে ছিলেন।সাধারনভাবে বলতে গেলে মানসিক ব্যাধির  জন্য যে ধরনের প্রেতাত্মাকে দায়ী করা হত, তার চিকিৎসা ও ঠিক করা হতো সেই অনুসারে। যদি প্রেতাত্মা কে ভাল বলে মনে করা হতো তাহলে আশ্রিতকে সম্মান করা হতো, আবার যদি প্রেতাত্মা শয়তান হতো বা খারাপ হতো, তাহলে হয়তো দেবতাদের স্তব করা হতো প্রেতাত্মাকে সরিয়ে নেয়ার জন্য, অথবা ঝাড়- ফুঁক হতো,আবার কঠোর শাস্তি দিয়ে শয়তান তাড়ানো হতো।আদিম যুগ শেষ হওয়ার শত শত বছর পরেও মধ্যযুগ পর্যন্ত এসব বিশ্বাস টিকে ছিল।মধ্যযুগে কঠোর শাস্তির সঙ্গে কিছু মৃদু ব্যবস্থা ও প্রচলিত ছিল।আশ্রিত বা ভূতে পাওয়া ব্যক্তিকে কিছু পবিত্র বস্তু স্পর্শ করতে দেয়া হতো,তাদের কানের কাছে তীব্র শব্দে বাদ্য বাজানো হতো, নাকে দুর্গন্ধ প্রবেশ করানো হতো (যেমন লঙ্কা পুড়িয়ে ঝাঁজ দেয়া)এবং সঙ্গে সঙ্গে একজন ওঝা /পুরোহিত শয়তানের চিত্তের উপর লাঠি বা ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করতেন।তারা বিশ্বাস

করতেন যে, এভাবে ভয় দেখানো হলে প্রেতাত্মা রোগীর দেহ ছেড়ে পালাবে।এতে কাজ না হলে শুরু হতো কঠীন শাস্তি।যেমন চাবুক মারা, উপবাস করতে বাধ্য করা, অত্যাচার করা-এমন কি হত্যা করা হতো।যে কোনভাবেই হোক ভূত- প্রেতকে তাড়াতেই হবে।এটা একদিকে যেমন ছিল শাস্তি, আবার অন্যদিকে ছিল করুণা –কারন এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে প্রেতাত্মার অধিষ্টান থেকে মুক্ত করা হতো।এই যুক্তিতেই মধ্যযুগে ডাইনিদের পুড়িয়ে মারা হতো

গ্রীক ও রোমান অভিজ্ঞতাবাদের উত্থান

খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ৬০০ বছরের মধ্যে বিজ্ঞানে প্রভুত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এর ফলে মানসিক রোগীদের পর্যবেক্ষণ, তাদের লক্ষনগুলোর অর্থবোধ করা এবং চিকিৎসায় প্রচুর উন্নতি হয়।প্রথমে গ্রীসে ও পরে রোমের জনসাধারণ পূর্বেকার কুসংস্কারগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকেন। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ভাবে সফল হতে পারেন নি।কারন তারা নিজেদের পক্ষপাত দোষ থেকে মুক্ত হতে পারেননি।কিন্তু তা সত্ত্বেও, তারা যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। সেই যুগটা শুরু হয় হিপোক্রেটিস (৪৬০-৩৭৭ BC) এর অবদানের মধ্য দিয়ে। হিপোক্রেটিসকে চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক বলা হয়। তিনিই সর্ব প্রথম মনো বিকৃতির গবেষনা ও ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞতা ভিত্তিক এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি প্রচলন করেন। মানসিক রোগ সম্পর্কে অতিপ্রাকৃত ব্যাখার মূলে তিনি আমূল পরিবর্তন করেছিলেন।মৃগী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় এ রোগটি অন্যান্য শারীরিক রোগের চেয়ে বেশি বা কম পবিত্র ও স্বর্গীয় নয়।কিন্তু প্রত্যেকটি রোগের প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে-যা থেকে রোগটি সৃষ্টি হয়। আপনি যদি এসব রোগীর মাথার খুলি কেটে ভিতরে দৃষ্টিপাত করেন, তাহলে দেখবেন, মস্তিষ্কটি আর্দ্র, ঘামে বোঝাই এবং এর থেকে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে।এ থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে, শরীরে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় বা শরীরকে যে কষ্ট দেয় সে কোন একটি দেবতা নয়,বরং একটা রোগ।

হিপোক্রেটিস এর ব্যাধির কার্যকারণ সম্পর্কিত তত্ত্ব ছিল সহজ। তিনি মনে করতেন, মানসিক ব্যাধি শুধুমাত্র মস্তিষ্কের রোগ বা ক্ষয়ক্ষতি, মস্তিষ্কে আঘাত, অথবা হিউমার বা পিত্ত রসের আধিক্যের জন্য সৃষ্টি হয়। এই তত্ত্বই ব্যক্তিত্বকে কতকগুলো টাইপ বা শ্রেনীতে ভাগ করা হয়।এই তত্ত্ব অনুসারে ব্যক্তিত্বের বিকৃতি এবং আবেগের গোলযোগ হল স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পরিমাণগত অধিক্য। হিপোক্রেটিস মানসিক ব্যাধির যে শ্রেনী বিন্যাস করেছিলেন তাহলোঃ মৃগীরোগ, ম্যানিয়া বা উত্তেজনা, মেলাঙ্কেলিয়া বা বিষন্নতা এবং মানসিক অবনতি ।এটা ছিল সুচনা।তারপর থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণকে একটি  সমন্বিত বা সামগ্রিক পদ্ধতির মধ্যে এনে শেনিবিভাগ করার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। মনোচিকিৎসা শাস্ত্রে হিপোক্রেটিস এর অবদানগুলো এই রকমঃ

১।তিনি সর্ব প্রথম মানসিক ব্যাধির প্রাকৃতিক এবং জৈবিক কারনের কথা বলেন।

২।তিনি শারীরিক গঠনের সঙ্গে মেজাজ ও ব্যাক্তিত্বের  সম্পর্ক দেখান।

৩।তিনি কতকগুলো মানসিক রোগের (যেমন- মৃগীরোগ,বিষন্নতা রোগ, উদ্বেগ )উৎপত্তি, বিকাশ ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন।

৪।তিনি মানসিক রোগের প্রথম শ্রেনীবিভাগ করেন

৫।তিনি মনে করতেন যে, হিস্টিরিয়া – যা একটি নিউরোসিস জাতীয় ব্যাধি হিসাবে ইতিপূর্বে ছিল, প্রকৃত পক্ষে জরায়ুর স্থান পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট একটি শারীরিক ব্যাধি। এবং এটা শুধু স্ত্রী লোকদের মধ্যে দেখা দেয়।এই ধারনাটি প্রায় ২০০০ বছর পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

৬।তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রক্তমোক্ষন পদ্ধতি উপকারী নয়।তিনি আরও লক্ষ্য করেছিলেন যে, শারীরিক ব্যাধি সৃষ্টি হলে মানসিক ব্যাধি সাময়িকভাবে উপশম হয়।

৭। হিপোক্রেটিস এর আরেকটি অবদান ফ্রয়েডের স্বপ্ন তত্ত্ব কে আঁচ করতে পেরেছিল। হিপোক্রেটিস বলেছিলেন যে, স্বপ্ন হলো জাগ্রত অবস্থার বাস্তবতার নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোর প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন।

হিপোক্রেটিস এর মৃত্যুর পর বৈজ্ঞানিক চিন্তার মৃত্যু ঘটে এবং অস্বাভাবিক আচরন সংক্রান্ত আলোচনা দার্শনিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।প্লেটোর দর্শন মনোবিজ্ঞানকে বিতর্ক ছাড়া কিছুই উপহার দেয়নি। প্লেটো বলতেন মনই চরম সত্য, এবং অন্যসব বস্তু মনের প্রতিরুপ।প্লেটো মন বা আত্মাকে দুটি ভাগে ভাগ করেন।একটি হল যুক্তি বুদ্ধি সম্পন্ন আত্মা, আরেকটি হল অযৈাক্তিক আত্মা থেকে সৃষ্টি হয় আমাদের ক্রোধ, কাম, ভীতি,  আশা, বেদনা, ও আনন্দ। যৈাক্তিক আত্মার সাথে অযৈাক্তিক আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে অযৈাক্তিক আত্মা প্রাধান্য বিস্তার করে।সুতরাং মানসিক ব্যাধি হল অযৈাক্তিক মনের কাজ।সুতরাং চিকিৎসা হল দার্শনিক উপদেশ দানের মাধ্যমে তার যৈাক্তিকতা ফিরিয়ে আনা।

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে আরেকজন লেখক সেলসাস, তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারনা তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীকালে, বিংশ শতাব্দীতে এসে পূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে।ধারনাটি ছিল এই যে, মানসিক ব্যাধি ব্যাক্তির শরীরের কোন একটি অঙ্গকে প্রভাবিত করে না বরং সমস্ত ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য অমানবিক ও নিষ্টুর ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন যা তখনকার দিনের প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। মধ্যযুগ যতই অগ্রসর হতে থাকে, মানসিক ব্যাধিকে ততবেশি করে ‘পাপ” হিসেবে গন্য করা শুরু হয়। এ পাপ ছিল প্রধানত যৌন আকাঙ্খার ফল। অশরীরী শয়তান, যাদের বলা হতো ইনকুবি-এরা মহিলা ও অন্যান্য লোকদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত।যেমনঃ  যৌন অক্ষমতা, বন্ধাত্য, গর্ভপাত, ইত্যাদি।এমন কি ঈর্ষা, শারীরিক ব্যাধি, এবং চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া- সব ধরনের অসুস্থতার জন্যই শয়তানকে দায়ী করা হত।১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে পোপ জোহানহাইনরিখ নামক দুজন ধর্ম প্রচারককে দায়িত্ব দেন যাদুবিদ্যা ধমন করার জন্য।তখন উক্ত দুজন ব্যক্তি একটি তথ্যপূর্ণ বই লেখেন –যার নাম মেলিয়াস মেলিফিকেরাম অর্থাৎ ডাইনিদের হাতুড়ি।এই বইটিকে তখন ডাইনিদের শনাক্ত করার জন্য এবং শাস্তি দেয়ার জন্য ম্যানুয়েল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।প্রায় আড়াইশত বছর এই বইটি ডাইনিদের শনাক্তকরন, বিচারকরন,শাস্তি দেয়া,অপরাধী হিসেবে প্রমানিত করা,দন্ডাদেশ দেয়া,এবং মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য নির্দেশক পুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হত।কিন্তু যাদের এভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছিল, আজকের দিনের দৃষ্টিভঙ্গিতে  তারা সবাই ছিল মানসিক রোগী।

মেলিয়াসে বলা হয়েছে,সব ডাইনিপনার উৎপত্তি হয় অদম্য যৌন কামনা থেকে।মেয়েদের যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকে অসীম এবং অতৃপ্ত ।সেজন্য তাদের যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরনের জন্য প্রেত/শয়তানের সাথে যোগসাযস করে।

এই তত্ত্ব থেকে অনেক মহিলা মানসিক রোগীকে পুড়িয়ে মারার জন্য যুক্তি দেখানো হত যে,তাদের দেহকে শয়তানের কবল থেকে মুক্ত করা হয়েছে।অর্থাৎ ডাইনিকে হত্যা করে তাকে মুক্ত করা হয়েছে।

রেনেসাঁ এবং প্রেততত্ত্ব থেকে উত্তরণঃ  সব শেষ ডাইনিকে হত্যা করা হয়েছিল জার্মানিতে ১৭৭৫ সালে এবং সুইজারল্যান্ডে ১৭৮২ সালে।  অনেক দেশে এবং  আমাদের দেশে ভূত তাড়ানোর নাম করে এই এখনও অনেককে হত্যা করা হয়। যাহোক, ষোড়শ শতাব্দীতে মানুষের চিন্তার জগতে নবযুগের সূচনা হয়।এবং কিছু কিছু লোক মেলিয়াসের এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।জোহান ওয়েয়ার (১৫১৫-১৫৭৮) কে মেলিয়াসের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী কণ্ঠস্বরের সর্বপ্রথম প্রতিনিধি বলা যায়।তিনিই এতিহাসের সর্ব প্রথম চিকিৎসক যার প্রধান আগ্রহ ছিল মানসিক রোগের প্রতি।তিনি  ঘোষনা করেন যে,‘বেশির ভাগ ডাইনি প্রকৃতপক্ষে নিরপরাধ এবং অসুস্থ ব্যক্তি” আমি প্রমান দিচ্ছি যে, যেসব অসুস্থতা বা ব্যাধির জন্য ডাইনিদের দায়ী করা হয়, সেগুলো প্রাকৃতিক কারন থেকে সৃষ্টি হয়। জোহান ওয়েয়ার লেখাগুলো পরবর্তীকালে মানসিক রোগের বর্ণনার জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ যুগের সবচেয়ে বেশি লোকের প্রতিনিধি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম জেমস- যিনি যাদুবিদ্যার বিরুদ্ধে ১৬৬৫ সালে একটি মেলিয়াসের সমালোচনা করে একটি পুস্তক প্রকাশ করেছিলেন.১৭০০ সালের কাছাকাছি এসে প্রেত তত্ত্বের উপর লোকের বিশ্বাস কমে আসে এবং তার প্রায় পঞ্চাশ পর প্রেত তত্ত্বের মৃত্যু ঘটে।

আধুনিক যুগ

আধুনিক যুগকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়ঃপ্রথম ভাগে মোটামুটি ১৯০০ সাল পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এই সময়ে জৈবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল ছিল। দ্বিতীয় কাল পর্ব শুরু হয় ১৮০০ সাল থেকে যখন জৈবিক দৃষ্টিভঙ্গি সর্বোচ্চ শিখরে আলোড়ন করেছিল তার থেকে বর্তমান কাল পর্যন্তআধুনিক যুগের দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য হল মানসিক রোগের কারন হিসেবে মানসিক শর্তাবলীকে প্রাধান্য দেয়া।

জৈবিক যুগ

ষোড়শ শতাব্দীতে শরীর সংস্থান এবং শারীরবিদ্যায় যে প্রভূত উন্নতি সূচিত হয়, তাই অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানে জৈবিক যুগের সূচনা করে।এই যুগের প্রধান বিজ্ঞানী ছিলেন উইলহেলম গ্রিসিঞ্জার (১৮১৭-১৮৮০) এবং এমিল কেপেলিন (১৮৫৬-১৯২৬) তাদের আগেই বেশ কয়েকজন সাইকিয়াট্রিস্ট বলেছিলেন যে, স্নায়ুতন্ত্রের ক্লান্তি, মস্তিষ্কের আকার এবং আকৃতি , মস্তিষ্কের কোষ –কলার ধ্বংস ,বংশ গতি সন্তান প্রসব,মাসিক ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া ইত্যাদি কারন থেকে আবেগীয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।গ্রিসিঞ্জার ছিলেন একজন জার্মান সাইকিয়াট্রিস্ট।তিনি মানসিক রোগ সম্পর্কিত সব ধরনের পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য বা অনুমান সমুহ সংগ্রহ করেন এবং এগুলো ১৮৪৫ সালে তার একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেনবইটির নাম mental pathology and therapeutics. এই বইটি মানসিক রোগের চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রথম বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ বলা যায়।এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য ছিল এই যে, সব ধরনের মানসিক ব্যাধির কোন মানসিক কারন নেই। সব মানসিক ব্যাধি প্রকৃত পক্ষে শারীরিক ব্যাধি –যার মূলকেন্দ্র হল মস্তিষ্ক।ক্রেপেলিন গ্রিসিঞ্জারের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন ও তার তত্ত্ব অনুসরন করে মানসিক রোগের একটি শ্রেনীবিন্যাস পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।ক্রেপেলিন এর মুল স্বীকার্য চিল যে,মানসিক ব্যাধির ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত। তিনি মনে করতেন মানসিক রোগকে তার পরিনতি ও গতিবিধি দ্বারাই শনাক্ত করা যায়। রোগীর অনুভূতি, চিন্তা, এবং আকাংখা ও উদ্বেগ হল আকস্মিক ও অপ্রাসঙ্গিক। ক্রেপেলিন তার শ্রেনীবিন্যাসে ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিসের এবং কিশোর বয়সের মনো বিকৃতি ইত্যাদি রোগের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।ক্রেপেলিন সব ধরনের মানসিক ব্যাধির জন্য মস্তিষ্কের ক্ষয়ক্ষতি বা রোগকে ,অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির অস্বাভাবিক ক্রিয়াকে বিপাক ক্রিয়ার ত্রুটিকে অথবা বংশ গতিকে দায়ী করেছিলেন।এক কথায় ক্রেপেলিন এর মতে জৈবিক শর্তই মানসিক ব্যধির কারন।এই দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তেও তার শ্রেনীবিন্যাস এবং প্রতীকটি শ্রেনীর জন্য লক্ষন সমূহের যে বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছিলেন তা মনোচিকিৎসার আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয়েছিল।এর পর অনেক বছর পর ১৯৮০ সালের দিকে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক সমিতি একটী নতুন শ্রেনীবিন্যাস প্রবর্তন করেছে যা DSM_ নামে প্রকাশিত হয়েছে। সর্ব শেষ শ্রেনীবিন্যাস প্রকাশিত হয়েছে DSM_5 নামে ২০১৩ সালে।

বেঞ্জামিন রাস ছিলেন সর্বপ্রথম আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট, যিনি আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষনার স্বাক্ষর করেছিলেন, তিনিও সেলসাস এর সঙ্গে একমত হয়ে মানসিক ব্যাধির চিকিৎসার জন্য বমন সৃষ্টিকারী ঔষধ জোলাপ এবং রক্তমোক্ষন পদ্ধতিকে সমর্থন করেছিলেন।জার্মান সাইকিয়াট্রিস্ট জোহান রেইল ছিলেন একজন বিদগ্ধ চিকিৎসক। কিন্তু তিনিও মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য মৃদু অত্যাচার এর পক্ষে প্রচার করেছিলেন।লন্ডনের বেথলেম হাসপাতালের মত একটি আদর্শ হাসপাতালেও মানসিক রোগীদের ঠান্ডা কুঠরীতে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো,তাদের পুষ্টিকর খাবার দেয়া হতো না।জেলখানার ধর্ষকামী কর্মচারীরা  রোগীদের পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার জন্য লেলিয়ে দিতো এবং অল্প প্রবেশ মূলের বিনিময়ে বহিরাগত লোকদের এ ধরনের মারামারির দৃশ্য প্রদর্শন করতো। এজন্য বেথলেম হাসপাতালের নামটি বিকৃত করে বেডলাম বলে ডাকা হতো।এই হাসপাতালের চিকিৎসার জন্য রোগীদের দম ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত পানিতে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে রাখা হত, এবং একটি ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে ঘুরানো হত-যতক্ষন না সে অচেতন হয়ে পড়ত।ধারনা করা হত যে, এভাবে ঘুরানো হলে রোগীর মস্তিষ্কের কোষগুলো পুনরায় সুসজ্জিত বা সুবিন্যস্ত হবে এবং মস্তিষ্ককে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসবে।মানসিক রোগীদের মুক্ত পরিবেশে রাখার জন্য, বিশেষ করে তাদের শৃঙ্খল মুক্ত করার জন্য, সর্বপ্রথম সরকারী অনুমতি আদায় করেছিলেন ১৭৯৩ সালে ফরাসি সাইকিয়াট্রিস্ট ফিলিপ পিনেল (১৭৪৫-১৮২৬)প্যারিসের লা বিকটরে হাসপাতালে।প্যারিসের নাগরিকগণ সবিস্ময়ে  দেখলেন যে, এসব মানসিক রোগীদের শেকল খুলে দেওয়ার পর তারা মোটেই বিশৃঙ্খল, আক্রমনাত্মক আচরন করেনি বরং শান্ত শিষ্ট ছিল।পিনেল যেসব মনিষীর চিন্তা ধারায় উৎসাহ পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে এস্ক্লেপিয়েডস থেকে শুরু করে করে বেলজিয়ামের ঘিল শহরের অনেক নাগরিক ছিলেন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে একটী রেওয়াজ  শুরু হল যে, মানসিক রোগীরা তাদের চিকিৎসার জন্য ঘিল শহরের একটি ধর্মশালায় যেত। কেউ আবার তীর্থযাত্রার নাম করে শহরের বাসিন্দাদের গৃহে আশ্রয় নিতেন ।আজও সেখানে একটি কলোনী  রয়েছে যেখানে হাজার হাজার মানসিক রোগী বসবাস করে, এবং শহরের লোকদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে মেলামেশা করে।আমেরিকায় ডোরাথিয়া ডিকস নামের একজন বিদূষী মহিলা দুঃস্থনিবাস ও পাগলাগারদে বা জেলখানায় অবস্থানরত মানসিক রোগীদের অমানুষিক নির্যাতন ও পাশবিক, নিষ্টুর অবস্থার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সচেতন করার জন্য কয়েক দশক ধরে প্রচারনা চালিয়েছেলিন।তার চেষ্টার ফলশ্রুতিতে আমেরিকায় রাষ্টীয় ব্যায়ে ৩০টি  হাস্পাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

মনোবৈজ্ঞানিক যুগ

১৮৮০ সালের কাছাকাছি সময়ে বিশুদ্ধ জৈবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই সময় কিছুটা নমনীয় জৈবিক ও মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে একটি মিশ্র বা সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটতে থাকে।মানসিক ব্যাধির চিকিৎসায় মনোবৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা হয় আংশিকভাবে মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অবদানের ফলে,  আর আংশিকভাবে হিপ্নোসিস বা নিদ্রাবেশের আবিষ্কারের ফলে।পিনেল এর লেখায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, মানসিক রোগীরা অন্যান্য সাধারন মানুষের মতই মানুষ।তাদের যখন শেকল খুলে মুক্ত করা হল তখন তাদের আচরন নিয়ে অনেকেই উৎসাহ দেখালেন।এ ধরনের রোগীদের নিয়ে কাজ লরতে গিয়ে ভিয়েনার চিকিৎসক ফ্রেঞ্জ এনটন মেস্মার (১৭৩৩-১৮১৫)হিপ্নেসিস বা সংবেশন ব্যবহার শুরু করেন।

জা মারটিন শারকো নামক একজন ফরাসি সাইকিয়াট্রিস্ট এবং স্নায়ুতত্ত্ববিদ কে আধুনিক স্নায়ুশারীরবিদ্যার জনক বলা হয়।তিনি প্যারিসের সাল পেট্রিয়ার হাসপাতালে নিউরোসিস, বিশেষ করে হিস্টিরিয়ার রূপান্তর প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে সংবেশন বা নিদ্রাবেশ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।কিন্তু তার একটি ভ্রান্ত ধারনা ছিল যে, শুধুমাত্র হিস্টিরিয়ার রোগীদের মধ্যে যেসব অবস্থা লক্ষ্য করা যায়-যেমন সমাধিস্ত অবস্থা, মাংস পেশীর জড়তা বা কঠীনতা প্রাপ্তি, সংবেদনহীনতা, অলীক প্রতক্ষন, এবং প্রতিবতী ক্রিয়ার পরিবর্তন, এগুলো সবই মস্তিষ্কের ক্ষতির ফলে সৃষ্টি হয়।

পিয়েরে জেনে (১৮৫৯-১৯৪৭) খুব বিস্তৃতভাবে হিস্টিরিয়ার লক্ষনাবলী বর্ণনা করেছিলেন এবং সংবেশন সম্পর্কে একটি মতবাদ গঠন করেছিলেন।জেনে মনে করতেন যে হিস্টিরিয়ার রোগীদের মধ্যে যে কারনে অভিভাবনশীলতা বেশী থাকে তাহল এসব রোগীদের বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবনতা –অর্থাৎ বংশগত বা দৈহিক কাঠামোগত প্রবনতা ।তার এই ধারনা সঙ্গে ফ্রয়েডের অবদমন ধারনাটির খুব মিল আছে।জেনের তত্ত্বে কয়েকটি ত্রুটি ছিল।প্রথমতঃ নিউরোটিক রোগের পেছনের কারন হিসেবে জেনে প্রেষনার ভূমিকা ও শৈশবকালীন অভিজ্ঞতার  মধ্যে সম্পর্ক দেখাননি, এবং দ্বিতীয়তঃ নিউরোটিক রোগীদের অনেক ধরনের লক্ষন প্রকাশ করার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রোগী শুধুমাত্র কয়েকটি নির্বাচিত লক্ষন প্রকাশ করে কেন-যেগুলো প্রত্যেক রোগীর বেলায় আলাদা হয় এসব প্রশ্নের কোন তাত্ত্বিক ব্যখ্যা বা উত্তর জেনে দিতে পারেননি।জেনের তত্ত্বের এ ত্রুটিগুলো দূর করেছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯).১৮৯৫ সালে ব্রুয়ার এবং ফ্রয়েডের যৌথ গবেষণামূলক প্রবন্ধ সংকলন (Studies in Hysteria)  প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তারা নিউরোটিক রোগীদের যেসব লক্ষন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন,সেগুলোকে ব্যখ্যা করার জন্য তাদের মনোসমীক্ষন তত্ত্বের প্রাথমিক রূপরেখা প্রণয়ন করেন।তারা অনুমান করেছিলেন যে, শৈশবের অভিজ্ঞতার ফলেই নিউরোসিস হয়, কতকগুলো অতীত অভিজ্ঞতার অবদমন বা বিস্মৃতি ঘটে, এবং এগুলো অবচেতন স্মৃতি তৈরি করে।এসব অবচেতন আকাঙ্খা থেকেই নিউরোটিক রোগের লক্ষন সৃষ্টি। অচিরেই ফ্রয়েড নিউরোসিসের চিকিৎসায় সংবেশনের প্রয়োগ বাতিল করে এবং তার বদলে মুক্ত অনুষঙ্গ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।এই পদ্ধতিতে রোগীকে মনে যা আসে তাই অবাধে বলতে বলা হয়।তারপরের ৪০ বছর ফ্রয়েড তার রোগীদের অনুষঙ্গসমূহ সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোর উপরে ভিত্তি করে তার অভিজ্ঞতাভিত্তিক মনোসমীক্ষন তত্ত্ব সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোর উপরে ভিত্তি করে তার মনোসমীক্ষন তত্ত্ব নির্মাণ করেছেন।ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্বের তিনটি স্তরের কথা বলেছিলেন- যেগুলোর একটি ইদ বা জৈবিক সত্তা, আরেকটি ইগো বা বাস্তব জ্ঞান কিংবা অহং সত্তা এবং বিবেক ।মানুষ এই তিনটি সত্তার সমন্বয়ে গঠিত এবং এই তিনটি সত্তার মধ্যে সব সময় দ্বন্দ্ব সংঘঠিত হচ্ছে।প্রত্যেকটি মানুষকে এই তিনটি সত্তার মধ্যে অর্থাৎ তার তাগিদ গুলোর সঙ্গে এবং অবদমনগুলোর সঙ্গে বাস্তব জগতের নীতিগুলোর সমন্বয় সাধন করে, ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়।এটা হল এক ধরনের সমঝোতা স্থাপন । কিন্তু নিউরোটিক রোগীরা এই সমঝোতা স্থাপনে  ব্যর্থ হয়।নিউরোটিকদের লক্ষনগুলো তাদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের প্রতিফলন বা বহিঃ প্রকাশ –যে দ্বন্দ্ব গুলোকে তারা মিটিয়ে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। মনোসমীক্ষন একটি তত্ত্ব হিসেবে এবং চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবেও প্রথম মহাযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত সর্বজন গ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পীড়ন বা চাপ এত এত প্রবল হয়েছিল যে হাজার হাজার সৈনিকদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের বিপর্যয় ঘটেছিল এবং তাদের মধ্যে হিস্টিরিয়ার লক্ষন দেখা দিয়েছিল।অনেক পর্যবেক্ষকদের নিকট মনে হয়েছিল যে, ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব অপ্রত্যাশিত গণ বিপর্যয়ের ঘটনাটিকে অন্যান্য তত্ত্বের চেয়ে ভালভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল। এরপর থেকে আমেরিকায় ও বিশ্বের অন্যত্র মনোসমীক্ষন তত্ত্ব মনোবিজ্ঞান ও সাইকিয়াট্রির উপর প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।মনোসমীক্ষন তত্ত্বের কিছু সংশোধন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে পরবর্তীকালে।১৯০৮ সালে ক্লিফোরড বীয়ারস মানসিক হাসপাতালে তার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে একটি বই লিখেন।বইটির নাম ছিল’ যে মন নিজেক খুঁজে পেয়েছে।এই বইয়ে আমেরিকান হাসপাতালগুলোতে যে কি দুর্বিষহ অবস্থা ছিল তা তুলে ধরেন।এর ফলে আমেরিকায় ১৯০৯ সালে মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলনের সূচনা হয়।এই আন্দোলনের ফলে মানসিক হাসপাতাল বা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান হাসপাতাল গুলোর পরিবেশ উন্নত করার জন্য, সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের মানসিক চিকিৎসা করার জন্য এবং চিকিৎসার মান উন্নত করার জন্য গোষ্ঠীভিত্তিক প্রচেষ্ঠা শুরু হয়।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে ১৯১৪ সালে রাশিয়ান শারীরতত্ত্ববিদ আইভান প্যাভলভ কর্তৃক পরীক্ষণ মূলক নিউরোসিস আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।প্যাভলভ আবিষ্কার করেন যে, একটি কুকুরকে যদি দুটি প্রত্যক্ষনমূলক অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত কঠিন –যেমন একটি বৃত্ত ও একটি প্রায় একই আকৃতির  উপবৃত্তের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে –তখন প্রানীটি চিৎকার করে, আক্রমণাত্মক আচরন করে।এই ধরনের ঘটনাকে প্যাভলভ পরীক্ষনমূলক নিউরোসিস বলেছিলেন।তারপরে প্রমানিত হয়েছে যে,একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন করা হলে ইঁদুর, বানর এবং শিম্পাঞ্জীদের মধ্যেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।এর তাৎপর্য হল এই যে মানুষকেও যদি এ ধরনের কঠিন সমস্যার সম্মুখীন করা হয় –যেখানে সে সহজে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না- অর্থাৎ যখন তার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় –তখন তার অভিযোজন ক্ষমতার উপরে পীড়ন সৃষ্টি হয় এবং সে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। এই বিপর্যয়ের সম্ভাবনা আরো বেশি হয়, তখন তার সিদ্ধান্তগুলো সামাজিক ও আবেগীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়. অতি  সাম্প্রতিক কালে অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বা মনোদৈহিক দৃষ্টিভঙ্গি অথবা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।  এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নিশ্চিত করা হয় যে, মানসিক ব্যাধির কারন হিসেবে জৈবিক শর্তাবলী কে যেমন উপেক্ষা করা যাবে না তেমনি মানসিক শর্তাবলীকে ও অস্বীকার করা যাবে না।এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রচলন ঘটেছে প্রখ্যাত আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট এডলফ মেয়ার (১৮৬৬-১৯৫০)এর অবদানের ফলশ্রুতিতে।মেয়ার যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তা হল, একজন রোগীর লক্ষনাবলীর প্রতি নজর না দিয়ে আমাদের উচিত রোগীকে এবং তার ব্যক্তিত্বের অন্যান্য সব দিক দিয়ে অনুধাবন করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব সৈনিক মানসিক বিকৃতিতে ভুগছিল, তাদের অনেকের জন্য প্রধানত দায়ী ছিল মনোশারীরবৃত্তীয় কারন। ১৯৩০ সালের দিকে কতকগুলো নতুন শারীরিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ায় অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানে অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ১৯৬০ এর দশকে উন্নত দেশগুলোতে গোষ্ঠীভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়  পর্যন্ত অস্বাভাবিক আচরন নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা, গবেষনা, নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন চলছে।

 

লিখেছেন – জাকিয়া সুলতানা

মাদকাসক্তি

Share

গত কয়েক দশক ধরেই মাদকাসক্তির পরিমাণ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক দ্রব্যের সহজলভ্যতা, এই ব্যাপারে সচেতনতার প্রভাব, তরুনদের মধ্যে নতুন অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ইত্যাদি বিবিধ কারণে মাদক দ্রব্য উৎপাদন ও ব্যবহারের হার এখন আগের চেয়ে বেশি। এমেরিকান টিভি সিরিজ “নারকোস” এর কথা মনে আছে? কলম্বিয়ার ড্রাগ লর্ড পাবলো এস্কোবার কিভাবে মাদক ব্যাবসা করে পরিণত হয়েছিল একজন কাল্ট ফিগারে! এখন প্রশ্ন আসতে পারে মাদকাসক্তির প্রকোপ হঠাৎ করে কেনই বা এত বেড়ে গেলো কিংবা একজন মানুষ কেনই বা মাদক গ্রহণ করে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পরে? এর উত্তর জানতে হলে আমাদের আগে জানতে হবে মাদকাসক্তি আসলে কি।

মাদকাসক্তি।
মাদকের অপব্যাবহার বলতে এলকোহলসহ অন্যান্য বিভিন্ন ধরণের চিত্ত-প্রভাবকারী ওষুধ বা মাদকের ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক ব্যবহারকে বোঝায়। এই ধরণের ওষুধগুলোর ক্রমাগত ব্যবহার তৈরি করে একধরনের “ডিপেন্ডেন্স সিন্ড্রোম” বা এদের উপর এক প্রকার নির্ভরশীলতা। এই নির্ভরশীলতা প্রকাশ পায় বিভিন্ন ধরণের শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত প্রকাশভংগির দ্বারা। ব্যাক্তি মাদকদ্রব্যটি গ্রহনের প্রতি একধরনের তীব্র তাড়না অনুভব করে। সে যতই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবগত থাকুক না কেন, মাদকাসক্ত ব্যাক্তি ক্রমাগত তা গ্রহনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যদি সে গ্রহন না করে তাহলে তার মধ্যে শুরু হয় শারীরিক এবং মানসিক অস্বস্তি। ব্যাক্তি তখন মাদক গ্রহনটাকেই তার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গন্য করে থাকে। মাঝে মাঝে এই পরিস্থিতি এত তীব্র হয়ে যায় যে, শারীরিকভাবে সে অসুস্থ হয়ে পরে।

কিভাবে বোঝা যায় কেউ মাদকে আসক্ত কিনা।
মাদকের প্রতি আসক্তি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। মাদক নেয়ার পিছনের কারণ যাই হোক না কেন, ব্যক্তি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্তির বুঝে উঠার আগেই তার মাদকের প্রতি সহ্য ক্ষমতা এবং ক্রমাগত এর প্রতি নির্ভরশীলতা শুরু হয়। যখন সহ্যক্ষমতা পুরোদস্তুর আসক্তিতে পরিণত হয়, তখন এর থেকে বের হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পরে।
যে ধরনের মাদকের প্রতি আসক্তিই তৈরি হোক না কেন, তা কতগুলো লক্ষন প্রকাশ করে। এই লক্ষন গুলো হতে পারে শারীরিক অথবা হতে পারে আচরণগত। অনেকক্ষেত্রে দুই ধরণের লক্ষনই প্রকাশ পায়।

শারীরিক লক্ষন-
১।মাদকাসক্তির কিছু চোখে পরার মত শারীরিক লক্ষন হচ্ছে শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলামের যখন এই মাদক দ্রব্যটি প্রভাব ফেলা শুরু করে। যেমন মাদক ব্যবহারের প্রতি শরীরের যে সহ্যক্ষমতা তৈরি হয়ে যখন ক্রমাগত ধীরে ধীরে আগের তুলনায় বেশি পরিমাণের মাদক সেবন প্রয়োজন হয় পূর্বের অনুভূতি ফিরিয়ে আনার জন্য। এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত চলতে চলতে এমন এক পর্যায় আসে, যখন ব্যক্তি অপরিমিত মাত্রায় মাদক গ্রহন করা শুরু করে। ব্যাক্তি ক্রমাগত প্রথমবার মাদক সেবনের অনুভূতিটা বার বার অনুভাব করতে চায়। অরথ্যাৎ যা শুরু হয়েছিল প্রথমে একটু খানি মাদক সেবনের মধ্য দিয়ে, তার শেষ হয় আসক্তিতে।  
২। মাদক ত্যাগ বা ডোজ কমালে তীব্র প্রত্যাহার জনিত শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়।
৩। রক্তরাংগা কিংবা মাতাল চক্ষু।
৪। বর্ধিত অথবা সংকুচিত চোখের মণি।
৫। আকস্মিকভাবে শরীরের ওজনের পরিবর্তন।
৬। ক্ষত, সংক্রমন অথবা অন্যান্য শারীরিক চিহ্ন যা শরীরের ড্রাগের অনুপ্রবেশ চিহ্নিত করে।

মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে বাধার সৃষ্টি, ব্যক্তিতে পরিবর্তন, হ্রদক্রিয়া এবং অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি মাদকসেবনের লক্ষন হিসেবে দেখা দেয়।

আচরণগত লক্ষন
অধিক মাদক দ্রব্য সেবনের ফলে ব্যক্তি ক্রমাগত মাদকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরার কারনে তা ব্যক্তির আচরনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মাদক ব্যক্তির ব্রেইনের মনোযোগ দেয়ার এবং সংলগ্ন চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নিম্নলিখিত আচরণগত পরিবর্তন ব্যক্তির মাদকের প্রতি আসক্তিকে নির্দেশ করে-
১। ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন বা উদ্বেগ। সবকিছুর প্রতি একধরনের বিরক্তি।
২। মনোভাব এবং ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন।
৩। ঝিমুনি ভাব।
৪। হতাশা।
৫। অভ্যাসের ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন।
৬। অর্থনৈতিক সমস্যা।
৭। অপরাধী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া।

উপরিক্ত শারীরিক এবং আচরনগত লক্ষন গুলো মাদকাসক্তির প্রতি নির্দেশ করে।

মাদকে আসক্ত কেন হয়?
মাদকদ্রব্য ব্রেইনে এক ধরণের গঠনগত পরিবর্তন সাধন করে বলে মাদক নেয়া রোগীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমাগত ব্রেইন নিজেই মাদকের প্রতি তীব্র আসক্তি অনুভব করে।
আমাদের নিজেদের শরীরে আরো ভাল করে বলতে গেলে ব্রেইনে প্রাকৃতিক ভাবেই এক ধরণের মাদকের উপস্থিতি  বিদ্যমান। এই মাদক বা ড্রাগগুলো আমাদের বাহিরের মাদক শরীরে প্রবেশ করলে যে অনূভুতি দেয় সেই রূপ অনুভূতিই দিয়ে থাকে। এদেরকে একত্রে বলা হয় “Endogenous Addictive Neurone Transmitter”.

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি আমাদের শরীরেই এ ধরণের মাদকের উপস্থিতি থাকে তাহলে আমরা কেন বাহিরের মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হই? উত্তর হচ্ছে ব্রেইনের নিজস্ব মাদকের তুলনায় বাহিরের মাদকের ডোজ বা এর আকর্ষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। যার কারণে যখন কেউ মাদক গ্রহণ করে থাকে সে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে।
বাহিরের মাদক যেমন হিরোইন, আফিম, ইয়াবা ইত্যাদি যখন ভিতরের প্রবেশ করে তখন তা ব্রেইনের বাহক সিস্টেমকে “হাইজ্যাক” করে ফেলে। যার কারণে স্বাভাবিক যে পুরষ্কার তন্ত্র তা মাদকের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। মাদকাসক্তরা স্বাভাবিকভাবে জীবন থেকে আর আনন্দ স্ফূর্তি নিতে পারে না। তাদের জীবন তাদের নিজেদের কাছে মনে হয় অনেক একঘেয়ে। আনন্দ আর স্ফূর্তি লাভের আসায় তারা দ্বারস্থ হয় মাদকের ওপর এবং ক্রমাগত হয়ে পরে নির্ভরশীল।
এক কথায় বলতে গেলে, ব্রেইনের Hedonic Capacity (আনন্দ সুখ অনুভব ক্ষমতা) নষ্ট হয়ে যায়।

মাদকাসক্তির কারণগুলো নিম্নে সংক্ষেপে দেয়া হলঃ

১। মন বা ব্রেইনের পুরস্কার/ আনন্দ তন্ত্রের বল বৃদ্ধি হওয়া।  আমাদের শরীরের ডোপামিন নামক এক ধরণের হরমোন বিদ্যমান। এই ডোপামিন হরমোন যাওবতীয় সুখানুভূতি/ তৃপ্তিদায়ক অনুভূতির জন্য দায়ী। এই ডোপামিন যাবতীয় ইতিবাচক বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয় (যেমন খাদ্য, পানীয়, যৌনতা)। মাদক গ্রহণ করলে তা ডোপামিন রিলিজ করে শরীরে আনন্দের বন্য বইয়ে দেয়। রোগীরা এক ধরণের শিহরিত অনুভুতি অনুভব করেন। তারা  এক প্রকার “হাই” ভাব পান।

২। মাদক যে শুধুমাত্র ডোপামিন রিলিজ করে আনন্দের শিহরণ দেয় তা নয়। মাদক শরীরের বিভিন্ন ব্যাথা, মানসিক উদ্বেগ ইত্যাদিও হ্রাস করে। যার কারণে মাদক গ্রহনকারীর কাছে মাদক আকরষনীয়।

৩। আশেপাশের বিভিন্ন উপাদানের সাথে মাদক গ্রহনের এক ধরণের কন্ডিশনিং বা যোগসূত্র হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ যে স্মৃতি গুলো, যে বন্ধুগুলো, না আবেগ অনুভূতি গুলো মাদক গ্রহনের সাথে যুক্ত, সেগুলো মাদকের আনন্দ সুখের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পরে। এই অনুভূতিগুলো ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যক্তি ক্রমাগত মাদক গ্রহণ করে। একটা সময় দেখা যায়, সেগুলো নিজেরাই মাদকের আকর্ষণ বা টান তৈরি করে।

৪। ব্রেইনের ক্ষুধা বর্ধক পর্যায়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

৫। দুর্বল স্ট্রেস কোপিং স্কিলও মাদকের প্রতি ক্রমাগত আসক্তির জন্য দায়ী।

এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কারণ যেমন Peer Pressure, সম্পর্কে ভাঙ্গন, অর্থনৈতিক ভাঙ্গন, মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদিও মাদক গ্রহনের জন্য দায়ী। তবে এই সবকিছুর পিছনেই রয়েছে মাদকের ভয়ংকর নির্ভরশীল করে ফেলারমত ক্ষমতা।

মাদকাসক্তি নিরাময় যোগ্য?
মাদকাসক্তি একটি নিরাময় যোগ্য ব্রেইনের রোগ। ব্রেইন ক্রমাগত মাদকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পরে। কিন্তু সঠিক স্টেপ নিলে তা থেকে ধীরে ধীরে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে বের করে আনা সম্ভব। বিভিন্ন রিহ্যাব সেন্টার গুলোতে নানারকম সাইকো থেরেপি, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং যত্নের মাধ্যমে মাদকের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আনা যায়।

মাদকদ্রব্য এক ভয়ংকর সাপের ছোবলের মতন। এর ছোয়ায় একজন ব্যক্তি থেকে শুরু করে ক্রমে একটি পুরো রাষ্ট্র ধ্বংসের দিকে যেতে থাকে। প্রথমে একবার সুবার শখ করে চেষ্টা করার পর তার উপর নিরভরশীল হয়ে পরলে তা থেকে বের হওয়া হয়ে পরে কষ্টসাধ্য। তাই আমাদের সবার উচিত মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো।

লিখেছেন – অর্থি