একাকীত্বের সাথে বসবাস

Share

ঐশী ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ক্লাসে তার অনেক বন্ধু। কিন্তু বাসায় আসলেই ঐশীর মনে হয় যে সে খুবই একা একজন মানুষ। ঐশীর বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। সে তখন প্রায়ই রুমের দরজা বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে। এই অবস্থায় সে পড়ায় মন দিতে পারেনা। তার রেজাল্ট আগের তুলনায় এখন বেশ খারাপ হচ্ছে। এজন্য তাকে তার বাবা মা অনেক কড়া কথা শুনিয়েছেন। ঐশী বুঝতে পারেনা তার অবস্থার জন্য আসলে দায়ী কে? তার মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা। কিন্তু তার মনে হয় তার কথা শোনার মত কেউ নেই। কলেজের সময়টুকু বন্ধুদের সাথে সে হাসি ঠাট্টা করলেও তার মনের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে বন্ধুদের সাথে অনেক কথা শেয়ার করতে চাইলেও কিছু শেয়ার করেনা এই ভেবে যে তারা ঐশীকে নিয়ে পরে কী ভাববে! এইভাবেই একাকী ঐশী নিজের মনের অবস্থার সাথে যুদ্ধ করতে থাকে।

প্রতিযোগিতার যুগে আমরা অনেক সময়ই আমাদের সবচেয়ে আপনজনকে সময় দিতে পারিনা। যার ফলে তারা দিন দিন একা হয়ে পরে। আমরা সবাই সুখী জীবন যাপন করতে চাই।আর তার জন্য দরকার মানসিক প্রশান্তি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের সমাজে এখনও অনেক অবহেলিত। মানসিক সমস্যাগুলো ট্যাবুর মত। একাকীত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক প্রকার অন্তরায়ই বলা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রতিদিন কত মানুষের সাথে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। কিন্তু তবুও মাঝেমাঝে মনের কথাগুলো বলার জন্য কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। এই নিঃসঙ্গতা থেকে মন খারাপের সৃষ্টি হয়। বন্ধুমহলে ‘ভাল্লাগেনা রোগী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মানুষগুলোর কাছে তার বন্ধুরা কি কখনও জানতে চায় তার ভালো না লাগার কারণ কী? জিজ্ঞেস করলে হয়তোবা উঠে আসত কোনো ঘটনা যা তাকে এখনো পীড়া দিচ্ছে। বন্ধুদের এই ঠাট্টার কারণে হয়ত এখন সে নিজেকে আরও একা অনুভব করে ।

একাকীত্বের আরেকটি বড় কারণ হতে পারে আশেপাশের মানুষের ‘জাজমেন্টাল’ মনোভাব। পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর- কথাটি মেনে চলার মানসিকতা আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষের নেই। কেউ আমাদের কাছে তার অপরাধবোধজনিত কোন কষ্ট শেয়ার করতে আসলে আমরা অনেকেই বাঁকা কথার দ্বারা তার অপরাধবোধকে আরো তীব্র করে তুলি। ফলে অপরাধবোধের সাথে যুক্ত হয় সংকোচ এবং সেই মানুষেরা নিজেদেরকে খুবই একা অনুভব করে। এমনকি অতীতের কোন ট্রমার কথা বলতেও মানুষ সংকোচ বোধ করে আর নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সম্পর্কবিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, আপনজনের মৃত্যু, বিরূপ পারিবারিক পরিবেশ ইত্যাদি মানুষের একাকীত্বের কারণ হতে পারে।  এই একাকীত্বের কারণে পরবর্তীতে অনেকে মানসিক জটিলতায় ভোগে। যেসব শিশু সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ না পেয়ে একা বেড়ে উঠে পরবর্তীতে তারা সহজে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনা। একাকীত্ব শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ব্যাহত করে।

একাকীত্ব কোন রোগ নয় কিন্তু অনেক মানসিক রোগের লক্ষণ। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশিরভাগই নিজেকে খুব একা অনুভব করে। মানুষের আত্মহত্যা চিন্তার পেছনেও একাকীত্বের ভূমিকা রয়েছে। একাকীত্ব মানুষের শারীরিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নিজেকে বাইরের জগত থেকে গুটিয়ে নেয়া মানুষের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

একাকীত্ব দূর করার জন্য সর্বপ্রথম নিজেকে নিজের সময় দেয়া উচিত। দিনের কিছুটা সময় নিজেকে নিয়ে ভাবলে নিজের পজিটিভ এবং নেগেটিভ সাইটগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এবং কোন কারণগুলো জন্য নিজেকে একা মনে হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। মাইন্ডফুলনেস চর্চা বা মেডিটেশন এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত, মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হতে হবে। আর এই ব্যাপারে কিছুটা সময় নিয়ে সঠিক বন্ধু বা সঙ্গী নির্বাচন করতে হবে। নিজের মনের কথাগুলো বিশ্বস্ত কাউকে বললে মানুষের একাকীত্ব অনেকাংশে কমে যায়। অন্যের ফ্যামিলি বা ফ্রেন্ড সার্কেল অথবা জীবনযাপনের সাথে নিজের তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মানসিক সমস্যাগুলো প্রয়োজনে কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। প্রতিদিন জীবনকে নতুন করে দেখার মানসিকতা আমাদের মানসিক উৎকর্ষের পক্ষে সহায়ক।

(সামিরা মাহজাবিন)

বুলিং এবং এর পেছনের গল্প

Share

তুহিন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। একদম প্রথম থেকে নিয়মিত ছাত্র হলেও ইদানীং সে ক্লাসে যেতে চায়না। বাবামা কিছু জিজ্ঞেস করেও সেটির কারণ বের করতে পারেনি। অবশেষে একদিন তুহিন তার কাজিনের কাছে এই স্কুলের প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টির কারণটি খুলে বলে। তুহিনের ক্লাসমেট সুমন তার বন্ধুদের নিয়ে তুহিনকে প্রতিদিনই উঠতে বসতে জ্বালাতন করে। কোনোদিন খাতা কিংবা জামায় পানি ঢেলে দিচ্ছে কিংবা টিফিনের খাবার কেড়ে নিচ্ছে। তুহিনের চশমা কিংবা ব্যাগ নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি তো নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক সময় তো শারীরিকভাবে আঘাতও করে বসে। তুহিন প্রতিবাদ করতে গেলে এই অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়।

“আজ ফেরার পথে ধাক্কা দিয়ে তুহিনকে কাদায় ফেলে কী মজাটাই না নিয়েছি বন্ধুদের সাথে। আরে বন্ধুদের সাথে যদি একটু মজাই করতে না পারলাম তো স্কুলে যেয়ে লাভটা কী? আর আমি তো শুধু মজাই করছি। তুহিন তো এগুলা বুঝতেই চায়না। আরেকটু হলেই কেঁদে দিচ্ছিলো গাধাটা।“ এইসব ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে আসে সুমন। বাসায় ঢুকেই শোনে তার বাবা-মা ঝগড়া করছে। ধুর, প্রতিদিন আর এই চেঁচামেচি সহ্য হয়না। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুমন। এলাকার বন্ধুদের আড্ডাখানায় যেয়ে বসে সে। সেখানেও ছোটখাটো একটা বিষয়ে মতের অমিল হওয়ায় বন্ধুদের সাথে ঝগড়া লেগে যায় তার।

বন্ধুদের সাথে মজা তো আমরা সবাই করি। কিন্তু সেই মজাটি যখন বন্ধুর জন্য অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে কিংবা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি যখন বন্ধুর আপত্তি সত্ত্বেও বারবার ঘটতে থাকে তখন সেটিকে বুলিং বলা হয়। প্রধানত দুই ধরণের বুলিং দেখা যায় স্কুলগামী বাচ্চাদের মধ্যে। শারিরীক ভাবে আঘাত কিংবা দলবদ্ধভাবে একজনের উপর চড়াও হওয়ার মাধ্যমেই বুলিং এর প্রকাশ ঘটে। আঘাত করা কিংবা বিভিন্নভাবে ক্ষতির মাধ্যমেই “ফিজিক্যাল বুলিং” এর ঘটনা দেখা যায়। গ্রুপের মধ্যে কাউকে একঘরে করে রাখা, সবসময় তাকে নিয়েই সমস্ত জোকস, তাকে নিয়ে গুজব ছড়ানো কিংবা তাকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদমূলক কথাবার্তা কিংবা গালিগালাজ; এইসব দ্বারা “রিলেশনাল বুলিং” বোঝানো হয়। এছাড়া স্কুল কলেজ ছাড়াও কর্মক্ষেত্রে সেক্সুয়াল বুলিং; কিংবা ইন্টারনেটে সাইবার বুলিং বেশ বড় ধরনের সমস্যা। এইসব অপ্রীতিকর ঘটনা পরবর্তীতে ভিক্টিমের মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলে থাকে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিশ্বের প্রায় ২২% মানুষ যারা বুলিং এর শিকার হয়েছেন তারা বেশ লম্বা সময় ধরে এটির দ্বারা প্রভাবিত হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি ৫০ বছর পর্যন্ত যেতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে শতকরা ৪০ জন এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে শতকরা ২৭ জন চাইল্ডহুড বুলিং এর ফলাফল হিসেবে পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারের সম্মুখীন হয় (মিশা কেচেল, ২০১৮)।

একজন মানুষ যখন বুলিড হয় তখন সে শারীরিক বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বেশ কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়। সে বন্ধুবান্ধব থেকে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একাকী হয়ে পড়ে; ডিপ্রেশন তাকে ঠেলে দিতে পারে ড্রাগ এ্যাডিকশনের দিকে। বুলিং এর মানসিক ট্রমা,  ডিপ্রেশন কিংবা লো সেলফ এস্টিম এর কারণে সে সুইসাইডের দিকেও এগিয়ে যেতে পারে। যখন সে দেখে সে বুলিড হচ্ছে দেখেও কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না তখন তার ভিতরে ট্রাস্ট ইস্যু গড়ে উঠতে পারে। এ্যাগোরাফোবিয়া কিংবা প্যানিক ডিসঅর্ডারের মত সমস্যার পিছনেরও অন্যতম কারণ এই বুলিং (ডিউক ইউনিভার্সিটি, নর্থ ক্যারোলাইনা)। বুলিং এর শিকার হওয়া মানুষ পাবলিকলি কথা বলতে ভয় পায় কারণ স্কুলে হয়তো তাকে অপিনিয়ন জানানোর কোনো সুযোগ দেয় হয়নি কিংবা তার মতামত নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছে। বুলিং এর ইফেক্ট হিসেবে অনেক মানুষই দুঃস্বপ্ন দেখে থাকে।

একজন বুলিং ভিক্টিমকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে সাধারণত কাউন্সেলিং কিংবা কথা বলাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। একজন প্রফেশনালের সাথে কথা বলে কিংবা অন্যান্য মানুষ যারা কিনা বুলিং এর শিকার হয়েছেন এসব মানুষের সাথে কথা বলে নিজের ভয়কে কাটানো যায়। বুলিং ভিক্টিমরা অনেক সময় বুলিড হওয়ার জন্য নিজেকে দোষারোপ করে থাকেন। যার কারণ হচ্ছে লো সেলফ এস্টিম। নিজের মতামতের গুরুত্ব না পাওয়া, সোশ্যাল সার্কেলে যথাযথ মনোযোগ না পাওয়া লো সেলফ এস্টিমের অন্যতম কারণ। এখানে কথা বলার মাধ্যমে ভিক্টিম বুঝতে পারে তার মতামতেরও গুরত্ব রয়েছে। সে নিজেকে গুরুত্ব দেয়া শেখে। বুলিং এর ফলে যে ভিক্টিম পাবলিকলি কথা বলতে ভয় পায় সে আস্তে আস্তে তার ভয়কে কাটিয়ে উঠে।

একজন বুলি বুলিং কেন করে? আমরা প্রায়শই দেখে থাকি ক্লাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ছেলেটি হয়ত ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছেলেকে বুলি করছে। এছাড়া অনেক সময় অবিসিটি (Obesity) কিংবা ইকোনমিক স্ট্যাটাসের কারণেও অনেকে বুলিং এর শিকার হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুলিং এর কারণ হিসেবে হাই সেলফ এস্টিম, আগ্রাসী মনোভাব, ক্রোধ, বেড়ে উঠার পরিবেশ ইত্যাদিকে দায়ী করেন। উপরে আমরা দেখতে পাই সুমন তার বাসায় বাবা-মায়ের ঝগড়ার ফলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এখানে বাসার পরিবেশের প্রতি সুমনের প্রতিক্রিয়া কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে না পারার ক্ষোভ ইত্যাদি বিষয় স্কুলে সুমনের বুলি করার দিকে আঙুল তোলে। স্কুলে বুলিং-এর ফলে সে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে এবং সেখানে সেই যেকোনো কিছুর কেন্দ্রবিন্দু এবং বুলিং করে সে নিজে আনন্দ পাচ্ছে এসব কারণই তাকে বারবার অন্যদের বুলি করতে উৎসাহিত করে।

আমাদের সমাজে মানুষ সাধারণত যে বুলিড হচ্ছে তার দিকেই বেশি নজর দেয়। কিন্তু আমরা চাইলেই যে বুলি করছে তার দিকেও একটু খেয়াল রেখে তার বুলিং এর কারণ বের করতে এবং বুলি করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারি। একজন বুলি সাধারণত রাগ, ক্ষোভ এবং অল্পবিস্তর ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে থাকেন। কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে তার চিন্তাধারা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাকে বুলিং এর ক্ষতিকর দিক সমূহ সম্পর্কে বোঝানো যেতে পারে। এছাড়া একজন বুলির মধ্যে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটির কিছু লক্ষণও দেখা যায়। এক্ষেত্রে তাকে অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া কিংবা অন্যের অসুবিধা বুঝতে পারা সম্পর্কে সাহায্য করা যেতে পারে। তার মধ্যে সিমপ্যাথি এমপ্যাথি ইত্যাদি গুণ গড়ে তুলতে সাহায্য করা যায়।

বুলিং সারাবিশ্বেই একটি সাধারণ ঘটনা হলেও ব্যাক্তির মানসিক সুস্থতার উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। আমাদের পাশের মানুষটিই হয়তো তার সোশ্যাল সার্কেল থেকে বিচ্ছিন্ন এই বুলিং এর কারণে; কিংবা সে নিজেই হয়তো একজন বুলি। বুলিং এর ভিক্টিম অথবা বুলিং এর জন্য দায়ীকে বুলিং এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা আমাদেরই দায়িত্ব।

অনেকে আছেন নিজের কথা শেয়ার করার জন্য ‘right person’ কে পাচ্ছে না। সেই ক্ষেত্রে itsokay website একটি ভালো একটা প্ল্যাটফর্ম। এখানে আপনি পরিচয় গোপন রেখে আপনার কথা বলতে পারেন এবং আপনার মত আরো অনেক জনকে পেতে পারেন যার সাথে আপনি নির্দ্বিধায় মনের কথা খুলে বলতে পারেন।

মেজাজ যখন এটম বম্ব

Share

আহসান হাবিব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।সারাদিন বিভিন্ন ধরণের মানুষের সাথে কাজ করতে হয় তাকে।

একদিন সকালে নাস্তা দিতে দেরী করায় রেগে গিয়ে সে তার স্ত্রী’কে খুব বকাঝকা করলেন এবং রাগ করে সকালের নাস্তা না খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন।অফিসে যাওয়ার পথে তার গাড়ির সাথে একটি রিক্সার ধাক্কা লাগলে তিনি রেগে গিয়ে রিকশাচালকে থাপ্পড় দিয়ে বসলেন।সেদিনই অফিসে সে তার কাছের একজন কলিগের সাথে সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা শুরু করলেন।যেহেতু সারাদিন বিভিন্ন কারণে রেগে ছিলেন, বাসায় এসেও মন ভালো ছিল না তার। আহসান হাবিবের ৫ বছরের সন্তান যখন তার কাছে বিভিন্ন বায়না করছিলো তখন তিনি রেগে গিয়ে বাচ্চার উপর চিৎকার করা শুরু করলেন।

রাগ করা খুব স্বাভাবিক এবং এর প্রকাশ করাটাও খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কেউ খুব ছোট বিষয়ে হঠাৎ রেগে যান আবার কেউ খুব সহজে রাগ না করলেও রাগান্বিত অবস্থায় বেশ ভয়ংকর হয়ে উঠেন। আবার অনেকে আছেন তারা রাগ করলেও সেটিকে প্রকাশ করেন না, বরং ঠান্ডা মাথায় সেটিকে মোকাবেলা করেন। তবে রাগের  ধরণ যেমনই হোক না কেন রাগ আমাদের ক্ষতি ছাড়া ভাল কিছু করেনা।রাগের অনেক ক্ষতিকারক দিক আছে। অতিরিক্ত রাগকে স্ট্রেসফুল ডিজিজের কারণ হিসেবে দেখা হয়। রাগান্বিত ব্যক্তি হঠাৎ করেই অধিক পরিমাণে উত্তেজিত হয়ে পড়েন যা কিনা ব্যক্তিকে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া অস্বাভাবিক রাগ ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। দীর্ঘ সময় ধরে যদি ব্যাক্তি রাগের মধ্যে দিয়ে যায় তবে সেই ব্যাক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে।তাই ব্যাক্তির রাগ কন্ট্রোল করা শিখে নেওয়াটা খুবই জরুরী।

যেভাবে রাগকে কন্ট্রোল করা যেতে পারে-

০১।আপনার রাগের কারণগুলো জানুন।যেসব বিষয় আপনাকে রাগিয়ে দেয় সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখুন।

০২।যখনই কোন বিষয় নিয়ে রাগ অনুভব করছেন তখন একটু ব্রিদিং এক্সারসাইজ করুন।

০৩।যেসব কাজ,আলোচনা বা তর্ক আপনাকে রাগিয়ে দেয়,সেসব এড়িয়ে চলুন;প্রয়োজনে একটু বিরতি নিন।

০৪।কারো আচরণ যদি আপনার রাগের কারণ হয়  তবে সেই ব্যাক্তিকে তা বুঝিয়ে বলুন।তার আচরণে কষ্ট পাচ্ছেন তা প্রকাশ করুন।

০৫।অফিসে কলিগের সাথে রেগে গেলে তাৎক্ষণিক ঐ স্থান ত্যাগ করুন।প্রয়োজনে একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসতে পারেন।

০৬।প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণ ঘুমান।

০৭।নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

০৮।প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকুন।

০৯।পজিটিভ হওয়ার চেষ্টা করুন।

১০।রাগগুলোকে মনে পুষে না রেখে রাগের কারণগুলোকে ব্যাখা করুন।দেখবেন রাগ অনেকটা কমে যাচ্ছে।

যখন আমরা রাগ করি তখন আমরা মূলত নিজেদেরকেই কষ্ট দেই এবং কাছের মানুষগুলোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলি।রেগে না গিয়ে শান্তভাবে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারাই মূলত এ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট টেকনিক।  রাগ করা ছাড়াও যে সমস্যার সমাধান করা যায় তা শিখে নেওয়া জরুরী।রাগ কন্ট্রোল করে সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করার জন্য প্রয়োজনে যে কেউ সাইকোলজিস্টের কাছ থেকে কাউন্সেলিং সেবাও নিতে পারেন।

অন্তরা অন্তু

Resilience: বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন

Share


শুভ খুব ভাল একজন ছাত্র। সে বড় হয়ে একজন রসায়নবিদ হতে চায়; কিন্তু তার পরিবার চায় সে ডাক্তার হোক। শুভর রসায়নবিদ হওয়ার ইচ্ছাটাকে পরিবার গুরুত্ব দেয়না। এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর শুভ পরিবারের চাপের মুখে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এরই মধ্যে এইচ.এস,সি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে দেখা যায় ভালো পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও সে এ+ পায়নি। পরিবার থেকে তাকে নিয়মিত বকাঝকা ও অপমান করা শুরু হয়। মানসিকভাবে পরিবারের সাপোর্ট না পেয়ে সে খুব ভেঙে পড়ে। অবস্থা আরও খারাপ হলো যখন সে কোনো ভার্সিটিতে চান্স পেলোনা। বন্ধুবান্ধব যারা বিভিন্ন ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিলো তারাও শুভকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে লাগলো। পরিবার, আত্নীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব সকলের অবহেলায় সে খুব আইসোলেটেড ফিল করতে লাগলো। স্বাভাবিক জীবন যাপন করা শুভর জন্য কঠিন হয়ে উঠলো। তার মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, আশাহীনতা, রাগ ইত্যাদি নেতিবাচক ইমোশনগুলো দিনকে দিন বেড়েই যেতে লাগলো। শুভর মনে হতে লাগলো বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।

শুভর বড় বোন তার মধ্যে এই একাকীত্ব, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা, হতাশাগুলো লক্ষ্য করেন এবং তিনি শুভকে একজন সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যান। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও বড় বোনের অনুপ্রেরণা পেয়ে শুভ প্রতিকূল অবস্থা থেকে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্য চেষ্টা শুরু করে।

ওপরে আমরা শুভর ক্ষেত্রে তার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে পরিবর্তিত অবস্থাতে খাপ খাওয়ানোর যে চেষ্টা দেখতে পাই তাকে বলা হয় রেজিলিয়েন্স।

রেজিলিয়েন্স হলো সংকটপূর্ণ অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করার একটি প্রক্রিয়া।

যেসব ব্যাক্তিদের মধ্যে রেজিলিয়েন্স বা পরিবর্তিত অবস্থাতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বেশি থাকে তারা সংকটপূর্ণ অবস্থাতে শান্ত থাকতে পারে যা তাদেরকে পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে সাহায্য করে। আর যাদের মধ্যে রেজিলিয়েন্স কম থাকে তাদের মধ্যে পরিবর্তিত অবস্থাতে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা কম থাকে।

সম্পর্কের ভাঙন, কাছের কোনো মানুষের মৃত্যু, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, পেশাদারী ব্যর্থতা, শারীরিক অক্ষমতা, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি যেকোনো কারণে ব্যক্তি দীর্ঘসময় ধরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতে পারে; যেটা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবর্তিত অবস্থাটাকে স্বীকার করে নেওয়াটা একজন বিপর্যস্ত ব্যক্তির জন্য খুবই জরুরী।

পরিবারের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, সামাজিক নিরাপত্তা, অভিযোজন কৌশল, নিয়মিত কাউন্সিলিং সেবা ইত্যাদি ব্যক্তির মধ্যে রেজিলিয়েন্স বাড়াতে সাহায্য করে। আমাদের কাছের বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যই  হয়তো আছে যাদের রেজিলিয়েন্স কম থাকার কারণে জীবনে এগোতে পারছে না। আমারদের সকলের সহায়তাই পারে তাদেরকে সুস্থ সুন্দর জীবন দিতে।

অন্তরা অন্তু

মরে গেলেই হয়ত বেঁচে যাবো!

Share

মনে পড়ে কনফিউজড শুভর কথা? তার এইচ.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে গতকাল। তার অনেক বন্ধুরা এ প্লাস পেলেও তার এ প্লাস আসেনি। এ নিয়ে বাবা মায়ের বকাঝকার শেষ নেই। সারাবছর খোঁজ না থাকলেও আজ অনেক আত্মীয় স্বজনই ফোন দিয়ে তার রেজাল্টের খবর নিচ্ছেন। এই এ-প্লাস না পাওয়ার ব্যর্থতাতেই অসহ্য মনে হচ্ছে জীবনটাকে।
দুই মাস পরের কথা, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির এ্যাডমিশন টেস্ট দেবার পরেও কোনোটাতেই চান্স হয়নি শুভর। এত ভালো পড়ালেখা করা সত্ত্বেও চান্স না পাওয়ায় সে অত্যন্ত হতাশ। এমনকি এ প্লাস না পাওয়ায় কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দেবারই সুযোগ পায়নি সে। এটি নিয়ে তার বাবা মা এখনো তার এইচএসসির রেজাল্ট নিয়ে তাকে কথা শোনায়। পরিবার থেকে অনেকটাই আইসোলেটেড হয়ে গেছে শুভ। ফ্রেন্ড সার্কেলে অনেকেই ভালো ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ায় ওদের সাথেও মেলামেশা কমে গেছে তার। বলা যায় সমাজ থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন সে। প্রায়ই তার মনে হয় এত গঞ্জনা সহ্য করার চাইতে এই ব্যর্থ জীবনকে শেষ করে দেয়াই শ্রেয়। বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভ। তার ভাবনা, এ জীবন রেখে আর কি হবে? মরে গেলেই হয়ত বেঁচে যাবে সে।

শুভর মধ্যে যে ভাবনাটি গড়ে উঠছে তাকে সুইসাইডাল থট কিংবা সুইসাইড আইডিয়েশন নামে অভিহিত করা হয়। আত্মহত্যার চিন্তা করা কিংবা প্ল্যান করাই হচ্ছে সুইসাইডাল আইডেয়শন। ব্যাক্তির মধ্যে এই চিন্তাটি অনেকদিনের গোছানো কিংবা হুট করে আসা দুই ভাবেই হতে পারে। সুইসাইডাল থট অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে সুইসাইডাল থট এর শিকার হন। কোনো বিষয় নিয়ে এ্যাংজাইটি কিংবা ডিপ্রেশন থেকে মানুষ সুইসাইড নিয়ে চিন্তা করে। সাধারণত সুইসাইডাল থট একটি অস্থায়ী বিষয় হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি বিপদজনক এবং ব্যক্তিকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। প্রথমত একজন ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থ, অকেজো ইত্যাদি ভাবা শুরু করে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া, বেকারত্ব ইত্যাদি পারিপার্শ্বিক চাপ এবং অবজ্ঞার মুখে এবং তার মনে হয় হয়ত জীবন শেষ করে দিলেই এইসব থেকে মুক্তি মিলবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় সে কাউকে অনুকরণ করতে চাইছে। সেটি হতে পারে তার পরিবারের কেউ যে কিনা আত্মহত্যা করেছে কিংবা কোনো সেলিব্রেটি। “মরে গিয়ে তো বেঁচে গেছে সে” এই ধরণের চিন্তা লালন করে সে। তার মধ্যে এই ধারণা  আসতে থাকে যে কেউ তাকে বুঝতে চাইছেনা কিংবা কেউ তাকে গ্রাহ্য করছেনা। এইজন্য অনেক ক্ষেত্রে “এ্যাটেনশন সীকিং”কেও ব্যক্তির সুইসাইডাল থট আসার কারণ হিসেবে ধরা যায়। অনেক সময় ব্যক্তি নিজেকে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। সে মনে করে তার জন্যই সকল সমস্যার শুরু, অতএব মরে যাওয়াই শ্রেয়। আমরা আশেপাশে অনেকেই রয়েছে যে কিনা হয়ত প্রতিদিনই অল্প অল্প করে আত্মহননের উপায় নিয়ে চিন্তা করছে, উপকরণ নিয়ে ভাবছে। আমরা হয়ত গ্রাহ্য করছিনা কিংবা বুঝতে পারছিনা। একসময় হয়ত শুনতে পাবো সে সুইসাইড করতে সফল ও হয়েছে।
সুইসাইড নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। বর্তমান বিশ্বের ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে সুইসাইড বা আত্মহত্যা একটি বড় সমস্যা। পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় দিনকে দিন আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে এই আত্মহত্যা। বর্তমানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ সুইসাইড করে। সমগ্র পৃথিবীতে যুবক যুবতীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এই সুইসাইড। যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই তবে গত ১ বছরে ১৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। এবং প্রতি বছর এই হার বেড়েই চলেছে। একটা মানুষ যখন তার নিজের জীবনের প্রতি সমস্ত আকর্ষণ কিংবা বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে তখনই সে সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় তার সবথেকে বেশি প্রয়োজন কাছের মানুষদের সংস্পর্শে থাকা।  
প্রতিরোধঃ
এই সুইসাইডাল থট কিংবা সুইসাইড আইডিয়েশন একটি ক্ষণস্থায়ী বিষয় হলেও এটিকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। একজন মানুষ যখন সুইসাইড নিয়ে চিন্তা করে তখন তার কথাবার্তা আচার ব্যবহারে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন সে হয়ত তার প্রিয় কোনো বস্তু যা কিনা সবসময় নিজের কাছে আগলে রাখতো সেটিকে ফেলে দিচ্ছে কিংবা কাউকে দিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে অন্যদের বোঝা হিসেবে দেখছে। তার কথাবার্তার মধ্যেও নিরাশার ছাপ পাওয়া যায়। “বেঁচে থেকে কি হবে?” “আমি মরে গেলেই হয়ত সবার জন্য ভালো” ইত্যাদি কথাও বলতে শোনা যায়। ব্যক্তি মৃত্যুকে নিয়ে কথা বলে। পরিবার কিংবা বন্ধু বান্ধব থেকে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নিচ্ছে। এইসমস্ত লক্ষণ দেখা দিলে আমরা ধরে নিতে পারি ব্যক্তির মধ্যে সুইসাইডাল থট বিরাজ করছে। এই সুইসাইডাল থট প্রতিরোধে পরিবার এবং বন্ধুরা বড় ধরণের সাহায্যে এসে থাকেন। কথা বলে, সময় দিয়ে সুইসাইডাল থট থেকে ব্যক্তিকে সরিয়ে আনতে পারেন তারা। ব্যক্তিকে নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে সাহায্য করা, তাকে সাহস দেয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। অনেক সময় প্রফেশনাল হেল্প ও প্রয়োজনীয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা কিনা সুইসাইডাল থট প্রতিরোধে কাজ করছে। এছাড়া সাইকোলজিস্ট এবং কাউন্সেলররাও প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মূলত কথা বলা এবং শেয়ারিং এর মাধ্যমেই ব্যক্তিকে সুইসাইডাল থট থেকে আস্তে আস্তে সরিয়ে আনা হয়। এছাড়া ব্যক্তি বিভিন্ন থেরাপির সাহায্য ও নিতে পারেন সুইসাইড কোনো সমাধান নয়। আপনার সুইসাইডাল থট আসছে এর মানে এই নয় যে আপনি মানসিক ভাবে অসুস্থ। আপনার আশে পাশের অনেক মানুষেরই সুইসাইডাল থট আসে এবং অনেকেই এটি থেকে মুক্তি পায়। এখানে সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে কথা বলা। নিজের ভাবনাকে নিজের মধ্যে পুষে না রেখে অন্যের সাথে শেয়ার করা, নিজের উপর বিশ্বাস রাখা। কথা বলুন, সুইসাইডাল থটকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আপনি ঠুনকো কিছু নন, একটি ব্যর্থতা আপনার গল্পকে শেষ করে দিচ্ছেনা। হয়ত সবেমাত্র তা শুরু। নিজেকে বলুন “My story will not end up in this way.”

আশিক মাহমুদ।

সিদ্ধান্তহীনতা

Share

শুভ এইবার এইচ.এস.সি পরিক্ষা দিয়েছে। সে এখন কোথায় এবং কী নিয়ে পড়বে তা নিয়ে খুব বেশী কনফিউজড। বাবা-মা বলছে মেডিকেলে পড়তে, নিজের ইচ্ছা রসায়ন কারণ তার রসায়ন পড়তে অসম্ভব ভাল লাগে, কিন্তু শুভর বন্ধুরা বলে সে যেহেতু সে ইংলিশে ভাল তাকে আইবিএ নিয়ে পড়তে। এখন শুভর মনে হয় মেডিকালে পড়লে তার বাবা-মা খুশি হবে, আবার নিজের ইচ্ছা কেমিস্ট হওয়ার, কিন্তু বন্ধুরা যা বলছে সেটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে শুভর। কারণ তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভর্তি পরিক্ষার প্রস্ততি নিতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই তার। যতদিন যায় ততই চাপে পড়ে শুভ। কোন দিকে যাবে সে? বাবা-মার মেডিকেলে যেতে বলার চাপ মেনে নিবে, নিজের ভাল লাগাকে গুরুত্ব দিবে নাকি বন্ধুদের কথা শুনবে? নিজের সিদ্ধান্তহীনতাবোধে চরম হতাশ শুভ। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে বাড়ছে দূরত্ব, ভাল লাগার কাজও এখন আর করতে পারে না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরতে থাকে ‘আমি এখন কি করব?’ চিন্তার চাপে সে এখন ছোটখাট সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বন্ধুরা তাকে ‘কনফিউজড শুভ’ নামে ডাকে আজকাল।

উপরে আমরা দেখলাম শুভ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। সময়ের প্রয়োজনে কি করতে হবে সেটা বুঝতে না পারাই সিদ্ধান্তহীনতা। জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং মাঝে মাঝে সিদ্ধান্তহীনতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। যেমন কোন জামাটা পড়ে বাইরে যাব, রেস্টুরেন্টের মেন্যু দেখে বুঝতে না পারা কোনটা রেখে কোনটা ওর্ডার করবে ইত্যাদি। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার কারণে যদি দৈনন্দিন জীবনের ব্যাঘাত ঘটে তাহলে এটা চিন্তার বিষয়।  

সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কিছু উপায় মেনে চলা যায়। যে বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ভুগছে সেটি একটি নোটবুকে লিখা এবং কোন সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে সেটি লিখে রাখা। সেই সময়ে ভেবে দেখা কোন সিদ্ধান্ত নিলে হলে কি আউটকাম আসবে। নিজেকে প্রশ্ন করা, ‘আমি কি এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেনে চলতে পারব?’ শুধু আউটকাম চিন্তা করলে হবে না, খুব সূক্ষ্ম ভাবে এর ফলাফলের দিকে তাকাতে হবে। যেমন, ডাক্তার হলে মাথায় রাখতে হবে দিন-রাত যেকোন সময়ে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে যেতে হবে, পরিবার ও নিজের জন্য খুব একটা সময় ব্যয় করা যাবে না। তারপর ভেবে দেখা, নিজের আদর্শের সাথে সিদ্ধান্তটা যাচ্ছে নাকি। বা যে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটি আপনার জীবন ধরণের সাথে যায় কিনা। ধরুণ,আপনি যদি আরামপ্রিয় মানুষ হোন, সে ক্ষেত্রে কোন পরিশ্রমের পেশা বেছে নিলে সেটার সাথে খাপ খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হবে। আবার, যে কারোর সাথে সিদ্ধান্তটা নিয়ে কি ভাবছেন তা নিয়ে কথা বলা। খুব জানে এমন মানুষের সাথে কথা বলা লাগবে এমনটা নয়, কারণ দেখা গেছে চিন্তাগুলা কথার মাধ্যমে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু একজন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষেরে সাথে কথা বললে সঠিক দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। আপনি যে সিদ্ধান্তটা নিতে চাচ্ছেন সেটা যারা নিয়েছে, তাদের সাথে কথা বলেও সহজে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। তখন একজন বুঝতে পারবে, সে যে সিদ্ধান্তগুলো ভাবছে সেটি আসলেও প্রয়োগ করা যাবে কিনা এবং সিদ্ধান্তটা নিলে কী হবে। যেমন, একজন মেডিকেলের ছাত্রই আপনাকে বলতে পারবে মেডিকেলে পড়লে আপনার জীবনের পথ কেমন হবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনি সেই পথে আগাতে চান কিনা। প্রয়োজনে, একজন কাউন্সিলরের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

আমরা প্রতিদিন অনেক ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি এবং মাঝে মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, সিদ্ধান্তহীনতার জন্য যাতে অন্যান্য কাজ বাধাপ্রাপ্ত না হয়।

(নুজহাত জাহানারা)

Emotional Literacy

Share

শুভ এইবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তার বাবা মার ইচ্ছা সে ডাক্তার হবে। কিন্তু শুভর চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় কেমিস্ট্রি। কেমিস্ট্রি সে অন্যান্য যেকোনো সাবজেক্টের চেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে পড়ে। শুভর ইচ্ছা সে ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়বে। কিন্তু শুভর এই সিদ্ধান্ত তার বাবা মা মানতে নারাজ। শুভর বাবার প্রথম প্রশ্নই ছিল ‘ কেমিস্ট্রি পড়ে তুমি কী করবে? আর মানুষ কী বলবে!’

শুভর এখন মনে হয় বাসার কেউ তার কথা বোঝার চেষ্টা করেনা। অনেকটা অভিমান করেই সে এখন কারও সাথে তেমন কথা বলেনা। সে এখন কী করবে নিজেও বুঝতে পারেনা।

শুভর মত ঘটনা হয়ত অনেকের সাথেই হয়। শুধুমাত্র ভর্তিযুদ্ধের সময়ই মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে পরে এমন নয়। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মনে হয় আমাদের কথা কেউ বুঝতে চায়না। এমনকি অনেক সময় আমরা নিজেরা কী চাই তাও বুঝতে পারিনা। শুধুমাত্র এই বোঝাপড়ার অভাবেই আমাদের আশেপাশের মানুষের সাথে এমন কিছু বিবাদের সৃষ্টি হয় যা কিনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এই সংক্রান্ত সাইকোলজির ভাষায় একটি টার্ম আছে- emotional literacy।

Emotional literacy কী

Emotional literacy বলতে বোঝায় নিজের চিন্তা ভাবনা, আবেগ সঠিকভাবে বোঝা এবং ইতিবাচকভাবে সেগুলো প্রকাশ করা। একইসাথে অন্যের কথা শোনা এবং তাদের চিন্তা ধারা বুঝতে চেষ্টা করা। সহজভাবে বললে, কোন মানুষের মানসিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতাকেই বলা হয় emotional literacy।

Emotional literacy কেন দরকার

সমাজে একসাথে চলতে গেলে অনেকের সাথেই আমাদের মনোমালিন্য হয়। এইসব কনফ্লিক্ট এর পিছনে একটি সাধারণ কারণ যা  মোটামুটি আমরা সবাই বলে থাকি তা হল- ‘সে আমার অবস্থা বুঝার চেষ্টা করেনা।‘ এই ‘বুঝতে না পারা’ মূলত emotional literacy এর অভাব।  মানুষকে বোঝার চেষ্টা করলে আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে সহমর্মিতা জন্মে। Emotional literacy মানুষকে productive way তে আবেগ প্রকাশ করতে শেখায়।  মানুষ নিজের আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে। সবার সব কাজ আপনার ভালো লাগবে না অথবা সবার চিন্তা ধারা আপনার সাথে মিলবে না এইটাই স্বাভাবিক। আপাতদৃষ্টিতে কারও কোন কাজ আপনার ভালো নাই লাগতে পারে। কিন্তু তাই বলে সবার সাথে কনফ্লিক্টে জড়ানো নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আরেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাপারটা দেখলে হয়তো অনেক কনফ্লিক্ট এর সমাধান হয়ে যায়। মানুষ নিজেকে যখন ভালভাবে বুঝতে শিখে, নিজের ব্যাপারে তার ধারণা যত স্পষ্ট হয়, নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়া তার পক্ষে তখন সহজ হয়। Positive living এর জন্য emotional literacy  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে আশেপাশের মানুষকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য জরুরি। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি না বুঝে সবসময় নিজের মতামত দেয়াটা সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

কিভাবে নিজের emotional literacy বাড়ানো যায়

ফ্রেঞ্চ সাইকোথেরাপিস্ট Claude Steiner তার ‘Emotional Literacy’ নামক বইতে emotional literacy কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন।

১. নিজের অনুভূতিগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা

২.সহমর্মিতা বা empathy চর্চা অর্থাৎ অন্যের জায়গায় নিজেকে রেখে চিন্তা করা।

৩.নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ

৪.Emotional problem (depression/anxiety ইত্যাদি) থাকলে তা চিহ্নিত করে দূর করা

৫. সার্বিকভাবে Emotional literacy এর প্রয়োগ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া।

Emotional literacy শব্দটা আমাদের অনেকের কাছেই নতুন। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অনেক বিবাদ কমে যাবে শুধুমাত্র এই মানুষকে বুঝতে চাওয়ার চর্চা করার মাধ্যমে।

(সামিরা মাহজাবিন)

পারিবারিক বন্ধন

Share

(ঘটনা ১)

নাহিদা বেগম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা। তার স্বামী শরীফ সাহেব একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত‌ আছেন। তাদের একমাত্র সন্তান সাকিব ঢাকার একটি স্বনামধন্য কলেজে পড়ছে। তিনজনের এই ছোট্ট পরিবারে সবার আগে দিন শুরু হয় নাহিদা বেগমের। প্রতিদিন সকালে উঠে স্বামী-সন্তানের জন্য নাস্তা তৈরি করে নিজের স্কুলে যাওয়ার জন্য তিনি রেডি হন। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেই বাসার অন্যান্য কাজে লেগে যান। সারাদিনে যেন মুহূর্তের বিশ্রাম নেই। শরীফ সাহেব আর সাকিবকে ঘিরেই তার জীবন। সাকিবের কলেজ ছুটির পর কোচিং শেষে বাসায় আসতে আসতে বিকাল হয়ে যায়। বিকালে সাকিবের প্রিয় কাজ কলোনির বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা। বাসায় থাকলেও সে প্রায় সময় নিজের রুমে গেমিংএ মশগুল থাকে। শরীফ সাহেব লক্ষ্য করলেন নাহিদা ইদানিং বেশ খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছেন। তিনি ভাবলেন ছেলে হয়তোবা কিছু করেছে, এইজন্য তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তিনিও নিজের মতই থাকেন। নাহিদার কাছে নিজেকে দিন দিন অনেক একা লাগে। ছোটখাটো ঘটনায় তিনি ইদানিং নিজের আবেগকে সামলে রাখতে পারেন না।

(ঘটনা ২)

প্রিয়াঙ্কা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। তার বাবা মা দুজনেই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং তাকে ঠিকমত সময় দিতে পারেন না। প্রিয়াঙ্কার টিচার ইদানিং লক্ষ্য করছেন সে ঠিকমতো পড়া শিখছেনা। তিনি প্রিয়াঙ্কাকে বেশ কয়েকবার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, তার বাসায় কেউ না থাকলে তার ভীষণ ভয় করে এবং সে ভয় এড়ানোর জন্য পড়া শেষ না করেই ঘুমিয়ে যায়।

প্রিয় পাঠক, নাহিদা বেগম আর প্রিয়াঙ্কার ঘটনা দুটি আমাদের অতি ব্যস্ত শহুরে জীবনে অজানা কিছু নয়। আমরা সবাই নিজ নিজ জীবনে এত ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি যে আমাদের সবচেয়ে আপনজনের জন্যই আমাদের কাছে সময় নেই। শুধু নাহিদা বেগমই না আমাদের চারপাশে অনেক মা আছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে নিজের পরিবারের জন্য দিনরাত কাজ করে যান। অথচ পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছ থেকে তারা তাদের প্রাপ্য সময়টুকু‌ পান না। অথবা প্রিয়াঙ্কার মত অনেক শিশুরই ভয় আর একাকীত্বের মধ্যে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন পরিবারের সব সদস্য মিলে একসাথে টিভিতে কোন অনুষ্ঠান দেখতেন অথবা ছুটির দিনে একসাথে বেড়াতে যেতেন। সেই ‘পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম’ এখন ব্যস্ততা আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একপ্রকার হারিয়ে গিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী Zygmunt Bauman আধুনিক সমাজকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য ‘liquid modernity’ টার্মটি ব্যবহার করেছেন। ব’ম্যানের ভাষ্যমতে liquid modernity বলতে বুঝায়, আধুনিক সমাজের সম্পর্কগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সম্পর্কগুলোর গভীরতা কমে যাচ্ছে। তার বই ‘liquid love’ এর অন্যতম মূল বিষয়বস্তু হল ‘fraility of human bonds’ বা মানুষের জীবনে সম্পর্কের ভঙ্গুরতা। সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, traditional family values এখন অনেকটাই বিলীন। এর ফলেও সমাজে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

একজন মানুষের জীবনে একাকীত্ব, হতাশা, ডিপ্রেশন, মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রতিরোধ করা সম্ভব সুস্থ পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে। পরিবারের সদস্যদের একে অপরের সাথে সময় কাটানো সদস্যদের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করে আর সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন মানসিক সুস্বাস্থ্যের অন্যতম নিয়ামক। আপনার পরিবারকে সময় দিন এবং পরিবারের সদস্যদের বোঝার চেষ্টা করুন। পরিবারের কারও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে অবহেলা না করে তার সাথে কথা বলুন এবং সমস্যা জানার চেষ্টা করুন। হয়তোবা আপনার অনেক কাছের কেউ মানসিক ভুগছে। তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনবোধে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং সেবা নিন। পরিবারের প্রতি যত্নশীল হওয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব।

মানুষের জীবনের সূচনা হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। তাই ভবিষ্যত জীবনে যত ব্যস্ততাই আসুক, আমাদের পারিবারিক বন্ধন যেন অটুট থাকে।

( সামিরা মাহজাবিন)

মনের দানব

Share


মিলি তার বন্ধুদের সাথে পহেলা বৈশাখের দিন খুশি খুশি মনে ঘুরতে বের হয়েছে। রমনা বটমূলে বছরকে বরণ করে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে দিনটি  বন্ধুদের সাথে চমৎকার ভাবে কাটায় সে। কিন্তু বিকালের দিকে মিলি হঠাৎ করে তার বন্ধুদের হারিয়ে ফেলে এবং ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায়। মিলি ভীড়ের মধ্যে কিছু দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে যারা খুবই নোংরাভাবে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান স্পর্শ করে। মিলি যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। মিলি ভিড়ের মধ্যে হাজার চিৎকার করলেও কারো সাহায্য পায়নি। এরপর পার হয়েছে বেশ কয়েক মাস। এখনো মিলির মনে সেই ঘটনাটি জীবন্ত। ঘোরের মধ্যে থাকে সে; বারবার এই ঘটনাটি মনে হতে থাকে তার এবং মনে হয় আবার বুঝি তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে এবং ভিড়ের অবস্থান জীবন্তভাবে তার কল্পনায় ভেসে উঠে। মিলি রাস্তায় বের হলে মনে হতে থাকে এই বুঝি কেউ তার গায়ে হাত দিলো। রাতে ঘুম হয় না, ঘুমালেও মাঝেমধ্যেই দুঃস্বপ্ন দেখে তাকে কেউ বাজে ভাবে স্পর্শ করছে এবং স্বপ্নগুলো সত্যি মনে হয়। এইভাবে রাতে প্রায়ই ঘুম ভাঙ্গে তার। তখন মিলির ঘাম হয় ও শরীর কাঁপতে থাকে।

রুবেল উপকূলীয় এলাকায় থাকে যেখানে কয়েক বছর পরপর ঘূর্ণীঝড়ের আগমন খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। একবার রুবেলের এলাকায় ঘূর্ণীঝড় সিডর আঘাত হানে যার ফলে রুবেল তার বাবা এবং তার সর্বস্ব হারায়। এর পর খোলা আকাশের নিচে ছাড়া থাকার আর কোন উপায় ছিল না তার। সিডরের পর রুবেলের ঘুমের সমস্যা প্রকট হয়ে যায়, স্মৃতিবিভ্রম হয়, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে এবং হালকা ঝড় হলেই ভয়ে অস্থির হয়ে যায় এই ভেবে আবার হয়তো তার বাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়ে যাবে এবং সে পথে বসে যাবে। সারাক্ষণ রুবেল তাই উদ্বিগ্ন থাকে। এতে তার দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাঘাত ঘটছে।

আমরা উপরে মিলি এবং রুবেলের যে অবস্থা দেখলাম, তাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি বলে। একটি দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে যখন কেউ সেই ঘটনা নিয়ে ভয় বা আশংকা অনুভব করে যেটার প্রভাব শারীরিক ও মানসিকভাবে তার ওপর পড়ে, তখন তাকে পিটিএসডি বলা হয়। সাধারণত একটি দুর্ঘটনার পর আমরা সেই ঘটনা নিয়ে কিছুদিন চিন্তা করতে থাকি। দুর্ঘটনাটি আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেললেই কি আমরা সেটিকে ডিসঅর্ডারের আওতায় আনবো?-না, দুর্ঘটনার রেশ থেকে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ব্যপার হলেও সেটির প্রভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাঘাতগ্রস্থ হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। দুর্ঘটনার ১ মাস পরেও যদি কোনো ব্যক্তি মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে না পারে এবং এটি যদি পরবর্তী কমপক্ষে এক মাস ধরে তার প্রতিদিনের কাজে কর্মে প্রভাব ফেলতে থাকে এবং এর সাথে সাথে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ করতে থাকে তখনই সেটিকে আমরা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের কাতারে ফেলতে পারি।

আমরা মিলি ও রুবেলের মধ্যে যে লক্ষণগুলো দেখতে পাই যেমন ঘুমে ব্যাঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, কল্পনায় ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, দৈনন্দিন জীবনের ব্যাঘাত ঘটা এবং শারীরিক প্রভাব পড়া। তাদের মধ্যে সেই দুর্ঘটনার প্রচুর ফ্ল্যাশব্যাক হয়, মনে হতে থাকে আবার হয়তো তার সাথে ঘটনাটি ঘটছে। মিলির সাথে যৌন নিপীড়ন বা রুবেলের সর্বস্ব হারানোর ফলে তাদের মধ্যে ভয় ও আশংকা বিরাজ করে যার কারণে তাদের শরীরে বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়। ঘাম, দ্রুত নিঃশ্বাস, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, সাময়িক উচ্চ রক্তচাপ ইত্যদি উপায়ে শারীরিকভাবে প্রভাব ফেলে। তাই বলা হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তিরা ভুগে থাকে।  এমনকি তাদের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনা ঘটলে বা শুনলে তারা এড়িয়ে যায় বা রিএক্ট করে ফেলে কারণ ব্যাপারটা তারা সহজভাবে নিতে পারে না।

বিভিন্ন ভাবে পিটিএসডি থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন থেরাপি যেমন কগনিটিভ-বিহ্যাভিউরাল থেরাপি, এক্সপোজার থেরাপি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট থেরাপি, হিপনোথেরাপি, রিল্যাক্সেশন থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি বা গ্রুপ থেরাপি দিয়ে থাকে। থেরাপির সাথে সাথে কাউন্সেলিং ও করা হয় যাতে করে কথা বলার মাধ্যমে সেই ব্যাক্তি হালকা অনুভব করতে পারে। নিয়মিত থেরাপি ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে পিটিএসডি ভালো হয়।

সবশেষে বলা যায়, পিটিএসডি আক্রান্ত ব্যাক্তি যদি পারিবারিক সাপোর্ট পায় এবং কাছের মানুষ যদি তাদের স্ট্রেসের সময় পাশে থাকে, তাহলে তাদের দৈনন্দিন জীবন সহজ হয় এবং পিটিএসডি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সহজভাবে।

(নুজহাত জাহানারা)

লোকে কী বলবে!!!

Share


হাসান অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। ছোটবেলা থেকেই একটূ লাজুক প্রকৃতির ছেলে। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও তেমন অংশ গ্রহণ করেনা। বন্ধুদের আড্ডায়ও চুপচাপ। আসলে কথা বলতে ভয় পায়- যদি বন্ধুরা ঠাট্টা করে বসে! ক্লাসরুমে টিচার পড়ানোর সময় কোনোকিছু বুঝতে না পারলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে ভয় পায়। ভাবে, যদি তার ক্লাসমেটরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে! অথবা যদি নার্ভাস অবস্থায় প্রশ্ন করেও বসে তখন প্রশ্ন করতে যেয়ে কথা আটকে যাওয়া কিংবা তোতলানোর ফলে শিক্ষক যদি তাকে তাচ্ছিল্য করেন! ধুর! থাক না, কী দরকার! যার ফলে আর প্রশ্ন করা হয়না। ক্লাস শেষে অনেক বিষয় নিয়েই কনফিউশন থেকে যায় হাসানের।


মৌমিতা বেশ ভালো গান গায়। আজ প্রথমবারের মত সে কলেজ ফাংশনে গান গাইবে। একটু পরেই স্টেজে তার নাম ঘোষণা হবে। কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছে। যদি গানের লিরিকস বা টোন ভুল হয়ে যায়!! কী একটা লজ্জাজনক বিষয়! স্টেজে ওঠার পর হলভর্তি মানুষ দেখে ভয়টা যেন আরো জাঁকিয়ে বসলো মৌমিতার। স্টেজে উঠে ভুল গান গাওয়া! ছিঃ ছিঃ লোকে কি বলবে! হাত পা কাঁপছে মৌমিতার, গলা শুকিয়ে আসছে, হাত থেকে মাইকটা পড়েই গেলো।

এই মৌমিতা বা হাসানের মত অনেকেই আছে যারা কিনা এইরকম জনসম্মুখে কথা বলতে কিংবা যেকোনো কাজ করতে ভয় পান কিংবা অস্বস্তি অনুভব করেন। নিজেদের মতামত কিংবা পারফর্মেন্স সম্পর্কে অহেতুক দুশ্চিন্তা করেন। যদি ভুল হয় তো মানুষ কি বলবে!!! এই টেনশন কাজ করতে থাকে নিজের ভিতর। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে আগে “সোশ্যাল ফোবিয়া” বলে উল্লেখ করলেও এখন এটিকে “সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার” নামেই অভিহিত করে থাকেন। যাদের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার রয়েছে, তারা সামাজিক সিচুয়েশনগুলোতে নিজেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। তারা মানুষ কি ভাববে এই নিয়ে বিব্রত বোধ করেন। আমরা যদি সোশ্যাল এ্যাংজাইটির উদাহরণ নিয়ে কথা বলতে চাই তাহলে প্রধানত এই পাবলিক প্লেসে কথা বলা কিংবা খাওয়াদাওয়া করার কথা আসবে। স্টেজ পারফরমেন্স এর বেলায় ব্যক্তির মধ্যে এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কাজ করা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। ২০০৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া অস্ট্রিয়ান লেখিকা এলফ্রিদে ইয়েলিনেক স্টকহোমের আড়ম্বরপূর্ণ নোবেল প্রদান অনুষ্ঠানে আসেননি। তার সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ছিলো বিধায় তিনি তার নোবেল প্রাইজ গ্রহণ করেন একটি ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এতে আমরা হয়তো বুঝতে পারছি এই ডিসঅর্ডারটি যেকোনো মানুষের মধ্যেই থাকতে পারে। কিন্তু এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি আমাদের কেন হয়ে থাকে?


গবেষকরা বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির কারণ হিসেবে। তারা বলেন, এমন অনেকে আছেন যারা নিজেদের সম্পর্কে কিছু ধারণা নিজের মধ্যে লালন করেন, যেমন তারা হয়ত দেখতে আকর্ষণীয় নন কিংবা তারা যেকোনো কাজে দক্ষতার পরিচয় রাখতে পারবেন না অথবা দক্ষতার সাথে কোনো কাজ করতে গেলে তারা ব্যর্থ হবেন এবং মানুষ তাকে তার ব্যর্থতার জন্য ব্যঙ্গ করবে। তারা মনে করেন যে সামাজিক কোনো সিচুয়েশনে তার ব্যবহারের ফলে মানুষ তাকে তিরস্কার করবে। এই ধরণের নানারকম চিন্তা ভাবনা ব্যক্তির ভিতর গেঁথে যাওয়ার ফলেই মূলত এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির সূচনা হয়।


সোশ্যাল এ্যাংজাইটি আমাদের বিশ্বে বেশ সাধারণ একটি বিষয়। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় আমেরিকায় প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭ জনের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি রয়েছে। পুরুষদের চাইতে মহিলাদের এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগার হার বেশি। প্রতি ২ জন পুরুষের অনুপাতে ৩ জন মহিলা এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটির মধ্য দিয়ে যায় (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ, জানুয়ারী, ২০১৮) বাংলাদেশে এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষের হার শতকরা ৪ ভাগ। (ডেইলি স্টার, জুন, ২০১৮)


সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষজনের মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা যায় সেগুলোর ভেতর কথা বলায় জড়তা অনুভব করা, নার্ভাস ফীল করা, ঘাম হওয়া, কাঁপুনি অনুভব করা  কমন। অনেক সময় বেশি সংখ্যক মানুষের সামনে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা কিংবা নাচ-গান পারফর্মের সময় দুশ্চিন্তা অনুভব হওয়া কিংবা ভয় পাওয়া বিষয়টিকে “স্টেজ ফ্রাইট” (Stage Fright) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই স্টেজ ফ্রাইটের কারণ হচ্ছে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার। ব্যক্তি মনে করেন যে তিনি দক্ষতার সাথে পারফর্ম করতে পারবেন না এবং দর্শকরা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করবে; একজন স্টুডেন্ট মনে করে করে যে সে হয়তো ভালোভাবে তার এ্যাসাইনমেন্টটি রুমভর্তি অন্যান্য স্টুডেন্টদের সামনে প্রেজেন্ট করতে পারবে না। ফলে সে ভীত হয়ে পড়ে।


তবে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কোনো দুরারোগ্য বিষয় নয়। গবেষকরা এর প্রতিকার বের করেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা একে “এক্সপোজার থেরাপী” নামে উল্লেখ করে থাকেন যা কিনা বিভিন্ন ধরণের ফোবিয়া ট্রিটমেন্টের সময় ব্যবহার হয়ে থাকে। থেরাপিস্টরা বলেন সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা ব্যক্তিকে বেশি বেশি সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তার এই অহেতুক ভয়টি তিনি কাটিয়ে উঠছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া সাধারণ ভাবে হাসান কিংবা মৌমিতার মত সোশ্যাল এ্যাংজাইটিতে ভোগা মানুষদের অন্যান্য পরামর্শ দেয়া হয়। যেমন ছোট গ্রুপে কথা বলা। যেহেতু তারা পরিচিত ও খুব কম মানুষের সামনে কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেহেতু প্রথমে তাদেরকে তাদের বন্ধুদের সামনেই কথা বলতে বলা হয়। এরপর হয়তো তাদের সেই গ্রুপে এক দুইজন অপরিচিত ব্যক্তিকে আনা হয়। এরপর আস্তে আস্তে সেই সংখ্যাটি বাড়ানো হয়। একে বলে গ্রুপ থেরাপি। এভাবে আস্তে আস্তে মানুষের সামনে কথা বলতে পারা ব্যাপারটা তাকে যেকোনো সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। গ্রুপ থেরাপিতে গ্রুপ মেম্বাররা ব্যক্তিকে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেন। তার প্রশংসা করেন যাতে ব্যক্তি কথা বলতে কিংবা গান গাইতে সাহস পান। মৌমিতার মত স্টেজ ফিয়ারযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য অনেক সময় থেরাপিস্টরা আয়নার মত খুব সাধারণ একটি বিষয় ব্যবহার করেন। ব্যক্তিকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে নিজেকে দেখে পারফরম করতে বা কথা বলতে বলা হয়। এরপর হয়তো দুই একজন মানুষের সামনে তাকে উপস্থাপন করা হয় কথা বলার জন্য। এভাবে আস্তে আস্তে সে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে ওঠা এবং কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই কথা বলা কিংবা যেকোনো কাজ করতে পারার কৌশল রপ্ত করে। আমরা বলছি না আপনি দুই-একবারের চেষ্টাতেই মোটিভেশনাল স্পীকারদের মত স্টেজ কাঁপিয়ে দিতে পারবেন। তবে এ্যাংজাইটি কাটিয়ে নিজেকে ভালোভাবে প্রেজেন্ট করতে পারাটাই এখানে বড় সাফল্য। এক্ষেত্রে সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কাটাতে ব্যক্তির চেষ্টা এবং ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে বড় উপায়। মূলত বারবার প্র্যাকটিসের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি এই সোশ্যাল এ্যাংজাইটি কেটে উঠতে পারে বলে মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা।

(আশিক মাহমুদ)