হিউম্যানিস্টিক থেরাপি

Share

থেরাপি বলতে সাধারণত এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে যেখানে একজন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত, দক্ষ ও লাইসেন্সধারী থেরাপিস্টের সহযোগিতায় মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো, যেমন-বিভিন্ন মানসিক সমস্যা,মানসিক আঘাত ইত্যাদি সমাধান করার পাশাপাশি নিজের ইতিবাচক চিন্তাকে ত্বরান্বিত করা ও কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিকে দক্ষভাবে মোকাবেলা করার উপায়গুলোর দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলোর জন্যে থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের থেরাপি ব্যবহার করে থাকেন। এটি মূলত থেরাপিস্টের ব্যক্তিগত চয়েস, রোগীর সমস্যার ধরণ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে থাকে। মানসিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে সকল থেরাপি প্রদান করা হয় তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম জনপ্রিয়ও থেরাপি হচ্ছে ‘হিউম্যানিস্টিক থেরাপি’।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপি কি?

হিউম্যানিস্টিক থেরাপি হলো এমন একটি থেরাপি যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব অনুভুতিগুলো বুঝতে, তার জীবনের অর্থের অনুভূতি লাভ করতে এবং নিজের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকগুলো বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। একজন হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্ট কোন ব্যক্তিকে থেরাপিস্টের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে একজন সম্পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাকে দেখার চেষ্টা করে থাকেন। এ থেরাপিতে ব্যক্তির মধ্যকার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য এবং আচরণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে। তাছাড়াও ব্যক্তির সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং আচরণগুলো তার নিরাময়ের ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি মানুষই জন্মগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ, সমবায় আচরণে বিশ্বাসী এবং গঠনমূলক।তারা বিশ্বাস করেন যে, মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্ভাব্যতা পূর্ণ করে থাকে। মানুষ তার প্রতিভা এবং সম্ভাব্যতাগুলোর স্বীকৃতি চায়। এজন্যে তারা নিজেদের দূর্বলতাগুলোর পাশাপাশি সবল দিকগুলোর জন্যেও অন্যের কাছে থেকে স্বীকৃতি আশা করে। এ ধরনের আচরণ মানুষকে সাহসী, স্বতঃস্ফূর্ত, এবং স্বাধীন হতেও সাহায্য করে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির লক্ষ্য

এ থেরাপির মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তির মাঝে তার নিজের সম্বন্ধে একটি শক্তিশালী সত্ত্বার সৃষ্টি করা, নিজের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে নির্ণয় করা যাতে করে সে তার জীবনের অর্থ বুঝতে পারে। এ থেরাপি ব্যক্তির স্বতন্ত্রতার উপর বেশি মনোযোগ দেয় এবং সেই সাথে নন- জাজমেন্টালভাবে ব্যক্তিকে থেরাপি দেয়া হয়ে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির ইতিহাস

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব এবং বি.এফ. স্কিনারের আচরণবিধির সীমাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হিউম্যানিস্টিক মনোবিজ্ঞান প্রবল হয়ে উঠেছিল। সক্রেটিস থেকে রেনেসাঁস- এ পুরো সময়কাল জুড়ে নিজের দক্ষতাকে উপলব্ধি এবং প্রকাশ করার প্রক্রিয়া, এবং ব্যক্তিদের সৃজনশীলতা, প্রতিভা প্রকাশের উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিলো। ১৯৪৩ সালে মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো মানুষের চাহিদা এবং অনুপ্রেরণাগুলোর উপর ভিত্তি করে একটি তত্ত্ব প্রদান করেন।

Carl Rogers
Carl Rogers

পরবর্তীকালে, ১৯৪৬ সালে কার্ল রজার্স ‘Significant aspects of client-centered therapy’ বা ‘ক্লায়েন্ট-সেন্টারড থেরাপি’ নামে একটি প্রকাশনা প্রকাশ করেন।এতে তিনি এমন একটি থেরাপির উল্লেখ করেন যেখানে একটি উষ্ণ ও সহায়্ক পদ্ধতিতে ক্লায়েন্টকে মানসিক সেবা প্রদান করা হতো। অবশেষে, ১৯৫০ দশকের শেষের দিকে মনোবিজ্ঞানীরা আচরণগত মনোবৈজ্ঞানিক থেরাপিগুলোর নেতিবাচক দিকগুলো অনুধাবন করতে পারেন। এই নেতিবাচক দিকগুলো অনুধাবনের মধ্যে থেকেই মূলত হিউম্যানিস্টিক থেরাপির মূলভাবনার সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। আব্রাহাম মাসলো এবং কার্ল রজার্সের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে হিউম্যানিস্টিক মনোবিজ্ঞান এবং হিউম্যানিস্টিক থেরাপীর সূত্রপাত ঘটায় যা তৎকালীন সময়ে মনোবিজ্ঞানে “তৃতীয় শক্তি” হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

কখন হিউম্যানিস্টিক থেরাপি ব্যবহার করা হয়?

আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে কমন সমস্যাগুলো নিয়ে হিউম্যানিস্টিক থেরাপি কাজ করে থাকে। এটি একজন ব্যক্তির সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করে থাকে। এটি সাধারণত যে সকল বিষয়ের উপর কাজ করে থাকে, তা হলো-

  • ডিপ্রেশন
  • প্যানিক ডিসঅর্ডার
  •  উদ্বেগ
  •  পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার
  •  সিজোফ্রেনিয়া
  •  মাদকাসক্তি
  •  সম্পর্কের সমস্যা
  • পারিবারিক ইস্যু
  • ব্যক্তিগত উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি।

এ থেরাপি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, লিঙ্গ সম্পর্কিত সামাজিক পরিবর্তনের তত্ত্বগুলিতেও প্রয়োগ করা হয় । এছাড়াও যারা নিজেদের বর্তমান সত্ত্বা নিয়ে সন্তুষ্ট নন, নিজের সত্ত্বার পূর্ণতা সম্পর্কে অনুভূতিহীন এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে সন্ধিহান, তারা এ থেরাপি থেকে উপকার পেতে পারেন।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

– সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন (Self-Actualization):

মানুষের তার নিজের পূর্ণ সম্ভাবনাকে উপলদ্ধি করতে পারাকেই মূলত এটি কেন্দ্র করে থাকে। মানুষ নিজে কি কি করতে সক্ষম তা বুঝতে পারা, জীবনের উদ্দেশ্য উপলদ্ধি করতে পারা, জ্ঞান আহরণ করা, তার নিজস্ব সত্ত্বাকে আলোকিত করা এবং নিজের এ আলোকিত সত্ত্বার মাধ্যমে সমাজের আর দশ জনের কল্যাণ করাকেই এটি নির্দেশ করে থাকে। থেরাপিস্ট ব্যক্তির মাঝে তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরো বেশি কার্যকর করে তোলার চেষ্টা করে থাকে।

– সমানুভূতিঃ

অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি,তার অনুভুতিগুলোর ব্যাপকতা,অবস্থান বোঝার ক্ষমতাকে সমানুভূতি বলা হয়ে থাকে।এটি হিউম্যানিস্টিক থেরাপির একটি অন্যতম অংশ।একজন হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টকে অবশ্যই সমানুভূতিশীল হতে হবে।এটি ব্যক্তি ও থেরাপিস্টের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়া সৃষ্টি করে থাকে যা থেরাপিকে কার্যকর হতে সাহায্য করে। এটি থেরাপিস্টকে যে কোন বিষয়ে ক্লায়েন্টের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে।সমানুভূতি ছাড়া থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের কাজ,চিন্তাগুলো বুঝতে অসমর্থ হয় এবং কেবলমাত্র থেরাপিস্টের দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্লায়েন্টকে দেখে থাকে যা এই থেরাপির আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

– ক্লায়েন্টকে শর্তহীনভাবে ইতিবাচক বিবেচনা করা :
ক্লায়েন্টকে নিঃশর্তভাবে বিবেচনা করার মাধ্যমে থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের প্রতি তার কেয়ার প্রদর্শন করে থাকে। এর মাধ্যমে ক্লায়েন্ট মনে করে যে, থেরাপিস্ট তার অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাল বা খারাপ হিসেবে বিবেচনা করছে না, বরং তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ক্লায়েন্ট থেরাপিস্টের সাথে তার কথাগুলো শেয়ার করতে আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকে, ক্লায়েন্ট তার আসল অনুভুতিগুলো আরো ভালভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং ক্লায়েন্ট ও থেরাপিস্টের মাঝে এক উষ্ণ প্রফেশনাল সম্পর্কের সৃষ্টি হয়।

– ক্লায়েন্টের সাথে সত্যতা ও আন্তরিক যোগাযোগ বজায় রাখা

বিভিন্ন ধরনের হিউম্যানিস্টিক থেরাপি:
হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের হিউম্যানিস্টিক থেরাপি ব্যবহার করে থাকে। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু থেরাপি হলো –
গেস্টাল্ট থেরাপি:
ফ্রেডরিক (ফ্রিৎস) পার্লস উদ্ভাবিত এ থেরাপিটি ব্যক্তির নিজস্ব সত্ত্বাকে চিনে নিতে, তার সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করে থাকে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে শেখে, নিজেকে মেনে নিতে শেখে। থেরাপিস্টরা এ থেরাপিতে সাধারণত ‘রোল প্লেয়িং’, ’স্কিলফুল ফ্রাস্ট্রেশন’ অনুশীলন করিয়ে থাকেন।
এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– সম্পর্কজনিত সমস্যা
– উদ্বেগ
– স্ট্রেস
– ডিপ্রেশন

ক্লায়েন্ট সেন্টারড থেরাপি:
এ থেরাপি ক্লায়েন্টের জন্যে একটি সহায়ক পরিবেশের সৃষ্টি করে থাকে যা তাদের আসল পরিচয় পুনরায় র্নির্মাণে সহায়তা করতে পারে। ক্লায়েন্টের আশেপাশের মানুষেরা তার যে কোন ব্যবহার বা কাজকে সবসময় ভাল বা মন্দ হিসেবে বিচার করে- এই দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত এ থেরাপিটির সৃষ্টিতে মুখ্য ভুমিকা রাখে। ক্লায়েন্ট তার নিজের সত্যিকার পরিচয় অনুধাবন করার মাধ্যমে নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে শেখে, চিনতে শেখে। একজনের সত্যিকারের পরিচয় পুনরায় র্নির্মাণের কাজটি সহজ নয় এবং এ জন্যে থেরাপিস্টকে অবশ্যই শর্তহীন ইতিবাচক ও সহানুভূতির কৌশলগুলির উপর নির্ভর করতে হবে।
এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– ডিপ্রেশন
– উদ্বেগ
– আত্মসম্মানবোধ কম হওয়া
– প্রচণ্ড শোকার্ত থাকলে
– ইটিং ডিসঅর্ডার
– নেশাজাত পানীয়তে আসক্তি

এক্সিস্টেনশিয়াল থেরাপি :
এ থেরাপিটি টেকনিক ভিত্তিক পদ্ধতির উপর জোর না দিয়ে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে কতিপয় ইস্যুগুলোকে সমাধান করার চেষ্টা করে থাকে। এ থেরাপিস্ট ব্যক্তিকে তার নিজের জীবনের ও জীবনের সমস্যাগুলোর দায়িত্ব নিজে নেবার জন্যে উৎসাহ দেয় এবং সেই সাথে জীবনকে বৃহৎ অর্থ ও মূল্যের সাথে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে।

সাইকোসিন্থেসিস:
চেতনার একটি উচ্চতর, আধ্যাত্মিক স্তর আবিষ্কার করা মূলত সাইকোসিন্থেসিসের লক্ষ্যে বলে বিবেচিত হয়।

সলিউশন ফোকাসড ব্রিফ থেরাপি:
এ থেরাপিকে সলিউশন ফোকাসড থেরাপি বা ব্রিফ থেরাপিও বলা হয়ে থাকে। এ থেরাপিতে ব্যক্তি জীবনে কি অর্জন করতে চায় তার উপর বেশি জোর দেয়া হয়ে থাকে। থেরাপিস্ট ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার নিজস্ব শক্তিগুলোকে এবং সীমাবদ্ধতাগুলোকে বের করতে পারে। যে সকল ব্যক্তি অত্যন্ত লক্ষ্য কেন্দ্রিক এবং যারা আসলেই নিজের মাঝে পরিবর্তন আনতে চায়, তাদের জন্যে এ থেরাপিটি সহায়ক হতে পারে।

কম্প্যাশন ফোকাসড থেরাপি:
এ থেরাপিটি ব্যক্তিকে তার নিজের প্রতি ও সেই সাথে অন্যের প্রতি সহায়ক ভঙ্গিতে অনুভব করতে ও ব্যবহার করতে শেখায়। এ থেরাপিটি প্রাত্যাহিক জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা শেখানোর পাশাপাশি আত্ম সমালোচনার প্রতি তুলনামূলক কম প্রবণ হতে সহায়তা করে।

এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– শৈশবকালীন অবহেলা, অপব্যবহার এবং বুলিংয়ের শিকার হওয়া
– নিজেকে অন্যের চেয়ে কম হিসেবে মূল্যায়িত করা
– উদ্বেগ
– কাউকে বিশ্বাস করা সংক্রান্ত ইস্যু
– কখনোই নিরাপদবোধ না করা ইত্যাদি

এসকল কতিপয় হিউম্যানিস্টিক থেরাপির মাধ্যমে একজন দক্ষ থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের সহযোগিতায় একজন ব্যক্তি তার সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

 

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা

এক কাপ বিষণ্ণতা গিলে খেলো আমাদের।

Share

হৈমর জানালার কাঁচে প্রচণ্ড রকমের মন খারাপের একটা বিকেলের রোদ এসে পড়েছে। হৈমর তাই ভীষণ রকমের মন খারাপ। মন খারাপের পিছনে সঙ্গত কোন কারন নেই। দুপুরের দিকে হৈম একবার ঘুমিয়েছিলো। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই কেমন জানি ভালো লাগছে না। কেমন যেন হতাশ হতাশ লাগছে। অর্থহীন মনে হচ্ছে সবকিছু। এই গাঢ় বিষাদটা হৈমর স্বভাবে নিয়ত। মাঝেসাঝেই আজকাল এমন মন খারাপ হয়ে থাকে। কিন্তু খুব গভীরে তলিয়ে দেখতে গেলে আবিষ্কার করা যাবে, এই মন খারাপের পিছনে কোন শক্তিশালী কারন নেই। আদতপক্ষে ছোটখাটো কারনও নেই।

এই যে হৈমর মন খারাপ প্রসঙ্গ টেনে আনলাম। বিকেলের কাঁচে করলাম এক টুকরো বিষণ্ণতার গল্প। এখন যদি প্রশ্ন করি, বিষণ্ণতা কি? এর যথোপযুক্ত জবাব আমরা কয়েকটা প্রশ্ন করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে দেখি।

তো, বিষণ্ণতা কি? এক কথায় উত্তর হতে পারে, বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন হলো মানসিক ভাবে অসুস্থ অনুভব করা। আরো একটু গুছিয়ে বলা যায়, বিষণ্ণতা এক প্রকার মানসিক ব্যাধি যার কারনে কোন একটা ব্যাক্তির মন-মেজাজ চরমভাবে অবনতি ঘটতে থাকে। তখন আর কিছুই ভালো লাগেনা। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হয়না। কোন কাজ করতে ইচ্ছে হয়না। মারাত্মক অবস্থায় বিষণ্ণ ব্যাক্তির কাছে বেঁচে থাকাটাই হয়ে পড়ে প্রচণ্ড রকমের পেইনফুল। তখন তার ভীষণ রকম ভাবে মরে যেতে ইচ্ছে করে। কি ভয়ংকর কথা!

এরপরের প্রশ্ন। বিষণ্ণতা কেন হয়? জবাবে বলা যায়—বিভিন্ন রকমের ঘটনার ফলাফল হতে পারে বিষণ্ণতার পিছনে কারন। অফিসে অনেক খাটখাটনি করে একটা প্রজেক্ট দাড় করানোর পরে বসের ঝাড়ি খেলে বিষণ্ণতা আসতে পারে। অনেক পড়াশুনা করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলেও আসতে পারে! প্রেমে বিফল হয়ে আসতে পারে। আর দ্বিতীয় যে কারনে বিষণ্ণতা আসতে পারে সেটা হলো, একঘেয়েমিতায়। দিনের পর দিন একটা নির্দিষ্ট কাজ করেই যেতে যেতে কেউ হয়ে উঠতে পারে ডিপ্রেসড!

বিষণ্ণতা আসার পিছনের কারন না হয় বোঝা গেলো। এখন আমরা আরো একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করি। বিষণ্ণতা হয় কেমন করে? আরো একটু নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, মানুষ আসলে বিষণ্ণতা ব্যাপারটা অনুভব করে কিভাবে? এই যে আমাদের আনন্দের অনুভূতি হয়, ভয়ের অনুভূতি হয়, ঠিক তেমনই বিষণ্ণতার অনুভূতি হয়। এই অনুভূতি ব্যাপারগুলো কাজ করে আসলে কিভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য আমরা একটু মানুষকে কাটাছেড়া করবো। খুব গভীরে যাবো না। একটা লজিকাল পয়েন্ট থেকে আমরা বিষণ্ণতা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করবো। কারন আমরা যদি এটা জেনে ফেলতে পারি, ব্যাপ্তর হলো, না। পারিনা। একেবারেই কি পারিনা? উত্তর হলো, একেবারেই পারিনা এই কথাটা সত্য না। আমরা একটা ভুল তথ্য মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়ে একটা প্রভাব ফেলতে পারি। We can’t control but can put an effect.

বুঝিয়ে ভেঙে বলছি। মনে করি একটা বাজে ঘটনা ঘটলো। ধরা যাক রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে গেলো কারো। আমাদের দেশে তরুণ সমাজের কমন একটা সমস্যা। মস্তিষ্ক ঘটনাটা বিশ্লেষণ করে দেখলো ব্যাপারটা দুঃখজনক। একটা রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে গেলে মানুষের কষ্ট পেতে হয়। মস্তিষ্ক তখন অ্যামিগডালার রিসেপ্টরগুলো থেকে দুঃখের নিউরো ট্রান্সমিটারগুলো রিলিজ করতে থাকলো। সেগুলোর মাঝে রিয়্যাকশনের ফলাফলে যে বৈদ্যতিক তরঙ্গ উদ্ভব হলো, মস্তিষ্ক সেই তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারলো, এটা দুঃখের অনুভূতি। তখন ওই অনুভুতিটা অনুভব হতে থাকলো। এখন কেউ যদি অনবরত ভাবতে থাকে, একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেছে। তার রিলেশন ভেঙে গেছে। রিলেশন ভেঙে গেলে দুঃখ পেতে হয়, তাহলে সেই ব্যাপারটাই ঘটবে। সে দুঃখ পাবে।

কিন্তু কেউ যদি মস্তিষ্কে কায়দা করে এই তথ্যটা ঢুকিয়ে দিতে পারে, দুঃখের মত কোন ঘটনা ঘটেনি। কিংবা বিষণ্ণ হওয়ার কিছু নেই। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, এই ব্যাপারটা ঘটতেই পারে। মস্তিষ্ক এই তথ্যটা গ্রহণ করে নিলে তার অ্যামিগডালা আর ওই হরমোন ক্ষরণ করবে না। কাজেই তার বিষন্নতার ওই বাজে অনুভুতিটা অনুভূত হবেনা।

তাহলে ব্যাপার যেটা দাঁড়ালো সেটা হলো, আমরা বিষণ্ণ হই কারন আমরা বিষণ্ণ হতে চাই। আমরা আনন্দ পাই কারন আমরা আনন্দ পেতে চাই। আমরা দুঃখ পাই কারন আমরা দুঃখ পেতে চাই।

কথা হচ্ছে, যেভাবে বলে ফেললাম, এই ব্যাপারটা কি তাহলে এতই সোজা। না, এত সোজা না। মস্তিষ্কে একটা অনুকূল তথ্য ঢুকিয়ে দিতে পারাটা সোজা কোন ব্যাপার না। আমাদের সাবকনসাস মাইন্ড এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কনসাস অংশ দিয়ে আমরা এই সাবকন্সাস এর উপর একটা প্রভাব ফেলতে পারি। That might help.

এখান থেকেই মেডিটেশন নামের একটা আলাদা রকমের আর্টস এর উদ্ভব। সাবকন্সাস মাইন্ডের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু আমরা আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে ছোটখাটো কিছু লাইফ হ্যাকিং শিখে রাখলে আলাদা করে মেডিটেশনের চর্চার আর দরকার পড়বে না।

প্রথমত সিরিয়াস ভাবে সব ব্যাপার গ্রহণ করার দরকার নেই। আমরা যে ইউনিভার্সে বাস করি সেখানে এনট্রপি বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্যাওস থিওরির মত করে এক গুচ্ছ ঘটনা প্রবাহ হয়। সেই কারনবশত যেকোন ঘটনা ঘটতে পারে। ঘটনাগুলো আমাদের নরমাল ভাবে গ্রহণ করে নেওয়া শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত যখনই মন খারাপ হবে, মস্তিষ্কের মাঝে এই ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দিতে হবে, আরেহ আমার মন খারাপ হ০রটা কাজ করে কিভাবে? আমরা অবশ্যই জেনে ফেলতে পারবো কিভাবে ব্যাপারটাকে কাজ না করানো যায়।

অনুভূতির প্রশ্ন সাপেক্ষে বলি, আমাদের হিউম্যান বডিতে আমরা যেকোন কিছু অনুভব করি অবশ্যই নিউরন বা স্নায়ুকোষের মাধ্যমে। আমাদের সম্পূর্ন হিউম্যান বডি কিংবা সম্পূর্ন মস্তিষ্ক জুড়েই কিছু কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হতে থাকে। এই কেমিক্যালগুলোকে বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ। নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজগুলোর মাঝে রিঅ্যাকশন সম্পন্ন হয়ে গেলে তার ফলাফল হতে পারে একটা বৈদ্যতিক সিগন্যাল বা ইলেকট্রনের ফ্লো। সেই সিগন্যাল স্নায়ুকোষের মাঝ দিয়ে সঞ্চরণশীল হয়ে নিউরাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে বিভিন্ন যায়গা পৌঁছে যায়। মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট অংশে সেই সিগন্যাল এনালাইসইস হয়ে আমরা বিভিন্ন রকমের অনুভূতি পেতে পারি কিংবা স্মৃতি সম্পর্কে অবগত হতে পারি অথবা পারি চিন্তা করতে।

কাজেই ইমোশন বা অনুভূতি যাই বলি না কেন, এই ব্যপারটা ঘটার পিছনে অবশ্যই কোন না কোন নিউরো ট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। নিউরো ট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মাঝে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন না ঘটলে বৈদ্যতিক সিগনাল তৈরি হবেনা। সেই সিগন্যাল নিরোনের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্কের একটা সার্টেইন অংশে পৌছাবে না। সেই সার্টেইন অংশে বৈদ্যতিক সিগন্যালটা এনালাইসিস হবেনা। কাজেই কেউ সেই ইমোশন সম্পর্কে কোন রকমের উপলব্ধি করার সুযোগ হবেনা।

আমাদের মানব মস্তিষ্কের একটা মূল্যবান অংশ আছে অ্যামিগডালা। এই অংশটা আমাদের যাবতীয় রকমের ইমোশনের চর্চা করে। অর্থাৎ মানুষের সুখ-দুঃখ, রাগ-ক্ষোভ, অভিমান-কষ্ট এইসব এনালাইসিস হয় এই অংশটাতে। এমনকি ভালোবেসে চুমু খেয়ে ‘ছিঃ যাহ!’ ওই ব্যাপারটাও মেটানোর দায়িত্বটা অ্যামিগডালার কাজ।

একটা মানুষ যখন প্রচণ্ড সুখের অনুভূতি অনুভব করছে, তার মানে তখন তার হিউম্যান বডিতে কিছু স্পেসেফিক নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মাঝে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন হচ্ছে। রিয়্যাকশন শেষে বৈদ্যতিক সিগন্যালগুলো নিউরাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে অ্যামিগডালাতে পৌছাচ্ছে। এবং সেখানে গিয়ে সিগন্যালগুলো এনালাইসি হয়ে মানুষটা সুখের অনুভূতিটুকু অনুভব করতে পারছে। কাজেই আমরা সোজা সাপটা ভাবে বলে ফেলতে পারি, আমরা যাকিছু অনুভব করি তাকিছু হলো কেমিস্ট্রি। কেমিক্যাল রিয়্যাকশন। বিষণ্ণতাও তাই। হিউম্যান বডিতে সার্টেইন কিছু নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মিলেমিশে এক কাপে বসে কফি খাওয়া।

তবে ডাক্তারি কথাবার্তা সারার সুবাদে একটু বলে নিই, শুধু যে অ্যামিগডালাতেই বিষণ্ণতা অনুভূত হয়—ব্যাপারটা এমন না। অ্যামিগডালা ঘিরে রাখে হাইপোথ্যালামাস নামের বিরাট একটা অংশ। এই যায়গাটাতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের মত ব্যাপারগুলো বিশ্লেষিত হয়। কেউ কেউ মনে করে বাইপোলার ডিস অর্ডার নামের যে ভয়বাহ মানসিক সমস্যাটা আছে, সেটাও হাইপোথ্যালামাসের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি।

আগেই বলেছি কিনা—এই যে আমরা নিউরো ট্রান্সমিটার নামে একটা ভারিক্কি শব্দ বলে চলেছি, এই জিনিসটাকে আমরা হরমোন নামে বেশি চিনি। যদিও কেবল মাত্র ‘হরমোন’ একাই সকল রকমের নিউরোট্রান্সমিটার নয়। যাহোক, হাইপোথ্যালামাস অংশটা পিটুইটারি গ্রন্থি আর এড্রেনাল গ্রন্থির সাথে মিলেমিশে একটা ট্রায়ো গঠন করে। যেটাকে বলা হয় হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-এড্রেনাল(HPA). এখান থেকে নির্গত হয় CRH নামের একটা হরমোন। পাটি বাংলায় নাম—কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং-হরমোন। তো এই ট্রায়ো থেকে যে হরমোনাল কার্যকালাপটা হয় সেটাই মানসিক চাপ কিংবা ডিপ্রেশনের পিছনে দায়ী বলে মনে করা হয়। সাদা ভাষায় আমরা যে ট্রায়োর কথা বললাম, সেই ট্রায়ো থেকে যদি হরমোনাল কার্যকালাপ সম্পন্ন হয়ে বৈদ্যতিক সিগন্যাল উৎপন্ন হতে পারে, তাহলেই একটা মানুষ বিষণ্ণতার অনুভূতি অনুভব করবে।

শুধু যে এই একভাবে বিষণ্ণতার অনুভূতি অনুভব হয় তা নয়, আরো অনেক রকমের থিওরি আছে। আরো অনেক রকমের গ্রন্থি আর হরমোনাল ক্রিয়াকালাপের ফসল হিসেবে একটা মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে।

এই পর্যন্ত যারা ধৈর্য ধরে পড়তে পেরেছে তারা মহাপুরুষ। এখন আর বায়োলজিক্যাল কথাবার্তা বলবো না।

মন বলতে আমরা যে ব্যাপারটা বায়োলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারি, তা হলো মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ করা অংশের সমন্বিত একটা সিস্টেম। অর্থাৎ নিউরো সিগন্যাল বিশ্লেষণ হওয়া অংশগুলোকে নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা। আমরা প্রতিনিয়ত যেসব ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়ে যাই। সেগুলো আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে। তার প্রেক্ষিতে গ্রন্থিগুলো থেকে বিভিন্ন রকমের হরমোনের ক্ষরণ হয়। হরমোনাল বিক্রিয়াগুলো জন্ম দেয় আমাদের সন্ধ্যের আকাশে অথবা জানালার কাঁচে যত খুঁচরো অনুভূতি জমা হয়, সেইসবের।

আমরা নাহয়, বুঝলাম অনুভূতি কি জিনিস। সেটা কাজ করে কিভাবে? সাথে সাথে একটু বোঝার চেষ্টা করলাম, বিষণ্ণতা ব্যাপারটা কি? বিষণ্ণতা আসেই বা কেমন করে। এখন কথা হলো, এই থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়টা আসলে কি?

এটাই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমরা আমাদের এতসব বিষণ্ণতা দূর করবো কিভাবে? সোজা ভাষায় কয়টা কথা বলার চেষ্টা করবো। প্রথম কথা হলো, আমাদের মাঝে যে নিউরো ট্রান্সমিটারের বিক্রিয়াগুলো হয়, এগুলো কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? উতনি তো। আমি তো ভালোই আছি। বিষণ্ণতার সময়গুলোতে নিজেকে বোঝাতে হবে, আমি বিষণ্ণতা অনুভব করছি না। বিপরীত একটা তথ্য ঢুকিয়ে দিতে হবে মস্তিষ্কে। এই যেমন আমি আনন্দ পাচ্ছি। কিংবা এখন এক কাপ কফি খেলেই আমার মন ভালো হয়ে যাবে।

পুরো ব্যাপারটাই মস্তিষ্কের মাঝে তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়ার চর্চা। সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আমরা বিষণ্ণ হই কারন আমরা বিষণ্ণতা অনুভব করতে চাই। একবার যদি নিজেকে বোকা বানিয়ে ফেলতে পারি, তাহলেই হ্যাকিং কমপ্লিট।

 

লেখা: শাহতাজ রহমান।


বিঃ দ্রঃ আগ্রহী পাঠকেরা নিচের লিংকটা পড়ে আসতে পারেন। এখানে ডিপ্রেশনের পিছনে মস্তিষ্কজনিত অসাধারণ একটা তথ্যমূলক আর্টিকেল লিখে রেখেছে হাভার্ড।

What causes depression?

 

শিশুর বিকাশ এবং ভাইগটস্কির তত্ত্ব কথা

Share

একজন শিশুর বিকাশ কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে? কেবলমাত্র তার শারিরিক বিকাশের উপর, পরিবারের সদস্যদের উপর নাকি শিশুর বিকাশে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকাও রয়েছে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাবার জন্য এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আলোকপাত করেন একজন রাশিয়ান মনোবিজ্ঞানী, লেভ ভাইগটস্কি। শিশুর বিকাশে তার দেয়া তত্ত্ব সম্পর্কে জানার আগে তার সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নেয়া যাক।

পরিচিতি

Image Source 

লেভ ভাইগটস্কি ১৮৯৬ সালে রাশিয়ার অরশা শহরে এক মধ্যবিত্ত ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৭ সালে তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক পাশ করেন। তিনি তার জীবদ্দশায় ২৭০টি বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল, অসংখ্য  লেকচার এবং অনেকগুলো মার্ক্স ভিত্তিক মনোবৈজ্ঞানিক,শিক্ষণ তত্ত্ব প্রদান করেন। তিনি ১৯৫৭ সালের জুন মাসে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৫৮ সালের আগে তার দেয়া তত্ত্বগুলো পশ্চিমা বিশ্বে সেভাবে প্রসার লাভ করতে পারে নি এবং ১৯৬০ সালের আগে তা প্রকাশিতও হয় নি।  ১৯৬২ সালের দিকে তার তত্ত্বসমূহ আমেরিকান মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে আগ্রহের জন্ম দেয়। তাকে “মোজার্ট অফ সাইকোলজি” বলা হয়।

ভাইগটস্কির তত্ত্ব

জ্ঞানগত বিকাশ বলতে সাধারণত একজন মানুষের শিশুকাল থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত যতগুলো চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরি হয়,সেই সবকটি প্রক্রিয়াকে একসাথে বোঝানো হয়ে থাকে, যেমন- কোন কিছু মনে করা, সমস্যা সমাধান করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ইত্যাদি। এছাড়া জ্ঞানীয় দক্ষতা বলতে এমন কিছু দক্ষতাকে বুঝায় যা সহজ থেকে জটিল- যে কোন ধরনের কাজ করতে সাহায্য করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আপনার মোবাইল ফোনটি  হঠাৎ বেজে উঠলো। মোবাইলের রিং টোন শুনে উত্তর দেওয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, ফোনের উত্তর দেওয়া, মোটর দক্ষতা (ফোনটির রিসিভ অপশনটি সিলেক্ট করা), ফোনে কথা বলা এবং বোঝার জন্যে ভাষার দক্ষতা, ভয়েসের স্বর ব্যাখ্যা এবং সঠিকভাবে অন্য মানুষের সাথে আলাপচারিতার জন্যে প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা- এ সকল কিছুই জ্ঞানীয় দক্ষতার অন্তর্ভুক্ত।

শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে ভাইগটস্কির দেয়া তত্ত্বটিকে “সোশ্যাল লারনিং থিওরি” বলা হয়ে থাকে। এ তত্ত্বটির মূল প্রতিপাদ্য হলো,একজন শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তার পরিবার, চারপাশের পরিবেশ, তাকে প্রদানকৃত শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  শিশু সমাজ থেকে পাওয়া তার এ জ্ঞানকে একসাথে করে তার কাজ সম্পাদন করে। যদিও একটি শিশুর জ্ঞানগত বিকাশের সাথে সঠিক শারীরিক বিকাশ জড়িত তবে সামাজিক বিষয়ের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। ভাইগটস্কি যুক্তি দেন যে,মনোযোগ, স্মৃতি, যৌক্তিক চিন্তা, পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের মতো মানসিক কাজগুলোর উন্নয়নে সামাজিক পরিবেশকে একটি প্রাথমিক ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচনা করা যায় ।  

তার ভাষ্যে, তিনটি ধারণা শিশুর বিকাশের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে তিনি দাবী করেন, সেগুলো হলো-    

ক) শিশুর জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোকে যদি বিকাশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে তাতে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা সহজেই বুঝা যায়।

খ) শব্দ, ভাষা ও বিভিন্ন ধরণের অভিব্যক্তি শিশুর মানসিক কাজকে সহজ এবং পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে।

গ) জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোর মূল উৎস হলো সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক- সাংস্কৃতিক পটভূমি। অর্থাৎ, শিশুর বিকাশকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজগুলো থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ শিশুর বিকাশের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও তিনি দাবী করেন যে, ভাষা শিশুকে তার জ্ঞানীয় কাজগুলোকে বুঝতে, আকৃতি প্রদানে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এটি শিশুকে কোন কাজের পরিকল্পনা করতে ও সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করতে পারে।

শিশুর বিকাশ সংক্রান্ত ধারণা

এ তত্ত্বটিতে ভাইগটস্কি প্রদত্ত দাবীগুলোর সাথে কতগুলো অভিনব এবং প্রভাব বিস্তারকারী ধারণার কথা বর্ণনা করেছেন; যেগুলো হলো-

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট ( Zone of Proximal Development-ZPD)

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding)

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought)

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (Zone of Proximal Development- ZPD):

জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (জে.পি.ডি.) দ্বারা কতগুলো কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে যার মাঝে কিছু কাজ  শিশু একা একাই করতে পারে আবার কিছু কাজ আছে যা তার একার পক্ষে সম্পাদন করা কঠিন। দ্বিতীয় কথাটির ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, যে কাজগুলো বা সমস্যাগুলো শিশু নিজে নিজে সমাধান করতে পারে না, সে কাজগুলো করার জন্যে সে  যদি একজন দক্ষতাসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বা সমবয়সী শিশুর (যে ঐ কাজটিতে দক্ষ) কাছে থেকে কাজটি করার বা সমস্যাটি সমাধান করার ঠিক নির্দেশনা পায়, তবে শিশু আগে যে কাজটি নিজে করতে পারতো না, এখন তা সহজেই নিজে নিজে করতে শিখে যায়।

জে.পি.ডি. সম্পর্কে ভাইগটস্কি বলেছেন,

The distance between the actual developmental level as determined by independent problem solving and the level of potential development as determined through problem solving under adult guidance or in collaboration with more capable peers.” – (Vygotsky, 1935)

জে.পি.ডি.-এর দুটি লেভেল আছে – একটি হলো ‘Upper Limit’ এবং অপরটি হলো ‘Lower Limit’.

 

Upper Limit

একজন দক্ষ ব্যক্তির আওতাধীন থেকে শিশুর অতিরিক্ত দায়িত্ব নেবার লেভেলকে বোঝায়

শিশুর স্বাধীনভাবে এবং নিজে নিজে কোন সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর লেভেলকে বোঝায়

Lower Limit

 

একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। যেমন ধরুন, বুদ্ধিমত্তা পরিমাপক টেস্টের মাধ্যমে ২টি শিশুর মানসিক বয়স পরিমাপ করা হল এবং তাদের মানসিক বয়স ৮ বছর পাওয়া গেলো। ভাইগটস্কির মতে, এখানেই থেমে না থেকে কিভাবে শিশুটি তার চাইতে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করতে পারে সেই চেষ্টা করা উচিত। শিশুটিকে যদি আরো দক্ষ কারো মাধ্যমে শিশুটির চেয়ে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তবে শিশুটির মানসিক বয়স ১২ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding): 

শিশুর নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে কাজটি করার জন্য বা কোন সমস্যা সমাধানের জন্য অধিক দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে যে সহযোগিতা দেয়া হয়, তাকে স্ক্যাফোল্ডিং বলে। এ ক্ষেত্রে শিশুটির বাবা, মা, শিক্ষক কিংবা ঐ সমস্যাটি সমাধানে তার চাইতে বেশি দক্ষ সহপাঠী প্রথমে তাকে সমস্যাটি সমাধান করার উপায় দেখিয়ে দেন, কিছু ক্লু বলে দেন এবং সমাধান করার সময় মুখে মুখে সমাধানটি বলতে থাকেন। এ প্রক্রিয়াটি দুই বা তার চাইতে বেশিবার শিশুকে দেখানো যেতে পারে। প্রয়োজনে শিশুকে প্রশ্নও করা যেতে পারে। অবশেষে, শিশুটিকে যখন কোন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে,তখন ভুল বা ঠিক নির্বিশেষে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে যাতে করে শিশু সমস্যা সমাধান করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সাথে শিশুর ভুলটি যেন তাকে ইতিবাচকভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখাটাও জরুরি। ধীরে ধীরে শিশুটি যখন নিজে নিজে সমস্যাটি সমাধান করার যোগ্য হয়ে পড়বে, তখন সহযোগিতার মাত্রা কমিয়ে দিতে হয়। অবশেষে কাজটি যখন শিশু সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে, তখন সহযোগিতা বা ক্লুগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে হবে। এ প্রসেসটিকে ‘ফেইডিং’ বলে।

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought):

ভাইগটস্কি বিশ্বাস করতেন যে, শিশুরা ভাষা কেবলমাত্র সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে ব্যবহার করে না, বরং ভাষাকে তারা পরিকল্পনা, নির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকে। এ সকল কাজের জন্যে ভাষার এ  ধরনের ব্যবহারকে অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ বলা হয়ে থাকে।

 

ভাইগটস্কির মতে, ভাষা এবং চিন্তন আলাদাভাবে বিকাশ লাভ করলেও পরে তা একত্রিত হয়ে যায়। শিশুরা সামাজিক যোগাযোগের জন্যে ভাষা ব্যবহারের আরো আগে থেকে সে তার নিজের চিন্তার উপর বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে।  প্রথমে শিশু তার চিন্তাকে মুখে উচ্চারণ করে প্রকাশ করে ফেলে,সাধারণভাবে বলতে গেলে, নিজের সাথে কথা বলে। ধীরে ধীরে সে তার চিন্তাকে সবসময় প্রকাশ না করে নিজের মাঝে রাখতে শিখে যায়। সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের মধ্যকার সময়ে শিশু এ বিষয়টি শিখে ফেলতে পারে। ভাইগটস্কির মতে, যে শিশু  তার ভাষাকে যত বেশি তার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করে, সে শিশু সামাজিকভাবে ততো বেশি উপযুক্ত হয়,সামাজিক যোগাযোগে ততো বেশি দক্ষ হয়।

তবে শিশুকে নির্দেশনা দেয়া এবং সহযোগিতা করা সব সময় কোন কাজ শিখতে বা সমস্যা সমাধান করতে একই রকম সাফল্য আনবে- এমন কোন কথা নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। যদিও ভাইগটস্কির তত্ত্বটি শিশুর বয়সের সাথে আসা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে তেমনভাবে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি, তা সত্ত্বেও এটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুর জ্ঞানের নির্মাণে সমর্থন দেয়। অর্থাৎ, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের ক্ষেত্রে শারীরিক বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশ, সহযোগিতা এবং নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।     

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা

শিশুর বিকাশের ধারাবাহিকতা

Share

শিশুর বিকাশ (জন্ম থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত)

শিশুর বৃদ্ধি একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এক একটা বয়সে শিশুর এক একটা কাজ করা উচিত, একে বলে বিকাশের স্তর। তবে বয়স অনুযায়ী শিশু কাজকর্ম করছে কিনা সেদিকে নিয়মিত নজর রাখা উচিত প্রত্যেক মা বাবার। কেননা দুটি বাচ্চার বিকাশ সমগতিতে হয় না। শিশু অন্য রকম ব্যবহার করছে, তার কারন হয়তো সে অসুস্থ বা কোন কারনে বিপর্যস্ত। কখনো কখনো তার বিকাশ কোনো কোনো বিষয়ে সম বয়সের অন্য বাচ্চাদের তুলনায় ধীরে হতে পারে। কিন্তু অন্য বিষয়ে হয়তো অন্যদের থেকে অনেক আগে হতে পারে।শিশু নিজে প্রস্তুত না হলে তাকে হাঁটতে শেখার জন্য জোর করলে কোনো উপকার হয় না। তাই প্রত্যেক অভিভাবককে এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ স্তরঃ

শিশুর বিকাশের স্তর হল একটি ক্ষমতা যা নির্দিষ্ট বয়সের অধিকাংশ শিশুদের দ্বারা অর্জিত হয়। বিকাশের স্তরগুলি শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়/জ্ঞানীয় এবং যোগাযোগ দক্ষতা যেমন হাটা, দৌড়ানো কথা বলা ইত্যাদি।শিশুর জন্মের পর শিশুর বেড়ে ওঠার ধারা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে পরিনতি লাভ করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

শিশুর মানসিক বিকাশের ধাপগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।সে যদি তা যথাসময়ে অর্জন করে, তবে তার বিকাশ স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া যায়। শিশু অন্য রকম ব্যবহার করছে, তার কারন হয়তো সে অসুস্থ বা কোন কারনে বিপর্যস্ত। এগুলো অবশ্য শিশুভেদে কখনো একটু এদিক – ওদিক হতেই পারে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও শিশুটি যদি বিকাশের ধাপ অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তার বিকাশের বিলম্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আলোচিত বিকাশের স্তরগুলোর মধ্যে কয়েকটি যদি শিশুর মধ্যে প্রকাশ না পায়, তবে শিশুর বিকাশ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা যেতে পারে। সাধারনভাবে এই দক্ষতাগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশ না দেখা গেলে বলা যেতে পারে শিশুর বিকাশে বিলম্ব হচ্ছে। তা ছাড়া কয়েক মাস পরও যদি শিশু বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক কাজ করতে না পারে, তবে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো দরকার।

জন্ম থেকে ২ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ

২ মাস বয়সে অধিকাংশ শিশু বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকাশ হয়ে থাকে, কথা বললে হাসি দেয়,শিশু নিজে নিজে কান্না থামায় ও মুখে হাত নিয়ে চুষতে পারে। শিশু বাবা মাকে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পারে। স্থির দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকাতে পারে, কোলে নিয়ে দোলালে শান্ত হয়।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ

শিশুরা এইসময়ে কান্না ছাড়া গলা দিয়ে শব্দ করতে শুরু করে। শব্দ শুনে মাথা সেদিকে ঘুরিয়ে দেখতে চায়।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন, চিন্তন, সমস্যা সমাধান)
মুখ দেখে শিশুরা হাসে, হঠাৎ আওয়াজে চমকে যায়। শিশুরা খুশি প্রকাশ করতে শেখে, কষ্ট পেলে মুখে তার অভিব্যাক্তি দেখা যায়।

শারীরিক বিকাশঃ

শিশুর মাথা একদিকে ফিরিয়ে চিত হয়ে শুতে পারে, হাত পা অনবরত নড়াচড়া করতে পছন্দ করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

২ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ

জোরে শব্দ হলে প্রতিক্রিয়া না করা
মুখ দেখে না হাসা
নড়াচড়া করে এমন জিনিসের দিকে না তাকান।
উল্টো অবস্থায় শোয়ানো থাকলে মাথাটা তুলতে না পারা বা চেষ্টা না করা।

৪ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
৪ মাস বয়সে শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসতে পছন্দ করে,শিশুটি মাকে চিনতে পারে,মানুষের সাথে খেলতে পছন্দ করে, খেলা বন্ধ করলে কান্না করে।কিছু অভিব্যাক্তি অনুকরন করে যেমন হাসি দিলে হাসে, কথা বললে মুখ দিয়ে শব্দ করে।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
৪ মাস বয়স থেকে শিশু অর্থহীন শব্দ বলা শুরু করে, অভিব্যাক্তির সাথে সাথে শব্দ করে এবং যে শব্দ শোনে অনুরূপ শব্দ করার চেষ্টা করে।ক্ষুধা ক্লান্তি ও ভয় অনুভূতির সাথে সাথে শিশুর কান্নার ধরন ও পরিবর্তন হয়।

জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু গলা জরিয়ে ধরে, ঘুরিয়ে তাকায় এবং আদর করলে প্রতিক্রিয়া করে। খেলনা এক হাত থেকে অন্য হাতে নিতে পারে। চোখের দৃষ্টি কোন জিনিসের প্রতি স্থির করতে পারে। চলন্ত জিনিসের সাথে সাথে শিশু ও ঘুরে এদিক অদিক তাকায়।পরিচিত মানুষ চিনতে পারে ও দূরত্ব বুঝতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
হাতের মুঠো বন্ধ করতে পারে। বাচ্চার হাতের তালুতে কিছু ছোঁয়ালে সেটা ধরার চেষ্টা করে, ঘাড় শক্ত হয়, সোজা করে শোয়ালে উল্টো হয়, শিশু পা দিয়ে জিনিস ধাক্কা দেয়, এবং হাত পা মুখে দিতে চায়।যখন সোজা করে তোলা হয় সে বেশ কিছুক্ষন মাথা সোজা রাখতে পারে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ

৪ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
নড়াচড়া করে এমন জিনিসের দিকে ঘুরে না তাকানো
পরিচিত মুখ দেখে না হাসা
ঘাড় শক্ত না হওয়া
মুখ দিয়ে কোন শব্দ না করা
মুখে কোন কিছু না দেওয়া
পা দিয়ে ধাক্কা না দেওয়া
চোখ ঘুরিয়ে দেখতে সমস্যা হলে
৬ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু পরিচিত মানুষ দেখে হাসে, অনেক শিশু অপরিচিত ব্যাক্তিদের কোলে যেতে চায় না ,অন্যদের সাথে খেলতে পছন্দ করে বিশেষ করে বাবা মার সাথে খেলতে পছন্দ করে, অন্যদের আবেগ বুঝে ও বেশিরবভাগ সময় হাসিখুশি থাকে।আয়নায় নিজেকে দেখে খুশি হয় বা আশ্চর্য হয়।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশু যে শব্দ শোনে অনুরূপ শব্দ করার চেষ্টা করে, অস্ফুট শব্দগুলো দুই শব্দের হয়।নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়, আনন্দ ও কষ্ট পেলে ভিন্ন শব্দ করে, এক শব্দ অনেকক্ষন করতে থাকে ।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু আশেপাশের জিনিস তাকিয়ে দেখে, জিনিস মুখে দেয়, দূরের কোন জিনিস ধরার জন্য কৌতূহল কাজ করে, এক হাত থেকে জিনিস অন্য হাতে নিতে পারে। আশেপাশের শব্দ শুনলে মাথা ঘোরায়।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু ৬মাস বয়সে চিত থেকে উপুড় বা উপুড় থেকে চিত হতে পারে, ঠেকা দিয়ে অল্প সময়ের জন্য বসতে পারে, শিশুকে উচু করে ধরলে পায়ে কিছু ভার নিতে পারে।উপুর হয়ে শুয়ে হাত –পা ছড়িয়ে নিজের শরীরের ভার নিতে পারে। শিশু দুই হাত জড়ো করে খেলে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৬ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
নাগালের মধ্যে কোন জিনিস না ধরতে চাওয়া।
বাবা মা বা তাকে যে দেখাশুনা করে তার প্রতি প্রতিক্রিয়া না দেখা।
আশেপাশের শব্দ শুনলে মাথা না ঘোরানো ।
মুখের কাছে কোন জিনিস নিতে কষ্ট হওয়া।
মুখে অস্ফুট শব্দ না করা।
নিজে নিজে চিত কাত না হওয়া।
না হাসা বা চিৎকার না করা।
খুব শক্ত হয়ে থাকা বা পেশী শক্ত থাকা।
খুব নিস্ক্রিয় থাকা।

৯ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু নতুন কোন ব্যক্তি দেখে ভীত হতে পারে,অনেক শিশু অপরিচিত ব্যাক্তি ছাড়া অন্য কার ও কাছে যেতে চায় না। মায়ের সঙ্গে বা যে তাকে দেখা শুনা করে তার সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মায়ের কাছে সরিয়ে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে আপত্তি প্রকাশ করে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশু হ্যাঁ /না বুঝতে পারে, বড় শব্দ বলতে পারে,ভিন্ন ভিন্ন শব্দ বলতে পারে,যেমন মা বাবা ।অন্যের মুখে কথা শুনে একইরকম শব্দ করার চেষ্টা করে।আঙ্গুল দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু দেখাতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশুরা এইসময়ে টুকি (মুখ লুকিয়ে মুখ দেখানোর খেলা) পছন্দ করে, অনেক শব্দ বলতে শেখে।কোন জিনিস চাইলে দিতে পারে,এক হাত থেকে অন্য হাতে জিনিস সহজেই নিতে পারে।
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু দাঁড়াতে পারে কোন কিছু ধরে এগোনোর চেষ্টা করে, আসন করে বসতে পারে, সমর্থন ছাড়াই বসতে পারে। হাত মুঠো করে কোন জিনিস ধরে টান দিতে পারে।নিজের বাহু নিয়ন্ত্রন করতে শেখে।হামাগুড়ি দেয়া শুরু করে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৯ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
সমর্থন ছাড়াই বসতে না পারা বা সমর্থন দিয়ে বসতে না পারা।
মা বাবা দাদা ইত্যাদি শব্দ না বলা।
মুখে অস্ফুট/অর্থহীন শব্দ না করা।
কোন খেলনার প্রতি আকর্ষণ অনুভব না করা।
এক হাত থেকে জিনিস অন্য হাতে না নেওয়া।

১বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অপরিচিত লোক দেখে লজ্জা ও জড়তা কাজ করে, বাবা মা বাইরে গেলে কান্না করে। পছন্দের ব্যাক্তি বা মানুষ বুঝতে পারে।কিছু পরিস্থিতিতে ভয় পায়।গল্প বললে বা শব্দ শোনে মনোযোগী হয়। রাগ ও ভালবাসার প্রকাশ শেখে। প্রবল উৎসুক নিয়ে নানান জিনিসে হাত দিতে দেয় ,মুখে দেয়। কোন জিনিস দিতে বা নিতে শিখে.
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
শিশুকে কোন বিষয়ে অনুরোধ করলে সাড়া দেয়, হাত নেড়ে টা টা করতে শেখে।না বললে বুঝতে পারে । কথা বললে সাড়া দিয়ে সেও কিছু বলার চেষ্টা করে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু ভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করতে পারে নিজেকে যেমন কোন জিনিস হাত ছুঁড়ে মারা। লুকানো জিনিস খুঁজে বের করতে পারে,।নির্দিষ্ট জিনিস নাম ধরে সনাক্ত করতে পারে। অন্যর অভিব্যাক্তি অনুকরন করতে পারে। কাপ দিয়ে পানি খাওয়া চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানো ইত্যাদি আচরন রপ্ত করে, শিশু দুটো জিনিস একত্রে জোড়া লাগাতে পারে, বোতলে/পাত্রে কোন জিনিস ভরতে পারে বের করতে পারে। আঙ্গুল দিয়ে জিনিস দেখাতে পারে। সাধারন নির্দেশনা বুঝে কাজ করতে পারে যেমন খেলনা যথাস্থানে রাখা।
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। শিশুরা এই বয়সে দাঁড়াতে শেখে । হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটু এগোতে পারে। বুড়ো আঙ্গুল ও তর্জনী একত্র করতে পারে। শিশু ফার্নিচার ধরে হাঁটতে পারে। অনেক শিশু একা একা হাঁটতে পারে। পায়ের উপর নিয়ন্ত্রন আসে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
১ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
হামাগুড়ি না দেওয়া।
সমর্থন দিয়েও দাঁড়াতে না পারা।
লোকানো জিনিসের প্রতি আগ্রহ না দেখানো।
এক শব্দ না বলা।
হ্যাঁ/না মাথা না ঝাকানো।
নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তু বুঝতে না পারা।
অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব।

১৮ মাস
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু ছোটখাটো নির্দেশ মানতে শেখে, অন্যের হাত থেকে কিছু নিয়ে খেলতে পছন্দ করে, মা বা যে দেখাশুনা করে তার কাছ থেকে সরিয়ে নিলে অত্যন্ত দুঃখ পায়।অনেক কথা শুনে সেগুলি উচ্চারন করে। আগ্রহ নিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। খাবার নিজে নিজে মুখে দিতে পারে,পুতুল কে দুধ খাওয়ানো ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি অনুকরন করে।

ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
অনেক একক শব্দ বলতে পারে,হ্যাঁ/না বলা বুঝতে পারে, এবং মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়।শিশুর চাহিদা সে দেখাতে পারে,এবংশিশু হাত দিয়ে দেখায় সে কি নিতে চায়।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু নিত্য ব্যবহার্য জিনিস বুঝতে পারে,যেমন টেলিফোন, ব্রাশ, চামচ। অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে, পুতুল বা প্রানীর প্রতি আগ্রহ দেখায় ও খাওয়াতে চায় তাকে সেভাবে খাওয়ায়।শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম বলতে পারে।নিজের জিনিস গুলো বুঝতে পারে, অভিব্যাক্তি ছাড়াই শব্দ বলতে পারে। দেখিয়ে দিলে কাগজে পেন্সিল ক্রেয়ন দিয়ে আঁকিবুকি করতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু একা একা হাঁটতে পারে, দৌড়াতে পারে বেশ কিছুক্ষন হাঁটতে পারে ১০ মিনিটের মত। কাপড় খুলতে পারে,একা পানি কাপ দিয়ে খেতে পারে,বাটিতে কিছু দিলে চামচ দিয়ে খেতে পারে।

শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
১৮ মাস বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ

নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তু হাত দিয়ে না দেখানো।
হাঁটতে না পারা।
পরিচিত জিনিস চিনতে না পারা।
অন্যকে অনুকরন না করা।
নতুন শব্দ বলতে না পারা।
কমপক্ষে ৬টি শব্দ না বলা।
বাবা মার প্রস্থানে কান্না করা বা ভাবান্তর না হওয়া।
২ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অন্যকে অনুকরন করে বিশেষ করে বড়দের বা অন্য শিশুকে। অন্য শিশুদের সাথে থাকার সময় উচ্চসিত থাকে। মাঝে মাঝে অবুঝ হয়ে চেঁচামেচি করে, যা বলা যায় তার উল্টো করতে পছন্দ করে নিজে নিজে সব কিছু করে স্বাধীনতা প্রকাশ করতে চায়। অন্য শিশুকে বাবা মা আদর করলে অখুশি হয়।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
ছবি দেখে নাম বলতে পারে, পরিচিত ব্যাক্তিদের নাম বলতে পারে ও শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম ভালভাবে বলতে পারে .২ থেকে ৪ শব্দের বাক্য বলতে পারে।সাধারন নির্দেশনা বুঝে কাজ করতে পারে যেমন- (ঘুমুতে যাও,এটা খাও ,এখানে বস)কথা বললে কঠিন শব্দ পুনারাবৃওি করতে পারে।বইয়ের জিনিস দেখে বস্তুর নাম বলতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
শিশু দুই তিন পরতে ঢাকা জিনিস খোঁজে বের করতে পারে, আকার এবং রঙ এর ধারনা তৈরি হয়। পরিপূর্ণ বাক্য ও ছড়া বলতে পারে. ৪ বা বেশি ব্লক সাজিয়ে চূড়া বানাতে পারে। পায়খানা ও প্রস্রাব নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা আসে, দুটি ধাপে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ কতে পারে যেমন, (জুতা খোলে তাকে রেখে আস)। ছবি দেখে বইয়ের প্রানির নাম বলতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
শিশু সুন্দরভাবে দাঁড়াতে পারে,বলে লাথি দিতে পারে, শিশু জোড়ে দৌড়াতে পারে।উপরে চেয়ার ও টেবিলে আরোহন করতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে ধাপে ধাপে পা ফেলতে পারে। বল শূন্যে ছুঁড়তে পারে,লম্বা রেখা বা বৃত্ত অনুকরন করে চলা বা লিখতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
২ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
দুটি শব্দের সংযোগ না করতে পারা যেমন (দুধ পান করা,)
শিশু নিত্য ব্যবহার্য জিনিস না বুঝতে পারা ,যেমন টেলিফোন, ব্রাশ,চামচ,জামা ইত্যাদি।
শব্দ ও কাজ অনুকরন না করা
সাধারন নির্দেশনা অনুসরন না করা
হাঁটতে না পারা
৩ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
শিশু অন্য শিশুদের সাথে বন্ধু তৈরি করতে পারে,হারিয়ে যাবার ভয় দেখা দিতে পারে। চেঁচামেচি করে শিশু রাগ প্রকাশ করে। কারোর খুশি,দুঃখ বা রাগ হয়েছে কিনা-সেটা মুখ দেখে বোঝার ক্ষমতা জন্মায়,বোকা বানিয়ে মজা পেতে শেখে।নিজের ও অন্যের জিনিস ধারনা হয়, অনেক শিশু নিজের খেলনা অন্যকে দিতে চায় না,তবে অন্য বাচ্চার পাশে বসে খেলতে ভালবাসে। ।বাবা –মাকে নকল করতে চায়,অনেক সময় নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায়। কিছু করতে বললে আপত্তি জানায়,হুকুম দিতে ভালবাসে। একই রুটিনে চলতে পছন্দ করে।কি চায় –অনেক সময় ঠিক বুঝে উঠতে পারে না । না বুঝিয়ে বলতে পারে না। একা একা জামা কাপড় পড়তে পারে। বাব মা ছাড়া সহজেই একা থাকতে পারে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
ছোট ছোট বাক্য বলতে শেখে- সেগুলি ব্যবহার করে জগতকে জানার চেষ্টা করে, এই বয়সে অনেক সময় তোতলামি দেখা দিতে পারে,কিন্ত সেটা স্থায়ী হয় না।পরিচিত জিনিসের নাম বলতে পারে,উপর, নিচ,পাশে বুঝতে পারে।নিজের ছোট নাম, বয়স,সে ছেলে না মেয়ে বলতে পারে।বন্ধুর নাম মনে রাখতে পারে।আমি তুমি সে ইত্যাদি সম্বোধন বুঝে ডাকতে পারে।বহুবচন শব্দ বুঝে বলতে পারে,যেমন গাড়িগুলো, পাখিরা।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান).
৩ বছরে শিশু বোতাম লাগাতে পারে,কোন কিছু ঘুরিয়ে খোলতে পারে।পুতুল,প্রানী, মানুষকে নিয়ে গঠনমূলক খেলা খেলতে পারে.৩-৪ টুকরা পাজল মিলাতে পারে,দুটি জিনিস সংযুক্ত করতে পারে।পেন্সিল দিয়ে বৃত্ত আঁকতে ও ভরাট করতে পারে।বইয়ের পাতা উল্টাতে পারে.৬বা বেশি ব্লক সাজিয়ে চূড়া বানাতে পারে।দরজা খোলা,ঢাকনা তোলা বা লাগাতে পারে।

শারীরিক বিকাশঃ
সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে উঠতে পারে, ট্রাই সাইকেল চালাতে পারে,সাহায্য ছাড়াই অল্প উপরে আরোহন করতে পারে
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৩ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে না পারা বা কষ্ট হোয়া।
কথা স্পষ্ট না হওয়া।
সাধারন খেলনা দিয়ে না খেলতে পারা।
বাক্য বলতে না পারা।
সাধারন নির্দেশনা অনুসরন না করা।
অন্য শিশুদের সাথে মিশতে না পারা বা খেলতে পছন্দ না করা
চোখে চোখে না তাকানো।
৪ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
বাবা মায়ের প্রতি ভালবাসা দেখায়,অন্ধকারে ভয় পায়, আঘাত পাবার ভয় ও দেখা দেয়।দলে বা অংশগ্রহনমূলক খেলা খেলতে পছন্দ করে। দেয়া নেয়া করতে শেখে। আমার কথাটা ব্যবহার করে এবং একসঙ্গে সবার সঙ্গে খেলতে শেখে। ছেলেদের বাবার সঙ্গে এবং মেয়েদের মায়ের সঙ্গে একাত্মতা বোধ শুরু হয়।অন্য ছেলেমেয়েদের শরীর সম্পর্কে কৌতূহল জন্মায়।কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করে খেলা করে । তার আগ্রহ ও পছন্দের বিষয় বলতে পারে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
৪ বছর বয়সে শিশুরা সে, তিনি,তার ইত্যাদি সম্বোধন করে কথা বলতে পারে।কবিতা ও গান বলতে পারে। এই বয়সে শিশু গুছিয়ে গল্প বলতে পারে,পুরো নাম বলতে পারে।
জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)

সংখ্যা ও রঙের নাম বলতে পারে,গননা করতে ও সময় বুঝতে পারে।গল্পের আগের ও পরের অংশ মনে করতে পারে।একইরকম ও ভিন্ন জিনিসের ধারনা হয়।গঠন মূলক কিছু আঁকতে পারে।কাচি ব্যবহার করতে পারে, বোর্ড ও কার্ড গেইম খেলতে পারে,বইয়ের চিত্রে কি আছে বলতে পারে। গোল আঁকতে পারে,ক্রস আঁকতে পারে
শারীরিক বিকাশঃ
শিশু এক পায়ে দাঁড়াতে শেখে,লাফিয়ে সামনে ও পেছনে যেতে পারে। বল হাত দিয়ে উপর থেকে ধরতে পারে খাবার মাখাতে পারে ও মাছের কাটা আলাদা করতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৪ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
লাফ দিতে না পারা।
অংশগ্রহন মূলক খেলায় আগ্রহ না থাকা।
অন্য শিশুদের এড়িয়ে চলা ।
বাবা মা বা পরিবারের লোকজন বাইরে গেলে প্রতিক্রিয়া না কর।।
কাপড় পরা ,টয়লেট ব্যবহার না করতে শেখা।
গল্প বলতে না পারা।
৩ অংশের নির্দেশনা বুঝতে না পারা।
একরকম ও ভিন্ন রকম জিনিসের পার্থক্য না বুঝা।
সঠিকভাবে আমি তুমি ও সে ব্যবহার না করে কথা বলা।

৫ বছর
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশঃ
অন্যদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করে, প্রতিযোগিতা মুলক খেলার ব্যাপারে উৎসাহী হয়।শিশুর কর্তব্যবোধ জন্মে, নিজের কার্যক্ষমতায় আত্মসন্তুষ্টি লাভ করে। নিয়মের সাথে অভ্যস্থ হয়।অভিনয়, গান,নাচ পছন্দ করে।সত্য মিথ্যা গল্প বুঝতে পারে। একা একা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।মাঝে মাঝে চাহিদা করে পূরণ না হলে জেদ করে।মাকে কাজে সহযোগিতা করে।
ভাষাগত ও যোগাযোগঃ
খুব স্পষ্টভাবে কথা গুছিয়ে বলে,ভবিষ্যত কালে কথা বলতে পারে যেমন ( বাবা আসবে,মা দিবে)।নাম ঠিকানা বলতে পারে।

জ্ঞানীয়(শিক্ষন,চিন্তন,সমস্যা সমাধান)
এই বয়সে শিশু ১০এর বেশি গুনতে পারে।আকার,আকৃতি,মানুষ হাত পা আঁকতে পারে।অক্ষর ও সংখ্যা লিখতে পারে। ত্রিকোণ ও চারকোণা আঁকতে পারে। খাবার টাকা এগুলোর সঠিক প্রয়োগ বোঝে।কথা বলার ধরন বড়দের মত করার চেষ্টা করে, কথাগুলো মোটামুটি শুদ্ধ হয়। গল্প বুঝতে পারে।
শারীরিক বিকাশঃ
লং জাম্প, হপ, স্কিপ ইতায়াদি করতে পারে। নিজের জামা নিজে পড়ে।চামচ, ছুরি ব্যবহার করতে পারে।টয়লেট ব্যবহার করতে পারে।
শিশুর বিকাশে বিলম্বঃ
৫ বছর বয়সে যেসব লক্ষন দেখে শিশুর বিকাশ বিলম্ব হচ্ছে বোঝা যাবেঃ
অতিরিক্ত ভয়,লজ্জা,ও রাগ প্রকাশ করা।
নিত্য ব্যবহার্য কাজ না করতে পারে।
৫ মিনিটের বেশি কোন কাজে মনোযোগ না থাকা।
মানুষের ডাকে সাড়া না দেওয়া ।
অন্যকে বা নিজেকে আঘাত করা বা জিনিস ভাংচুর করা।
ভিন্ন ভিন্ন কাজ না করা,(এক ধরনের কাজে বা খেলনা দিয়ে খেলা)।
নাম বলতে না পারা।
অতীত কালে বা ভবিষ্যতে কথা বলতে না পারা ।
ছবি না আঁকতে না পারা।
ব্রাশ করা, হাত ধোয়া,মোছা ও কাপড় খোলা, ইত্যাদি নিজে নিজে না করতে না পারা।

 

লিখেছেন – জাকিয়া সুলতানা

বয়ঃসন্ধির গল্প

Share

একটা জীবনের শুরু হয় কতগুলো অসাধারন ঘটনার মাধ্যমে। মায়ের পেটে ছোট্ট ভ্রুণ অবস্থা থেকে আমাদের জন্ম। একটি শুক্রাণুর সাথে একটি ডিম্বানুর একত্রিত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় একটি নতুন প্রাণ, একটি নতুন শিশু। এই শিশু অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং একদম শেষে মৃত্যু। কিন্তু শিশুটির এই অবস্থায় আসার পূর্বে পেরোতে হয় কিছু ধাপ। আর এই ধাপগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর। মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন বয়ঃসন্ধিকে একটা আলাদা ধাপ হিসেবে দেখা হলেও, পূর্বে কিন্তু তা ভাবা হত না।

১৮০০ শতকের শুরুর দিকে ভাবা হত শিশুরা হুট করেই “বড় মানুষে” পরিণত হয়। তাদের তখন বড় মানুষদের মত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই চিন্তা ধারার পরিবর্তন আসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে। সেসময় বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হওয়ার কারণে কাজ গুলো ক্রমশ জটিল হওয়া শুরু করে। তাই এই হুট করে বড় মানুষদের দায়িত্ব নেয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সময় দরকার হয় কৈশোর বয়সের ছেলে বা মেয়েটির। তখনই উদ্ভাবিত হয় বয়ঃসন্ধির ধারণাটি।

 

কিভাবে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরকাল চেনা যায়?

কিশোর বয়স মানুষের জীবনের এমন একটি সময় যখন একজন শিশুর প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য এবং বিকাশগত উন্নয়ন। এ সময়ে একজন ব্যাক্তি নতুন নতুন জ্ঞান এবং দক্ষতা অর্জন করে, কিভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রনে রেখে অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা যায়, এবং সেইসকল গুণ এবং দক্ষতা অর্জন করে যা তাকে তার কিশোর বয়সকে উপোভোগ করতে সাহায্য করে এবং একইসাথে তাকে প্রাপ্তঃবয়স্ক হওয়ার পথের যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে। সব সমাজে বা দেশেই একজন শিশু আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে যে পার্থক্য আছে তা চিহ্নিত করতে পারে। এখন শিশু থেকে বড় হওয়ার যে রূপান্তর তা কিভাবে হয়, কখন হয়, কিভাবে তা বোঝা যায়- সবকিছু নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সমাজ তা কিভাবে দেখে তার উপর। অতীতে দেখা যেত বয়ঃসন্ধির ধারণাটা তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সাথে দেখা দেখ, এখন আবার দেখা যাচ্ছে বয়ঃসন্ধি কালীন সময়টার ব্যপ্তি বেড়েছে।

বয়স বয়ঃসন্ধির সম্পূর্ণ গল্প নয়।

যদিও বা বয়স দ্বারা বয়ঃসন্ধিকে খুব সহজেই সংজ্ঞায়িত করা যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কিশোর বয়সের পুরো চিত্রটা ফুটে উঠে না। বরং আমরা বয়সকে এই সময়ের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলতে পারি। আরো ভালভাবে বলা যায়, বয়স দ্বারা শারীরিক এবং জৈবিক বিভিন্ন পরিবর্তনকে মূল্যায়িত এবং তুলনা করা যায়। এই ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুলো সকল সমাজের ক্ষেত্রে একইরকম প্রায়। কিন্তু সামাজিন যে রূপান্তর গুলো এই বয়সে এসে দেখা যায়, তার পার্থক্য দেখা যায় সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে।

বয়ঃসন্ধি শারীরিক পরিবর্তন।

বয়ঃসন্ধি মানব জীবনের অত্যন্ত ক্ষিপ্র একটা ধাপ। যদিওবা অধিকাংশ শারীরিক পরিবর্তন একটা নির্দিষ্ট ধাপ মেনে চলে, কিন্তু এই ধাপ শুরু হওয়া বা শেষ হওয়াটা কিছু ক্ষেত্রে সমাজ ভেদে ভিন্ন হয়। কোনো সমাজে দেখা যায়, শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়ে যায় ১১/১২ বছরে, আবার কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় তা শুরু হতেই সময় নেয় ১৩/১৪ বছর। আবার মেয়েদের এবং ছেলেদের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যেও পার্থক্য দেখা দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন ছেলেদের পূর্বে শুরু হয়। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের উচ্চতা এবং ওজন হুট করে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। যেই ছেলেটা বা মেয়েটা শিশুকালে সবার খাটো ছিল, দেখা যায় এ বয়সে এসে হঠাৎ করে তার উচ্চতাই সবার চেয়ে বেশি! গলার স্বরের পরিবর্তন, লোম বৃদ্ধি এসবও এই বয়সে এসে শুরু হয়।

বয়ঃসন্ধিঃ নিউরোডেভেলপমেন্টাল (neurodevelopmental) পরিবর্তন।

গুরুত্বপূর্ণ নিউরোডেভেলপমেন্টাল পরিবর্তনগুলো এই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে এসে দেখা দেয়। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে অনেক ক্ষেত্রেই হরমোনের পরিবর্তনের সংযোগ থাকলেও, তা পুরোপুরি হরমোনাল পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে এই বিকাশ সংঘটিত হয়। যেমন লিম্বিক সিস্টেম, যা কিনা আনন্দ লাভ এবং পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া, আবেগীয় নিয়ন্ত্রন, ঘুম নিয়ন্ত্রন ইত্যাদির সাথে যুক্ত। একই সময়ে প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সেও পরিবর্তন দেখা দেয়। যা কিনা বিভিন্ন কার্যনির্বাহী ক্রিয়া যেমন, ডিসিশন নেয়া, সংগঠিত করা, রাগ নিয়ন্ত্রন এবং ভবিষৎ পরিকল্পনার জন্য দায়ী। প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন গুলো লিম্বিক সিস্টেমে পরিবর্তনের পরে হয়।

বয়ঃসন্ধিঃমানসিক এবং সামাজিক পরিবর্তন।

হরমোনাল এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল যে সকল পরিবর্তন গুলো ঘটে থাকে তার সাথে সাইকোসোশাল এবং ইমোশনাল পরিবর্তন গুলো সংযুক্ত। জীবনের দ্বিতীয় দশক থেকে কিশোর এবং কিশোরিদের যুক্তিগত এবং নৈতিক দক্ষতার শক্তিশালী বিকাশ ঘটে। একই সাথে তারা ভাবগত চিন্তন এবং যুক্তিযুক্ত রায় করতে আরো সমর্থ হয়। কিশোরদের আশে পাশের পরিবেশ তাদের অভ্যন্তরীন এবং মানসিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। আবার একই সাথে কিশোরদের অভ্যন্তরীন পরিবর্তন গুলো প্রভাব ফেলে তাদের আশেপাশের পরিবেশের ওপর। বহিরাগত প্রভাব গুলো সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হয়। সামাজিক মূল্যবোধ এবং আদর্শ, পরিবর্তিত ভূমিকা, দায়িত্ব, সম্পর্ক, প্রত্যাশা ইত্যাদি সবকিছু ভূমিকা রাখের কিশোরটির মানসিক পরিবর্তনের উপর। এই সময়কালকে অনেকেই “ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ” সময় বলে দাবী করেন। কারণ এ সময় একজন কিশোরের মনের মধ্যে চলে অনেক প্রশ্নের ঝড়। নানারকম শারীরিক মানসিক পরিবর্তন তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিদ্ধ করে তুলে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মত মানুষ তারা পায় না। অনেক সময় এই পরিবর্তন বুঝে উঠতে উঠতে মেনে নিতেও তার সময় লাগে। না পারে বড়দের সাথে মিশতে, না পারে একদম ছোটদের মত করে থাকতে। হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় অন্যের প্রতি ভাললাগা। এ সময়টায় কিশোররা একটা “বিপ্লবী ধাপ (Rebel phase)” পার করে। নিজের এবং আশে পাশের মানুষজনের সাথে মনোমালিন্য আর বোঝা পরার অভাব দেখা দেয়। যা এই বয়ঃসন্ধি পার হতে হতে স্থিতীশীল পর্যায়ে চলে আসে।

স্বাস্থ্য এবং আচরণের ওপর বয়ঃসন্ধির প্রভাব।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বয়ঃসন্ধি কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অব্দী বিভিন্ন রোগের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। যেমন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক অসুস্থতা এবং আঘাত ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে সকল স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়, যার মধ্যে বিভিন্ন পদার্থ ব্যবহার ঘটিত ব্যাধি, মানসিক ব্যাধি এবং আঘাত ইত্যাদি কৈশোরের জৈবিক পরিবর্তন এবং পরিবেশের প্রভাবকেই প্রতিফলিত করে। অধিকাংশ স্বাস্থ্য ঘটিত সমস্যা যা বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে দেখা দেয়, তা বর্তমান এবং ভবিষতের স্বাস্থ্যগত সমস্যাকেই নির্দেশ করে। যেমন মদ্যপান জনিত সমস্যা কিংবা স্থুলতা, বরতমানেও যেমন শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে, একই সাথে তা ভবিষত্যেও স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতি নির্দেশ করে।

বয়ঃসন্ধিকালীন বৈশিষ্ট্য।

বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যেই পরিবর্তন গুলি দেখা যায় তা এই সময়ের নয়টি বৈশিষ্ট্যের প্রতি নির্দেশ করে যা স্বাস্থ্য গত নীতি এবং এই বিষয়ক কর্মসূচির উপর প্রভাব ফেলে।

১। বয়ঃসন্ধির ছেলে মেয়ে গুলো বিশেষ একটা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকে সবসময়।

২। সকল বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েরা এক নয়। তাদেরকে সবসময় এক কাতারে ফেলা যাবে না।

৩। কিছু কিছু কিশোর/ কিশোরী একটু বেশিই আবেগী।

৪। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলে মেয়েদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৫। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকা সারাজীবনের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৬। এ বয়সের ছেলে মেয়েরা কিভাবে চিন্তা করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে তা নির্ভর করে বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন গুলোর উপর।

৭। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে পরিবর্তন গুলো হয় তা বুঝতে হবে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েদের।

৮। পজিটিভ প্রভাব ফেলার লক্ষ্যে প্রাপ্ত বয়স্কদেরও এ সময়ের পরিবর্তন গুলো সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

৯। জনস্বাস্থ্য এবং গণ অধিকার বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশের সাথে একই বিন্দুতে মিলিত হয়।

 

বয়ঃসন্ধি একটি সংকটময় সময় সবার জীবনে। এই সময়ের সঠিক বিকাশই পরবর্তী জীবনের জন্য একজন ব্যাক্তিকে তৈরি করে দেয়। এই বয়সটা অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। শারীরিক, জৈবিক, মানসিক সকল পরিবর্তনকে সামলাতে সামলাতেই দিন চলে যায়। এই সময় তারা চায় একটু ভালবাসা, একটু অধিক মনোযোগ, একটু যত্ন, মন দিয়ে তাদের কথা শোনার মত একজন মানুষ। এ টুকু যদি আমরা তাদের দিতে পারি তাহলেই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়টা এতটাও সংকটময় হয়ে উঠে না।

 

লিখেছেন – অর্থি

Episode 2: Defence Mechanism

Share

তোমাদের বন্ধু রাফিউল মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক vlog ‘Empower yourself with Rafeul’-এর সেকেন্ড এপিসোড নিয়ে এসেছে। এখানে সে কথা বলেছে চমৎকার একটি টপিক্স ডিফেন্স মেকানিজম নিয়ে।

Episode 2: Defence Mechanism সম্পর্কে জানো।

 

 

নারী নির্যাতন ও মানসিক স্বাস্থ্য

Share

ঘটনা ১ –
জরিনা, বয়স ত্রিশ। বাসায় বাসায় কাজ করে সে পরিবারে অন্ন সংস্থান করে। দিনে অন্তত ৪-৫টি বাসায় কাজ করার পর দিনশেষে তাকে আবার পরিচর্যা করতে হয় নিজের পরিবারের, তিন সন্তান আর স্বামীর। তার স্বামী দিনের পর দিন আলসেমীতে দিন কাটিয়েও দিনশেষে রাতে এসে তার পৌরষত্বের প্রমাণ রাখতে যেয়ে অত্যাচার করে জরিনার উপর। মুখে গালাগালি আর পিঠের উপর কিল ঘুষি, জরিনার নিত্যদিনের জীবন। যার প্রভাব পরছে তার মানসিক অবস্থাতেও। ক্রমাগত তার মধ্যে এই নিয়ে একধরনের এঞ্জাইটি কাজ করে।

ঘটনা ২ –

ফারিয়ার বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো। প্রেম করে বিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ছয় বছরের প্রেমের পরিণতি। বিয়ের আগে একটা আইটি ফার্ম এ চাকরি করলেও বিয়ের পর স্বামীর ইচ্ছার প্রতিদান দিতে তাকে ছাড়তে হয় সেই চাকরি। আর এদিকে তার স্বামী নীরব একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির বেশ ভাল পদের কর্মকর্তা। বিয়ের প্রথম ক’বছর দু’জনের বেশ সুখের সংসার চললেও, কিছুদিনের মধ্যে দেখা দেয় নীরবের আসল রূপ। আগে যখন মুখে ফুটতো প্রেমের বুলি এখন সেই মুখ দিয়ে বের হয় ফারিয়ার প্রতি বিরক্তির সুর। ফারিয়ার প্রতিবাদের উত্তর হিসেবে সে এখন তার গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হয় না।

ফারিয়া, যে কিনা হাসি খুশি প্রানোচ্ছল মেয়ে ছিল, সে এখন জীবন নিয়ে হতাশ, কোনোকিছুতেই আর আগ্রহ পায় না। উপরে উল্লিখিত দু’টি ঘটনাই দুইজন নারীর জীবনের।

 

এখানে সমাজের ভিন্ন দুই স্তরের দুই নারীর কথা বললেও একটি জায়গায় এসে তাদের দুইজনের জীবন মিলে গেছে একই বিন্দুতে। দুইজনই শিকার পারিবারিক নির্যাতনের। যার প্রভাব পরছে তাদের মানসিক অবস্থায়।

নারী নির্যাতন বলতে আমরা বুঝি –

ব্যক্তিগত এবং পাব্লিক দুই ক্ষেত্রেই যে কোনো ধরনের লিঙ্গ নির্ভর নির্যাতন যা কিনা নারীদের শারীরিক, যৌনভিত্তিক এবং মানসিক ক্ষতি করে, একই সাথে এ ধরণের কাজ করার হুমকি এবং নারীদেরকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমান সমাজের একটি বেশ সাধারণ চিত্র হয়ে গেছে নারী নির্যাতন। রাস্তাঘাটে, বাসায়, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে সবখানে নারীরা মৌখিক বা শারীরিক কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আগে যেটা মনে করা হতো সমাজের নিম্ন শ্রেনীর, কম শিক্ষিত মানুষের মধ্যকার বর্বরতার চিত্র, এখন আর তা না। নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, স্বাধীন, শিক্ষিত সমাজের নারীরাও এই পাশবিক অত্যাচারের শিকার। আবার পুরুষ দ্বারা চালিত এই সমাজে নারীরা যতই নির্যাতনের শিকার হোক না কেন শেষ মেশ তাদের উপর সকল দোষ চাপিয়ে দেয়া হয়। এক ধরের সামাজিক চাপ দ্বারা তারা চালিত হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে পুরো বিশ্বে প্রায় ১৫-১৭% নারীরা এ ধরণের নির্যাতনের শিকার। বাংলাদেশে এর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাড়িয়েছে ৫০-৭০%। নারী নির্যাতন শুধুমাত্র শারীরিক না মানসিক দিক থেকেও নারীদের উপর হানিকর প্রভাব ফেলে। “বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা” তাদের একটি গবেষণায় নারীদের দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তাদের উপর নির্যাতনকে দায়ী করেছে। নয়টি নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশের উপর করা একটি কোয়ান্টিটিভ গবেষণার ফলাফল হিসেবে নারী নির্যাতনের সাথে তাদের আত্মহত্যার আন্তঃসম্পর্ক পাওয়া গেছে। মানসিক অসুস্থতা বহুগুণিতক অবস্থা। অনেকগুলো ফ্যাক্টর জটিল্ভাবে একত্রিত হয়ে মানসিক রোগের সৃষ্টি অথবা তা বজায় রাখে। কিছু জিনের সাথে সম্পর্কিত, আবার কিছু পারিপ্বারশিক পরিবেশ দ্বারা ত্বরান্বিত হয়। বেশ কিছু গবেষক নারী নির্যাতনের সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্কের গবেষনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিনহিত করেছেন। এটি গ্রুত্বপূর্ণ কারণ নির্যাতনের ধরন এবং এর প্রভাব সমাজভেদে ভিন্ন হয়। যেমন বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও তা কারো কাছে প্রকাশ করে নি, অপরদিকে ব্রাজিল এবং নামিবিয়ার ৮০% নারী তা প্রকাশ করেছে। নির্যাতনের ধরনের মধ্যে বিভিন্ন রকমভেদ পাওয়া গেছে গবেষণা করে। এগুলো কিছু ক্ষেত্রে মানসিক রোগের কারণ এবং প্রায় ক্ষেত্রে অসুস্থতা বহাল রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। নির্যাতনের রকমভেদে এর প্রভাবের পার্থক্য দেখা যায়। শারীরিক অত্যাচার, সামাজিক অপমান, মৌখিক নির্যাতন ইত্যাদি ভিক্টিমের মধ্যে ইমোশনাল এবং মানসিক ট্রমার সৃষ্টি করে। “তুমি কালো, তোমাকে আমার ভাল লাগে না, অন্যমেয়েরা তোমার চেয়ে বেশি সুন্দর” বরের কাছ থেকে এ ধরণের উক্তি কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা অন্য নারীর সাথে যৌন মিলন, দ্বিতীয় বিবাহ ইত্যাদি মানসিক অসুস্থতার দিকে নারীদের ঠেলে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক, মৌখিক, সামাজিক নির্যাতন কনভার্সন ডিজঅর্ডার, মুড ডিজঅর্ডার, বায়োপোলার ডিজরডার, অবসেশন, ডিপ্রেশন ইত্যাদির সৃষ্টি করে। এড়িয়ে চলা, অবজ্ঞা করা, কটু কথা শোনানো ইত্যাদিও ভিক্টিমের মানসিক অবস্থার উপর বাজে প্রভাব ফেলে। যার কারণে ক্রমাগত তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। বাংলাদেশে এবং একই সাথে পুরো বিশ্বে অনেক নারী প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে নির্যাতনের। সেটা ঘরে হোক কিংবা বাহিরেই হোক, শারীরিক হোক কিংবা মানসিক। এই নির্যাতন একটা নারীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি প্রভাব রাখে মানসিক অবস্থাতেও। বেশ কিছু ক্ষেত্রেই তার পরিণতি হয় মানসিক রোগে। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসড ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে ডিপ্রেশন। নির্যাতন প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এই মানসিক রোগগুলোর পিছনের। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক রোগ থাকার কারণে তারা শিকার হয় নির্যাতনের। এমন একটি সমাজ ব্যাবস্থা, যেখানে মানসিক সমস্যাকে সাধারণভাবেই কটু দৃষ্টিতে দেখা হয়, সেখানে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথাই থাকে না। অথচ এর কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত তাদের জীবন পার করছে এক কঠোর, বিষন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে। এই বিষয়ে সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীদের প্রতি সম্মান তৈরি করার মাধ্যমেই হয়তো এই সমস্যা কাটিয়ে উঠা যাবে।

 

লিখেছেন – অর্থি

 

আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য

Share

আত্মহত্যা বা, সুইসাইড কি তা হয়তো সহজ বাংলায় প্রায় সবাই বলতে পারবো।আত্মহত্যা হল স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশ করা।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে অনেক আগে থেকেই আত্মহত্যা কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সবাই। কিন্তু নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরও আত্মহত্যা এখনো মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এমন কি আমাদের দেশেও আশংকাজনক হারে আত্মহত্যার হার বাড়ছে।

World health organization এর প্রতিবেদন মতে, আমাদের বাংলাদেশে শুধু ২০১১ সালে ১৯,৬৯৭ জন আত্মহত্যা করেছে। আর বর্তমানে আত্মহত্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭ তম।

আজ কেন আবার আত্মহত্যা নিয়ে এতো বলার চেষ্টা করছি? কারণ আছে অবশ্যই। এক গবেষণার রিপোর্ট অনুসারে, আত্মহত্যা করা মানুষের মাঝে ৯০% মানুষ মানুষিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকে। এদিক থেকে বলতে গেলে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসাবে এটাকে দেখা যায়। আর এ ব্যপারে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বলতে গেলেই চলে।

 

মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের রুগীদের মাঝে সুইসাইডের প্রবণতা অনেকটা বেশী। এমন কি বাইপোলার ডিসঅর্ডার থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সুইসাইডের প্রবণতা বাড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া স্ক্রিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার(ও.সি.ডি), পোষ্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সহ বেশ কিছু মানুষিক রোগে আত্মহত্যার প্রবনতা বাড়ে।

এছাড়া যাদের পারিবারে আগে কেও আত্মহত্যা করেছে, ড্রাগ সহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত, যদি কেও কোন ধরনের abuse এর শিকার হয়ে থাকে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশী থাকে।
আত্মহত্যা প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা জরুরী। এজন্য প্রয়োজনে মানুষিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া জরুরী।
আমাদের সবারই চোখ-কান খোলা রাখা জরুরী। হয়তো, খুব নিকট জনের মনের ভেতর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, একটুখানি সচেতনতা অভাবে তা আমলে আসছে না।

 

লিখেছেন – আরিফ

তথ্যসুত্রঃ
Suicide – Wikipedia

Suicide in Bangladesh – Wikipedia

Suicide data

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার

Share

গত আগস্টে মায়ানমার থেকে অত্যাচারিত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলো মামুন। চোখের সামনে তার বাবাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, তার মাকে ধর্ষণ করেছে ঐদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সে বহু কষ্টে তার ছোট ভাইকে নিয়ে জীবন বাঁচাতে পেরেছে। এখনো সে রাতে ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়, সবসময় অস্থিরতায় ভোগে, সে এখনো ভয়ে থাকে এই বুঝি মায়ানমারের সেনাবাহিনী এসে আবার একইরকম অত্যাচার চালাবে।

মামুনের এই ভয় লাগা, আশঙ্কায় থাকাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়ে থাকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার। সাধারণত কোন আকস্মিক দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মানবিক বিপর্যয়ের ফলে মানসিকভাবে অস্থিরতা ভোগা মানুষজন এই মানসিক রোগের শিকার হয়ে থাকে। অনেক সময় এই রোগটির লক্ষণ দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই দেখা যায়, আবার অনেকের ক্ষেত্রে অনেক পরেও আসে।

যেকোন বয়সের মানুষজনই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে, শিশুদের উপরে এর প্রভাব বেশী দেখা যায়। শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষেরা এটার শিকার হয়। চুরি বা ডাকাতির শিকার হওয়া, জটিল কোন রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষজনও এই জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

 

লক্ষণঃ সাধারণত তিন ধরণের লক্ষণ দেখা যায়। প্রথমত, কোন একটা কাজে যুক্ত থাকার মধ্যেও ঐ ট্রমার কথা মনে পড়ে যাওয়া এবং বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে একদম চুপ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, কোন জায়গা বা মানুষ দেখে ঐ কষ্টের ঘটনার কথা মনে পড়ে যাওয়া এবং মানুষদের এড়িয়ে চলা। তৃতীয়ত, হঠাৎ করে চমকে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে থাকা।

এছাড়াও আরও যেসব লক্ষণ দেখা যায়-

১। ঐ ঘটনাকে বারংবার মনে করা,

২। চুপচাপ হয়ে যাওয়া,

৩। ঐ ধরণের ঘটনা বা অবস্থা এড়িয়ে চলা,

৪। মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা,

৫। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া,

৬। ঘুমাতে না পারা,

৭। অল্পতেই রেগে যাওয়া,

৮। মানুষজন এড়িয়ে চলা,

৯। সম্পর্ক রক্ষা করতে হিমশিম খাওয়া,

১০। দুঃস্বপ্ন দেখা,

১১। নেতিবাচক চিন্তা বেড়ে যাওয়া,

১২। হ্যালুসিনেশনের শিকার হওয়া,

১৩। কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া,

১৪। মনে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া,

১৫। রক্তচাপ বেড়ে যায় ও শরীরে কাঁপুনি আসে।

প্রতি ১০০ জনে ৭-৮ জন এই ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে, নারীদের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা প্রায় ১১জন, যা পুরুষের ক্ষেত্রে ৫-৬। সাধারণত যুদ্ধের মধ্যে থাকা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এই হার বেড়ে যায় ২০-৩০%। আবার জীবনে সবাইই কোন না কোন সময়ে এই রোগের শিকার হয়ে থাকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, শৈশবে অবহেলার শিকার হওয়া পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হবার মূল কারণ। পুরুষের ক্ষেত্রেও ছোটবেলায় অবহেলা কিংবা শারীরিক নির্যাতন, যুদ্ধকালীন ভয়াবহ স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা এই রোগের কারণ।

প্রতিকারঃ
এই রোগের প্রতিকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই। এরপরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনেরা। নিজে সহজ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করা, নিজের ইস্যুগুলো নিয়ে বিশ্বস্ত কারও সাথে কথা বলা, নিয়মিত খাওয়া ও ব্যায়াম করা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মাধ্যে দ্রুত এই মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এছাড়াও সাইকোথেরাপী, কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপী (সিবিটি), EMDR (Eye Movement Desensitisation & Reprocessing) থেরাপী, গ্রুপ থেরাপী ও মেডিকেশন খুবই কার্যকরী।

(Cognitive Behavior Therapy)
(Eye Movement Desensitization & Reprocessing)

 

লিখেছেন – চয়ন