চঞ্চলতার ডিসঅর্ডার

Share


রাতুলের বয়স সাত। তার বাবা-মা তাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত। কারণ এ নিয়ে ২ মাসের মাথায় ৫ম বারের মত রাতুলের শিক্ষক তার বাবাকে স্কুলে ডেকে তার নামে অভিযোগ দিয়েছে যে সে খুব চঞ্চল। রাতুল ক্লাসে অনেক কথা বলে। প্রায়ই শিক্ষকের দিকে মনোযোগ না দিয়ে কাগজ নিয়ে খেলতে থাকে। শিক্ষক তাকে ধমক দিলে সে নিজেও তার জিদ প্রকাশ করে। ক্লাসে সে বড়ই অধৈর্য। ঠিকমত ক্লাসের কাজ করেনা। খাতাপত্র হারিয়ে ফেলে। এই শুনে রাতুলের বাবার মনে পড়লো আসলেই তো! রাতুল গত এক মাসে ১১ বার তার পেনসিল রাবার হারিয়ে ফেলেছে, বাংলা বই এই নিয়ে ৩বার কিনে দেয়া হয়েছে। শিক্ষক রাতুলের বাবাকে পরামর্শ দিলেন রাতুলকে নিয়ে কোনো একটি মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে।

ADHD বা Attention Deficit hyperactivity disorder কে বাচ্চাদের মধ্যে অন্যতম একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি সাধারণত বাচ্চাদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় তবে এর বিস্তৃতি বড়দের মধ্যেও পাওয়া যায়। ADHD তে আক্রান্ত বাচ্চারা সাধারণত কোনোকিছুতে মনোযোগ ধরে রাখতে বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়ে। অনেকসময় দেখা যায় নিজদের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয় কিংবা অতিচঞ্চল স্বভাবের হয়ে থাকে।

লক্ষণঃ কিভাবে বুঝবেন আপনার বাচ্চা ADHD তে আক্রান্ত? বাচ্চাদের মধ্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা কিংবা চঞ্চলতা খুবই স্বাভাবিক একটি জিনিস। তবে এই ADHD তে আক্রান্ত বাচ্চাদের মধ্যে এই চঞ্চলতা কিংবা মনোযোগহীনতা খুব প্রকট ভাবে দেখা যায়। কিছু লক্ষণ হলো- মনোযোগ হারিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখা, যেকোনো বিষোয় নিয়ে প্রচণ্ডরকমের অধৈর্য হওয়া, যেকোনো কিছু ভুলে যাওয়া, স্কুলে কিংবা স্কুলের বাইরে বারবার জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা, জিদ দেখানো, অন্যদের সাথে সহজে মিশতে না পারা। ADHD বাচ্চার স্কুল এবং বাইরের পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সমস্যার সৃষ্টি করে বিধায় বাচ্চাদের মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে তাকে শুধুমাত্র “আরে ও একটু চঞ্চল, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে” ইত্যাদি বলে অবহেলা করা উচিত নয়।

বাচ্চাদের ভিতর সাধারণত তিন ধরণের ADHD দেখা যায়। ১) প্রিডমিনেন্টলি ইনএ্যাটেনটিভ প্রেজেন্টেশনঃ এখানে বাচ্চারা তাদের যেকোনো কাজ সম্পন্ন করতে অসুবিধা বোধ করে। মনোযোগ দিতে পারেনা অথবা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনা। খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, স্কুলের রুটিন কিংবা ক্লাসের কাজ ভুলে যায়।  ২) প্রিডমিনেন্টলি হাইপার এ্যাক্টিভ-ইম্পালসিভ প্রেজেন্টেশনঃ এখানে বাচ্চাকে অতিরিক্ত উসখুস করতে দেখা যায়। কোনো একজায়গায় সে স্থির হয়ে বসতে পারেনা; অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। সারাক্ষণ দৌড়-ঝাঁপের মধ্যে থাকতে দেখা যায়। স্কুলে অন্যদের কাজে অনবরত বিঘ্ন ঘটানো, অন্যদের জিনিসপত্র কেড়ে নেয়া, নির্দেশনা মানতে না চাওয়া কিংবা অধৈর্য হয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এরকম অতিচঞ্চলতা বাচ্চার নিজের এবং তার আশেপাশের মানুষের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ৩) কম্বাইন্ড প্রেজেন্টেশনঃ প্রথম দুই ধরণের লক্ষণগুলো সমানভাবে বাচ্চার মধ্যে প্রকাশ পায়। সময়ের সাথে লক্ষণগুলোর মাঝে বেশ পরিবর্তন দেখা যায়।

ADHD কেন হয়? বিজ্ঞানীরা ডিসঅর্ডারটির মূল কারণ বের করতে না পারলেও মূলত জেনেটিক সমস্যাকে ADHD এর জন্য দায়ী করেছেন। ব্রেইনে ডোপামিন ট্রান্সমিশনের পরিমাণ কম হওয়া ছাড়াও আরো কিছু কারণকে বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক ভাবে ADHD এর জন্য দায়ী করেন। যেমন- ব্রেইন ইঞ্জুরি, গর্ভাবস্থায় মায়ের এ্যালকোহল কিংবা অন্যান্য ড্রাগের সাথে জড়িত থাকা, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি, জন্মের সময় বাচ্চার ওজন কম থাকা ইত্যাদি। বাচ্চার ADHD এর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত টিভি দেখা, প্যারেন্টিং স্টাইল কিংবা আশেপাশের পরিবেশের সম্পৃক্ততা থাকার কথা বিজ্ঞানীরা অস্বীকার করলেও এগুলো ADHD এর লক্ষণগুলোর প্রবলতা বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে বলে কিছু গবেষণাই পাওয়া যায়।

চিকিৎসাঃ সাধারণত ADHD এর চিকিৎসা হিসেবে মূলত বিহেভিয়ার থেরাপি এবং মেডিকেশনকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। ৪-৫ বছর বয়সীদের জন্য থেরাপী, এবং বাচ্চার বাবা-মার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকেই প্রাথমিক চিকিৎসা বলে মনে করা হয়। এছাড়া ডিসঅর্ডারটির প্রাবল্যতা অনুসারে পরবর্তীতে বাচ্চাকে মানসিক চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে তার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

ADHD তে আক্রান্ত বাচ্চারা সাধারণত হীনমন্যতায় ভুগে থাকে কারণ তারা কারো সাথে সঠিকভাবে মিশতে পারে যার কারণে তাদের বন্ধু সংখ্যা নাই বললেই চলে। এবং পরবর্তীতে তাদের ডিপ্রেশনে ভোগার সম্ভাবনার হার খুব বেশি। তাই তাদের সাথে তাদের পরিবার এবং আশেপাশের মানুষের সহযোগিতাই পারে তাদের জীবন অনেকখানি সহজ করে দিতে।সুস্থ থাকা প্রত্যেক বাচ্চার জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। এবং যখন বাচ্চাটি ADHD ডিসঅর্ডার সম্পন্ন তখন তার জন্য এটির গুরুত্ব আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। থেরাপী কিংবা মেডিটেশনের পাশাপাশি একটি সুস্থ জীবনধারা বাচ্চাকে ADHD এর লক্ষণগুলোর সাথে মানিয়ে চলতে সাহায্য করে।

নুজহাত জাহানারা

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share