বয়ঃসন্ধির গল্প

Share

একটা জীবনের শুরু হয় কতগুলো অসাধারন ঘটনার মাধ্যমে। মায়ের পেটে ছোট্ট ভ্রুণ অবস্থা থেকে আমাদের জন্ম। একটি শুক্রাণুর সাথে একটি ডিম্বানুর একত্রিত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় একটি নতুন প্রাণ, একটি নতুন শিশু। এই শিশু অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং একদম শেষে মৃত্যু। কিন্তু শিশুটির এই অবস্থায় আসার পূর্বে পেরোতে হয় কিছু ধাপ। আর এই ধাপগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোর। মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন বয়ঃসন্ধিকে একটা আলাদা ধাপ হিসেবে দেখা হলেও, পূর্বে কিন্তু তা ভাবা হত না।

১৮০০ শতকের শুরুর দিকে ভাবা হত শিশুরা হুট করেই “বড় মানুষে” পরিণত হয়। তাদের তখন বড় মানুষদের মত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই চিন্তা ধারার পরিবর্তন আসে শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে। সেসময় বিভিন্ন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হওয়ার কারণে কাজ গুলো ক্রমশ জটিল হওয়া শুরু করে। তাই এই হুট করে বড় মানুষদের দায়িত্ব নেয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সময় দরকার হয় কৈশোর বয়সের ছেলে বা মেয়েটির। তখনই উদ্ভাবিত হয় বয়ঃসন্ধির ধারণাটি।

 

কিভাবে বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরকাল চেনা যায়?

কিশোর বয়স মানুষের জীবনের এমন একটি সময় যখন একজন শিশুর প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য এবং বিকাশগত উন্নয়ন। এ সময়ে একজন ব্যাক্তি নতুন নতুন জ্ঞান এবং দক্ষতা অর্জন করে, কিভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রনে রেখে অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা যায়, এবং সেইসকল গুণ এবং দক্ষতা অর্জন করে যা তাকে তার কিশোর বয়সকে উপোভোগ করতে সাহায্য করে এবং একইসাথে তাকে প্রাপ্তঃবয়স্ক হওয়ার পথের যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে। সব সমাজে বা দেশেই একজন শিশু আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে যে পার্থক্য আছে তা চিহ্নিত করতে পারে। এখন শিশু থেকে বড় হওয়ার যে রূপান্তর তা কিভাবে হয়, কখন হয়, কিভাবে তা বোঝা যায়- সবকিছু নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সমাজ তা কিভাবে দেখে তার উপর। অতীতে দেখা যেত বয়ঃসন্ধির ধারণাটা তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সাথে দেখা দেখ, এখন আবার দেখা যাচ্ছে বয়ঃসন্ধি কালীন সময়টার ব্যপ্তি বেড়েছে।

বয়স বয়ঃসন্ধির সম্পূর্ণ গল্প নয়।

যদিও বা বয়স দ্বারা বয়ঃসন্ধিকে খুব সহজেই সংজ্ঞায়িত করা যায়, কিন্তু এর মাধ্যমে কিশোর বয়সের পুরো চিত্রটা ফুটে উঠে না। বরং আমরা বয়সকে এই সময়ের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলতে পারি। আরো ভালভাবে বলা যায়, বয়স দ্বারা শারীরিক এবং জৈবিক বিভিন্ন পরিবর্তনকে মূল্যায়িত এবং তুলনা করা যায়। এই ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুলো সকল সমাজের ক্ষেত্রে একইরকম প্রায়। কিন্তু সামাজিন যে রূপান্তর গুলো এই বয়সে এসে দেখা যায়, তার পার্থক্য দেখা যায় সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে।

বয়ঃসন্ধি শারীরিক পরিবর্তন।

বয়ঃসন্ধি মানব জীবনের অত্যন্ত ক্ষিপ্র একটা ধাপ। যদিওবা অধিকাংশ শারীরিক পরিবর্তন একটা নির্দিষ্ট ধাপ মেনে চলে, কিন্তু এই ধাপ শুরু হওয়া বা শেষ হওয়াটা কিছু ক্ষেত্রে সমাজ ভেদে ভিন্ন হয়। কোনো সমাজে দেখা যায়, শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়ে যায় ১১/১২ বছরে, আবার কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় তা শুরু হতেই সময় নেয় ১৩/১৪ বছর। আবার মেয়েদের এবং ছেলেদের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যেও পার্থক্য দেখা দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন ছেলেদের পূর্বে শুরু হয়। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের উচ্চতা এবং ওজন হুট করে বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। যেই ছেলেটা বা মেয়েটা শিশুকালে সবার খাটো ছিল, দেখা যায় এ বয়সে এসে হঠাৎ করে তার উচ্চতাই সবার চেয়ে বেশি! গলার স্বরের পরিবর্তন, লোম বৃদ্ধি এসবও এই বয়সে এসে শুরু হয়।

বয়ঃসন্ধিঃ নিউরোডেভেলপমেন্টাল (neurodevelopmental) পরিবর্তন।

গুরুত্বপূর্ণ নিউরোডেভেলপমেন্টাল পরিবর্তনগুলো এই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে এসে দেখা দেয়। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে অনেক ক্ষেত্রেই হরমোনের পরিবর্তনের সংযোগ থাকলেও, তা পুরোপুরি হরমোনাল পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে এই বিকাশ সংঘটিত হয়। যেমন লিম্বিক সিস্টেম, যা কিনা আনন্দ লাভ এবং পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া, আবেগীয় নিয়ন্ত্রন, ঘুম নিয়ন্ত্রন ইত্যাদির সাথে যুক্ত। একই সময়ে প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সেও পরিবর্তন দেখা দেয়। যা কিনা বিভিন্ন কার্যনির্বাহী ক্রিয়া যেমন, ডিসিশন নেয়া, সংগঠিত করা, রাগ নিয়ন্ত্রন এবং ভবিষৎ পরিকল্পনার জন্য দায়ী। প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্সে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন গুলো লিম্বিক সিস্টেমে পরিবর্তনের পরে হয়।

বয়ঃসন্ধিঃমানসিক এবং সামাজিক পরিবর্তন।

হরমোনাল এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল যে সকল পরিবর্তন গুলো ঘটে থাকে তার সাথে সাইকোসোশাল এবং ইমোশনাল পরিবর্তন গুলো সংযুক্ত। জীবনের দ্বিতীয় দশক থেকে কিশোর এবং কিশোরিদের যুক্তিগত এবং নৈতিক দক্ষতার শক্তিশালী বিকাশ ঘটে। একই সাথে তারা ভাবগত চিন্তন এবং যুক্তিযুক্ত রায় করতে আরো সমর্থ হয়। কিশোরদের আশে পাশের পরিবেশ তাদের অভ্যন্তরীন এবং মানসিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। আবার একই সাথে কিশোরদের অভ্যন্তরীন পরিবর্তন গুলো প্রভাব ফেলে তাদের আশেপাশের পরিবেশের ওপর। বহিরাগত প্রভাব গুলো সমাজ এবং সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন হয়। সামাজিক মূল্যবোধ এবং আদর্শ, পরিবর্তিত ভূমিকা, দায়িত্ব, সম্পর্ক, প্রত্যাশা ইত্যাদি সবকিছু ভূমিকা রাখের কিশোরটির মানসিক পরিবর্তনের উপর। এই সময়কালকে অনেকেই “ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ” সময় বলে দাবী করেন। কারণ এ সময় একজন কিশোরের মনের মধ্যে চলে অনেক প্রশ্নের ঝড়। নানারকম শারীরিক মানসিক পরিবর্তন তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিদ্ধ করে তুলে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মত মানুষ তারা পায় না। অনেক সময় এই পরিবর্তন বুঝে উঠতে উঠতে মেনে নিতেও তার সময় লাগে। না পারে বড়দের সাথে মিশতে, না পারে একদম ছোটদের মত করে থাকতে। হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় অন্যের প্রতি ভাললাগা। এ সময়টায় কিশোররা একটা “বিপ্লবী ধাপ (Rebel phase)” পার করে। নিজের এবং আশে পাশের মানুষজনের সাথে মনোমালিন্য আর বোঝা পরার অভাব দেখা দেয়। যা এই বয়ঃসন্ধি পার হতে হতে স্থিতীশীল পর্যায়ে চলে আসে।

স্বাস্থ্য এবং আচরণের ওপর বয়ঃসন্ধির প্রভাব।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বয়ঃসন্ধি কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অব্দী বিভিন্ন রোগের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। যেমন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক অসুস্থতা এবং আঘাত ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে সকল স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়, যার মধ্যে বিভিন্ন পদার্থ ব্যবহার ঘটিত ব্যাধি, মানসিক ব্যাধি এবং আঘাত ইত্যাদি কৈশোরের জৈবিক পরিবর্তন এবং পরিবেশের প্রভাবকেই প্রতিফলিত করে। অধিকাংশ স্বাস্থ্য ঘটিত সমস্যা যা বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে দেখা দেয়, তা বর্তমান এবং ভবিষতের স্বাস্থ্যগত সমস্যাকেই নির্দেশ করে। যেমন মদ্যপান জনিত সমস্যা কিংবা স্থুলতা, বরতমানেও যেমন শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে, একই সাথে তা ভবিষত্যেও স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতি নির্দেশ করে।

বয়ঃসন্ধিকালীন বৈশিষ্ট্য।

বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যেই পরিবর্তন গুলি দেখা যায় তা এই সময়ের নয়টি বৈশিষ্ট্যের প্রতি নির্দেশ করে যা স্বাস্থ্য গত নীতি এবং এই বিষয়ক কর্মসূচির উপর প্রভাব ফেলে।

১। বয়ঃসন্ধির ছেলে মেয়ে গুলো বিশেষ একটা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকে সবসময়।

২। সকল বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েরা এক নয়। তাদেরকে সবসময় এক কাতারে ফেলা যাবে না।

৩। কিছু কিছু কিশোর/ কিশোরী একটু বেশিই আবেগী।

৪। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলে মেয়েদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৫। বয়ঃসন্ধিকালীন বিকা সারাজীবনের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

৬। এ বয়সের ছেলে মেয়েরা কিভাবে চিন্তা করে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে তা নির্ভর করে বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন গুলোর উপর।

৭। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে যে পরিবর্তন গুলো হয় তা বুঝতে হবে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলে মেয়েদের।

৮। পজিটিভ প্রভাব ফেলার লক্ষ্যে প্রাপ্ত বয়স্কদেরও এ সময়ের পরিবর্তন গুলো সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

৯। জনস্বাস্থ্য এবং গণ অধিকার বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশের সাথে একই বিন্দুতে মিলিত হয়।

 

বয়ঃসন্ধি একটি সংকটময় সময় সবার জীবনে। এই সময়ের সঠিক বিকাশই পরবর্তী জীবনের জন্য একজন ব্যাক্তিকে তৈরি করে দেয়। এই বয়সটা অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। শারীরিক, জৈবিক, মানসিক সকল পরিবর্তনকে সামলাতে সামলাতেই দিন চলে যায়। এই সময় তারা চায় একটু ভালবাসা, একটু অধিক মনোযোগ, একটু যত্ন, মন দিয়ে তাদের কথা শোনার মত একজন মানুষ। এ টুকু যদি আমরা তাদের দিতে পারি তাহলেই বয়ঃসন্ধিকালীন সময়টা এতটাও সংকটময় হয়ে উঠে না।

 

লিখেছেন – অর্থি

Loved this article? Share with your community and friends.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Share