চিন্তার কাছে দাসত্ব

Share

১)ফাইজা ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। তার বন্ধু সংখ্যা খুব কম। আরাফ সবসময় ওর সাথেই থাকে। ফাইজা মেয়েটা সবসময় সবকিছু নিয়ে Over confused  থাকে। রুটিন  থাকা স্বত্বেও আরাফকে ফোন দিয়ে কখন, কোন ক্লাস  সিওর হওয়া চাইই । প্রায়ই এমন হয় আরাফকে একটানা ২৫-৩০  বার কল দেয় ক্লাস  টাইম জানার জন্য । শুরুতে আরাফের ধারণা ছিল ওকেই শুধু এতবার কল দেয়,  বিরক্ত করে। কিন্তু ও সবাইকে  এতবার কল দেয়। ফাইজার আরেকটা সমস্যা হলো দরজার লক বার বার চেক করা। গত সপ্তাহে  Statistics ক্লাস মিস করেছে, বাসার গেইট বন্ধ করেছে কিনা তা সিওর হবার জন্য বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসায় ফিরে গিয়ে দেখে এসেছে গেইট  ঠিক মতো  বন্ধ করেছে কিনা। ফাইজা নিজের আচরণে প্রায়ই কষ্ট পায়।বাসার লোকজনও চায় ফাইজা আগের মতো হয়ে যাক।

২)আরাফের প্রতিবেশি মতিন আংকেল, কলেজের শিক্ষক। উনার একটি সমস্যা হলো বার বার হাত ধোয়া। ভদ্রলোক ৩ ঘন্টার মতো সময় নিয়ে গোছল করেন।উনার কাছে সবকিছু  অপরিষ্কার লাগে।  মোবাইল, টাকা, রিমোট ধরার পর বার বার হাত ধোয়া লাগে উনার । সহকর্মী বা বাসার সবাই উনার উপর খুব  বিরক্ত।

##ফাইজা বা মতিন আংকেল এক ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। যার নাম অবসেসিভ -কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার। যা সংক্ষেপে ওসিডি(OCD) নামে পরিচিত। যা চিন্তার কাছে দাসত্ব নামেও অবিহিত। এ রোগের লক্ষ্মণ গুলো হলোঃ

-বার বার একই কাজ বা একই চিন্তা করা,

-কোনো কাজ খুব বেশি নিখুঁত ভাবে করার চেষ্টা করা, বেশি দুশ্চিন্তা করা,

-হাত ধোয়া বার বার, ঘনঘন ঘর পরিষ্কার করা,

– পুরনো ও অদরকারি জিনিস জমিয়ে রাখা

-দরজার লক বার বার চেক করা ইত্যাদি।

কারণঃ

অনেক কারণে একজন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কারণ গুলো হলো –

১.হতাশা, মানসিক চাপ

২.বংশগত কারণেও অনেকে এ রোগে  আক্রান্ত হতে পারে

৩.মস্তিষ্কে বেশি পরিমাণে সেরোটোনিন থাকলে

৪.নিউরোট্রান্সমিটার এ ডিসফাংশন দেখা দিলে (ব্রেইন তখন বার বার একই কাজ করতে  সিগন্যাল দেয় )

চিকিৎসা:

১)মেডিটেশন, যোগ ব্যায়াম খুব উপকারী রোগ নিরাময়ে কারণ এর মাধ্যমে রোগী তার অবসেসিভ ব্যবহার উপলব্ধি করে।

২)ব্যক্তিগত সমালোচনা পরিহার করতে হবে,রোগীকে বুঝাতে হবে একই কাজ বার বার করার কোনো দরকার নেই।

৩)ব্রেইনের ফাংশন স্বাভাবিক করতে ঔষধ নিতে হবে

৪) কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি :রোগীর আচরণে পরিবর্তন ঘটিয়ে রোগ মুক্তি। এ থেরাপি দুভাবে কাজ করে,

এক্সপোজার – যে বিষয়ে রোগীর মনে  খুঁতখুঁতে চিন্তা আসে তার মুখোমুখি করা রোগীকে।

রোগীকে বুঝানো অযথা চিন্তা করছে তুচ্ছ বিষয় বা কাজ নিয়ে।

রেসপন্স প্রিভেনশন – রোগী যে কাজটি বার বার  করতে চায় তা করতে না দেয়া।এবং বুঝানো কাজটি বার বার করার কোনো মানে নেই ।

অনেক সময়  রোগীকে ভালো করতে আর অবসেসিভ চিন্তা দূর   ডায়েরি লিখতে বলা হয়। পছন্দের কাজ বা বন্ধুদের বেশি সময় দিতে উৎসাহ দেয়া হয় ।

লিখেছেন – তাহমিনা সুলতানা ইভা

মাইন্ডফুলনেস – বর্তমানে থাকুন

Share

সাহানা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।প্রতিদিনের হাজারো কাজের চাপে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন।এই দিশেহারা অবস্থা থেকে বের হতে তিনি নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়েছেন।
কক্সবাজারের সুবিশাল জলরাশী ও অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে থেকেও সাহানা অস্থির হয়ে আছেন বিভিন্ন চিন্তা নিয়ে।তিনি ভাবছেন তার এই মুহুর্তে কক্সবাজার না এসে অফিসের কাজ করা উচিত ছিল,ছুটিশেষে সে কিভাবে এতকাজ একসাথে সামলে নিবে,এছাড়া আরো কত কাজ তার পরে আছে,আগেও সে কাজে ফাঁকি দিয়েছিল যার জন্য তাকে খেসারত দিতে হয়েছিল ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে তার নিজস্ব চিন্তার জগতে হারিয়ে গেলো এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য তার আর উপভোগ করা হয়ে উঠলনা।

একটু ভেবে দেখুন তো আপনার সাথেও কি এরকমটা হয়?

এমন অনেক সময় হয় যে আমরা কারো সাথে কথা বলছি,বা বই পড়ছি কিন্তু আমাদের মন পড়ে আছে নিজেদের চিন্তা,আশংকা,ব্যাকুলতা,আশা-হতাশা,উদ্বিগ্নতা ভবিষ্যত নিয়ে অথবা অতীতের স্মৃতিরোমন্থন নিয়ে।আর বর্তমান সময়ে আমাদের মোবাইল ফোন,সোস্যাল মিডিয়া,মেইল,টেক্সট ইত্যাদি অতি সহজেই আমাদেরকে অন্যমনস্ক করে তোলে।প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়গুলোতে অতীত আর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে করতে আমরা আমাদের বর্তমান মুহুর্তটিতে আর মনোযোগ দিতে পারিনা।

কিভাবে অতীত ও বর্তমানের হাজারো চিন্তা থেকে মনকে সড়িয়ে বর্তমানে ধরে রাখা যায়?

“মাইন্ডফুলনেস”যা আপনাকে আত্ম-পরিবর্তন ও আত্ম-সমৃদ্ধিতে সহায্য করবে।
কোন রকম বিচার বিবেচনা না করে বর্তমান মুহুর্তটিতে সজাগ থাকাই হলো মাইন্ডফুলনেস।
বর্তমান সময়টিই আসল।কিন্তু অতীত আর ভবিষ্যতের নানাবিধ চিন্তার কারনে বর্তমান সময়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়না।মাইন্ডফুলনেস আপনাকে বর্তমান সময়ে মনোযোগী ও দক্ষতাসম্পন্ন হতে সাহায্য করবে।

মাইন্ডফুলনেস একধরনের মেডিটেশন।বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরনের মাধ্যমে মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন করানো হয়ে থাকে।প্রতিনিয়ত প্র্যাকটিস করলে মনোযোগ বর্তমান মুহূর্তে ধরে রাখা সম্ভব।মাইন্ডফুল থাকা অবস্থায় আপনি দেখতে ও বুঝতে পারবেন বিভিন্ন চিন্তার জগৎ কিভাবে আপনাকে গ্রাস করে ফেলছে।যেহেতু মাইন্ডফুল অবস্থায় ক্লিয়ার মাইন্ডে থাকা হয় সেহেতু জীবনের বিভিন্ন প্রবলেমগুলোকে সহজভাবে দেখা যায়।

কেন আপনি মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস করবেন?

-মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস স্ট্রেস,এ্যাংজাইটি ও ডিপ্রেসন থেকে বের হয়ে আসতে অসাধারন ভূমিকা পালন করে।
-পর্যবেক্ষণ ও মনোসংযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
-আত্মনিয়ন্ত্রন ক্ষমতা বাড়ায়।
-মাইন্ডফুলনেস এক ধরনের মেডিটেশন যা প্রতিনিয়ত চর্চা করার ফলে আমার মতিষ্কের গঠনে পরিবর্তন আসে এবং শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
-শান্তিপূর্ণ ঘুমে এর ভুমিকা অনস্বীকার্য।
-বয়স্ক মানুষদের মধ্যে একাকীত্বতার হার কমায়।

আজকালকার দিনে যখন প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারনে আমাদের মনোযোগ ও দক্ষতা সঠিকভাবে ব্যাবহার করা কঠিন হয়ে উঠছে তখন এই মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস আমাদের জন্য হতে পারে আশীর্বাদ।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন,মানসিক স্বাস্থ্য,মানসিক প্রশান্তি ইত্যাদির উপর হাতকলমে শিক্ষা দিয়ে থাকে।আর আপনার হাতে যদি সময় কম থাকে তবে ইউটিউবে মাইন্ডফুলনেস রিলেটেড ভিডিওগুলো দেখে নিতে পারেন।
মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস একবার শুরু করেই দেখুন না জীবন কতটা সুন্দর হয়ে উঠে;জীবনের স্বাদ,গন্ধ,প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করা আসলেই কতটা আনন্দদায়ক।


অন্তরা অন্তু

মন খারাপই বিষন্নতা নয়

Share

‘দোস্ত, কিছুই ভাল্লাগেনা, আমি অনেক ডিপ্রেসড!’ বর্তমান সময়ে প্রায় মানুষের মুখেই এই কথাটা শোনা যায়। কিন্তু আসলেই কি সবাই ডিপ্রেশনের শিকার?

প্রায় সময়ই আমরা মন খারাপ থাকা (sadness) এবং বিষন্নতাকে (depression) এক করে ফেলি। কিন্তু বিষয় দুটি এক নয়। মানুষের মধ্যে basic কিছু আবেগ বা emotion থাকে, sadness তার মধ্যে একটি।  আমাদের মন ভালো থাকাটা যেমন খুব স্বাভাবিক, তেমনি মন খারাপ থাকাটা‌ও খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন, আপনার কোন একটা পরীক্ষায় আপনার ফলাফল খুবই খারাপ হল। সেদিন আপনার মন খারাপ থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? অথবা প্রতিদিনের প্রচুর ক্লাস, পড়া, টিউশন আর কাজের চাপের কারণে বা কর্মক্ষেত্রে বিরূপ পরিবেশের কারণে দিন শেষে কিছুই ভালো না লাগা। এখানে আপনার ভালো না‌ লাগার কারণ ডিপ্রেশন না, কাজের চাপ বা stress। পরবর্তীতে কাজের চাপ সামলানো শিখে গেলে আমরা অনেকটা স্বস্তি বা‌ আনন্দ বোধ করি। এখানেই মূলত মন‌ খারাপ আর ডিপ্রেশনের মধ্যে পার্থক্যটা। 

ডিপ্রেশন একটি ক্লিনিকাল ডিজঅর্ডার।  আমাদের শরীরে কোন অসুখ আছে কি না তার জন্য যেমন diagnosis দরকার, তেমনিভাবে ডিপ্রেশন নির্ণয়ের জন্যও কিন্তু diagnosis দরকার। ডিপ্রেশনের অনেকগুলো লক্ষনের মধ্যে একটি হচ্ছে sadness।  প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ডিপ্রেশনের শিকার মানুষ কোন কাজেই আনন্দ খুঁজে পায়না। প্রতিদিন আড্ডা দেয়া মানুষটা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া শুরু করে। প্রিয় সিরিজের নতুন এপিসোড রিলিজ হলে সবার মাঝে যে excitement কাজ করে, ডিপ্রেশনে থাকলে সেই excitement এর ছিটেফোঁটাও হয়ত কারও মাঝে দেখা যায়না। পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ পায়। নিজের প্রতি, নিজের জীবনের প্রতি মানুষ খুবই নেতিবাচক ও হতাশ হয়ে পড়ে এবং কাজ করার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।  খাওয়া, ঘুম, প্রতিদিনের ছোট বড় কাজে মানুষ অনিয়মিত হয়ে পড়ে । মানুষ নিজের উপর যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই লক্ষণগুলো টানা দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে থাকলে ব্যক্তি ডিপ্রেশনে ভুগছে বলে ধরা হয়। চারপাশে ঘটে যাওয়া কিছু আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি তারা প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনের শিকার ছিল।

মন খারাপ ডিপ্রেশন কেন হয়?

মন‌ খারাপের কারণ আমাদের সবারই জানা। কারও সাথে মনোমালিন্য হলে, প্রিয় কোন জিনিস হারিয়ে গেলে, প্রিয় দল খেলায় হারলে ইত্যাদি কারণে আমাদের মধ্যে যে আবেগ বা ইমোশনের উদ্রেক হয়  সেটা sadness। অপরদিকে ডিপ্রেশনের কারণগুলো বেশ‌ সূক্ষ্ণ ও জটিল। বিভিন্ন মানুষের ডিপ্রেশনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন এবং তাদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে কারণগুলোর বিস্তৃত ও সঠিক বর্ণনা প্রয়োজন।

মন খারাপ থাকা আমাদের প্রতিদিনের রুটিনকে বাধাগ্রস্ত করেনা, অপরদিকে ডিপ্রেশনে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম কাজ করার জন্যও যেন নিজের সাথে যুদ্ধ করা লাগে। আমাদের মন খারাপ থাকাটা সাময়িক। পছন্দের কোন কাজ করলে বা প্রিয়জনের সাথে সময় কাটালে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু ডিপ্রেশন দূর করার জন্য প্রফেশনাল হেল্প বা কাউন্সেলিং দরকার।

জীবনে ভালো থাকার তাগিদ অনুভব করতে একটু আধটু মন খারাপের দরকার আছে। একটা দিন খারাপ যেতেই পারে। তাকে বিষন্নতা না ভেবে ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে দেখাটা জরুরি।

লিখেছেন – সামিরা

দুশ্চিন্তার সাইক্লোন

Share

কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ফয়সাল। ছোট একটি কোম্পানীতে চাকরি করছে সে। তবে তার লক্ষ্য আরো বড়। সে নিজের একটি ফার্ম খুলে সেটি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। এই বিষয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। তবে ফয়সাল সবসময়ই তার জীবনের সবকিছুকে নিয়ে অধিক পরিমাণে চিন্তা করে। তার পরিবার, তার সোশ্যাল লাইফ, তার গার্লফ্রেন্ড, তার কাজ এবং সেটির ভবিষ্যৎ, নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো কত কী! তার ফ্যামিলিকে সময় দিতে পারছে কি না? গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কি না? বন্ধুরা তাকে নিয়ে কী ভাবছে? তার বস এবং ক্লায়েন্টরা তার কাজে সন্তুষ্ট কি না? তবে ইদানীং তার এই চিন্তাগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছে। তার শুধু মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু একটা হতে যাচ্ছে। হয়তো তার কোম্পানী তাকে বরখাস্ত করবে, হয়তো তার ক্যান্সার বা হার্টের কোনো রোগ হয়ে যাবে, বাবা-মার স্বাস্থ্যও ইদানীং ভেঙে পড়ছে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা তো একদমই হচ্ছেনা, গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঠিকমত কথা হচ্ছে না। সব কিছু ঠিকঠাক থাকবে তো? নাহ, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা! নিশ্চয় খারাপ কিছু ঘটবে, এই হয়তো দুঃসংবাদটা আসলো। চিন্তায় আর ভালো লাগছেনা, খাওয়া ঘুম সব হারাম হয়ে যাচ্ছে। নাহ, আর পারছেনা!

এই যে ফয়সালের এই দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ; এগুলোকেই আমরা সাধারণত এ্যাংজাইটি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। অবশ্য এ্যাংজাইটি যে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণের জন্য হতে হবে তা কিন্তু নয়। মাঝে মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই অথবা অনেকগুলো চিন্তা এক হয়ে আমাদের ভিতর একটু টেন্সড ভাব কিংবা আমাদের মধ্যে কোনো একটি বিপদের আশঙ্কা বা অস্বস্তি জাগিয়ে তোলে। এটিকে আমরা এ্যাংজাইটি বলতে পারি। এ্যাংজাইটি আমাদের নিত্যদিনের কাজ কর্মে অনেক বাধা দিতে পারে। এমন অনেক স্টুডেন্ট আছেন যারা কিনা পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে কিংবা রেজাল্ট কী হবে সেই টেনশনে পড়ালেখা শুরু করতে পারেন না। ফয়সালের যে লক্ষণগুলো আমরা দেখছি যেমন অনবরত দুশ্চিন্তা করা, কাজে মনোযোগের ব্যাঘাত, খাওয়ায় অরুচি, ঘুম কম হওয়া এগুলো সাধারণত এ্যাংজাইটি চিহ্নিত করে। আমরা প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো সময়ে এ্যাংজাইটিতে ভুগছি তবে এই লক্ষণগুলো কমপক্ষে ৬ মাস বিরাজ করলে আমরা বলতে পারি একজন জেনারেলাইজড এ্যাংজাইটি ডিজর্ডারে (জিএডি) ভুগছে। জেনারেলাইজড এ্যাংজাইটি ডিজর্ডার (জিএডি) বা এ্যাংজাইটিতে ভোগা নারী ও পুরুষের অনুপাত ২:১। অর্থাৎ প্রতি একজন পুরুষের অনুপাতে দুইজন নারী এই জিএডিতে ভুগে থাকে।  ৬% মানুষ জীবনে একবার হলেও এ্যাংজাইটিতে ভুগেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ যেমন প্রচুর ঘাম, ক্লান্ত লাগা, হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া, ঘনঘন পেটের পীড়াও জিএডির বহিঃপ্রকাশ। এ্যাংজাইটির কারণ নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও কিছু কারণ সহজেই নির্ণয় করা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির কারণে মানুষ জিএডির শিকার। যেমন আমরা দেখলাম ফয়সালের বেলায় তার চাকরি, পরিবার, সোশ্যাল লাইফ, গার্লফ্রেন্ড, অর্থনৈতিক অবস্থা প্রতিনিয়ত এতো ভাবাচ্ছে যে তার সাধারন জীবনযাত্রার ছন্দপতন ঘটছে। সাধারণত জিএডিতে ভোগা মানুষেরা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সম্মুখীন হন। এবং তারা যেকোনো বিষয় নিয়েই অতিভাবনা অর্থাৎ ওভার থিংকিং করে থাকেন। এই ওভার থিংকিং হচ্ছে এ্যাংজাইটির একটি বড় কারণ। তারা সচরাচর ক্লান্তি অনুভব করেন, যেকোনো কিছুতে মনোযোগ দেওয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, উল্লেখযোগ্য হারে ঘুম কমে যায়। এ ছাড়াও এ্যাংজাইটির কারণ হিসেবে ব্রেন কেমিস্ট্রি, ব্যক্তিত্বের ধরণ ও জেনেটিক্স জড়িত। বলা হয়, ব্রেনের অ্যামিগডালার অস্বাভাবিকতার কারণে ব্রেন কেমিস্ট্রি পাল্টে যায় যেটি এ্যাংজাইটি ডিজর্ডারের কারণ।

এ্যাংজাইটি থেকে বাঁচার কিছু উপায় আছে। দুশ্চিন্তাগুলো আমরা একটি নোট খাতায় লিখে ফেলতে পারি। কিছু বিষয়ে দুশ্চিন্তা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। নোট ডাউন করার মাধ্যমে বুঝা যাবে আসলেই চিন্তাটি যৌক্তিক কিনা, অযৌক্তিক চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলা এবং যৌক্তিক চিন্তাগুলো কীভাবে সমাধানের পথে আনা যায় একটা প্ল্যান করা। দুশ্চিন্তার কারণ ঘেটে দেখা এবং কীভাবে সমাধান করা যায়-এইসব চিন্তার মাধ্যমে  দুশ্চিন্তা অনেকটুকু কমেও যেতে পারে। জীবনে একটি প্ল্যান নিয়ে এগোলেও অনেকখানি দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা যায়।  জীবনে ইতিবাচক বা পজিটিভ মনোভাব রাখার মাধ্যমেও এ্যাংজাইটির মাত্রা কমে আসতে পারে। মেন্টাল এক্সারসাইজ যেমন মেডিটেশন করে নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। নিয়ন্ত্রিত জীবনে দুশ্চিন্তা খুব বেশি আঁকড়ে ধরতে পারে না। পজিটিভ চিন্তা দিয়ে জীবনের প্রতিকূলতা মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়। মাইন্ডফুলনেস চর্চার মাধ্যমেও এ্যাংজাইটি কমানো যায়। উপরের উপায়গুলো অনেক সময় এ্যাংজাইটি নাও কমাতে পারে। সেক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন থেরাপীর মাধ্যমে জিএডিকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন।  

সবশেষে, এ্যাংজাইটি বা দুশ্চিন্তা আমাদের জন্য ভালো কোনো ফল বয়ে আনে না। আমরা কেউই জানিনা আমাদের জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবা জ্ঞানীর কাজ হলেও অতিরিক্ত চিন্তা এবং এই দুশ্চিন্তা কখনোই ভালো কোনোকিছুর দিকে আমাদের ধাবিত করবেনা।

লিখেছেন – নুজহাত জাহানারা

HSC Exam :The বেসামাল চাপ!

Share

(১)

‘উফ্!!এবার আর এ+ পাব না। ‘

রাব্বির তাই মনে হচ্ছে। এপ্রিল থেকে তার পরীক্ষা শুরু হবে। ভালো কলেজের মেধাবী ছাত্র সে, প্রস্তুতিও খুব ভালো। সারাবছর রাতদিন এক করে পড়ালেখা করেছে। মা-বাবার প্রত্যাশা অনেক বেশি, একমাত্র ছেলে রাব্বি। সবার কথা মাথায় রেখে সে পরিশ্রম করেছে। অথচ পরীক্ষার সাত দিন আগে থেকে কিছুই পড়তে পারছে না। ভয় আর টেনশনের ফলে রাব্বি খুব হতাশ হয়ে পড়েছে। বই নিয়ে বসলেই মনে হয়,

– যদি Golden A + না আসে তবে কি হবে?

-যদি  MCQ কঠিন হয়?

 -ICT সহজ হবে তো? আর কত কী!

রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। ঘুমাতে গেলে দুঃস্বপ্ন দেখে। তাই সারারাত জেগে কাটাচ্ছে। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করতে পারছে না। মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। মা-বাবা তাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। বন্ধুরা বিরক্ত। সবারই তো পরীক্ষা। ‘রাব্বি কেন বেশি ভাব ধরছে?’-বন্ধুরা মিলে তাই ভাবছে। পরীক্ষা আসলে প্রতি বার এমন হয় তার।কিন্তু এবার বেশি টেনশনে আছে রাব্বি। সামনে যে ভর্তি পরীক্ষা!

খুব ভালো  করতে হবে। সবাই রাব্বিকে মানসিক ভাবে চাপ মুক্ত থাকার সুফল বোঝাচ্ছে। তবুও বেচারার টেনশন কমছে না।

(২)

ইমা পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত। টিউশনি করানো, বাসার কাজ সবই আগের মতোই করছে। পরীক্ষা আসলে প্রতি বার সে সব কাজ সময় মতো করার চেষ্টা করে। ইমা মনোযোগী ছাত্রী,  পড়ালেখা করে নিয়মিত। ফলে সবসময় খুবconfident থাকে। সব পরীক্ষা ভালো করবে, সে বিশ্বাস করে। সান্ধ্য আড্ডায় কম যাবে। আর টিভি দেখবে খুব কম পরীক্ষার সময়টায়। ফেসবুক চালানো বাদ দিবে। পড়ালেখা আর কাজে  ভারসাম্য আনবে। ইমা আরও বেশি নিয়মিত হবে পড়াশোনায়। পরীক্ষার চাপ তাকে  মনোযোগী করে তুলেছে।

আমরা প্রতিনিয়ত স্ট্রেস জিনিসটিকে নেগেটিভ ভাবেই দেখে থাকি। তবে আমাদের মধ্যে এই স্ট্রেস থাকাটাই স্বাভাবিক; কিন্ত খেয়াল রাখতে হবে সেই স্ট্রেসটা যেন পরিমিত পর্যায়ে থাকে। বেশি স্ট্রেসড হলে আমাদের নিত্যদিনের কাজ কর্মে ব্যাঘাত ঘটে। আবার অনেক সময় একদমই স্ট্রেস না থাকাটা আমাদের যেকোনো কাজে ডিমোটিভেট করতে যথেষ্ট। আমরা বলছি না প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে জোর করে স্ট্রেস আনতে হবে। অনেকেই আছেন যারা স্ট্রেসে থাকলে কাজ ভালো করেন। আবার অনেকে স্ট্রেসড না থাকলেই কাজে ভালো বোধ করেন। বিজ্ঞানীরা এই অপটিমাম স্ট্রেস লেভেল কে একটি গ্রাফের সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এখানে দেখানো হয় স্ট্রেস কিভাবে প্রোডাক্টিভিটি অর্থাৎ উৎপাদনের সাথে জড়িত। স্ট্রেস যত কম থাকে, “আরে ধুর, সমস্যা নাই, হয়ে যাবে, এত টেনশনের কিছু নাই” ইত্যাদি মনোভাব তৈরী হয়, অর্থাৎ মোটিভেশন কম থাকে, ফলে কাজ অথবা উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। আবার স্ট্রেস বেশি হলে “হায় হায় কী হবে” মনোভাব তৈরী হয়ে সমস্ত কাজটিকেই বিগড়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা গ্রাফটির মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই পরিমিত স্ট্রেস অনেক সময় একধরণের ভালো মোটিভেটর হিসেবে কাজ করে এবং ব্যক্তিকে প্রোডাক্টিভিটির দিকে ধাবিত করায়। পরিমিত স্ট্রেস আমাদের মধ্যে ঠিক যতটুকু টেনশন সৃষ্টি করে ঠিক ততটুকুই কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য মোটিভেট করতে থাকে। তখন আমরা কাজটি শুরু করি। সুতরাং বলা যায়, আমাদের জীবনে স্ট্রেস সম্পূর্ণ নেগেটিভ কোনো ফ্যাক্টরও নয়।

(৩)

পরীক্ষা তো কি? প্যারা নাই মামা!!

তুহিন পরীক্ষা নিয়ে মোটেও চিন্তিত  নয়। পরীক্ষা যতই কাছে আসছে সে ততই অনলাইনে থাকে। তুহিনের চিন্তায় বাসার সবাই অস্থির। মা বলেন – পড়াশোনা না করলে ছেলেটা ফেল করবে,আমি মানুষকে মুখ দেখাব কি করে!?  তাতে কি! সবার টেনশন তুহিন কে পড়ায় বসাতে পারে না। সে নিয়মিত ছবি আপলোডে ব্যস্ত। কতটা like আর react  হলো ছবিতে সে তা নিয়ে ব্যস্ত।পড়তে বসলে মনে হয় দুবছর তো আর কম পড়িনি। ভালো রেজাল্ট করতে একদিন পড়লেই হবে। So no tension, do furti।

ICT, Finance এ টেনেটুনে পাশ করেও ফাইনালে ভালো করার স্বপ্ন দেখে তুহিন। মা বাবা, বন্ধুরা যতই মোটিভেট করুক না, তাতে কোনো লাভ হয়নি।

পরীক্ষার আগে পড়লেই ভালো করা যাবে, তাই তুহিন মানসিক ভাবে কোনো চাপ অনুভব করছে না।

###উপরের গল্প গুলো থেকে বলা যায়, রাব্বি পরীক্ষা নিয়ে অনেক বেশি  চিন্তিত। সে High Stress level এ আছে। এ অবস্থায় সে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারছে না। বেশি ভালো করার চিন্তায়, স্বাভাবিক পড়ালেখাই চালিয়ে যেতে পারছে না।পরীক্ষার সময় অনেকের  এমন হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরীক্ষায়। যারা সব কিছুতে Stress নেয় বেশি, তাদের পক্ষে ভালো করে পড়ালেখা বা কাজ করা সম্ভব হয় না।

অপরদিকে, ইমা optimum stress level  এ আছে। এজন্য ইমার পক্ষে পড়াশোনা বা অন্যান্য কাজ চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হয় না। মানসিক চাপ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।  পরিমিত মানসিক চাপ  মনোযোগ বাড়ায়। ফলে মানসিক চাপ যে কাজ করার ইচ্ছে আর ক্ষমতা বাড়ায় তা প্রমাণিত হয়ে যায়।

যদি কোনো চাপ না থাকে কাজ করার সময় তবে কোনো কাজই  ভালো করে করা সম্ভব হয় না। তুহিনের বর্তমান চাপ মুক্ত চিন্তা তাকে পড়ায় মনোযোগী করতে পারছে না। মোট কথা তুহিন যদি মানসিক ভাবে পরীক্ষার জন্য চাপ অনুভব করে, তাতে পড়াশোনায় মন বসবে। তুহিন Low Stress level এ আছে, তার পক্ষে ভালো করা সম্ভব হবে না

তাই সবশেষে বলা যায়, রাব্বি কে মানসিক চাপ কমাতে হবে ভালো করার জন্য।

ইমা যেটুকু চাপ বা টেনশনে আছে তা থাকাটাই ভালো।

আর তুহিনের জন্য চাপ নেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

চাপ কমাতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমে যেসব বিষয়ে আমরা স্ট্রেস অনুভব করি দেখতে হবে সেগুলি কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় কিনা। এর মধ্যে না বলতে শেখা অন্যতম। যেগুলি আমাদের চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে সেগুলিকে না করার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই চাপমুক্ত থাকতে পারি। এমনকি যেই মানুষ আমাদের স্ট্রেসে ফেলে দেয় তাদেরও আমরা এড়িয়ে চলতে পারি যেমন পাশের বাসার আন্টি। চাইলেই আমরা আমাদের অবস্থানকে পরিবর্তন করে স্ট্রেস কমাতে পারি। আমাদের স্ট্রেসের কারণ আমরা কারো সাথে শেয়ার করার মাধ্যমে বা যারা আমাদের স্ট্রেসের পরিমান বাড়িয়ে দিচ্ছে তাদের জানানোর মাধ্যমে চাপমুক্ত থাকতে পারি। টাইম ম্যানেজমেন্ট করেও চাপমুক্ত থাকা যায় কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সময়মত কাজ না শুরু করার ফলে আমরা চাপে পড়ে যাই। যদি কোনভাবেই স্ট্রেস এড়ানো না যায় তাহলে স্ট্রেসের সাথে মানিয়ে নিতে পারি। স্ট্রেসের কারণ বা স্ট্রেসর কে নিজের সাথে ইতিবাচকভাবে মানিয়ে নিতে হবে। যেমন পরীক্ষার টেনসনে পড়া হচ্ছে না কিন্তু এটাও চিন্তা করা যায় যে এখন পড়তে না বসলে পরীক্ষা এমনিও খারাপ হবে তাই সময়মত পড়তে বসা যাতে পরীক্ষার ফল ভাল হয়। স্ট্রেস থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে গান শোনা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুর সাথে সময় কাটানো , আপনার যে কাজ করে আনন্দ পান সেগুলো করতে পারেন। অবশেষে যদি স্ট্রেস থেকে মুক্ত হবার কোন উপায় না পাওয়া যায় তাহলে কোন থেরাপিস্টের শরাপন্ন হতে পারেন।

সাধ্যের মধ্যে মন ভালো করার  পথ আছে। নিজেকে ভালোবাসুন, জীবন সুন্দর হয়ে যাবে রাতারাতি!!

লিখেছেন: তাহমিনা সুলতানা ইভা