হিউম্যানিস্টিক থেরাপি

Share

থেরাপি বলতে সাধারণত এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে যেখানে একজন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত, দক্ষ ও লাইসেন্সধারী থেরাপিস্টের সহযোগিতায় মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো, যেমন-বিভিন্ন মানসিক সমস্যা,মানসিক আঘাত ইত্যাদি সমাধান করার পাশাপাশি নিজের ইতিবাচক চিন্তাকে ত্বরান্বিত করা ও কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিকে দক্ষভাবে মোকাবেলা করার উপায়গুলোর দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলোর জন্যে থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের থেরাপি ব্যবহার করে থাকেন। এটি মূলত থেরাপিস্টের ব্যক্তিগত চয়েস, রোগীর সমস্যার ধরণ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে থাকে। মানসিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে সকল থেরাপি প্রদান করা হয় তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম জনপ্রিয়ও থেরাপি হচ্ছে ‘হিউম্যানিস্টিক থেরাপি’।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপি কি?

হিউম্যানিস্টিক থেরাপি হলো এমন একটি থেরাপি যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব অনুভুতিগুলো বুঝতে, তার জীবনের অর্থের অনুভূতি লাভ করতে এবং নিজের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকগুলো বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। একজন হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্ট কোন ব্যক্তিকে থেরাপিস্টের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে একজন সম্পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাকে দেখার চেষ্টা করে থাকেন। এ থেরাপিতে ব্যক্তির মধ্যকার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য এবং আচরণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে। তাছাড়াও ব্যক্তির সহজাত বৈশিষ্ট্য এবং আচরণগুলো তার নিরাময়ের ক্ষেত্রেও সাহায্য করে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি মানুষই জন্মগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ, সমবায় আচরণে বিশ্বাসী এবং গঠনমূলক।তারা বিশ্বাস করেন যে, মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্ভাব্যতা পূর্ণ করে থাকে। মানুষ তার প্রতিভা এবং সম্ভাব্যতাগুলোর স্বীকৃতি চায়। এজন্যে তারা নিজেদের দূর্বলতাগুলোর পাশাপাশি সবল দিকগুলোর জন্যেও অন্যের কাছে থেকে স্বীকৃতি আশা করে। এ ধরনের আচরণ মানুষকে সাহসী, স্বতঃস্ফূর্ত, এবং স্বাধীন হতেও সাহায্য করে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির লক্ষ্য

এ থেরাপির মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তির মাঝে তার নিজের সম্বন্ধে একটি শক্তিশালী সত্ত্বার সৃষ্টি করা, নিজের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে নির্ণয় করা যাতে করে সে তার জীবনের অর্থ বুঝতে পারে। এ থেরাপি ব্যক্তির স্বতন্ত্রতার উপর বেশি মনোযোগ দেয় এবং সেই সাথে নন- জাজমেন্টালভাবে ব্যক্তিকে থেরাপি দেয়া হয়ে থাকে।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির ইতিহাস

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব এবং বি.এফ. স্কিনারের আচরণবিধির সীমাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হিউম্যানিস্টিক মনোবিজ্ঞান প্রবল হয়ে উঠেছিল। সক্রেটিস থেকে রেনেসাঁস- এ পুরো সময়কাল জুড়ে নিজের দক্ষতাকে উপলব্ধি এবং প্রকাশ করার প্রক্রিয়া, এবং ব্যক্তিদের সৃজনশীলতা, প্রতিভা প্রকাশের উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিলো। ১৯৪৩ সালে মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো মানুষের চাহিদা এবং অনুপ্রেরণাগুলোর উপর ভিত্তি করে একটি তত্ত্ব প্রদান করেন।

Carl Rogers
Carl Rogers

পরবর্তীকালে, ১৯৪৬ সালে কার্ল রজার্স ‘Significant aspects of client-centered therapy’ বা ‘ক্লায়েন্ট-সেন্টারড থেরাপি’ নামে একটি প্রকাশনা প্রকাশ করেন।এতে তিনি এমন একটি থেরাপির উল্লেখ করেন যেখানে একটি উষ্ণ ও সহায়্ক পদ্ধতিতে ক্লায়েন্টকে মানসিক সেবা প্রদান করা হতো। অবশেষে, ১৯৫০ দশকের শেষের দিকে মনোবিজ্ঞানীরা আচরণগত মনোবৈজ্ঞানিক থেরাপিগুলোর নেতিবাচক দিকগুলো অনুধাবন করতে পারেন। এই নেতিবাচক দিকগুলো অনুধাবনের মধ্যে থেকেই মূলত হিউম্যানিস্টিক থেরাপির মূলভাবনার সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। আব্রাহাম মাসলো এবং কার্ল রজার্সের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে হিউম্যানিস্টিক মনোবিজ্ঞান এবং হিউম্যানিস্টিক থেরাপীর সূত্রপাত ঘটায় যা তৎকালীন সময়ে মনোবিজ্ঞানে “তৃতীয় শক্তি” হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

কখন হিউম্যানিস্টিক থেরাপি ব্যবহার করা হয়?

আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে কমন সমস্যাগুলো নিয়ে হিউম্যানিস্টিক থেরাপি কাজ করে থাকে। এটি একজন ব্যক্তির সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করে থাকে। এটি সাধারণত যে সকল বিষয়ের উপর কাজ করে থাকে, তা হলো-

  • ডিপ্রেশন
  • প্যানিক ডিসঅর্ডার
  •  উদ্বেগ
  •  পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার
  •  সিজোফ্রেনিয়া
  •  মাদকাসক্তি
  •  সম্পর্কের সমস্যা
  • পারিবারিক ইস্যু
  • ব্যক্তিগত উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি।

এ থেরাপি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, লিঙ্গ সম্পর্কিত সামাজিক পরিবর্তনের তত্ত্বগুলিতেও প্রয়োগ করা হয় । এছাড়াও যারা নিজেদের বর্তমান সত্ত্বা নিয়ে সন্তুষ্ট নন, নিজের সত্ত্বার পূর্ণতা সম্পর্কে অনুভূতিহীন এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে সন্ধিহান, তারা এ থেরাপি থেকে উপকার পেতে পারেন।

হিউম্যানিস্টিক থেরাপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

– সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন (Self-Actualization):

মানুষের তার নিজের পূর্ণ সম্ভাবনাকে উপলদ্ধি করতে পারাকেই মূলত এটি কেন্দ্র করে থাকে। মানুষ নিজে কি কি করতে সক্ষম তা বুঝতে পারা, জীবনের উদ্দেশ্য উপলদ্ধি করতে পারা, জ্ঞান আহরণ করা, তার নিজস্ব সত্ত্বাকে আলোকিত করা এবং নিজের এ আলোকিত সত্ত্বার মাধ্যমে সমাজের আর দশ জনের কল্যাণ করাকেই এটি নির্দেশ করে থাকে। থেরাপিস্ট ব্যক্তির মাঝে তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরো বেশি কার্যকর করে তোলার চেষ্টা করে থাকে।

– সমানুভূতিঃ

অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি,তার অনুভুতিগুলোর ব্যাপকতা,অবস্থান বোঝার ক্ষমতাকে সমানুভূতি বলা হয়ে থাকে।এটি হিউম্যানিস্টিক থেরাপির একটি অন্যতম অংশ।একজন হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টকে অবশ্যই সমানুভূতিশীল হতে হবে।এটি ব্যক্তি ও থেরাপিস্টের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়া সৃষ্টি করে থাকে যা থেরাপিকে কার্যকর হতে সাহায্য করে। এটি থেরাপিস্টকে যে কোন বিষয়ে ক্লায়েন্টের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে।সমানুভূতি ছাড়া থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের কাজ,চিন্তাগুলো বুঝতে অসমর্থ হয় এবং কেবলমাত্র থেরাপিস্টের দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্লায়েন্টকে দেখে থাকে যা এই থেরাপির আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

– ক্লায়েন্টকে শর্তহীনভাবে ইতিবাচক বিবেচনা করা :
ক্লায়েন্টকে নিঃশর্তভাবে বিবেচনা করার মাধ্যমে থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের প্রতি তার কেয়ার প্রদর্শন করে থাকে। এর মাধ্যমে ক্লায়েন্ট মনে করে যে, থেরাপিস্ট তার অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে ভাল বা খারাপ হিসেবে বিবেচনা করছে না, বরং তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ক্লায়েন্ট থেরাপিস্টের সাথে তার কথাগুলো শেয়ার করতে আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকে, ক্লায়েন্ট তার আসল অনুভুতিগুলো আরো ভালভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং ক্লায়েন্ট ও থেরাপিস্টের মাঝে এক উষ্ণ প্রফেশনাল সম্পর্কের সৃষ্টি হয়।

– ক্লায়েন্টের সাথে সত্যতা ও আন্তরিক যোগাযোগ বজায় রাখা

বিভিন্ন ধরনের হিউম্যানিস্টিক থেরাপি:
হিউম্যানিস্টিক থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের হিউম্যানিস্টিক থেরাপি ব্যবহার করে থাকে। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু থেরাপি হলো –
গেস্টাল্ট থেরাপি:
ফ্রেডরিক (ফ্রিৎস) পার্লস উদ্ভাবিত এ থেরাপিটি ব্যক্তির নিজস্ব সত্ত্বাকে চিনে নিতে, তার সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করে থাকে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে শেখে, নিজেকে মেনে নিতে শেখে। থেরাপিস্টরা এ থেরাপিতে সাধারণত ‘রোল প্লেয়িং’, ’স্কিলফুল ফ্রাস্ট্রেশন’ অনুশীলন করিয়ে থাকেন।
এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– সম্পর্কজনিত সমস্যা
– উদ্বেগ
– স্ট্রেস
– ডিপ্রেশন

ক্লায়েন্ট সেন্টারড থেরাপি:
এ থেরাপি ক্লায়েন্টের জন্যে একটি সহায়ক পরিবেশের সৃষ্টি করে থাকে যা তাদের আসল পরিচয় পুনরায় র্নির্মাণে সহায়তা করতে পারে। ক্লায়েন্টের আশেপাশের মানুষেরা তার যে কোন ব্যবহার বা কাজকে সবসময় ভাল বা মন্দ হিসেবে বিচার করে- এই দৃষ্টিভঙ্গিটি মূলত এ থেরাপিটির সৃষ্টিতে মুখ্য ভুমিকা রাখে। ক্লায়েন্ট তার নিজের সত্যিকার পরিচয় অনুধাবন করার মাধ্যমে নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে শেখে, চিনতে শেখে। একজনের সত্যিকারের পরিচয় পুনরায় র্নির্মাণের কাজটি সহজ নয় এবং এ জন্যে থেরাপিস্টকে অবশ্যই শর্তহীন ইতিবাচক ও সহানুভূতির কৌশলগুলির উপর নির্ভর করতে হবে।
এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– ডিপ্রেশন
– উদ্বেগ
– আত্মসম্মানবোধ কম হওয়া
– প্রচণ্ড শোকার্ত থাকলে
– ইটিং ডিসঅর্ডার
– নেশাজাত পানীয়তে আসক্তি

এক্সিস্টেনশিয়াল থেরাপি :
এ থেরাপিটি টেকনিক ভিত্তিক পদ্ধতির উপর জোর না দিয়ে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে কতিপয় ইস্যুগুলোকে সমাধান করার চেষ্টা করে থাকে। এ থেরাপিস্ট ব্যক্তিকে তার নিজের জীবনের ও জীবনের সমস্যাগুলোর দায়িত্ব নিজে নেবার জন্যে উৎসাহ দেয় এবং সেই সাথে জীবনকে বৃহৎ অর্থ ও মূল্যের সাথে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে।

সাইকোসিন্থেসিস:
চেতনার একটি উচ্চতর, আধ্যাত্মিক স্তর আবিষ্কার করা মূলত সাইকোসিন্থেসিসের লক্ষ্যে বলে বিবেচিত হয়।

সলিউশন ফোকাসড ব্রিফ থেরাপি:
এ থেরাপিকে সলিউশন ফোকাসড থেরাপি বা ব্রিফ থেরাপিও বলা হয়ে থাকে। এ থেরাপিতে ব্যক্তি জীবনে কি অর্জন করতে চায় তার উপর বেশি জোর দেয়া হয়ে থাকে। থেরাপিস্ট ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার নিজস্ব শক্তিগুলোকে এবং সীমাবদ্ধতাগুলোকে বের করতে পারে। যে সকল ব্যক্তি অত্যন্ত লক্ষ্য কেন্দ্রিক এবং যারা আসলেই নিজের মাঝে পরিবর্তন আনতে চায়, তাদের জন্যে এ থেরাপিটি সহায়ক হতে পারে।

কম্প্যাশন ফোকাসড থেরাপি:
এ থেরাপিটি ব্যক্তিকে তার নিজের প্রতি ও সেই সাথে অন্যের প্রতি সহায়ক ভঙ্গিতে অনুভব করতে ও ব্যবহার করতে শেখায়। এ থেরাপিটি প্রাত্যাহিক জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা শেখানোর পাশাপাশি আত্ম সমালোচনার প্রতি তুলনামূলক কম প্রবণ হতে সহায়তা করে।

এ থেরাপিটি মূলত যে সকল ইস্যু নিয়ে কাজ করে, তা হলো-
– শৈশবকালীন অবহেলা, অপব্যবহার এবং বুলিংয়ের শিকার হওয়া
– নিজেকে অন্যের চেয়ে কম হিসেবে মূল্যায়িত করা
– উদ্বেগ
– কাউকে বিশ্বাস করা সংক্রান্ত ইস্যু
– কখনোই নিরাপদবোধ না করা ইত্যাদি

এসকল কতিপয় হিউম্যানিস্টিক থেরাপির মাধ্যমে একজন দক্ষ থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলরের সহযোগিতায় একজন ব্যক্তি তার সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

 

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা

এক কাপ বিষণ্ণতা গিলে খেলো আমাদের।

Share

হৈমর জানালার কাঁচে প্রচণ্ড রকমের মন খারাপের একটা বিকেলের রোদ এসে পড়েছে। হৈমর তাই ভীষণ রকমের মন খারাপ। মন খারাপের পিছনে সঙ্গত কোন কারন নেই। দুপুরের দিকে হৈম একবার ঘুমিয়েছিলো। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই কেমন জানি ভালো লাগছে না। কেমন যেন হতাশ হতাশ লাগছে। অর্থহীন মনে হচ্ছে সবকিছু। এই গাঢ় বিষাদটা হৈমর স্বভাবে নিয়ত। মাঝেসাঝেই আজকাল এমন মন খারাপ হয়ে থাকে। কিন্তু খুব গভীরে তলিয়ে দেখতে গেলে আবিষ্কার করা যাবে, এই মন খারাপের পিছনে কোন শক্তিশালী কারন নেই। আদতপক্ষে ছোটখাটো কারনও নেই।

এই যে হৈমর মন খারাপ প্রসঙ্গ টেনে আনলাম। বিকেলের কাঁচে করলাম এক টুকরো বিষণ্ণতার গল্প। এখন যদি প্রশ্ন করি, বিষণ্ণতা কি? এর যথোপযুক্ত জবাব আমরা কয়েকটা প্রশ্ন করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে দেখি।

তো, বিষণ্ণতা কি? এক কথায় উত্তর হতে পারে, বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন হলো মানসিক ভাবে অসুস্থ অনুভব করা। আরো একটু গুছিয়ে বলা যায়, বিষণ্ণতা এক প্রকার মানসিক ব্যাধি যার কারনে কোন একটা ব্যাক্তির মন-মেজাজ চরমভাবে অবনতি ঘটতে থাকে। তখন আর কিছুই ভালো লাগেনা। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হয়না। কোন কাজ করতে ইচ্ছে হয়না। মারাত্মক অবস্থায় বিষণ্ণ ব্যাক্তির কাছে বেঁচে থাকাটাই হয়ে পড়ে প্রচণ্ড রকমের পেইনফুল। তখন তার ভীষণ রকম ভাবে মরে যেতে ইচ্ছে করে। কি ভয়ংকর কথা!

এরপরের প্রশ্ন। বিষণ্ণতা কেন হয়? জবাবে বলা যায়—বিভিন্ন রকমের ঘটনার ফলাফল হতে পারে বিষণ্ণতার পিছনে কারন। অফিসে অনেক খাটখাটনি করে একটা প্রজেক্ট দাড় করানোর পরে বসের ঝাড়ি খেলে বিষণ্ণতা আসতে পারে। অনেক পড়াশুনা করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলেও আসতে পারে! প্রেমে বিফল হয়ে আসতে পারে। আর দ্বিতীয় যে কারনে বিষণ্ণতা আসতে পারে সেটা হলো, একঘেয়েমিতায়। দিনের পর দিন একটা নির্দিষ্ট কাজ করেই যেতে যেতে কেউ হয়ে উঠতে পারে ডিপ্রেসড!

বিষণ্ণতা আসার পিছনের কারন না হয় বোঝা গেলো। এখন আমরা আরো একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করি। বিষণ্ণতা হয় কেমন করে? আরো একটু নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, মানুষ আসলে বিষণ্ণতা ব্যাপারটা অনুভব করে কিভাবে? এই যে আমাদের আনন্দের অনুভূতি হয়, ভয়ের অনুভূতি হয়, ঠিক তেমনই বিষণ্ণতার অনুভূতি হয়। এই অনুভূতি ব্যাপারগুলো কাজ করে আসলে কিভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য আমরা একটু মানুষকে কাটাছেড়া করবো। খুব গভীরে যাবো না। একটা লজিকাল পয়েন্ট থেকে আমরা বিষণ্ণতা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করবো। কারন আমরা যদি এটা জেনে ফেলতে পারি, ব্যাপ্তর হলো, না। পারিনা। একেবারেই কি পারিনা? উত্তর হলো, একেবারেই পারিনা এই কথাটা সত্য না। আমরা একটা ভুল তথ্য মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়ে একটা প্রভাব ফেলতে পারি। We can’t control but can put an effect.

বুঝিয়ে ভেঙে বলছি। মনে করি একটা বাজে ঘটনা ঘটলো। ধরা যাক রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে গেলো কারো। আমাদের দেশে তরুণ সমাজের কমন একটা সমস্যা। মস্তিষ্ক ঘটনাটা বিশ্লেষণ করে দেখলো ব্যাপারটা দুঃখজনক। একটা রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে গেলে মানুষের কষ্ট পেতে হয়। মস্তিষ্ক তখন অ্যামিগডালার রিসেপ্টরগুলো থেকে দুঃখের নিউরো ট্রান্সমিটারগুলো রিলিজ করতে থাকলো। সেগুলোর মাঝে রিয়্যাকশনের ফলাফলে যে বৈদ্যতিক তরঙ্গ উদ্ভব হলো, মস্তিষ্ক সেই তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারলো, এটা দুঃখের অনুভূতি। তখন ওই অনুভুতিটা অনুভব হতে থাকলো। এখন কেউ যদি অনবরত ভাবতে থাকে, একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেছে। তার রিলেশন ভেঙে গেছে। রিলেশন ভেঙে গেলে দুঃখ পেতে হয়, তাহলে সেই ব্যাপারটাই ঘটবে। সে দুঃখ পাবে।

কিন্তু কেউ যদি মস্তিষ্কে কায়দা করে এই তথ্যটা ঢুকিয়ে দিতে পারে, দুঃখের মত কোন ঘটনা ঘটেনি। কিংবা বিষণ্ণ হওয়ার কিছু নেই। স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, এই ব্যাপারটা ঘটতেই পারে। মস্তিষ্ক এই তথ্যটা গ্রহণ করে নিলে তার অ্যামিগডালা আর ওই হরমোন ক্ষরণ করবে না। কাজেই তার বিষন্নতার ওই বাজে অনুভুতিটা অনুভূত হবেনা।

তাহলে ব্যাপার যেটা দাঁড়ালো সেটা হলো, আমরা বিষণ্ণ হই কারন আমরা বিষণ্ণ হতে চাই। আমরা আনন্দ পাই কারন আমরা আনন্দ পেতে চাই। আমরা দুঃখ পাই কারন আমরা দুঃখ পেতে চাই।

কথা হচ্ছে, যেভাবে বলে ফেললাম, এই ব্যাপারটা কি তাহলে এতই সোজা। না, এত সোজা না। মস্তিষ্কে একটা অনুকূল তথ্য ঢুকিয়ে দিতে পারাটা সোজা কোন ব্যাপার না। আমাদের সাবকনসাস মাইন্ড এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কনসাস অংশ দিয়ে আমরা এই সাবকন্সাস এর উপর একটা প্রভাব ফেলতে পারি। That might help.

এখান থেকেই মেডিটেশন নামের একটা আলাদা রকমের আর্টস এর উদ্ভব। সাবকন্সাস মাইন্ডের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা অর্জন করা। কিন্তু আমরা আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে ছোটখাটো কিছু লাইফ হ্যাকিং শিখে রাখলে আলাদা করে মেডিটেশনের চর্চার আর দরকার পড়বে না।

প্রথমত সিরিয়াস ভাবে সব ব্যাপার গ্রহণ করার দরকার নেই। আমরা যে ইউনিভার্সে বাস করি সেখানে এনট্রপি বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্যাওস থিওরির মত করে এক গুচ্ছ ঘটনা প্রবাহ হয়। সেই কারনবশত যেকোন ঘটনা ঘটতে পারে। ঘটনাগুলো আমাদের নরমাল ভাবে গ্রহণ করে নেওয়া শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত যখনই মন খারাপ হবে, মস্তিষ্কের মাঝে এই ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দিতে হবে, আরেহ আমার মন খারাপ হ০রটা কাজ করে কিভাবে? আমরা অবশ্যই জেনে ফেলতে পারবো কিভাবে ব্যাপারটাকে কাজ না করানো যায়।

অনুভূতির প্রশ্ন সাপেক্ষে বলি, আমাদের হিউম্যান বডিতে আমরা যেকোন কিছু অনুভব করি অবশ্যই নিউরন বা স্নায়ুকোষের মাধ্যমে। আমাদের সম্পূর্ন হিউম্যান বডি কিংবা সম্পূর্ন মস্তিষ্ক জুড়েই কিছু কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হতে থাকে। এই কেমিক্যালগুলোকে বলা হয় নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ। নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজগুলোর মাঝে রিঅ্যাকশন সম্পন্ন হয়ে গেলে তার ফলাফল হতে পারে একটা বৈদ্যতিক সিগন্যাল বা ইলেকট্রনের ফ্লো। সেই সিগন্যাল স্নায়ুকোষের মাঝ দিয়ে সঞ্চরণশীল হয়ে নিউরাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে বিভিন্ন যায়গা পৌঁছে যায়। মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট অংশে সেই সিগন্যাল এনালাইসইস হয়ে আমরা বিভিন্ন রকমের অনুভূতি পেতে পারি কিংবা স্মৃতি সম্পর্কে অবগত হতে পারি অথবা পারি চিন্তা করতে।

কাজেই ইমোশন বা অনুভূতি যাই বলি না কেন, এই ব্যপারটা ঘটার পিছনে অবশ্যই কোন না কোন নিউরো ট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। নিউরো ট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মাঝে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন না ঘটলে বৈদ্যতিক সিগনাল তৈরি হবেনা। সেই সিগন্যাল নিরোনের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্কের একটা সার্টেইন অংশে পৌছাবে না। সেই সার্টেইন অংশে বৈদ্যতিক সিগন্যালটা এনালাইসিস হবেনা। কাজেই কেউ সেই ইমোশন সম্পর্কে কোন রকমের উপলব্ধি করার সুযোগ হবেনা।

আমাদের মানব মস্তিষ্কের একটা মূল্যবান অংশ আছে অ্যামিগডালা। এই অংশটা আমাদের যাবতীয় রকমের ইমোশনের চর্চা করে। অর্থাৎ মানুষের সুখ-দুঃখ, রাগ-ক্ষোভ, অভিমান-কষ্ট এইসব এনালাইসিস হয় এই অংশটাতে। এমনকি ভালোবেসে চুমু খেয়ে ‘ছিঃ যাহ!’ ওই ব্যাপারটাও মেটানোর দায়িত্বটা অ্যামিগডালার কাজ।

একটা মানুষ যখন প্রচণ্ড সুখের অনুভূতি অনুভব করছে, তার মানে তখন তার হিউম্যান বডিতে কিছু স্পেসেফিক নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মাঝে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন হচ্ছে। রিয়্যাকশন শেষে বৈদ্যতিক সিগন্যালগুলো নিউরাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে অ্যামিগডালাতে পৌছাচ্ছে। এবং সেখানে গিয়ে সিগন্যালগুলো এনালাইসি হয়ে মানুষটা সুখের অনুভূতিটুকু অনুভব করতে পারছে। কাজেই আমরা সোজা সাপটা ভাবে বলে ফেলতে পারি, আমরা যাকিছু অনুভব করি তাকিছু হলো কেমিস্ট্রি। কেমিক্যাল রিয়্যাকশন। বিষণ্ণতাও তাই। হিউম্যান বডিতে সার্টেইন কিছু নিউরোট্রান্সমিটার প্রোপার্টিজ এর মিলেমিশে এক কাপে বসে কফি খাওয়া।

তবে ডাক্তারি কথাবার্তা সারার সুবাদে একটু বলে নিই, শুধু যে অ্যামিগডালাতেই বিষণ্ণতা অনুভূত হয়—ব্যাপারটা এমন না। অ্যামিগডালা ঘিরে রাখে হাইপোথ্যালামাস নামের বিরাট একটা অংশ। এই যায়গাটাতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের মত ব্যাপারগুলো বিশ্লেষিত হয়। কেউ কেউ মনে করে বাইপোলার ডিস অর্ডার নামের যে ভয়বাহ মানসিক সমস্যাটা আছে, সেটাও হাইপোথ্যালামাসের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি।

আগেই বলেছি কিনা—এই যে আমরা নিউরো ট্রান্সমিটার নামে একটা ভারিক্কি শব্দ বলে চলেছি, এই জিনিসটাকে আমরা হরমোন নামে বেশি চিনি। যদিও কেবল মাত্র ‘হরমোন’ একাই সকল রকমের নিউরোট্রান্সমিটার নয়। যাহোক, হাইপোথ্যালামাস অংশটা পিটুইটারি গ্রন্থি আর এড্রেনাল গ্রন্থির সাথে মিলেমিশে একটা ট্রায়ো গঠন করে। যেটাকে বলা হয় হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-এড্রেনাল(HPA). এখান থেকে নির্গত হয় CRH নামের একটা হরমোন। পাটি বাংলায় নাম—কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং-হরমোন। তো এই ট্রায়ো থেকে যে হরমোনাল কার্যকালাপটা হয় সেটাই মানসিক চাপ কিংবা ডিপ্রেশনের পিছনে দায়ী বলে মনে করা হয়। সাদা ভাষায় আমরা যে ট্রায়োর কথা বললাম, সেই ট্রায়ো থেকে যদি হরমোনাল কার্যকালাপ সম্পন্ন হয়ে বৈদ্যতিক সিগন্যাল উৎপন্ন হতে পারে, তাহলেই একটা মানুষ বিষণ্ণতার অনুভূতি অনুভব করবে।

শুধু যে এই একভাবে বিষণ্ণতার অনুভূতি অনুভব হয় তা নয়, আরো অনেক রকমের থিওরি আছে। আরো অনেক রকমের গ্রন্থি আর হরমোনাল ক্রিয়াকালাপের ফসল হিসেবে একটা মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে।

এই পর্যন্ত যারা ধৈর্য ধরে পড়তে পেরেছে তারা মহাপুরুষ। এখন আর বায়োলজিক্যাল কথাবার্তা বলবো না।

মন বলতে আমরা যে ব্যাপারটা বায়োলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারি, তা হলো মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ করা অংশের সমন্বিত একটা সিস্টেম। অর্থাৎ নিউরো সিগন্যাল বিশ্লেষণ হওয়া অংশগুলোকে নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা। আমরা প্রতিনিয়ত যেসব ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়ে যাই। সেগুলো আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে। তার প্রেক্ষিতে গ্রন্থিগুলো থেকে বিভিন্ন রকমের হরমোনের ক্ষরণ হয়। হরমোনাল বিক্রিয়াগুলো জন্ম দেয় আমাদের সন্ধ্যের আকাশে অথবা জানালার কাঁচে যত খুঁচরো অনুভূতি জমা হয়, সেইসবের।

আমরা নাহয়, বুঝলাম অনুভূতি কি জিনিস। সেটা কাজ করে কিভাবে? সাথে সাথে একটু বোঝার চেষ্টা করলাম, বিষণ্ণতা ব্যাপারটা কি? বিষণ্ণতা আসেই বা কেমন করে। এখন কথা হলো, এই থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়টা আসলে কি?

এটাই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমরা আমাদের এতসব বিষণ্ণতা দূর করবো কিভাবে? সোজা ভাষায় কয়টা কথা বলার চেষ্টা করবো। প্রথম কথা হলো, আমাদের মাঝে যে নিউরো ট্রান্সমিটারের বিক্রিয়াগুলো হয়, এগুলো কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? উতনি তো। আমি তো ভালোই আছি। বিষণ্ণতার সময়গুলোতে নিজেকে বোঝাতে হবে, আমি বিষণ্ণতা অনুভব করছি না। বিপরীত একটা তথ্য ঢুকিয়ে দিতে হবে মস্তিষ্কে। এই যেমন আমি আনন্দ পাচ্ছি। কিংবা এখন এক কাপ কফি খেলেই আমার মন ভালো হয়ে যাবে।

পুরো ব্যাপারটাই মস্তিষ্কের মাঝে তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়ার চর্চা। সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আমরা বিষণ্ণ হই কারন আমরা বিষণ্ণতা অনুভব করতে চাই। একবার যদি নিজেকে বোকা বানিয়ে ফেলতে পারি, তাহলেই হ্যাকিং কমপ্লিট।

 

লেখা: শাহতাজ রহমান।


বিঃ দ্রঃ আগ্রহী পাঠকেরা নিচের লিংকটা পড়ে আসতে পারেন। এখানে ডিপ্রেশনের পিছনে মস্তিষ্কজনিত অসাধারণ একটা তথ্যমূলক আর্টিকেল লিখে রেখেছে হাভার্ড।

What causes depression?

 

শিশুর বিকাশ এবং ভাইগটস্কির তত্ত্ব কথা

Share

একজন শিশুর বিকাশ কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে? কেবলমাত্র তার শারিরিক বিকাশের উপর, পরিবারের সদস্যদের উপর নাকি শিশুর বিকাশে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকাও রয়েছে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাবার জন্য এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আলোকপাত করেন একজন রাশিয়ান মনোবিজ্ঞানী, লেভ ভাইগটস্কি। শিশুর বিকাশে তার দেয়া তত্ত্ব সম্পর্কে জানার আগে তার সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নেয়া যাক।

পরিচিতি

Image Source 

লেভ ভাইগটস্কি ১৮৯৬ সালে রাশিয়ার অরশা শহরে এক মধ্যবিত্ত ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৭ সালে তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক পাশ করেন। তিনি তার জীবদ্দশায় ২৭০টি বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল, অসংখ্য  লেকচার এবং অনেকগুলো মার্ক্স ভিত্তিক মনোবৈজ্ঞানিক,শিক্ষণ তত্ত্ব প্রদান করেন। তিনি ১৯৫৭ সালের জুন মাসে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৫৮ সালের আগে তার দেয়া তত্ত্বগুলো পশ্চিমা বিশ্বে সেভাবে প্রসার লাভ করতে পারে নি এবং ১৯৬০ সালের আগে তা প্রকাশিতও হয় নি।  ১৯৬২ সালের দিকে তার তত্ত্বসমূহ আমেরিকান মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে আগ্রহের জন্ম দেয়। তাকে “মোজার্ট অফ সাইকোলজি” বলা হয়।

ভাইগটস্কির তত্ত্ব

জ্ঞানগত বিকাশ বলতে সাধারণত একজন মানুষের শিশুকাল থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত যতগুলো চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরি হয়,সেই সবকটি প্রক্রিয়াকে একসাথে বোঝানো হয়ে থাকে, যেমন- কোন কিছু মনে করা, সমস্যা সমাধান করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ইত্যাদি। এছাড়া জ্ঞানীয় দক্ষতা বলতে এমন কিছু দক্ষতাকে বুঝায় যা সহজ থেকে জটিল- যে কোন ধরনের কাজ করতে সাহায্য করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আপনার মোবাইল ফোনটি  হঠাৎ বেজে উঠলো। মোবাইলের রিং টোন শুনে উত্তর দেওয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া, ফোনের উত্তর দেওয়া, মোটর দক্ষতা (ফোনটির রিসিভ অপশনটি সিলেক্ট করা), ফোনে কথা বলা এবং বোঝার জন্যে ভাষার দক্ষতা, ভয়েসের স্বর ব্যাখ্যা এবং সঠিকভাবে অন্য মানুষের সাথে আলাপচারিতার জন্যে প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা- এ সকল কিছুই জ্ঞানীয় দক্ষতার অন্তর্ভুক্ত।

শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে ভাইগটস্কির দেয়া তত্ত্বটিকে “সোশ্যাল লারনিং থিওরি” বলা হয়ে থাকে। এ তত্ত্বটির মূল প্রতিপাদ্য হলো,একজন শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তার পরিবার, চারপাশের পরিবেশ, তাকে প্রদানকৃত শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  শিশু সমাজ থেকে পাওয়া তার এ জ্ঞানকে একসাথে করে তার কাজ সম্পাদন করে। যদিও একটি শিশুর জ্ঞানগত বিকাশের সাথে সঠিক শারীরিক বিকাশ জড়িত তবে সামাজিক বিষয়ের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। ভাইগটস্কি যুক্তি দেন যে,মনোযোগ, স্মৃতি, যৌক্তিক চিন্তা, পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের মতো মানসিক কাজগুলোর উন্নয়নে সামাজিক পরিবেশকে একটি প্রাথমিক ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচনা করা যায় ।  

তার ভাষ্যে, তিনটি ধারণা শিশুর বিকাশের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে তিনি দাবী করেন, সেগুলো হলো-    

ক) শিশুর জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোকে যদি বিকাশগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে তাতে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা সহজেই বুঝা যায়।

খ) শব্দ, ভাষা ও বিভিন্ন ধরণের অভিব্যক্তি শিশুর মানসিক কাজকে সহজ এবং পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে।

গ) জ্ঞানীয় দক্ষতাগুলোর মূল উৎস হলো সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক- সাংস্কৃতিক পটভূমি। অর্থাৎ, শিশুর বিকাশকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজগুলো থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ শিশুর বিকাশের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়াও তিনি দাবী করেন যে, ভাষা শিশুকে তার জ্ঞানীয় কাজগুলোকে বুঝতে, আকৃতি প্রদানে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। এটি শিশুকে কোন কাজের পরিকল্পনা করতে ও সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করতে পারে।

শিশুর বিকাশ সংক্রান্ত ধারণা

এ তত্ত্বটিতে ভাইগটস্কি প্রদত্ত দাবীগুলোর সাথে কতগুলো অভিনব এবং প্রভাব বিস্তারকারী ধারণার কথা বর্ণনা করেছেন; যেগুলো হলো-

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট ( Zone of Proximal Development-ZPD)

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding)

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought)

ক) জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (Zone of Proximal Development- ZPD):

জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (জে.পি.ডি.) দ্বারা কতগুলো কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে যার মাঝে কিছু কাজ  শিশু একা একাই করতে পারে আবার কিছু কাজ আছে যা তার একার পক্ষে সম্পাদন করা কঠিন। দ্বিতীয় কথাটির ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, যে কাজগুলো বা সমস্যাগুলো শিশু নিজে নিজে সমাধান করতে পারে না, সে কাজগুলো করার জন্যে সে  যদি একজন দক্ষতাসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বা সমবয়সী শিশুর (যে ঐ কাজটিতে দক্ষ) কাছে থেকে কাজটি করার বা সমস্যাটি সমাধান করার ঠিক নির্দেশনা পায়, তবে শিশু আগে যে কাজটি নিজে করতে পারতো না, এখন তা সহজেই নিজে নিজে করতে শিখে যায়।

জে.পি.ডি. সম্পর্কে ভাইগটস্কি বলেছেন,

The distance between the actual developmental level as determined by independent problem solving and the level of potential development as determined through problem solving under adult guidance or in collaboration with more capable peers.” – (Vygotsky, 1935)

জে.পি.ডি.-এর দুটি লেভেল আছে – একটি হলো ‘Upper Limit’ এবং অপরটি হলো ‘Lower Limit’.

 

Upper Limit

একজন দক্ষ ব্যক্তির আওতাধীন থেকে শিশুর অতিরিক্ত দায়িত্ব নেবার লেভেলকে বোঝায়

শিশুর স্বাধীনভাবে এবং নিজে নিজে কোন সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর লেভেলকে বোঝায়

Lower Limit

 

একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। যেমন ধরুন, বুদ্ধিমত্তা পরিমাপক টেস্টের মাধ্যমে ২টি শিশুর মানসিক বয়স পরিমাপ করা হল এবং তাদের মানসিক বয়স ৮ বছর পাওয়া গেলো। ভাইগটস্কির মতে, এখানেই থেমে না থেকে কিভাবে শিশুটি তার চাইতে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করতে পারে সেই চেষ্টা করা উচিত। শিশুটিকে যদি আরো দক্ষ কারো মাধ্যমে শিশুটির চেয়ে বড় বয়সী শিশুদের মতো সমস্যা সমাধান করার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তবে শিশুটির মানসিক বয়স ১২ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

খ) স্ক্যাফোল্ডিং (Scaffolding): 

শিশুর নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে কাজটি করার জন্য বা কোন সমস্যা সমাধানের জন্য অধিক দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে যে সহযোগিতা দেয়া হয়, তাকে স্ক্যাফোল্ডিং বলে। এ ক্ষেত্রে শিশুটির বাবা, মা, শিক্ষক কিংবা ঐ সমস্যাটি সমাধানে তার চাইতে বেশি দক্ষ সহপাঠী প্রথমে তাকে সমস্যাটি সমাধান করার উপায় দেখিয়ে দেন, কিছু ক্লু বলে দেন এবং সমাধান করার সময় মুখে মুখে সমাধানটি বলতে থাকেন। এ প্রক্রিয়াটি দুই বা তার চাইতে বেশিবার শিশুকে দেখানো যেতে পারে। প্রয়োজনে শিশুকে প্রশ্নও করা যেতে পারে। অবশেষে, শিশুটিকে যখন কোন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে,তখন ভুল বা ঠিক নির্বিশেষে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে যাতে করে শিশু সমস্যা সমাধান করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সাথে শিশুর ভুলটি যেন তাকে ইতিবাচকভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখাটাও জরুরি। ধীরে ধীরে শিশুটি যখন নিজে নিজে সমস্যাটি সমাধান করার যোগ্য হয়ে পড়বে, তখন সহযোগিতার মাত্রা কমিয়ে দিতে হয়। অবশেষে কাজটি যখন শিশু সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে, তখন সহযোগিতা বা ক্লুগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে হবে। এ প্রসেসটিকে ‘ফেইডিং’ বলে।

গ) ভাষা ও চিন্তন (Language and Thought):

ভাইগটস্কি বিশ্বাস করতেন যে, শিশুরা ভাষা কেবলমাত্র সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে ব্যবহার করে না, বরং ভাষাকে তারা পরিকল্পনা, নির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকে। এ সকল কাজের জন্যে ভাষার এ  ধরনের ব্যবহারকে অভ্যন্তরীণ কথোপকথন বা ‘Inner Speech’ বলা হয়ে থাকে।

 

ভাইগটস্কির মতে, ভাষা এবং চিন্তন আলাদাভাবে বিকাশ লাভ করলেও পরে তা একত্রিত হয়ে যায়। শিশুরা সামাজিক যোগাযোগের জন্যে ভাষা ব্যবহারের আরো আগে থেকে সে তার নিজের চিন্তার উপর বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে।  প্রথমে শিশু তার চিন্তাকে মুখে উচ্চারণ করে প্রকাশ করে ফেলে,সাধারণভাবে বলতে গেলে, নিজের সাথে কথা বলে। ধীরে ধীরে সে তার চিন্তাকে সবসময় প্রকাশ না করে নিজের মাঝে রাখতে শিখে যায়। সাধারণত তিন থেকে সাত বছরের মধ্যকার সময়ে শিশু এ বিষয়টি শিখে ফেলতে পারে। ভাইগটস্কির মতে, যে শিশু  তার ভাষাকে যত বেশি তার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করে, সে শিশু সামাজিকভাবে ততো বেশি উপযুক্ত হয়,সামাজিক যোগাযোগে ততো বেশি দক্ষ হয়।

তবে শিশুকে নির্দেশনা দেয়া এবং সহযোগিতা করা সব সময় কোন কাজ শিখতে বা সমস্যা সমাধান করতে একই রকম সাফল্য আনবে- এমন কোন কথা নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। যদিও ভাইগটস্কির তত্ত্বটি শিশুর বয়সের সাথে আসা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে তেমনভাবে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি, তা সত্ত্বেও এটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুর জ্ঞানের নির্মাণে সমর্থন দেয়। অর্থাৎ, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশের ক্ষেত্রে শারীরিক বিষয়ের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশ, সহযোগিতা এবং নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।     

লিখেছেন – সাদিয়া সানজিদা অধরা