মন খারাপ জয়ের গল্প

Share

খুব সকালে যখন ঘুম ভাঙে পূর্ণ‘র ,তখন কিছুতেই ওর উঠতে মন চায় না, তবুও মনে মনে ভাবে কেউ যদি একটু আদর করে ঘুম ভাঙাতো …ঠিক এমন সময়ই মা গলা খাকরানি দিয়ে বলে উঠেন, ”আর কতোক্ষণ…… আমার অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে , নাস্তা রইল টেবিলে, খেয়ে নিয়ো“। পূর্ণ কিছুদিন হয় স্কুলে যেতে পারছে না… ওর খুব মাথা ব্যাথা , প্রায়ই শ্বাসকষ্ট হয়,মাঝে মাঝেই সারা শরীরে খিঁচুনি দিয়ে ওঠে ,স্কুলে গেলে আরও বাড়ে কিন্তু বাসায় থাকলে কি কমে ? কই বাসায় থাকলেও তো হয় … ওহহো কথায় কথায় বলাই হয় নি পূর্ণ‘র বয়স ৯, ওরা তিন ভাইবোন , বড় বোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভাইটি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র । ভাইবোনদের সাথে বয়সের যেমন তফাতটা বেশি ঠিক তেমনি মনের দূরত্বটাও কম যায় না । কেউ যেন ওকে বুঝতে চায় না আর মা-বাবা তো বলতেই না । স্কুলে যখন যেতো , ও আর যাইহোক অবহেলা ব্যাপারটা কোনমতেই মেনে নিতে পারতো না, কেউ বকলে বা বন্ধুদের সাথে ঝগড়া হলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো কিন্তু পূর্ণ স্কুলে যেতে চায় , বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতে চায়,সবার অনেক আদর চায় আর চায় একটু সময় , খুব কি বেশি চেয়ে ফেলেছে সে ?
কিন্তু বাস্তবটা ভিন্ন কারণ উপরের অনেককিছুই পূর্ণ‘র নিজস্ব চিন্তা যার আদতেও কোন ভিত্তি নেই। যেমন পূর্ণ‘র মা-বাবা চাকুরীজীবী হলেও তাকে অনেকটা সময় দেয়ার চেষ্টা করে কিন্তু মুশকিল হল যতক্ষণ কাছে থাকে ততোক্ষণ এটা করো না, ওটা ধরো না , বেশি বেশি পড় ,এইসব বলতে থাকে কিন্তু বেশি পরা-লেখা কেন করা দরকার তা বলেন না ,তাই সে তেমন উৎসাহও বোধ করে না ,ভাইবোনদের সাথে থাকলেও ওর সময়টা এমনই কাটে ।
পূর্ণ আসলে একজন কনভার্সন ডিসঅর্ডারের রোগী। এই রোগে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব এবং চাপ শারীরিক সমস্যায় রুপ নেয়। মনোচিকিৎসক তার রোগটি শনাক্ত করার পর কিছু ঔষধ দেন এবং একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছ থেকে সাইকোথেরাপি গ্রহণের জন্য পাঠান । নিয়মিত মনের জমে থাকা কষ্টের কথাগুলো মনোবিজ্ঞানীকে খুলে বলাতে সে কিছুটা হাল্কা বোধ করতে থাকে আর পাশাপাশি তার পরিবারকে একজন ৯ বছরের আবেগি শিশুর সাথে কেমন ব্যাবহার করা উচিত তা সেখানো শুরু করেন মনোবিদ এবং পূর্ণ ও পরিবার উভয়কে সাথে নিয়ে বসে তাদের মধ্যকার ভুলবোঝাবুঝিগুলো দূর করে সম্পর্কের মান উন্নয়নের চেষ্টা করেন , সেইসাথে পারিপার্শ্বিক সমাজে চলাফেরা করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলার অভ্যাস করা এবং কিছু কৌশল সেখানো হয় । সাইকথেরাপির নিয়মিত সেশন গ্রহণ এবং সেবনে পূর্ণ দ্রুতই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
পূর্ণ এখন ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল । সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে বন্ধের দিনগুলোতে পরিবারের সবার সাথে ঘুরতে বের হয় আর ভাইবোনদের সাথেতো বাসায় থাকলে সারাক্ষণই খুনসুটি করা হয় ,ওদের বাড়িটা যেন এখন সবসময় হৈ-হুল্লরে মুখর হয়ে থাকে। ওর কিছু ভালো বন্ধুও তৈরি হয়েছে তাছাড়া ক্লাসের সবার সাথেই ওর অনেক ভাব। টিচারও ওকে অনেক ভালোবাসে। পূর্ণ জয় করে ফেলেছে ওর মনের সব ভয় ।

কনভার্সন ডিসঅর্ডার সম্পর্ক এ আরও জানতে পড়ুন :

https://rx71.co/disease/conversion-disorder/

লেখক:

  1. জেসমিন মাহমুদা জুথি